
বঙ্গবন্ধর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য লেখ।
ভূমিকা : বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ৭ই মার্চের ভাষণ যেমন তাৎপর্যবহুল, তেমনি সুদূরপ্রসারী। পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব ভাষণ বিভিন্ন জাতির মুক্তিসংগ্রামের প্রেরণার মন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে তার মধ্যে ৭ মার্চ দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অন্যতম শ্রেষ্ঠত্বের আসন লাভ করে। এ ভাষণে যেমন যুদ্ধের দিক নির্দেশনা ছিল, তেমনি ছিল মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনলবর্ষী বাণী। এ ভাষণ আকস্মিকভাবে দেয়া হয় নি, এজন্য পূর্ব থেকেই গড়ে উঠেছিল আন্দোলনের একটা ধারাবহিক পটভূমি।
১৯৭১ সালের ৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে এক বেতার ভাষণে জানায় যে, সে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্বন্ধে জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা -OnlineRedingRoom (onlinereadingroombd.com)
ইয়াহিয়া খান এ ভাষণে বাংলার বিক্ষুব্ধ ও মুক্তিকামী মানুষকে দুষ্কৃতিকারী আখ্যা দেন। তিনি ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা বললেও আসলে এটা ছিল তার কৌশল ও ভাওতাবাজি। গণহত্যার উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনার প্রয়োজনীয় সময় পাওয়ার জন্য ঐ ঘোসণা দেয়া হয়েছিল। এদিকে ৬ মার্চেও অসহযোগ আন্দোলন পূর্ণ গতিতে চলতে থাকে। অলি আহাদের সভাপতিত্বে পল্টন ময়দানে জনসভা হয়। এছাড়া মোজাফফর আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গণসমাবেশ। ঐদিন সাংবাদিক ইউনিয়ন, শিক্ষক সমিতি, মহিলা পরিষদ, ছাত্র ইউনিয়ন, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদি দল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করে। টঙ্গীর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে কাজী জাফরের সভাপতিত্বে বিশাল শ্রমিক সভা ও বিক্ষোভ মিছিল হয়। ছাত্রলীগ ৬ তারিখ সন্ধ্যায় বের করে মশাল শোভাযাত্রা।
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চঃ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে অত্যুজ্জ্বল এক দিন। ঐ দিন রমনা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর এ বক্তৃতা বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা দিয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে এ ভাষণ ছিল বাঙালির শক্তি সঞ্চয়ের হাতিয়ার ও প্রেরণার মূলমন্ত্র। ৭ মার্চের জনসভা সম্পর্কে ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকায় বলা হয়।
মুহুমুহ গর্জনে ফেটে পড়ছে জনসমুদ্রের উত্তাল কণ্ঠ। স্লোগানের ফেউ একের পর এক আছড়ে পড়ছে। লক্ষ কন্ঠে এক আওয়াজ। বাঁধ না মানা দামাল হাওয়ায় সওয়ার লক্ষ কন্ঠের বজ্র শপথ। হওয়ায় পত পত করে উড়ছে পূর্ব বাংলার মানচিত্র অঙ্কিত সবুজ জমিনের উপর লাল সূর্যের পতাকা। লক্ষ হস্তে শপথের বজ্রমুষ্ঠি মুহুর্মুহু উত্থিত হচ্ছে আকামে। জাগ্রত বীর বাঙালির সার্বিক সংগ্রামের প্রত্যয়ের প্রতীক সাত কোটি মানুষের সংগ্রামী হাতিয়ারের প্রতীক বাঁশের লাঠি মুহুর্মুহু স্লোগানের সাথে সাথে উত্থিত হচ্ছে আকাশের দিকে। এই ছিল গতকাল রোববার রমনা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সভার দৃশ্য। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে আরোহণ করেন ৩টা ২০ মিনিটে।
এই স্লোগানে স্লোগানে সভাস্থলে ক্রমে বেড়ে গেছে সংগ্রামের উদ্দীপনা, শপথের প্রাণবহ্নি। স্লোগানের ভাষা ছিলঃ জয় বাংলা-জয় বাংলা, আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম, আমার দেশ তোমার দেশ-বাংলাদেশ বাংলাদেশ, পরিষদ না রাজপথ-রাজপথ রাজপথ, ষড়যন্ত্রের পরিষদে-বঙ্গবন্ধু যাবেন না। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়, বাংলাদেশ স্বাধীন কর ইত্যাদি’।
৭ মার্চের জনসভায় স্লোগান বেশি উঠে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়-বাংলাদেশ স্বাধীন কর, তোমার দেশ আমার দেশ-বাংলাদেশ বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল প্রকৃতপক্ষেই বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণামন্ত্র।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের তাৎপর্য
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক। এ ভাষণ নানা কারণে তাৎপর্য বহন করে। এই ভাষণের মাধ্যমে তিনি সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রভাগে ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
ভাষণটি আদ্যপান্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু বাঙালির দীর্ঘ শোষণের ইতিহাস, সংগ্রামের ইতিহাস জনতার সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আযুব খাঁ মার্শাল ল জারি করে ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনের সময় আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।” ভাষণে বাঙালি সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে পাশাপাশি তুলে ধরেছেন পাকিস্তানি শাসকদের নিষ্ঠুর দমনমূলক কর্মকাণ্ডের কথা। আবেগভারাক্রান্ত চিত্তে তিনি উচ্চারণ করেছেন, “আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সকলে জানেন এবং বোঝেন, আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্ট করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশহী, রংপুরে আমারা ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।”
পূর্ব বাংলার মানুষ আশায় বুক বেঁধে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট করতে দিয়েছিল। তারা ভেবেছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা অধিকার ভোগ করতে পারবে। কিন্তু পাক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে এদেশের মানুষের উপর নির্যাতন নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা অস্ত্রের ভাষায় এদশের মানুষকে স্তব্ধ দেয়ার নানা পাঁয়তারা করে। ৭ মার্চের ভাষণের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব, এখানে সরাসরি বাঙালিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তিনি দেশের আপমর মুক্তিকামী জনতাকে বলেছেন, যার যা আছে তাই নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। শত্রুর মোকবিলা করার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গড়ে হবে। তিনি নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব প্রত্যেক মহল্লায় জনতাকে সংগঠিত হওয়ার। তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, “তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শক্রুর মোকবিলা করতে হবে। আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমর বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পনিতে মারব।” উত্তাল জনতার মুহুর্মুহু স্লোগানের মধ্যে তিনি সকলকে অভয়বাণী শুনিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা
দিয়ে বলেন, “আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এমন বজ্রকণ্ঠ বাংলার মানুষ কোন দিন শোনে নি। এমন উদাত্ত আহ্বানে কেউ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা বলে নি। ফলে ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বজ্রনিঘোষ বাণী। এ ভাষণ লক্ষ লক্ষ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের প্রেরণামন্ত্র ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এ ভাষণের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়। বাঙালির চেতনায় বিদ্রোহ ও সংগ্রামের আগুন প্রজ্বলনে এ ভাষণের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম।
ভূমিকাঃ
“স্বাধীনতায় হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে?
কে পরিবে পায়?
কোনো জাতিই স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চায় না। আর চায়না বলেই সব জাতির কাছে স্বাধীনতা অত্যন্ত প্রিয়। তাই বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম। এক সাহসী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ শুধু একখন্ড ভূমির অধিকার পাবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি দেয়ার পাশাপাশি এ সংগ্রাম অন্য জাতির সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে আমাদের রক্ষা করে জাতি গঠন ও আত্মবিকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাঙালি জাতির প্রেরণা রূপে কাজ করে যাবে যুগ যুগ ধরে। এ চেতনা বাঙালি জনগোষ্ঠীকে একতাবদ্ধ করে জাতিকে নিয়ে যেতে পারে-চিরকাক্সিক্ষত উন্নয়নের শীর্ষদেশে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিকথাঃ জাতিগঠনের দিক থেকে পাকিস্তানে ছিল এক অদ্ভূত সৃষ্টি। ১৯৩২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ড নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছিল মূলত ধর্মীয় ঐক্যের বিচারে। রাজনৈতিক বিচারে একই রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া সত্তে¡ও পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান এ দু অংশের জনগণের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানসিক গঠনের দিক থেকে নিজস্ব আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান ছিল। দেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি প্রবল হওয়ায় ধর্মকেই শোষণ ও বঞ্চনার হাতিয়াররূপে ব্যবহার করা হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতঃ কয়েকশ বছর ধরে এ দেশ শাসিত হয়েছে। সোনার বাংলার অফুরন্ত সম্পদ থাকা সত্তে¡ও ইংরেজ শাসনে বাঙালি মুসলমানদের ভাগ্যোন্নয়ন হয়নি। ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি ইংরেজ এদেশ থেকে বিদায় নিলেও স্বাধীনতার স্বাদ এ দেশের মানুষ পায়নি। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী এক রাষ্ট্রের নামে বাংলায় তাদের রাজত্ব কায়েম করেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি ভিন্নভাষা ভাষী শাসক গোষ্ঠী আমাদের ভাষা শিল্প সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তের জাল বিস্তার করেছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে ছাত্র সমাজ এবং বুদ্ধিজীবী স¤প্রদায়ের মধ্যে পশ্চিমা শাসক স¤প্রদায়ের বাঙালিদের প্রতি বিমাতাসুলভ ব্যবহারের কারণে অসন্তোষ ধুমায়িত হতে থাকে।
তাই মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা বাংলাকে সে সময় বন্ধ করে দিয়ে তারা উর্দু ভাষাকে এ দেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাঙালি জনতা মায়ের ভাষা রক্ষা করেছিল জীবন দিয়ে আর সে থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ বপন হয়েছিল।
পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর চক্রান্তঃ ১৯৬৬ সালে উত্থাপিত ‘ছয়দফা’ দাবি মূলত বাঙালির স্বায়ত্বশাসনের দাবি। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একে মেনে নিতে পারে নি। শুরু হয় সারা দেশে ধরপাকড়। দেশের নেতৃবৃন্দকে জেলে আটকে রাখা হয়। আর কর্মীদের ওপর চালানো হয় অমানসিক নির্যাতন। এমন পরিস্থিতিতে শুরু হয় জ্বালাও পোড়াও অভিযান। গণ আন্দোলন যখন তুঙ্গে ওঠে তখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দেশবাসীকে কিছু দিনের শান্ত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলে আতঙ্কিত হয়ে পশ্চিমারা শুরু করে চক্রান্ত। ইয়াহিয়া খান বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হলেন না।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাত্রিতে শান্তিপ্রিয় নিরস্ত্র বাঙালির ওপর লেলিয়ে দেয়া হয় সেনাবাহিনী। গুলি আর বোমার গর্জনে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে দেশ। পৃথিবীতে এমন বিশ্বাসঘাতকতার নজির বিরল।
ভাষার সংগ্রামঃ ভাষা আন্দোলন-স্বাধীনতা চেতনার ভিত্তিভূমি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমধারায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এ আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ উপ্ত হয়েছিল। ভাষা জাতীয় চেতনার প্রধান ধারক। তাই পশ্চিম পাকিস্তানিরা দেশ বিভাগের পর পরই আঘাত হানে আমাদের ভাষার ওপর। ১৯৪৮ সালে কেবল উর্দুভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেয়া হলে দেশপ্রেমিক পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালি সদস্যরা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারি উত্তাল গণ-আন্দোলনে বাংলাদেশ বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। আন্দোলন স্তব্ধ করে দেবার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরো অনেক তরুণের উষ্ণ শোণিতের বিনিময়ে মাতৃভাষা বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃত হয়।
নিপীড়ন, নির্যাতন এবং আন্দোলনের ধারাক্রমঃ ইংরেজ শাসনের শৃঙ্খলা থেকে মুক্ত হলেও ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি বঞ্চিত এবং অত্যাচারিতই থেকে গিয়েছে। পাকিস্তানি শাসকদেরও ছিল সেই একই উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি। ভাষা-আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায় ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে। সেবার যুক্তফ্রন্টকে নির্বাচিত করে বাঙ্গালি নতুন সমাজ গঠনের পক্ষে রায় দেয়। এতে মুসলিম লীগ পরাজয় বরণ করে। পাকিস্তানের প্রায় দুই যুগের শাসন ইতিহাস শোষণ ও বঞ্চনার কালিমায় ভরপুর। প্রথম পরিকল্পনায় মোট বিনিয়োগের মাত্র ২৬% পূর্ব বাংলায় খরচ করা হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পরিকল্পনায় তা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র। শিক্ষা, সামরিক ক্ষেত্র, বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি, কর্মসংস্থান সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ২২৪০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও সে সময়কালে এখানে আমদানির জন্য খরচ করা হয়েছিল মাত্র ১৬৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ ছিল ১৭৫৯ কোটি টাকা অথচ সেখানে আমদানির জন্য ব্যয় করা হয়েছিল ৩৭৯৯ কোটি টাকা। সামরিক খাতে উক্ত সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় হয় ১৮০ কোটি টাকা সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৭১৮ কোটি টাকা। বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সে একই বঞ্চনার চিত্র দেখা যায়। এক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি প্রাপ্য হলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অর্থ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল।
এ শোষণ ও বঞ্চনা বাঙালির মনে বিক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামী মনোভাব জাগিয়ে তোলে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনেই বাঙালি থেকে থাকেননি এরপর একে একে ১৯৬২-র ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যূত্থান পাকিস্তানি শাসকদের শঙ্কিত করে তুলেছিল। এছাড়া ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বাঙালির স্বাধিকারের দাবিতে ‘ছয় দফা’ উত্থাপন করে। ১৯৭০-৭১ সালের ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বাঙালির স্বাধিকার চেতনার প্রতিফলন ঘটে। এখানে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিতে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্রে ৩ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করা হয়। তখনই বাঙালি বুঝে নেয় স্বাধীনতা আন্দোলন ছাড়া নিজেরদের অধিকার রক্ষার আর কোন উপায় নেই।
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে সারা বাংলার জীবন স্তব্ধ হয়ে গেল। পাকিস্তানি স্বৈরাচারদের দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে ঘোষণা করলেন-“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ২৫শে মার্চ রাতে সামরিক শাসকের পেটোয়া বাহিনী ঘুমে অচেতন বাঙালির উপর আক্রমণ চালানো শুরু করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ২৬ মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি অত্যাচারে গোটা বাংলাদেশে সংগ্রামের আগুন জ্বলে ওঠে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাংলার শ্রমিক, জনতা, ছাত্র, তথা সাধারণ মানুষ মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। দেশের অনেক লোক নিরূপায় হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেখানে গড়ে ওঠে ত্রাণ শিবির এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সুদীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ চলল। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাঙালি ছিনিয়ে নিল বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার সূর্য। লক্ষ বাঙালির হাতে সেদিন শোভা পেয়েছিল লাল সবুজের মাঝে হলুদ মানচিত্র খচিত জাতীয় অহঙ্কার ও স্বাধীনতার প্রতীক জাতীয় পতাকা। এভাবেই বিশ্বের বুকে সেদিন নতুন রাষ্ট্র সগৌরবে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাঙালিকে শোষণ ও অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছে। ধর্মীয় কুসংস্কারের উর্ধ্বে ওঠে হাজার বছরের বাঙালি পরিচয়কে প্রধান বিবেচনা করে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান একই পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। এ একতা দেশ গঠনে বাঙালিকে নতুন প্রেরণা দান করে।
১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি যে দেশপ্রেম, অকুতোভয় সাহস এবং সুদৃঢ় একতা নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল সেই চেতনাকে জাগ্রত রাখতে পারলে জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি দৃঢ়তা অর্জন করবে। দেশের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে হলে আর্থ-সামাজিক দিক থেকে অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। দেশপ্রেম এবং জাতীয় সংহতি এক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই পারে আমাদের সব বিভেদ ভুলিয়ে দেশপ্রেমিক বাঙালি হিসেবে লাল-সবুজ পতাকার তলে সমবেত করতে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়া আজ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচন সম্বন্ধে জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন:
১৯৫৪ সালের নির্বাচন -OnlineRedingRoom (onlinereadingroombd.com)
অনলাইন রিডিং রুম শিক্ষক প্যানেল
+88 01713 211 910