
উপভাষা কাকে বলে? বাংলা উপভাষাগুলোর শ্রেণিকরণ এবং প্রতিটি শ্রেণির প্রধান বৈশিষ্ট্য
প্রসঙ্গ: উপভাষা কাকে বলে? বাংলা উপভাষাগুলোর শ্রেণিকরণ কর এবং প্রতিটি শ্রেণির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা কর।
উত্তর: উপভাষা (Dilect) হচ্ছে কোন ভাষা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত কোন অঞ্চল বিশেষ ব্যবহৃত ভাষা। ম্যাকসমুলার উপভাষা স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন- ‘ভাষার স্বাভাবিক ও যথার্থ জীবন নিহিত আছে উপভাষায়। তাই সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্ম পরিচালনার জন্য উপভাষাই ব্যবহৃত করে থাকে। এই ভাষা অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন হয়। উপভাষার ধ্বনি, রূপমূল, বাক্যগঠন রীতি এবং উচ্চারণরীতিও পৃথক হয়ে থাকে। তবে মূলভাষার আন্তবৈশিষ্টের সাথে খুব একটা পার্থক্য দৃষ্ট হয় না। তাই বলা যায়, একই ভাষা অঞ্চল ভেদে যে রূপ তাই আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা।
বাংলার উপভাষাগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে জরীপ করে তার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের চেষ্টা অদ্যাবধি হয় নি।তবে স্যার জর্জ গ্রায়ারসন ১৯০৩ সালে ভারতবর্ষের উপভাষাসমূহের নমুনা সংগ্রহ করেন। লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে তার পরিচয় আছে। ঐ গ্রন্থের পঞ্চম খন্ডে তিনি বাংলায় বিভিন্ন উপভাষার নমুনা সংগ্রহ করে তার কিছু ব্যাকরণগত ধ্বনি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন। মোটামুটি ভাবে বাংলার উপভাষাসমূহের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বাংলার প্রধান উপভাষাকে পাঁচটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এই শ্রেণীগুলো হলো নিম্নরূপঃ ১. রাঢ়ী উপভাষা ২. ঝাড় খন্ডী উপভাষা,৩. বরেন্দ্রী উপভাষা, ৪. বাঙালি উপভাষা ও ,৫. কামরূপী উপভাষা।
নিচে উল্লিখিত উপভাষাসমূহের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো।
১. রাঢ়ী উপভাষা:
ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
ক. অ-কারের ও-কার রূপে উচ্চারণ প্রবণতা। যেমনঃ অতুল > ওতুল,মধু> মোধু।
খ. অভিশ্রুতি ও স্বসঙ্গতির ফলে স্বরধ্বনির পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যেমনঃ রাখিয়া > রেখে, বিলাতি > বিলিতি।
গ. আনুনাসিক স্বর পূর্ণ মাত্রায় রক্ষিত। যেমনঃ চাঁদ,কাঁটা,বাঁধ ইত্যাদি।
ঘ. শব্দের আদিতে অকারণে ‘র’ এর আগম ও লোপ। যেমনঃ আম > রাম, ওঝা> রোজা, রস> অস।
ঙ. ‘ল’ স্থানে ‘ন’ উচ্চারণ। যেমনঃ লুচি > নুচি, লেপ >নেপ।
চ. শ- এর স রূপে উচ্চরিণ। যেমনঃ আশু > আসু, শশী > সসী।
রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যঃ
ক. কর্ম কারকে বহুবচনের বিভক্তি ‘দেয়’।
খ. কর্ম কারক ও সম্প্রদানে ‘কে’ বিভক্তির ব্যবহার।
গ. অধিকরণ কারকে ‘তে’ বিভত্তির ব্যবহার।
ঘ. সামান্য অতীত অকর্মক ক্রিয়ার প্রথম পুরুষে ‘ল’ বিভক্তি এবং সকর্মক ক্রিয়ায় ‘ লে, বিভক্তির ব্যবহার।যেমনঃ সে গেল ,সে দিলে।
ঙ. সামান্য অতীতে উত্তম পুরুষে ‘লুম’, ‘নু’ ‘লম’ বিভক্তির প্রয়োগ। যেমরঃ আমি দেখলুম। আমি দেখনু।
২. ঝাড়খণ্ডী উপভাষা: সাধারণ লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য:
ক. আনুনাসিক ধ্বনির প্রচুর ব্যবহার যেমন: চাঁ, হঁইছে।
খ. অনুসর্গহীন সম্প্রদান কারক। যেমন: জলকে চল। ঘাসকে গেলছ।
গ. নামধাতুর প্রচুর ব্যবহার। যেমন: জাড়াবে (শীত করবে)।
ঘ. ‘আছ’ ধাতুর স্থানে ‘বট’ ধাতুর প্রয়োগ । যেমন: গাঁধাচ্ছে (গন্ধ হচ্ছে), কবি বটে=করছে।
৩. বরেন্দ্র উপভাষা: সাধারণ লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য।
ক. স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে প্রায় রাঢ়ীয় সঙ্গে অভিন্ন।
খ. আনুনাসিক স্বরধ্বনি রক্ষিত হয়েছে।
গ.শব্দের আদিতে ঘোষ ধ্বনির মহাপ্রাণতা রক্ষিত হয়েছে।
ঘ.শ্বাসাঘাতের নির্দিষ্ট স্থান নেই।
ঙ. পূর্ববঙ্গীয় উপভাষার প্রভাবে জ ধ্বনি কখনো য রূপে উচ্চারিত হয়। যেমনঃ কাগজ > কাগয
চ. শব্দের আদিতে ‘র’ ধ্বনির আগম ও লোপ । যেমনঃ রস > অস , আম > রাম,আশু> রাশু।
ছ. শব্দ ও ধাতুরূপে এ উপভাষার সঙ্গে রাঢ়ী উপভাষার সাদৃশ্য রয়েছে। এখানে অধিকরণ কারকে ‘ত’ বিভাক্তি যুক্ত হয়। অতীত কালে উত্তম পুরুষে ‘ রাম’ বিভক্তি যুক্ত হয়।
জ. প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘শ,ষ,স’ এর উচ্চারণ শুধু ‘স’ এর মতো অর্থাৎ অনেকটা ইংরেজি ‘S’ এর মতো হয়।
৪. বাঙালি ( পূর্ববঙ্গীয়) উপভাষা:
ক. অপিনিহিতি স্বর রক্ষিত আছে। যেমন: রাখিয়া> রাইখ্যা, বলিয়া> বইল্যা।
খ. য ফলা ও যুক্ত ব্যঞ্জনে অপিনিহিতির মতো স্বরাগম হয়। যেমন: সত্য > সইত্ত ব্রাহ্ম > ব্রাইম্ম।
গ. এ-এর উচ্চারণ বিবৃত তথা এ্যা-এর মত হয়। যেমন: মেঘ> ম্যাগ,দেখা > দ্যাখ্যা।
ঘ. ও-কারের উচ্চারণ সংবৃত তথা উ-কারের মতো হয়।
যেমন: চোর> চুর,গোল > গুল,পোকা > পুকা,বোকা > বুকা।
ঙ. স্বরধ্বনিতে অনুনাসিক্যতা বজায় থাকে। যেমন: চান্দ >চাঁদ,কান্দে >কাঁদে।
চ. শ্বাসাঘাতের কোন নির্দিষ্ট স্থান নেই।
ছ. মহাপ্রাণ ঘোষ ধ্বনির মহাপ্রাণতা লোপ। যেমন: ভাত > বাত, ভাই > বাই, খালু > কালু।
জ. পদ মধ্যস্থিত অঘোস ধ্বনি ঘোষবৎ ধ্বনি রূপে উচ্চারিত হয়। যেমনঃ ছোট > ছুডু, কেটা > কেডা।
ঝ. শ,স,য-এর হ রূপে উচ্চারণ। যেমনঃ শালা > হালা,সে> হে।
ঞ. ড়,ঢ়-এর র-এর মতো উচ্চারণ। যেমনঃ বাড়ি > বাড়ি, আষাঢ়> আষার।
ট. পদের আদিতে কিংবা পদ মধ্যস্থিত হ- এর অ-এর মতো উচ্চারণ। যেমনঃ হং> অয়,হইবে>অইবে।
ঠ. কর্তৃ কারকে ‘এ’ বিভক্তি সম্প্রদানে ‘রে’ বিভক্তি অধিকার ‘ত’ বিভক্তি সম্বন্ধে ‘বার’ বিভক্তি। ওযমনঃ তাসনিমে খায়, ফকিররে ভিক্ষা দাও।
ড. তুমর্থে ‘অন’ বিভক্তি। যেমনঃ খাওন, আসন ইত্যাদি। তবে যশোহগর খুলনা অঞ্চলে ‘তি’ বিভক্তি যুক্ত হয়। যেমনঃ নাতি,খাতি ইত্যাদি।
৫. কামরূপী উপভাষা: সাধারণ লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য।
বাঙালি উপভাষার প্রায় সমস্ত বৈশিষ্ট্যই কামরূপী ভাষায় দৃষ্ট হয়। এ ছাড়া আরো যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য এই উপভাষার দেখা যায় তা ন্ম্নিরূপ:
ক. ও-কারের উচ্চারণ অনেকটা সংবৃত। যেমনঃ ও> উ; জ্যোতিষ> জুতিয।
খ. শব্দের আদিতে অ কখনও আ হয়। যেমনঃ অষ্ট > আষ্ট, লম্বা > লাম্বা।
গ. পদের শেষের অ ও হয়। যেমনঃ হইতে> অইতো।
ঘ. পদের শুরুর অ কখনও উ হয়। যেমনঃ ডগা > ডুগা।
ঙ. পদের মধ্যেও প ফ রূপে উচ্চারিত হয়। যেমনঃ আপদ > আফদ, আপনার > আফনার।
চ. কখনও কখনও শব্দের মধ্যে র-এর আগমন ঘটে। যেমনঃ সম্মান> সর্মান, সাহয্য> সাহার্য।
ছ. ভবিষ্যৎ কালে ক্রিয়ার বাম প্রত্যয় হয়। যেমনঃ কবির> করিবাম,খাইব> কাইবাম।
একটি স্থুল দৃষ্টিভঙ্গীতে উল্লিখিত বিভাজন করা হয়েছে। আরো সুক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গীতে বিভাজন করলে বাংলা উপভাষাসমূহের আরো ক্ষুদ্র শ্রেণীতে বিভাজন করা সম্ভব। তবে সময় সংক্ষিপ্ততার কারণে আমরা উল্লিখিত বিভাজনেই কান্ত থাকলাম।
#
ড. এ. আই. এম. মুসা
সহযোগী অধ্যাপক
বাংলা
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ।
+88 01713 211 910