
এইচএসসি বাংলা প্রথম পত্র : উপন্যাস : লালসালু : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ , প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা বিচার
এইচএসসি বাংলা প্রথম পত্র : উপন্যাস : লালসালু : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্
প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা বিচার
সহজে এবং কম সময়ের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য এবং ১০০% কমনের নিশ্চয়তায় সংগ্রহ করুন মুসা স্যারের বাংলা ১ম ও দ্বিতীয় পত্র সাজেশন ও সমাধান গ্রন্থসমূহ
লালসালু উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত কাহিনি
(এই কাহিনিটি জানা থাকলে যে কোনো প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্নের উত্তর সম্ভব)
লালসালু’ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মজিদ। ‘লালসালু’ উপন্যাসের কাহিনি-বৃত্ত নির্মিত হয়েছে মজিদের অস্তিত্বের সংগ্রামকে আশ্রয় করে। মজিদের জন্মভূমি একটি শস্যহীন জনবহুল অঞ্চল। তাই জীবিকার তাগিদে এই অঞ্চলের মানুষ বেরিয়ে পড়ে এলাকার বাইরে, জেলার বাইরে কিংবা আরো দূরে। এই এলাকার মানুষের গোঁফ না উঠতেই কোরান হেফ্জ করে ফেলে। এই এলাকার মানুষের যেকোনো ধরনের কাজ করতে দ্বিধা নেই। এই জন্য তাদের কেউ হয় জাহাজের খালাসি, কারখানার শ্রমিক, বাসাবাড়ির চাকর, দফতরি, ছাপাখানার মেশিনম্যান, ট্যানারির চামড়ার লোক। আবার কেহ হয় মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিন। ইমাম বা মুয়াজ্জিন হয়ে তারা চলে যায় দুর্গম অঞ্চলে। সেখানে মিহি কণ্ঠে তাদের আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। মজিদ এদেরই একজন।
শ্রাবণের শেষাশেষি সময়। বৃষ্টি শূন্য, হাওয়া শূন্য মাঠঘাট। এমন দিনে ডিঙিতে দুজন করে কোঁচ-জুতি নিয়ে ধানখেতে বেরোয় এখানকার লোকজন। তাহের-কাদেরও বেরিয়েছে। মাছ মারার সময় তাহের-কাদের হঠাৎ দেখে মতিগঞ্জের সড়কের ওপর একটা অপরিচিত লোককে। লোকটি মোনাজাতের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ক-গাছি দাঁড়ি, চোখ নিমীলিত। মোনাজাত শেষ করে পুটলিটা হাতে নিয়ে মহব্বতনগর গ্রামের দিকে এগিয়ে যায়। বাড়ি ফেরার সময় তাহের-কাদের দেখে খালেক ব্যাপারীর ঘরে গ্রামের মানুষের সাথে বসে আছে সেই লোকটা। এই লোকটিই আসলে মজিদ। শীর্ণ দেহের মজিদ চিৎকার করে সবাইকে গালাগাল দিচ্ছে- আপনারা জাহেল, বে-এলেম আনপারাহ্। মোদাচ্ছের পীরের মাজারকে আপনারা এইভাবে ফেলে রেখেছেন? মজিদ গারো পাহাড়ের সচ্ছল অবস্থান থেকে এখানে চলে এসেছে শুধুই মোদাচ্ছের পীরের ডাকে। তিনি তাকে স্বপ্নে আহ্বান জানিয়েছেন, সেকথা বলতে গিয়ে সে কেঁদে ফেলে। সবার দিকে দৃষ্টি রেখে সে বুঝতে পারে তার কথা সবাই বিশ্বাস করেছে। তারপর জঙ্গল পরিস্কার হয়, ইট সুরকি দিয়ে ভাঙা কবর নতুন রূপ ধারণ করে। সালু কাপড়ে আবৃত হয়, মোমবাতি জ্বলে রাতদিন, আগরবাতি গন্ধ ছাড়ায় চারদিকে। এ গ্রাম সে গ্রাম থেকে লোকজন আসতে শুরু করে। তাদের কান্না, অশ্রুসজল কৃতজ্ঞতা, আশার কথা, ব্যর্থতার কথা অজ্ঞাত ব্যক্তির কবরে ব্যক্ত হতে থাকে। তার সঙ্গে আসে সিকি-দুআনি-আধুলি-টাকা। মজিদের ঘরবাড়ি হয় জমিজমা হয়, গৃহস্থালি হয়, রহিমাকে বিয়ে করে সংসারও জমজমাট হয়ে ওঠে। মজিদ ভাবে, খোদার ভয়টা গ্রামের মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে তারা তাকেও ভয় পাবে। অবশ্য গ্রামের মাতব্বর যেকোনো কাজে তার কাছেই আসে, খতম পড়ানোর জন্য অন্য লোকেরাও আসে। কিন্তু সে একক কর্তৃত্ব চায়। সাত ছেলের বাপ দুদু মিঞাকে ব্যাপারীর মক্তবে কলমা শিখতে বাধ্য করে। ধাড়ি ধাড়ি ছেলেদের পাকড়াও করে খতনা করাতে বাধ্য করে। ব্যাপারীকে শুনিয়ে মজিদ বলে-আপনাগো দেশটা বড় জাহেলের দেশ। তাহের-কাদেরের বোন হাসুনির মা। সে মজিদের বাড়িতে কাজ করে। একদিন সে রহিমার মাধ্যমে মজিদের কাছে তার বাবা-মা সম্বন্ধে নালিশ করে। মজিদ তাহেরের বাপকে ডেকে পাঠায়। বলে, “তোমার বিবিরে কইয়া দিও অমন কথা যেন আর কোনো দিন না কয়।” বুড়ো বাড়িতে গিয়ে মেয়েকে মারধর করে। মেয়ে আবার এসে কান্নাকাটি করে একথা জানিয়ে দেয় মজিদের কাছে। বিকালে জমায়েত বসে। “তুমি তোমার মাইয়ারে, ঠ্যাঙাইছ ক্যান?”- খালেক ব্যাপারীর এ প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয় বিচারের কাজ। মজিদ হাত নেড়ে ব্যাপারীকে থামিয়ে দিয়ে “ভাই সকল” বলে তার বক্তব্য শুরু করে। সে বলে-মানুষের মধ্যে গুনাহগার আছে, নেকবান্দা আছে। কুৎসা রচনাটা বড় গর্হিত কাজ। প্রিয় পয়গম্বরের পেয়ারাবিবি আয়েশার নামেও কুৎসা রটেছিল। বিসমিল্লাহ পড়ে মজিদ সুরায়ে আন-নুর থেকে কিছুটা কেরাত করে শোনায়। তারপর বলে, যে আপন সংসার আপন হাতে ভাঙতে চায় এবং আপন সন্তানের জন্ম সম্পর্কে কুৎসা রটনা করে, সে নিজের বিরুদ্ধে কাজ করে, তার শাস্তি বড় কঠিন শাস্তি। এরপর বুড়োর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “তুমি কি হলফ কইরা বলতে পার তোমার দিলে ময়লা নাই?” বুড়ো বিভ্রান্ত হয়ে যায়, কাঁদতে শুরু করে। মজিদ এবার ঠান্ডা গলায় সিদ্ধান্ত দেয়-তুমি তোমার মাইয়ার কাছে মাফ চাইবা আর মাজারে, সিন্নি দিবা পাঁচ পইসার।” বুড়ো বাড়ি গিয়ে সটান শুয়ে পড়ে। মেয়ের কাছে চিঁড়া-পানি চায়। খাওয়া শেষ হলে মেয়ের কাছে মাফ চায়। সেদিন সন্ধ্যায় বুড়ো কোথায় চলে যায় কেউ বলতে পারে না। পরদিন থেকে বুড়ি একেবারে চুপ হয়ে যায়।মজিদ গ্রামবাসীকে ভালোভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, পৃথিবীতে যাই ঘটুক, জন্ম-মৃত্যু-শোক-দুঃখ,খোদা সবকিছু ভালোর জন্যই করেন। এবার যে সবার গোলা ভরা ধান উঠেছে, সেটাও খোদার রহমত। মজিদেরও গোলা ধানে ভরে গেছে। খোদার রহমত আর মাজারের ‘তানার’ দোয়ায়ই তা হয়েছে বলে সে সবাইকে শোনায়। তার অন্তরে ক্রমশ ছড়িয়ে যায় যে আগুন তাতে বেগুনি রঙের শাড়ি পরা হাসুনির মাকে অস্পষ্ট দেখে। কিন্তু সে স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায় তিন গ্রাম পরে আওয়ালপুরে এক পীর সাহেবের আগমন সংবাদ শুনে। পীরের রুহানি তাকত নিয়ে খ্যাতির শেষ নেই। মজিদের সে তাকত নেই। তাই সে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। সবসময় হাওয়ায় ভেসে আসে পীর সাহেবের কার্যকলাপের কথা। এদিকে মাজারে লোকজনের আগমনও কমে যায়। সে ভেবে নেয়, এবার কিছু একটা করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যেই সে আওয়ালপুর গ্রামে যায়। পীর সাহেবকে দেখার জন্য সে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতে থাকে কিন্তু কাছে পৌঁছতে পারে না। এ সময় প্রধান মুরিদ মতলুব মিয়া হুজুরের গুনাগুন ব্যাখ্যা করছে। সে বলছে, তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত না হুকুম দেবেন ততক্ষণ পর্যন্ত সূর্য এক আঙুল নড়তে পারে না। ভক্তদের ভক্তির ভয়ে পীর সাহেব গাছে উঠেছিলেন, এখন নামলেন। সাথে সাথেই কাতারে দাঁড়ানোর হুকুম হলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে নামাজ শুরু হয়ে গেল। মজিদ চিৎকার করে গালাগাল শুরু করল- এ কেমন বে-শরিয়তি কারবার, আছরের সময় জোহরের নামাজ পড়া? সাঙ্গোপাঙ্গরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করল, ভাদ্র মাসে দুকদমের ওপর দুই লাঠি হিসেবে এখন সময় আছে। মজিদ মাপতে বললে তারা ছয় কদমের পরদুই লাঠি যোগ করেও ছায়ার নাগাল পেল না। এবার মজিদ জোর গলায় বলল-”তোগো পীর ধইরা রাখবার পারলোনা সুরুজটারে?:” সে মহব্বতনগর কে কে যাবেন বলে হাঁটতে শুরু করে। রাত্রে ব্যাপারীকে নিয়ে এক জরুরি বৈঠক বসল। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো, মহব্বত নগরের কোনো লোক আওয়ালপুরে আগত পীরের কাছে যাবে না। কিন্তু খালেক ব্যাপারীর প্রথম স্ত্রী আমেনা বিবি এই সিদ্ধান্ত মানতে পারে নি। কারণ, তার পীর সাহেবের পড়াপানি দরকার। বিয়ের সতেরো বছর পরও তার কোল শূন্য। অথচ তার সতীন বছর বছর সন্তানের জন্ম দিচ্ছে। কাজেই সন্তান কামনায় আকুল আমেনা ব্যাপাররি কাছে আবদার জানায়, উনি যেন পীরের পড়াপানি আনার ব্যবস্থা করে দেন। ব্যাপারী দ্বিধায় পড়লেও দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর ভাই ধলা মিয়াকে এ কাজটার দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ধলা মিয়া পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মস্ত দেবংশি তেঁতুল গাছ আর পীর সাহেবের ঠেঙ্গারে সাঙ্গোপাঙ্গকে ভয় পায়। তাই সে গোপনে মজিদকে সব কথা জানিয়ে তাকেই পানিপড়া দিতে অনুরোধ করে। কিন্তু টাকার লোভ দেখানোর পরও মজিদ রাজি হয় না। মজিদ মনে মনে আমেনা বিবিকে শাস্তি দেয়ার জন্য ফন্দি আঁটতে থাকে। ধলা মিয়া মুখ ভারী করে প্রস্থান করে। মজিদ এসে উপস্থিত হয় ব্যাপারীর বৈঠকখানায়। একথা সেকথার পর মজিদ পীরের কথা তোলে এবং তার কাছে লোক পাঠিয়ে কী হবে তা-ও জানায়। ব্যাপারী কথাটা সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে সব কথা খুলে বলে। মজিদ জানায়, পেটে বেড়ি পড়েছে বলেই সন্তান হয় না। তবে এই বেড়ির প্যাঁচ খোলা যাবে। প্যাঁচ খোলার আগে প্যাঁচের সংখ্যা জানতে হবে। প্যাঁচের সংখ্যা জানতে হলে আমেনা বিবিকে কী কী করতে হবে তা বুঝিয়ে বলে মজিদ বিদায় নেয়। আমেনা বিবি সব প্রস্তুতি নেয়। মজিদের মাজারে যাবার আগে একবার আমেনা বিবির মনে হয়, সে যাবে না। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবে-
‘মেয়ে লোকের মনের মস্করা সহ্য করবে অতটা দুর্বল নয় সমাজ’
সন্ধ্যার দিকে পালকিতে করে আমেনা বিবি আসে। তাকে মাজারের ঘরটিতে আস্তে করে বসানো হয়। মজিদ দোয়া-দরুদ পড়তে থাকে। তারপর পানিপড়া খেতে দেয়। এবার মাজারের চারদিকে সাত পাক দেওয়ার পালা। কিন্তু তিন পাক শেষ না হতেই আমেনা বিবি সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যায়। রহিমা আর হাসুনির মা তাকে ভেতরে নিয়ে যায়। ব্যাপারীর মনে প্রশ্ন, “তানি কেন অজ্ঞান হইছেন?” অনেক অনুরোধের পর মজিদ শুধু বলে, “তয় একটা কথা আমার কওন দরকার। তানারে তালাক দেন। কারণ
পানিপড়াটা খাওয়ার পরও তিনি সাত পাক দিতে পারলেন না, এর মধ্যেই যেন সব কথার উত্তর একটাই।” আমেনা বিবিকে নিয়ে পালকি চলে গেল। কোনো কথা না বলে ব্যাপারীও চলে গেল। তিনদিন পর পালকিতে চড়ে আমেনা বিবি বাপের বাড়ি চলে যায়।
পথে হাসুনির মার কাছে জানতে পারে তার মা মারা গেছে। মজিদ তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে।
আক্কাস মহব্বত নগর গ্রামের একজন শিক্ষিত ছেলে। তার বাবার নাম মোদাব্বের মিঞা। সে শহরে থেকে লেখা পড়া করে। সম্প্রতি সে গ্রামে ফিরে এসেছে। সে নাকি গ্রামে একটা স্কুল দেবে। স্কুলে না পড়লে মুসলমানদের মুক্তি নেই। এটাই তার ধারণা। আর সে জন্য প্রাথমিকভাবে যা করা দরকার তা করছে আক্কাস। কিন্তু মজিদ এর ঘোরবিরোধী। সন্ধ্যার পর ব্যাপারীর বৈঠকখানায় আক্কাস আর তার বাপকে ডেকে পাঠানো হলো। আক্কাসকে আগাগোড়া দেখে মজিদ ঠাস করে চড় মারার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে-“তোমার দাড়ি কই মিঞা?” এ প্রসঙ্গে ইংরেজি পড়া নিয়ে কথা চলতে থাকে। এভাবে স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা ঢাকা পড়ে যায়। মজিদ গ্রামে একটা পাকা মসজিদ নির্মাণ করার প্রস্তাব দেয়। সবাই মজিদকে বাহবা দিয়ে প্রস্তাব সমর্থন করে এবং এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়। শহর থেকে মিস্ত্রি কারিগর আসে, গাঁয়ের দুস্থ লোকেরা শ্রম দেয়। তৈরি হতে থাকে একটা পাকা গম্বুজওয়ালা মসজিদ। মজিদেরও প্রতিপত্তি আরো প্রবল হয়।
কিন্তু মজিদ নিঃসঙ্গতা বোধ করে। সে নতুন নর-মাংসের স্বাদ পেতে চায়। কিন্তু ছলনা করে রহিমাকে বলে-‘বিবি আমাগো যদি পোলাপাইন থাকতো।” তবে সে পোলাপাইন নিজেদের, অন্যের নয়। রাতের বেলা মজিদ অন্য কথা বলে-“বিবি, তোমার একটা সাথি আনুম?” রহিমা বোঝে সাথি মানে সতীন। সে সহজভাবেই জবাব দেয়-“আপনে যেমুন বোঝেন।” কিছ ুদিন পরই মজিদের বিয়ে সম্পন্ন হয় অনাড়ম্বরভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে। নতুন বউয়ের নাম জমিলা। জমিলাকে পেয়ে রহিমার ভালো লাগে। শান্তশিষ্ট ভালো মেয়ে। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার আসল রূপ বেরিয়ে পড়ে। প্রথমে ঘোমটা খোলে, তারপর মুখ আড়াল করে হাসতে শুরু করে। একবার যখন কথা ফোটে তখন বোঝা যায় সে অনেক কথাই জানে। তার ধারণা ছিল-“তানি দুলার বাপ আর রহিমা শাশুড়ি।” কথা শেষ করে হাসিতে ফেটে পড়ে। কিন্তু রহিমার গম্ভীর মুখ দেখে থেমে যায়। একটু পর কাঁদতে শুরু করে। জমিলা দুদিনের মধ্যে ভাবিয়ে তোলে মজিদকে-মেয়েটা কেমন যেন, তার মনের হদিস পাওয়া যায় না। বিশেষ করে খ্যাংটা বুড়ির বিলাপ শোনার পর থেকেই সে যেন কেমন হয়ে গেছে। প্রতিরাতের মতো মজিদ আজ তাকে আদর করে না। ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙলে দেখে জমিলা ঘরে নেই। রহিমার প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে সে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মজিদের মুখে অন্ধকার নেমে আসে। কারণ মহব্বতনগরে আপন-পর কেউ তার হুকুম অমান্য করেনি। কিন্তু জমিলাই ব্যতিক্রম। মজিদ আবার গর্জে ওঠে। কিন্তু জমিলা ঠায় বসে থাকে। মজিদ বুঝতে পারে তার মনে খোদার ভয় জাগাতে হবে। ঠান্ডা মেজাজে তাকে বোঝায় মজিদ। খোদার ভয় দেখায়, মাজারের ভয় দেখায়। কিন্তু জমিলা মনোযোগের সাথে সিঁথি কাটতে থাকে। শিরনি চড়ানোর দিন লোকেরা চাল-ডাল-মসলা-মোমবাতি-আগরবাতি আনতে থাকে। রহিমা খিচুড়ি রাঁধে। দোয়া-দরুদ পাঠের পর জিকির শুরু হয়। জমিলা হাঁটুতে থুতনি রেখে ডেকচির বলক ওঠা দেখে। গ্রামের মেয়েরা ঘুরে ঘুরে নানা কাজকর্ম করে একটু পরে চিৎকার ওঠে। বিদ্যুৎ গতিতে জমিলা উঠে দাঁড়ায়, ডাকে-বুবু! জিকির করতে করতে মজিদ অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে গাছতলার দিকে পাতলা ঘোমটাহীন মেয়েটাকে দেখতে পায় মজিদ। এতে তার প্রচণ্ড রাগ হয়। রাগে তার চোখজ্বলে ওঠে। মজিদ ধমকে ওঠে। জমিলা শীঘ্রই বেড়ার আড়ালে চলে যায়। খাওয়া-দাওয়া শুরু হয়। মজিদ ভেতরে গিয়ে রহিমাকে বলে-“ও যে একদম বাইরে চইলা গেলো, দেখলা না তুমি?” শুনে রহিমার হাত পা অসাড় হয়ে আসে। রহিমা হঠাৎ সিঁড়ির দিকে এলে মজিদ তাকে ডেকে বলে-“বিবি, কারে বিয়া করলাম? আমার বুদ্ধিতে যানি কুলায় না।” নির্ভেজাল হৃদয় নিংড়ে কথা বলছে মজিদ। রহিমা ঘোমটা দিয়ে বলে-‘আপনে এলেমদার মানুষ। দোয়াপানি দিলে ঠিক হইয়া যাইবনি সব।” পরদিন থেকে শিক্ষা শুরু হয় জমিলার। মজিদ বাইরে থেকে এসে তাকে ডেকে ভালোভাবে বোঝায়। জমিলা চুপ করে থাকে। মজিদ নির্দেশ দেয়-“তুমি আইজ রাইতে তারাবি নামাজ পড়বা। তারপর মাজারে গিয়া তানার কাছে মাফ চাইবা।” জমিলা দীর্ঘ সময় জায়নামাজে ওঠা বসা করে। মজিদ উঠে গিয়ে দেখে জায়নামাজে সেজদা দিয়ে আছে জমিলা। সে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু সেজদা শেষ হয়না। বুঝতে পারে জমিলা ঘুমিয়ে পড়েছে। হেঁচকা টানে তাকে তুলে নিয়ে মাজারের দিকে রওয়ানা দিল। মাঝ উঠানে বেঁকে বসল জমিলা। জোরকরলে মজিদেও মুখে থুথু ছিটিয়ে দিল। মজিদ প্রচন্ড রেগে জমিলাকে মাজার ঘরে নিয়ে পদপ্রান্তে ধপাস করে ফেলে দিল। মজিদ দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করে। হঠাৎ জমিলা ধাঁ করে উঠে দাঁড়ালে মজিদ উঠে তাকে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। দোয়া-দরুদ পড়ার পরামর্শ দিয়ে ঘরের ঝাপটা লাগিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় মজিদ। অপেক্ষা করে থাকে জমিলার কান্নার আওয়াজ শোনার জন্য, কিন্তু কোনো আওয়াজ নেই। হঠাৎ মেঘ গর্জন শুরু হয়, বিদ্যুৎ চমকায় ঘন ঘন। শুরু হয় প্রচণ্ড ঝড় আর শিলাবৃষ্টি। ভয়ে তার মুখ কালো হয়ে যায়।
মাঠে মাঠে নধর কচি ধান নষ্ট হয়ে যাবে বলে। রহিমাকে ডাকে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে পরিস্কার গলায় রহিমা বলে-“ধান দিয়া কী হইবো, মানুষের জান যদি না থাকে। আপনে ওরে নিয়া আসেন ভেতরে।” মজিদ মাজারে যায়। পাঁজাকোলা করে নিয়ে আসে জমিলাকে। রহিমা প্রবল আবেগে তার দেহে হাত বোলাতে থাকে। রহিমা বুঝতে পারে জমিলা আর নেই। রহিমার এই ভাব দেখে মজিদ বলে:
‘দুনিয়াটা বড় কঠিন পরীক্ষা ক্ষেত্র। দয়া মায়া সকলেরই আছে। কিন্তু তা যেন তোমারে আঁধা না করে।’
ঝড়-বৃষ্টি থামলে মজিদ বেরিয়ে যায় মাঠের দিকে। তাকে দেখে হাহাকার করে ওঠে সবাই। মজিদ সবাইকে শান্ত হতে বলে। সে কঠিনভাবে তাদের উদ্দেশ্য করে বলে-“নাফরমানি করিও না। খোদার ওপর তোয়াক্কল রাখো।”
এভাবেই উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ সমাপ্ত হয়।
মজিদ চরিত্র
'লালসালু' (১৯৪৮) 'চাঁদের অমাবস্যা' ও 'কাঁদো নদী কাঁদো' এই তিনটি উপন্যাস রচনা করেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাফল্যের শীর্ষ শিখরে আরোহণ করেন। এই তিনটি উপন্যাসের মধ্যে লালসালু তার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। 'মজিদ' চরিত্র চিত্রণের জন্যই 'লালসালু' উপন্যাস শ্রেষ্ঠত্বের অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছে । মজিদ চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমেই লেখক বাংলাদেশের ধর্ম ব্যসায়ীদের শোষণ ভণ্ডামীর চিত্র অঙ্কনের পাশাপাশি অস্তিত্ব প্রত্যাশী মানুষের জীবন সংগ্রামকেও তুলে ধরেছেন।
মজিদকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সক্রিয় চরিত্র হিসেবেই চিত্রিত করেছেন। তাই দেখা যায় মজিদ উপন্যাসের কোনো ঘটনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় নি, বরং সে-ই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনার সংগঠক ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেছে। এই অর্থে মজিদ নিষ্ক্রিয় নয়, সক্রিয় চরিত্র। বস্তুত মজিদ চরিত্র শুধু ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসের নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের অনন্য এবং ব্যতিক্রমী সৃষ্টি।
' লালসালু' উপন্যাস-এ মজিদ চরিত্র পর্যায় বহুল এবং তার আবরণ পূর্বাপর নৈয়ায়িক শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রিত । উপন্যাসটি একটু অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করলেই বুঝা যায় যে, মজিদ চরিত্র তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। প্রথম পর্যায় হলো মজিদের জীবন পটভূমি বা পরিপ্রক্ষিত পর্যায় আর দ্বিতীয় পর্যায় হলো মজিদের জীবন বিনির্মাণ বা উত্তরণ পর্যায় এবং তৃতীয় পর্যায় হল মজিদের জীবন পরিণতির পর্যায় ।
উপন্যাসের সূচনা থেকে মজিদের মহব্বত নগরে প্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত হলো মজিদ চরিত্রের জীবন পটভূমি বা পরিপ্রেক্ষিত পর্যায় । মজিদ চরিত্রে যে শঠতা, প্রতারণা, ছলনা, ধূর্ততা, প্রতিহিংসা পরায়ণতা, মিথ্যাচার লাম্পট্য আর সংগ্রামশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় তার অনিবার্যতা নির্মাণ করা হয়েছে এ পর্বে। প্রাকৃতিক ভাবে দুর্যোগপূর্ণ একটি অঞ্চলের অধিবাসী মজিদ। যার পটভূমি উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
বিরান মাঠ, সব ভাঙ্গা পাড় আর বন্যা ভাসানো ক্ষেত। নদী গহবরেও জমি নেই।
শস্য নেই, যা আছে তা যৎসামান্য । শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের আগাছা বেশি।”
তবে মজিদ ছিল আরবী শিক্ষায় শিক্ষিত। তাই সে অভাব আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবন বিপন্ন না করে জীবনকে পরিপূর্ণ ভোগে প্রয়াসী হয়েছে। ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের বিরান অঞ্চল অতিক্রম করে সে মহব্বতনগর গ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে । মহব্বতনগর এসে মজিদ জীবন উপ-ভোগের কোন শুদ্ধ প্রক্রিয়াকে নয় বরং মাজার ব্যবসার মত অশুদ্ধ প্রক্রিয়াকেই বেছে নেয় । কারণ-
“ তথাকথিত মাজারের পানে চেয়ে কচিৎ কখনো সে যে ভাবিত হয় না তা নয় । কিন্তু তারও যে বাঁচার অধিকার
আছে সেই কথাটাই সে সাময়িক চিন্তার মধ্যে প্রধান হয়ে উঠে ।”
মহব্বত নগর গ্রামে বসে মাজার ব্যবসার পর থেকে শুরু হয়েছে মজিদ চরিত্রের দ্বিতীয় পর্যায়। এ পর্যায় হলো মজিদের জীবন বিনির্মাণ বা উত্তরণের পর্যায়। প্রাক জীবনের দৈন্য দুর্দশা এখানে নেই। এখন সে ধনে মানে আর প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ। শুধু তাই নয় মহব্বতনগর গ্রামের সে এখন চালিকা শক্তি। গ্রামের সমস্ত জন জীবন মজিদের আঙ্গুলের ইশারায় কখনও গতিপায়, আবার কখনও গতিহীন হয়। মজিদের এই প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জনের পিছনের সক্রিয় থেকেছে সমাজ মূলের অন্ধবিশ্বাস, সংস্কার, অশিক্ষা আর ধর্মভিরুতা । মজিদ লক্ষ্য করেছে-
“এখানে ধানক্ষেতের হাওয়া গান তোলে বটে কিন্তু মুসল্লীদের গলা আকাশে ভাসে না ।
মজিদ আরো লক্ষ করেছে যে, এখানকার লোকগুলো অবস্থাবান ও জোতজমির মালিক হলেও, তারা অত্যন্ত সরল এবং প্রকৃতির মতই অপ্রতিবাদী। আর মজিদ এদের এই সরলতা কাজে লাগিয়েছে। বাঁশ ঝাড়ে পরিত্যক্ত একটি কবর দেখিয়ে সে গ্রামবাসীদের বলেছে-
আপনারা জাহেল, বে-এলেম, আনপাড়াহ। মোদাচ্ছের পীরের মাজারকে এমন করি ফেলি রেখেছেন।”
বস্তুত গ্রামবাসীদের সরলতা অশিক্ষা, আর ধর্মভীরুতাই মজিদকে ঘরবাড়ি, জোঁত জমির মালিক হতে সহায়তা করেছে। তবে মজিদের এ প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন ও সহজ সরল ছিল না । প্রতিনিয়তই তাকে অত্যন্ত সতর্কতার ও বিচক্ষণতার সাথে তার অস্তিত্বগ্রাসী শক্তি নির্মূল করতে হয়েছে। এর জন্য কখনও সে হয়েছে ধূর্ত, প্রতারক, মিথ্যাবাদী ও কূটকৌশলী। আবার কখন তাকে হতে হয়েছে চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ ও নিষ্ঠুর। তাহেরের বাপ ও আমেনা বিবির অবিশ্বাস আর ঔদ্ধতকে মজিদ নির্মূল করেছে অত্যন্ত ধুর্ততা এবং নিষ্ঠুরতার সাথে। উপস্থিত বুদ্ধি, কৌশল আর বিচক্ষণতা দিয়ে নির্মূল করেছে আক্কাসের স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এবং আওয়াল পুরের পীরকে।
ক্ষণিবৃত্তির চিন্তা দুর হলে মানুষ নিজেকে আরো চরমভাবে উপভোগ করতে চায়। মজিদের জীবনে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যতা এলে সেও রহীমাকে বিয়ে করেছে। কিন্তু রহীমা মজিদের নারী সম্পর্কীয় চেতনাকে নিবৃত করতে পারেন নি। তাই সে অনতিকাল পরই কিশোরী জমিলাকে বিয়ে করে। আর এর মধ্যদিয়েই সূচিত হয় মজিদ চরিত্রের পরাভব পর্যায়। মজিদ ভেবেছিল সে জমিলার শ্রদ্ধা ও ভালবাসা লাভ করবে। কিন্তু সে তা পায় নি । কারণ কিশোরী জমিলার মধ্যে যে প্রাণ স্ফুরণ ছিল তা মজিদের পরাভবকে অনিবার্য করে তোলে । তাই বিত্ত ও ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত মজিদ হয়েপড়ে চরম নিঃসঙ্গ একা। .....
শিল্পতত্ত্বের নান্দনিক সূত্র অনুযায়ী উপন্যাসের চরিত্রকে হতে হয় পরীক্ষিত ও ফলিত। তাছাড়া অ্যারিস্টটলীয় ত্রিনীতি অনুযায়ী চরিত্রকে হতে হয় আদি, মধ্য ও অন্ত সমন্বিত। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার লালসালু উপন্যাসে মজিদ চরিত্র নির্মাণে এ তত্ত্বকে পূর্বাপর মেনে চলেছেন। তাই মজিদ চরিত্র টাইপ চরিত্রে পরিণত হয় নি। সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভালমন্দে মেশানো বাস্তব মানুষ রূপে। স্বীয় অস্তিত্বের প্রশ্নে সে মিথ্যা কথা বললেও এর জন্য সে অনুশোচনা করেছে, খোদার কাছে মাপ চেয়েছে ।
বস্তুত, সব দিক বিচারে মজিদ চরিত্র পরীক্ষিত, ফলিত ও বিবর্তিত চরিত্র। সে বিচক্ষণতা, মেধা, কৌশল, চাতুর্য আর শঠতার সাহায্যে নিজেই নিজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে আবার নিজেই নিজের চরম পরিণতিকে অনিবার্য করে তুলেছে। সুতরাং বলা যায় যে, মজিদ চরিত্র শুধু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু উপন্যাসে নয়, সমগ্ৰ বাংলা সাহিত্যেই অনন্য, অসাধারণ ব্যতিক্রমী ও কালজয়ী সৃষ্টি।
জমিলা
মজিদ দ্বিতীয় বিয়ে করে। দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে মজিদের ঘরে যার আগমন ঘটে সে তার কন্যার বয়সী এক কিশোরী। জমিলার চরিত্রে কৈশোরক আচরণই প্রধান। এই কৈশোরক আচরণের কারণেই দাম্পত্য সম্পর্কের গাম্ভীর্য তাকে স্পর্শ করে না। এমনকি তার সপতœী রহিমাও তার কাছে কখনো ঈর্ষার বিষয় হয়ে ওঠে না। রহিমার তার কাছে মাতৃসম বড়বোন হিসেবেই বিবেচিত হয় এবং তার কাছ থেকে সে তদ্রæপ স্নেহ আদর পেয়ে অভিমান-কাতর থাকে। তার ধর্মকর্ম পালন কিংবা মাজার প্রতিনিধির স্ত্রী হিসেবে তার যেরূপ গাম্ভীর্য রক্ষা করা প্রযোজন সে ব্যাপারে তার মধ্যে কোনো সচেতনতাই লক্ষ করা যায় না ওই কৈশোরক বৈশিষ্ট্যের কারণে। প্রথম দর্শনে স্বামীকে তার যে ভাবী শ্বশুর বলে প্রতীয়মান হয়েছিল, বিয়ের পরেও সেটি তার কাছে হাস্যকর বিষয় হয়ে থাকে ওই কৈশোরক অনুভূতির কারণেই। ধর্মপালন কিংবা স্বামীর নির্দেশ পালন উভয় ক্ষেত্রেই তার মধ্যে যে দায়িত্ববোধ ও সচেতনতার অভাব হলে তার মূলে রয়েছে তার বয়সোচিত অপরিপক্বতা। মাজার সম্পর্কে রহিমার মতো সে ভীত-শঙ্কিত নয় কিংবা মাজারের পবিত্রতা সম্পর্কেও সে সচেতন নয় এবং এই একই কারণে মাজারে সংঘটিত জিকির অনুষ্ঠান দেখার জন্য তার ভিতরে কৌতূহল মেটাতে কোথায় তার অন্যায় ঘটে তা উপলব্ধির ক্ষমতাও তার হয় না। সুতরাং স্বামী মজিদ যখন এসবের গুরত্ব ব্যাখ্যা করে তার অনুচিত কর্ম সম্পর্কে তাকে সচেতন করে, তখন সে সবের কিছু তার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয় না। সুতরাং তাকে শাসনের ব্যাপারে মজিদের সকল উদ্যোগই তার কাছে অত্যাচার কিংবা নিপীড়ন বলে মনে হয়। এবং এই পীড়ন থেকে মুক্তি লাভের জন্য মজিদের মুখে যে সে থুথু নিক্ষেপ করে সেটাও তার মানসিক অপরিপক্বতারই ফল। এমনকি মাজারে যখন তাকে বন্দি করে রেখে আসে মজিদ তখন সেই অন্ধকারের নির্জনে ঝড়ের মধ্যে ছোট মেয়েটি ভয়ে মারা যেতে পারে বলে রহিমা যখন আতঙ্কে স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তখনও জমিলাকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে দেখা যায়। এরূপ আচরণের মূল্যেও সক্রিয় থাকে তার স্বল্প বয়েসোচিত ছেলেমানুষি, অপরিপক্বতা। অর্থাৎ এই চরিত্রের মধ্যে দিয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, ‘লালসালু’ উপন্যাসে একটি প্রাণময় সত্তার উপস্থিতি ঘটিয়েছেন। শাস্ত্রীয় ধর্মীয় আদেশ নির্দেশের প্রাবল্যে পুরো মহব্বত নগর গ্রামে যে প্রাণময়তা ছিল রুদ্ধ, জমিলা যেন সেখানে এক মুক্তির সুবাতাস। রুদ্ধতার নাযক যে মজিদ, ঔপন্যাসিক সেই মজিদের গৃহেই এই প্রাণময় সত্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন।
একদিকে সে নারী অন্য দিকে সে বয়সে তরুণী- এই দুটিই তার প্রাণধর্মের এক প্রতীকী উদ্ভাসন। এ উপন্যাসে মজিদের মধ্য দিয়ে যে ধর্মতন্ত্রের বিস্তার ঘটেছে তার পেছনে পুরুষতন্ত্রও সক্রিয়। সুতরাং নির্জীব ধর্মতন্ত্রর বিরুদ্ধে সজীব প্রাণধর্মের জাগরণের ক্ষেত্রে এ নারীকে যথাযথভাবেই আশ্রয় করা হয়েছে। জমিলা হয়ে উঠেছে নারীধর্ম, হৃদয়ধর্ম বা সজীবতারই এক যোগ্য প্রতিনিধি।
উপন্যাস বিচার
শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১)। তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে একজন সমাজমনষ্ক শিল্পী । সমাজের নানা সংকটকে তিনি দার্শনিক মনোভঙ্গি থেকে বিচার করেছেন এবং সে ভাবেই তাঁর উপন্যাসে রূপায়ণ করেছেন। তাই বিষয় নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশের --- জনজীবন মূল সম্পৃক্ত, কিন্তু বক্তব্য ও প্রকরণে সর্বজনীন, বিশ্বম্প্রসারিত, স্বনিষ্ঠ, পরীক্ষা প্রিয় ও আধুনিক । উল্লিখিত জীবনবোধ ও শিল্প-চেতনারই সফল রূপায়ণ 'লালসালু' (১৯৪৮), চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪) ও কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮) উপন্যাস।
“ঈশ্বরহীন পৃথিবীতে ব্যক্তি মাত্রই স্বাধীন, স্বয়ং শাসিত এবং সে নিজেই তার নিয়ন্ত্রক ও নির্মাতা; কোন অনির্দেশ্য সার্বভৌম শক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না।” বাঙলা সাহিত্যে সার্ভের এ অস্তিত্ববাদী দর্শনের সফল রূপকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। 'লালসালু'তে উপকরণ হিসেবে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনকে অবলম্বন করেও অস্তিত্ববাদী দর্শনের সফল প্রয়োগে ওয়ালীউল্লাহর কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। এ উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ বহির্মূখী জীবন নয়, রূপায়ণ করেছেন মজিদের অস্তিত্বের সংকটকে।
',শ্রেণীবিভক্ত সমাজে ব্যক্তি হয়ে ওঠে শূন্য অস্তিত্বের প্রতিভূ । তাই সে স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষায় প্রতিযোগী শ্রেণীর ওপর হয় শোষক। সামন্ত ও আধা সামন্তবাদী সমাজ পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপিত লালসালু উপন্যাসের নায়ক মজিদও এর ব্যতিক্রম নয়। সে তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বেছে নেয় আত্মনির্মিত মাজার ব্যবসার নর্থক প্রক্রিয়াকে । তবে সে তার এ নর্থক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিঃসংশিত নয়। প্রথম পর্যায়ে সে বেঁচে থাকার এবং মধ্য পর্যায়ে উপভৌগিক অস্তিত্বে রক্তিম উচ্চাশায় হয়েছে উচ্ছ্বসিত। সে তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ব্যবহার করেছে মহব্বত নগর গ্রামের লোকায়িত মানুষের সর্বপ্রকার ভয় ও বিশ্বাসকে। তার উচ্চারণে তা স্পষ্ট
“মজিদের চোখ ছোট হয়ে আসে। রহীমার শরীরে তো এদেরই রক্ত, আর তার মতই এরা তাগড়া, গাট্টা গোট্টা ও প্রশস্ত।
রহীমার চোখে ভয় দেখেছে মজিদ, এরা কি ভয় পাবে না ?
লোকায়াত মানুষের এই ধর্মঅভীতি, সমাজ শক্তি ভীতি, জোতদার ও মাজার ভীতিকে কাজে লাগিয়ে মজিদ দৃঢ়মূল হলেও সে আশংকা মুক্ত হতে পারেনি। যেহেতু -
“ যে কবরের পাশে আজ তার একযুগ ধরে বসবাস এবং যে কবরের সত্তা সম্পর্কে সে প্রায় অচেতন হয়ে উঠেছিলো, সে
কবরই ভীত করে তোলে তার মনকে । কবরের কাপড় উল্টানো নগ্ন অংশই হঠাৎ তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মৃত লোকটিকে সে চিনে না । ”
ফলে অস্তিত্ব জিজ্ঞাসায় মজিদের বিমিশ্র সত্তা থেকে শুদ্ধ সত্তায় উত্তরণ সম্ভব হয় না। কারণ, মজিদের অস্তিত্ব ব্যক্তিগত উপভৌগিক স্তরেই ছিল সীমাবদ্ধ। মানবিক দায়িত্ব ও মহব্বতনগরের মানুষের স্বাধীন বিবেচনা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে ছিল নিশ্চেতন। তবে শুদ্ধ সত্তার অব্যাখ্যাত অথচ সংকেতময় প্রতিনিধি হল জমিলা । মোদাচ্ছের পীরের মাজারে তার মেহেদি রঞ্জিত পক্ষাঘাত যেন সূক্ষ্ম ও সত্য অস্তিত্বের সাহসী প্রতিভাস । তাই লালসালুতে ওয়ালীউল্লাহ নৈরাশ্যবিহারী নন বরং স্বাতিক্রমণে অস্তিত্বের মুক্ত চৈতন্য উন্মীলিত ।
লালসালুতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র প্রকরণ নিষ্ঠা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য । এ উপন্যাসের প্লট সরল । ঘটনাকে প্রতিক্রিয়ার এবং প্রতিক্রয়ার আােকে চিত্রে অঙ্কন করে ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীর বৈশিষ্ট্যকে ওয়ালীউল্লাহ স্পর্শ করতে পেরেছেন । যেমন-
“খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে, আলোকিত হয়ে উঠেছে সারা উঠানটা। ওপরে আকাশ অন্ধকার গনগনে আগুনের
শিখা যেন সেই কালো আকাশে গিয়ে ছোঁয়? ও ধারে ধোয়া হয়, শব্দ হয় ভাঁপরে । যেন শত সহস্র সাপ শিস দেয় ।”
লালসালু উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ আপতঃ দৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন ঔপনাসিকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ । কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে চরিত্রের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সাথে সমান্তরাল ভাবে লেখকের দৃষ্টিকোণও পরিবর্তিত হয়েছে । মজিদের মহব্বতনগরে প্রবেশের পর থেকে মজিদের প্রেক্ষণ বিন্দু ব্যবহার করা হয়েছে । প্রকৃতভাবে এ উপন্যাসে লেখক ব্যবহার করেন চরিত্রের অন্তর্গত সংবেদনসিক্ত ও চেতনাময় অনেকান্ত নির্বাচিত দৃষ্টিকোন। (Multiple selective Omni science Point of view ) লাল সালু উপন্যাসের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ব্যবহার করেছেন - ইমপ্রেশনিষ্ট, গীতময়, চিত্রাত্মক ও চিত্রকল্পময় পরিচর্যারীতি। তবে ভাবানুষঙ্গে কখনো তিনি প্রতীকী পরিচর্যারীতিও ব্যবহার করেছেন । তাহেরের বাপের নিরস্তিত্ব হওয়ার প্রতীকী অনুষঙ্গকে লেখক তুলে ধরেছেন এভাবে -
দুদিন পরে ঝড় উঠে । আকাশে দূরন্ত হাওয়া আর দলে ভাবি কালো কালো মেঘ লড়াই লাগে ; মহব্বত নগরের
সর্বোচ্চ তালগাছটি বন্দি পাখির মত আছড়াতে থাকে । হাওয়া মাঠে ঘূর্ণিপাক খেয়ে আসে, তির্যক ভঙ্গিতে বাজপাখির মত
শোঁ করে নেবে আসে, কখনো ভোঁতা প্রশস্ততায় হাতির মত ঠেলে এগিয়ে যায়।
লালসালু উপন্যাসের চরিত্র সমূহ সুঅঙ্কিত। চরিত্র ও ঘটনার বিন্যাসে কোথাও প্রগাঢ় রঙ ব্যবহৃত হয় নি । এ উপন্যাসের ভাষা জীবন ঘনিষ্ট, এবং চরিত্রানুগ । ‘এমন করে হাটে না বিবি মাটি গোস্বা করে।' বক্তার এ উক্তিতে শ্রোতার নয়, যেন বক্তারই ভয়ের সংকেতময় আভাস প্রকাশিত হয় । এ উপন্যাসে ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষার সর্বজনীন রূপ এ উপন্যাসের ভাষার উল্লেখ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জীবন বিমুখ আত্মবিনাসী অন্ধকারবাসী কিংবা নৈরাশ্যবিহারী কোন শিল্পীপুরুষ নন । তার কৃতিত্ব তিনি বুর্জোয়া সভ্যতাজাত প্রতিক্রিয়ার দর্শনকে বিবেচনা করেছিলেন ক্রমশঃ হয়ে উঠা মানবীয় অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু দিয়ে। নিরস্তিত্বের শূন্যতায় ফুরিয়ে যাওয়া জীবন নয়, অন্ধকার ভেঙ্গে ভেঙ্গে অতিত্বের দায়িত্বশীল স্বাধীন সত্তায় উত্তরণই জীবন । মোট কথা স্বাতিক্রমণই এ জীবনার্থের মূলকথা। এ শিল্পনীতি ও জীবনবোধের রূপায়ণ ঘটেছে আমাদের আলোচ্য লালসালু উপন্যাসে।
সমাজ বাস্তবতা
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত “লালসালু”। ১৯৪৯) উপন্যাস বাংলাদেশের শাশ্বত সমাজ বাস্তবতার শিল্পিত প্ৰতিমা ।ও সাংস্কৃতিক জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্রকেই উন্মোচন করেছেন ।
এ উপন্যাসের প্রতিটি ঘটনা ও চরিত্র শুধু ঘটনা ও চরিত্র নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে লেখক সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয়, শিক্ষা ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের ফলে মানুষের জীবন অর্থনৈতিকভাবে হয়ে পড়ে নিঃস্ব, রিক্ত । লালসালু উপন্যাসে বিবৃত সমাজ এ সত্য থেকে মুক্ত হতে পারে নি। বরং এখানকার জীবন ক্রমশ অশিক্ষা, কুসংস্কার আর অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে । শঠতা, প্রতারণা আর শাসনের জটিল এবং সংখ্যাবিহীন শিকড় জীবনের স্তরে স্তরে বিস্তৃত হয়ে জীবনকে এক দুর্লঙ্ঘ্য বেষ্টনে আবদ্ধ করে ফেলে। সমাজের এ বাস্তবতাকে লেখক অঙ্কন করেছেন এভাবে-
“বিরান মাঠ, সব ডাঙ্গা পাড় আর বন্যা ভাসানো ক্ষেত। নদী গহ্বরেও জমি সামান্যই। জমিতে শস্য নেই। যা আছে তা যৎসামান্য । শস্যের চেয়ে টুপী বেশি, ধর্মের আগাছা বেশি
এখানেই শেষ নয়। লেখক এ উপন্যাসে শ্রেণী বিভক্ত সমাজ সত্যের উন্মোচন ঘটিয়েছেন । এখানে একদিকে যেমন রয়েছে কুসংস্কারাচ্ছন্ন শোষিত দরিদ্র শ্রেণী তেমনি অন্যদিকে রয়েছে শঠ, প্রতারক ধর্মব্যবসায়ী প্রতারক শোষক শ্রেণী। দুদু মিয়া সোলেমানের বাপ, তাহের কাদের, মতি, কালু হাসুনির মা, রহীমা শোষিত শ্রেণী আর মজিদ খালেক ব্যাপারি শোসক শ্রেণীর প্রতীক। তবে শোষণ প্রক্রিয়া কখনই নির্বিঘ্ন হয় না, একে কখনও কখনও প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। এখানেও তাই হয়েছে । মজিদের শোষণ আর প্রতারণা জমিলার সমাজ- শর্তহীন উন্মুক্ত জীবনচেতনা ও সুস্থ প্রাণ ধর্মের কাছে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। বস্তুত লালসালু উপন্যাসে যুগ যুগ ব্যাপী শিকড় গাড়া শোষণ প্রক্রিয়া আর অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও ভীতির সাথে সুস্থ জীবনাকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবে উন্মোচিত হয়েছে ।
আধা সামন্তবাদী ও আধা পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা মানুষকে অপ্রতিবাদী করে গড়ে তোলে । যুক্তিহীন জীবনাচরণে তারা অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। লালসালু উপন্যাসের সমাজ বাস্তবতা সম্বন্ধেও এ সত্য প্রাসঙ্গিক। কারণ, এখানকার লোকগুলো একদিকে যেমন সরল তেমনি যুক্তিহীন । তাই মজিদ যখন একটি অখ্যাত কবরকে মোদাচ্ছের পীরের কবর বলে চালিয়েছে এবং গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলেছে- --
“আপনারা জাহেল, বে-এলেম আনপাড়াহ। মোদাচ্ছেরপীরের মাজারকে আপনারা এমনি করি ফেলি রেখেছেন।”
তখন তারা নির্দ্বিধায় তা বিশ্বাস করেছে। নিজেদের অপরাধী ভেবেছে। মজিদ গ্রামবাসীদের এ সরলতার সুযোগ নিয়েছে। সে আরো লক্ষ করেছে -
“এখানে ধানক্ষেতের হাওয়া গান তোলে বটে কিন্তু মুসল্লীদের গলা আকাশে ভাসেনা”
ফলে স্বাভাবিক ভাবেই মজিদের শোষণ প্রক্রিয়া আরো সুদৃঢ় হয়েছে এবং ব্যাপক বিস্তৃত হয়েছে।
অন্যদিকে মজিদ মহব্বত নগর গ্রামে এসে খালেক ব্যাপারীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং গ্রামবাসীদের উপর প্রবর্তন করেছে এদের যৌথ শাসন । সর্বকালেই ধর্মব্যবসায়ী প্রতারক শক্তির সঙ্গে সফর ও অস্ত্রধারী পেশীশক্তি যুক্ত হয়ে জনগণের উপর শোষণ ও শাসন প্রক্রিয়া বহাল রেখেছে। এই দুই শ্রেণীর রূপ দুটি হলেও তাদের লক্ষ্য এক। লালসালু উপন্যাসে লেখক তাই উচ্চারণ করেছেন--
‘একজনের আছে মাজার আর একজনের আছে জোতজমি,
-প্রতিপত্তি। সজ্ঞানে না হলেও তারা একাট্টা, পথ তাদের এক।'
শুধু মহব্বত নগর গ্রামই নয় অদ্যাবধি সমগ্র বাংলাদের আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতাই এ সত্যকে ধারণ করে ।
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নারীরা অধিকারহীন, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, পুরুষের সাময়িক আনন্দের সহযোগী মাত্র । এ উপন্যাসের সমস্ত নারী চরিত্রই এ সত্যকে লালন করে। রহীমা, হাসুনির মা, জমিলা, আমেনা বিবি এখানে কোনো ব্যক্তি নয়, সমাজ সত্য মাত্ৰ।
তৎকালীন সমাজে পারিবারিক ব্যবস্থা ছিল শিথিল অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে পরিবারে যথার্থ সুখ বিরাজিত ছিল না। তাহেরের বাপের পরিবার এর প্রমাণ । তাছাড়া সে সমাজে বহু বিবাহের প্রচলনও লক্ষ করা যায়- মজিদ ও খালেক ব্যাপারীর মাধ্যমে।
‘লালসালু' উপন্যাসে বিধৃত সমাজ ব্যবস্থায় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার কোনো প্রচলন লক্ষ্য করা যায় না। মক্তব-মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধেই অবহিত হওয়া যায় --- । তবে সমাজের কিছু লোক যে আধুনিক, ও স্বাধীন শিক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে সচেতন ছিল, তা বুঝা যায় । আক্কাসের স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রয়াস এর প্রমাণ। তবে মৌলবাদী, অস্ত্রধারী পেশী শক্তির প্রভাবে সে প্রয়াস নস্যাৎ হয়।
নির্যাতিত মানুষের উপর শাসন ও শোষণ কখনই চিরস্থায়ী নয়, তা ক্ষণিক। শোষিত মানুষ জাগরিত হলেই শোষক শক্তির পতন অনিবার্য। সমাজ বিকাশের এ দার্শনিক সত্যটিও উন্মোচনেও হয়েছে লালসালু উপন্যাসে। তথাকথিত মোদাচ্ছের পীরের কবরে জমিলার মেহেদী রঞ্জিত পদাঘাত এর প্রতীকী ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত।
বস্তুত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন স্বদেশ, স্বসমাজ ও স্বজাতি নিষ্ঠ । তিনি তাঁর উপন্যাসে ব্যক্তির অস্তিত্বের সংকটকে রূপায়ণে প্রয়াসী হলেও সমাজের অন্তর ও বর্হিবাস্তবতা উন্মোচনেও ছিলেন সমুৎসুক । তাই তাঁর 'লালসালু' উপন্যাস সমকালীন সমাজের বাস্তব চিত্র রূপাণের প্রশ্নে বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে একটি দীপ্তিমান এবং অনতিক্রান্ত শিল্প প্রতিমা ।
মুসা স্যার, বাংলা, 01713211910
+88 01713 211 910