
এইচএসসি রচনা: একুশের চেতনা, অথবা, জাতীয় জীবনে একুশের তাৎপর্য
এইচএসসি রচনা: একুশের চেতনা , অথবা, জাতীয় জীবনে একুশের তাৎপর্য
ভূমিকা : আমরা মানুষ। মানুষ হিসেবে আমাদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো ভাষার মাধ্যমে ভাবের আদান-প্রদান। মেধার বিকাশ, মনের আকুলতা, কল্পনা, অনুভূতি সবকিছু প্রেরণা পায় ও রূপায়িত হয়ে ওঠে ভাষা তথা মাতৃভাষার মাধ্যমেই। এজন্যই মাতৃভাষার দাবি জীবনের দাবি, মনুষ্যত্বের দাবি। অপ্রতিরোধ্য বাঙালি জীবন দিয়ে- এ জীবন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি। সেদিন জাতির মানসভূমিতে উপ্ত স্বাধীকারের যে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, আজ তা স্বচ্ছলতায় শিকড় গাড়া সশাখ বৃক্ষ। সেদিনের চারপ্রহরে আটকে আছে বাঙালির অনন্ত মহাকাল, অখণ্ড সময়। সে চেতনার পরিমণ্ডলে গরবিনী জাতির ইতিহাস সংযোজিত হয়েছে আরও অনেক অধ্যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, যুগ থেকে যুগান্তর সত্যভাষণ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার, একুশ তার অমিয় শক্তির উৎস।
একুশে ফেব্রুয়ারি কী এবং কেন : সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের দোসর প্রতিক্রিয়াশীলতার দানবীয় নিষ্পেষণে দেশের অর্থনৈতিক জীবন যখন, পঙ্গু, শিক্ষার অধিকার যখন ভূলুণ্ঠিত, ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা যখন বিপর্যস্ত, গণতন্ত্র যখন নির্বাসিত এবং শোষণের শানিত খড়গ যখন উল্লাসিত, নিঃসীম অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জনতার যখন জীবন গভীর হতাশার আছন্ন আর তখনই এক ঝলক আশীর্বাদের আলোর মত এল একুশে ফেব্রুয়ারি।
দিনে দিনে যে বিপুল বিক্ষোভ পুঞ্জ পুঞ্জ হয়ে জমেছিল বাংলার মানুষের মনে মনে, শহীদের পবিত্র রক্তস্পর্শে যেন কোন মন্ত্র গুণে তার বাঁধ গেল ভেঙ্গে-১৪৪ ধারাকে উপেক্ষা করে উচ্ছল তরুণ, ছাত্র জনতা সামিল হলো মিছিলে। মিছিলের দাবি একটাই-‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। বিকাল তিনটার দিকে মেডিকেল কলেজের সামনে বিক্ষোভ রত ছাত্র জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালালো পুলিশ। হতাহত হলেন অনেকে। রক্তস্নাত গরবিনী রাজপথে ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখে মৃত্যুর শীতল ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়লো কয়েকটি তাজা প্রাণ। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম সে রক্তিম সে রক্তিম বিকেলে জন্ম নিল মহান একুশের চেতনা।
একুশের আন্দোলনের পটভূমি : রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার চূড়ান্ত রূপ লাভ হঠাৎ একদিনেই সম্ভব হয় নি। এর পেছনে আছে অনেক সংগ্রাম, অনেক ত্যাগ। ভাষার অধিকার নিয়ে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল যুগ যুগ আগে সেই অবিভক্ত ভারতে। সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষে মানস জগতে গণতান্ত্রিক চেতনা, জাতীয় মুক্তির চেতনা দানা বেঁধে উঠতে থাকে। আর এ জাতীয় মুক্তির অপরিহার্য শর্ত হিসেবে ভাষা অধিকার সর্বোচ্চ স্থান পায়।
ভাষার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা দেশবিভাগের পরও শেষ হয় নি, বরং আগের স্বেচ্ছাচারিতার রোল বদলিয়ে নতুন স্বেচ্ছারিতার রূপ গ্রহণ করল। স্বৈরাচারী মুসলিম লীগ শাসক জনগণের প্রাণের দাবিকে পদদলিত করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করল। কিন্তু প্রাণধর্মতো সহজে দলিত হবার কথা নয়-
‘মাগো ওরা বলে,
সবার কথা কেড়ে নেবে
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।
বলো মা, তাই কি হয়?
হ্যাঁ, হায়েনাদের অপপ্রায়াস আর বাস্তব রূপ লাভ করে নি। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি তারিকে বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বাংলার ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সমুন্নত রেখেছে।
একুশের ঘটনাপঞ্জি :
২৬ জানুয়ারি- নাজিমুদ্দিনের ঘোষণা ও জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়া।
৩০ জানুয়ারি- বাঙালির ক্রমান্বয়ে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বিদ্বেষ আর অসন্তোষ বিস্ফোরিত হল একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে। গুলি চালালো পুলিশ, হতাহত হলো প্রজম্মের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা। নিহত সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের নিস্পন্দ দেহ এবং আহত অগণিত উচ্ছল তরুণের দৈহিত বৈকল্যের পথ বেয়ে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত হলো।
একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য : ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে বর্বর হত্যাকাণ্ড সাধিত হয়েছিল তা স্মরণ করার জন্য প্রতি বছর ভাবগম্ভীর পরিবেশে শহীদ দিবস উদযাপন করা হয়। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য কেবল শহীদ দিবস পালনের মধ্যে, শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি। তা বাঙালির জীবনের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনাই বাঙালিকে স্বাধিকার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে এবং এর মাধ্যমে বাঙালি আত্মসচেতন হয়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।
জাতীয় চেতনা : একুশের চেতনা থেকেই ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাঙালির সংগ্রামী চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মাতৃভাষার মর্যাদা আদায়ের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়। ফলে বাঙালি জাতির মধ্যে জাতিয়তাবোধের বিকাশ ঘটে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ জাতীয়তাবোধ বিশেষভাবে কার্যকর ছিল। তাই বলা চলে, একুশে ফেব্রুয়ারির সংগ্রামের পথ ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হয়েছে।
আমাদের সাহিত্যে একুশের প্রভাব :
কবিতার একুশ : একুশের তাৎক্ষণিক প্রভাব সর্বপ্রথম লক্ষ্য করা যায় বাংলা কবিতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত ঢাকার রক্তাক্ত ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামের কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী একুশ নির্ভর একটি কবিতা রচনা করে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সে কবিতায় তিনি খুনি জান্তাদের ফাঁসির আবেদন জানান। কবিতার অংশবিশেষ নিম্নরূপ:
“এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনায় ঊর্ধমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়
সেখানে দাঁড়িয়ে আমি কাঁদতে আসি নি
আজ আমি শোক বিহ্বল নই
আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল
আমি আজ তাদের ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি
যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে নির্বিচারে হত্যা করেছে।”
একুশের সংগ্রামী চেতনাক উপজীব্য করে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ‘শহীদ স্মরণে’ কবিতাটি রচনা করেন। এ কবিতায় শহীদদের প্রতি তাঁর গভীর অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে এভাবে-
“কবিতায় আর কি লিখবো
যখন বুকের রক্তে লিখেছি একটি নাম
বাংলাদেশ।”
সঙ্গীতে একুশ : একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে লক্ষ কোটি বাঙালির কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়, আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত নিম্নলিখিত গানটি
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।”
নাটকে একুশ : বাংলার নাটকে একুশের প্রভাব লক্ষণীয়। মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকটি একুশের পটভূমিকায় রচিত হয়েছে।
উপন্যাসে একুশ : একুশের ঘটনাবলীকে উপজীব্য করে জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ সর্বজনবিদিত। শওকত ওসমানের ‘আর্তনাদ’ এবং সেলিনা হোসেনের ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ একুশের পটভূমিকায় রচিত উপন্যাস।
ছোটগল্পে একুশ : জহির রায়হান বিরচিত ‘অতি পরিচিত’, ‘কয়েকটি সংলাপ’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, ‘একুশের গল্প’ প্রভৃতি ছোটগল্প একুশের প্রত্যক্ষ চেতনা থেকে জন্মেছে।
চিত্রকলায় একুশ: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, হামিদুজ্জামানের আঁকা ছবি ও ভাস্কর্যে একুশের চেতনা মূর্ত হয়ে উঠেছে।
২১ ফেব্রুয়ারি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয় : একুশ শুধু কিছু ঘটনা কিংবা হতাহতের পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি আত্মপ্রত্যয়ের দিবস। এ প্রত্যয়কে বুকে ধারণ করেই আমরা আমাদের দেশকে স্বাধীন করেছি। সুতরাং এ দিনটির আদর্শ, দর্শন ও চেতনাকে সামনে রেখে আমরা বাস্তবায়িত করতে পারি জাতি গড়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন নিয়ে আমরা আমাদের জাতীয় জীবনের শিক্ষার হার বাড়াতে পারি, শিক্ষার মানও বাড়াতে পারি। এ দিনটি তাই শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতায় ফুরিয়ে যাবার জন্য নয়। এর মহান আদর্শ বিস্মৃত হলে আমাদের অগ্রযাত্রা নিশ্চিতভাবে ব্যহত হবে। এ কারণে, কর্মশৈথিল্য পরিহার করে যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে তাকে সফল করতে হবে।
উপসংহার : দেশ আজ স্বাধীন। পরিস্থিতি আজ পরিবর্তিত। কিন্তু আজও বাঙলা ভাষা জীবনের সর্বস্তরে চালু হয় নি। অফিস-আদালতে সম্পূর্ণ আসন গ্রহণ করে নি। শিক্ষার পরিপূর্ণ মাধ্যম হয় নি বাংলা ভাষা। নিজের বিবেকের মুখোমুখি তাই আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় একুশে ফেব্রুয়ারি । একুশের চেতনাই আমাদের উপহার দিয়েছে চেতনার রঙে রাঙা একটি মানচিত্র-বাংলাদেশ। সুতরাং কথাসর্বস্ব জীবন যাপন করলে চলবে না। বাংলা ভাষাকে, বাংলা সাহিত্যকে জীবনের সামগ্রী করতে হবে, চালু করতে হবে সরকারি-বেসরকারি সর্বস্তরে বাংলাভাষাকে। আর এর মধ্য দিয়েই একুশ লাভ করবে যথার্থ মর্যাদা এবং শহীদদের আত্মত্যাগ হবে যথার্থ।
+88 01713 211 910