
এইচএসসি রচনা: পরিবেশ-দূষণ ও তার প্রতিকার
এইচএসসি রচনা: প্রধান প্রধান সমস্যা ও সম্ভাবনা কেন্দ্রিক রচনা
এইচএসসি রচনা: পরিবেশ-দূষণ ও তার প্রতিকার
ভূমিকা : মানব জীবনের অপরিহার্য অংশ হলো পরিবেশ। তাই মানুষের সামগ্রিক জীবনে পরিবেশের প্রভাব ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ ক্রমে ক্রমে তার পরিবেশকে নির্মাণ করেছে। মানুষের নির্মিত পরিবেশ তারই সভ্যতার বিবর্তনের ফল। পরিবেশ প্রাণের রক্ষক ও ধারক। এ কারণেই পরিবেশ বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার উপরই নির্ভর করে প্রাণীকূলের অস্তিত্ব। পরিবেশ বিরুদ্ধ হয়ে উঠলে প্রাণীর ধ্বংস অনিবার্য। আর পরিবেশ অনুকূল থাকলে মানুষের জীবন হয় সুখকর, শান্তিময়। কিন্তু দুঃখের বিষয় মানুষ আজ নিজেই নিজের পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলেছে। ফলে তার জীবনের অস্তিত্ব আজ হুমকীর সম্মুখীন।
কাকে পরিবেশ দূষণ বলি : মানুষের অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ডের ফলে পরিবেশের যে নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে তাই পরিবেশ দূষণ। আমাদের পরিবেশ হলো- আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তথা – মাটি, পানি, বাতাস, গাছপালা, নদী, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ প্রভৃতির সমষ্টি। কোন কারণে এই সমস্ত প্রাকৃতিক উপাদানের সামঞ্জস্য বিনষ্ট হলে পরিবেশ বিপন্ন হয়, হয় দূষিত। পরিবেশের এই বিপন্ন বা বিনষ্টের পিছনে মানুষের ভূমিকাই মুখ্য !
পরিবেশ দূষণের স্বরূপ : পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবেশের অতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। সেই সাথে বাংলাদেশের পরিবেশেরও অবনতি ঘটছে দ্রুত। গত কয়েক দশকে এ অবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, বনাঞ্চলের অবক্ষয় ও ঘাটতি এবং শিল্প ও পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাবের কারণে দেশের পরিবেশ এক জটিল অবস্থার দিকে পৌঁছতে যাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের অবিবেকী আচরণ এবং পরিকল্পনাবিহীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিবেশকে এক নাজুক অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
মানুষ নিজের প্রয়োজনে প্রকৃতিকে যেমন কাজে লাগাচ্ছে বা প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করছে, প্রকৃতিও তেমনি ছিন্ন-ভিন্ন -আহত রূপ নিয়ে মানুষের তথা সমগ্র প্রাণপুঞ্জের ঠিক সমপরিমাণ বিরোধিতা করতে তৎপর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানের বিজয়গৌরবে মোহান্ধ মানুষ পৃথিবীর পরিবেশকে বিষাক্ত করেছে। আজও করছে। ছড়িয়ে দিয়েছে ক্ষতিকর সব আবর্জনা। তার ফল হয়েছে বিষময়। পরিবেশ দূষিত হয়েছে। আর দূষিত পরিবেশ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। তাই গোটা জীবজগতের অস্তিত্বই আজ বিপন্ন।
বায়ু দূষণ : আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে সুখকর এবং সীমাহীন সম্পদ হলো - বায়ু। কিন্তু এই বায়ু আজ দূষিত। তা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠছে জীবনের জন্য হুমকী স্বরূপ। কেননা বায়ুর সাথে আজ মিশে যাচ্ছে ঝুল জাতীয় কার্বন কণা, ভারী ধাতু, নিউক্লিয় আবর্জনা, বিভিন্ন জ্বালানি থেকে প্রস্তুত কার্বন-ডাইঅক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরোমিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি। তাছাড়া বায়ু দূষণের মূলে আছে কলকারখানা, মোটর গাড়ি, ট্রেন, ঘরবাড়ি ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উত্তাপ সৃষ্টির যন্ত্রপাতি এবং নানান আবর্জনা। তাছাড়া বিভিন্ন অক্সাইড বাতাসের জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে তৈরি করে সালফার এবং নাইট্রোজেনের অম্ল। এই অম্লেরই নাম 'এসিড রেইন' বা অম্লবর্ষণ। এই অম্লবর্ষণ মাটি, নদী ও হ্রদ ইত্যাদির পানিতে মিশে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।
আমাদের বায়ুমণ্ডল দূষণের আর একটি দিক হলো ভূ-পৃষ্ঠের উর্ধ্বাকাশে ভাসমান বিভিন্ন রাসায়নিক কণার পরিমাণ বৃদ্ধি । উপর আকাশে এই সব ভাসমান বস্তুকণার সঙ্গে জলীয় বাষ্প মিশে গড়ে ওঠে বৃষ্টি-বিন্দু । এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ অকাল বর্ষণ এবং বর্ষণের সঙ্গে ঝড় ও শিলা- বৃষ্টি হয়ে থাকে। কুয়াশা আর তেল, কয়লা দহনের ফলে নির্গত গ্যাসের মিশ্রণে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে। এই ধোঁয়াশা মানুষের মারাত্মক ক্ষতি করে। শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, মাথাধরা, দীর্ঘস্থায়ী ব্রংকাইটিস, ফুসফুস ক্যান্সার এই ধরনের ক্ষতিকর বায়ু দূষণের ফল।
পরিবেশ দূষণ ও পানি : আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো পানি দূষণ প্রক্রিয়া। পৃথিবীর পানির উৎসগুলো বর্তমানে নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। ভারী ধাতু হ্যালোজেন নিষিক্ত হাইড্রোকার্বন, কার্বন ডাই অক্সাইড, পেট্রোলিয়াম, কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা ও শহরের পয়ঃপ্রণালী বেয়ে আসা দূষিত তরল আবর্জনার কারণে পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ জনপদ কিংবা শহর। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক চামড়ার কারখানা, চটকল, কাপড় কল, চিনি কল, কাগজের কল, ভেষজ তেল ইত্যাদি । এইসব কলকারখানার আবর্জনা প্রতিনিয়ত নদনদীর পানিকে দূষিত করছে। দ্রুত শিল্পায়ন বিভিন্ন দেশের পানি সরবরাহের এবং আবর্জনা নিক্ষেপের সমস্যাকে ক্রমশ জটিল করে তুলেছে। উন্নয়নশীল এবং উন্নত দেশগুলোতে দেখা দিচ্ছে গৃহকার্যে ব্যবহৃত নোংরা পানিকে শোধন করে পুনরায় তা ব্যবহারযোগ্য করে তোলার প্রয়োজনীয়তা।
শব্দ দূষণের প্রভাব : শব্দদূষণের কারণে বর্তমান জনস্বাস্থ্য ক্ষতিকর হুমকীর সম্মুখীন। শব্দ দূষণের মূল উৎসগুলো হচ্ছে মোটরগাড়ির হর্ণ, বাজি ও পটকার আওয়াজ, রেডিও-টেলিভিশনের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, কলকারখানার শব্দ ইত্যাদি। শব্দ-দূষণের পরিণামে শ্রবণেন্দ্রিয় অকেজো হয়ে যায়, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়, স্নায়ুতন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে অনিদ্রা এবং নানা প্রকার স্নায়ুরোগের সৃষ্টি হওয়া। এছাড়া কলকারখানার আশেপাশের স্থায়ী বাসিন্দাদের শিশু সন্তানরা কমবেশি বধির হতে দেখা যায়।
বাংলাদেশের শব্দ দূষণের বিভিন্ন কারণ : শব্দ দূষণের প্রকোপ বাংলাদেশের জন্য এক সুদূরপ্রসারী পরিণতি বয়ে আনছে। গাড়ির হর্ণ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোন ট্রাফিক আইন না থাকায় শহরের অনেক অংশে শব্দ সমস্যা অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মৃত্তিকাজনিত দূষণ : মৃত্তিকা বা মাটি ভূত্বকের উপরিভাগের একটি পাতলা আবরণ। বিভিন্ন কারণে মৃত্তিকা দূষণ ঘটে। যেমন, ভূমিকম্প, বায়ু প্রবাহ, বৃষ্টি, গাছকাটা, বন উজাড়, জমিতে অতিরিক্ত বা নিয়মিত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা ইত্যাদি কারণে মাটির গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়, ফলে মৃত্তিকা দূষণ ঘটে।
তেজস্ক্রিয়তাজনিত দূষণ : মানুষের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর এক ধরনের অদৃশ্য দূষণ। ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তার অধিকাংশ বিকরিত হয় বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ, বিশেষত পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক সামগ্রী থেকে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লেজার রশ্মি, এক্সরে মেশিন, রঙিন টেলিভিশন সেট, মাইক্রো ওয়েভ ও ওভেন ইত্যাদি। অধুনা পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের ফলে সৃষ্ট দূষণ বিশ্বব্যাপী মানুষের আতঙ্ক ও উদ্বেগের কারণ হয়েছে।
পরিবেশ দূষণ ও বাংলাদেশ : বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণের কারণগুলো হলো-জীবাশ্ম জ্বালানি, ইটের ভাটা, সার কারখানা এবং চিনি- কাগজ-পাট-বস্ত্র ও সুতা কল। তাছাড়া চামড়া শিল্পের বর্জ্য, রাসায়নিক ও ঔষধ কারখানার বর্জ্যও বাংলাদেশের পরিবেশকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন করছে। নদী ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নিচু জলাভূমি ভরাট ইত্যাদির কারণে বাংলাদেশের পরিবেশ ক্রম অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রকার শিল্প শহরের আবর্জনা বাংলাদেশের নদী ও জলাশয়গুলোকে দূষিত করছে। পরিবেশ অধিদপ্তর উল্লেখ করেছে যে চট্টগ্রামের টিএসপি সারকারখানা থেকে সালফিউরিক ও ফসফরিক এসিড এবং চন্দ্রঘোনার কর্ণফুলি কাগজের মিল, সিলেট কাগজ মিল, দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি, খুলনার শিপইয়ার্ড ও মাছ প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, ঢাকার অলিম্পিক ও কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিলস লক্ষ লক্ষ গেলন তরল বর্জ্য পার্শ্ববর্তী নদী ও জলাশয়ে নিক্ষেপ করে পানির দূষণ ঘটাচ্ছে। ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে ও বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত হয় যে, বাংলাদেশের ১.৮৫ থেকে ২.২৭ কোটি মানুষ ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক দূষণযুক্ত পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে।
পরিবেশ-দূষণের কারণ : আমাদের এই সুন্দর পরিবেশ এমনিতেই দূষিত হয় নি। এর পিছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। স্থল দাগে পরিবেশ দূষণের কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি : দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ এবং এটি অনেক কারণের জনকও বটে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বর্ধিত জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা যেমন - অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার আয়োজনের জন্য যে দ্রব্যাদির প্রয়োজন হয় তা পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য আবাস নির্মাণ করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় কৃষি জমি যেমন ধ্বংস হয় তেমনি গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়। যা পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে।
২। প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার : মানুষের স্বচ্ছন্দ জীবনের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের বিকল্প নেই। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের অপরিকল্পিত ব্যবহার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেমন : নদীতে বাঁধ, খনি থেকে খনিজ দ্রব্যাদির উত্তোলন, গাছপালা কর্তন, পশুপাখির নিধন পরিবেশকে সামঞ্জস্যহীন করে তোলে।
৩। বনভূমি উজাড় : পৃথিবীর যথাযথ ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের জন্য স্থলভূমির ২৫ ভাগ বৃক্ষ থাকা আবশ্যক। কিন্তু নানা কারণে এই বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে পরিবেশ হয়ে উঠছে দূষিত।
৪। ওজোন স্তরের ক্রমাবনতি : বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহারের কারণে ওজোন স্তর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে । এই কারণে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বরফ গলে গিয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। যা আমাদের মতো উপকূলবর্তী দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকী হয়ে উঠেছে।
৫। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ : বর্তমান যুগ নগরায়ণের যুগ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যাপক হারে নগরায়ণ হচ্ছে। নগর তৈরির জন্য যে সমস্ত উপাদান প্রয়োজন হয় তা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে পরিবেশের উপর প্রভাব বিস্তার করে।
৬। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন : আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় শিল্পের কোনো বিকল্প নেই । কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত দেশেই অনেক শিল্প অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠছে। ফলে এই সমস্ত শিল্পের ক্ষতিকর বর্জ্য পরিবেশের জন্য হুমকী হয়ে দেখা দিয়েছে। আমাদের বুড়িগঙ্গাসহ অনেক নদী অপরিকল্পিত শিল্পায়নের শিকার হয়েছে।
৭। কলকারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য : বিভিন্ন প্রকার কারখানার বর্জ্য পদার্থ বায়ু ও পানির সাথে মিশে পরিবেশকে ক্ষতির সম্মুখীন করে তুলছে। আমাদের দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক নয়। ফলে এই বর্জ্য পৃথিবীর পরিবেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
৮। এসিড বৃষ্টি : কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া এসিড বৃষ্টির অন্যতম কারণ। এই এসিড বৃষ্টি গাছপালাসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে।
৯। ক্ষতিকর প্রসাধন সামগ্রী : আমরা এমন অনেক প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহার করি যেগুলো পরিবেশ বান্ধব নয়। এই প্রসাধন সামগ্রী থেকে নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।
১০। সার ও কীটনাশকের ব্যবহার : ফসল রক্ষা কিংবা অনেক সময় অধিক ফলনের আশায় কৃষকরা জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার করে থাকে। এই সমস্ত সার ও কীটনাশক পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে।
১১। গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া : গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া নগর জীবনের পরিবেশকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে তেমনি সামগ্রিক পরিবেশের উপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
১২। অপরিকল্পিত আবাস নির্মাণ : সভ্যভাবে বেঁচে থাকার জন্য আবাসনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে আবাস নির্মাণের কারণে একদিকে যেমন মোট ভূমির উপর চাপ পড়ে তেমনি পরিবেশের উপরও ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে।
১৩। বিভিন্ন প্লাস্টিক দ্রব্য : প্লাস্টিক দ্রব্যের বড় বৈশিষ্ট্য হলো তা মাটির সাথে সহজে মিশে না বা ধ্বংস হয় না । যুগ যুগ ধরে তা অক্ষত থাকে। এটি নগর জীবনের পরিবেশ নষ্ট করার পাশাপাশি আবাদি জমিরও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।
প্রতিকার ও বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ: পরিবেশ দূষণ রোধ করার জন্যে সারা বিশ্ব সচেতন হয়ে উঠেছে। পরিবেশ দূষণের ফলে বিশ্বের বিভিন্নস্থানে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে দূষণ রোধকরার প্রচেষ্টা চলছে। আমাদের দেশে এ ব্যাপারে সচেতনতার সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার এ ব্যাপারে বিভিন্ন ব্যবস্থা ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। যেমন -
১। ব্যাপক ভিত্তিতে বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
২। পলিথিন জনিত দূষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য সরকার ইতোমধ্যে পলিথিন নিষিদ্ধ করেছে।
৩। বায়ু দূষণ রোধের জন্য টু-স্ট্রোক ইঞ্জিন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৪। মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এরকম যান বাহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পেট্রোলিয়ামের পরিবর্তে সিএনজি ব্যবহার বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
৬। ইতোমধ্যে সরকার পরিবেশ আদালত গঠন করেছে। এই আদালতের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবেশ অপরাধ সম্পর্কিত বিচার কাজ ত্বরান্বিত করা।
৭। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণ ও এর প্রকৃতি নির্ধাণের জন্য আন্তর্জাতিক কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে।
৮। সরকার দেশের পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ ( সংশোধন) বিল ২০০২ এবং পরিবেশ আদালত (সংশোধন) বিল ২০০২ নামে দুইটি আইন পাশ করেছে। তাছাড়া পরিবেশ দূষণ রোধে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তার কয়েকটি দিক নিচে তুলে ধরা হল-
(ক) পরিবেশ রক্ষার জন্য দেশের মোট আয়তনের শতকরা পঁচিশভাগ বনায়ন করতে হবে।
(খ) পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
(গ) যে কোনো প্রকার গাছ কাটা নিষিদ্ধ করতে হবে।
(ঘ) পেট্রোলিয়ামের পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌর ও পানি বিদ্যুতের মতো উৎস আবিষ্কার করতে হবে।
(ঙ) আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
(চ) কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
(ছ) কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার রোধ করতে হবে।
(জ) জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করতে হবে।
(ঝ) পরিবেশ দূষণ রোধে ব্যাপক গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।
উপসংহার : একসময় মানুষ মনে করত পরিবেশের উপর যে কোনো প্রকারে আধিপত্য বিস্তার করতে পারলেই হলো। কিন্তু আজ সেই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। পরিবেশকে রক্ষা করেই সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। এর অন্যথা হলে আমাদের এই সুন্দর সবুজ পৃথিবী একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মানুষ হিসেবে আমরা নিশ্চয় এটি চাই না। তাই আমাদের একটা মাত্র পৃথিবীকে সকলেরই রক্ষা করতে এগিয়ে আসা উচিৎ।
+88 01713 211 910