
এইচএসসি রচনা: বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প অথবা, বাংলাদেশর পর্যটন শিল্প: সমস্যা ও সম্ভাবনা
এইচএসসি রচনা: বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প অথবা, বাংলাদেশর পর্যটন শিল্প: সমস্যা ও সম্ভাবনা
ভূমিকা: কবি উচ্চারণ করেছেন:
তোমার যেখানে সাধ চ’লে যাও− আমি এই বাংলার পারে
রয়ে যাবো; দেখিব কাঁঠাল পাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে; (জীবনানন্দ দাশ)
কিংবা
অবারিত মাঠ, গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি
ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ
স্তব্ধ অতল দীঘি কালো-জল নিশীত শীতল স্নেহ। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
বাংলাদেশ সম্পর্কে বাঙালি কবিদের উল্লিখিত অনুভূতি অমূলক নয়। কেননা, ব-দ্বীপ সদৃশ এই বাংলার ভূ-ভাগ সমগ্র পৃথিবীতেই তুলনাহীন। এর রয়েছে বিস্তৃর্ণ সমভূমি, পার্বত্য অঞ্চল, ম্যানগ্রোভ বন, জলপ্রপাত, চা-বাগান, সবুজ গালিচার মতো শস্য ক্ষেত, মাঠ ও প্রান্তর। সর্বোপরি এর রয়েছে নয়াভিরাম নদী, যা মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে একে নন্দন কাননে পরিণত করেছে। সব কিছুর সমন্বয়ে পর্যটন শিল্পের জন্য বাংলাদেশ এক আদর্শ স্থান। কবিতার ভাষায়:
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।
পর্যটনের বিকাশ: মানুষ কৌতূহলী প্রাণী। নতুন কিছু জানার, পরস্পরকে জানার আগ্রহ মানুষের চিরায়ত। মানুষের এই বৈশিষ্ট্য থেকেই পর্যটনের বিকাশ ঘটেছে বিশ্বময়। পর্যটন বিষয়টি অত্যন্ত পুরাতন। বর্তমানের রূপে না থাকলেও কোনো না কোনো রূপে পর্যটন সুপ্রাচীনকাল থেকেই ছিল। ইবনে বতুতা, ফাহিয়েন, হিউয়েন সাং-সহ বিখ্যাত পর্যটকের ইতিহাস আমাদের এই বক্তব্যকেই সমর্থন করে। অতীত কালে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই কষ্টদায়ক, তবুও ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ঘুরে বেড়িয়েছে বিশ্বময়।
লাভজনক খাত: অর্থনীতির লাভজনক খাত হিসেবে পর্যটন শিল্প এখন সারা বিশ্বে খুবই আদরণীয়। পর্যটন এমনই এক অর্থনৈতিক খাত যেখানে প্রচুর বিনিয়োগ না করেও অনেক বেশি আয় করা সম্ভব। পর্যটনের জন্য নতুন তেমন কিছু তৈরি বা নির্মাণ করতে হয় না। শুধু প্রকৃতির দেয় উপকরণকে একটু পরিবর্তন করে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করলেই চলে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে এরকম স্থানগুলোকে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করলেই এ খাতে বিপুল আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ইতিহাস: ১৯৭১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন এক দেশের জন্ম হয়, যার নাম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরই তৎকালীন সরকার পর্যটন শিল্পের বিকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেই অনুভব থেকেই ১৯৭২ সালের ২৭ নভেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির মাধ্যমে পর্যটন শিল্প প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৫ সালে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে নবগঠিত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। জাতীয় পর্যটন সংস্থা হিসেবে এই সংস্থার মূল কাজ হচ্ছে− বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের কাম্য বিকাশ, পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থানসমূহের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যটকদের সেবা প্রদান ইত্যাদি। আর এই সমস্ত দায়িত্ব সুচারু রূপে সম্পন্ন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্যবিমোচন।
পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা: বাংলাদেশ একটি সুপ্রাচীন জনপদ। এর রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। প্রাচীনত্বের গরিমায় বাংলাদেশ সারা বিশ্বে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজপরিবারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এ দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি বিপুলভাবে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। আমরা জানি প্রাচীনকালে বিশ্ব জয় করেছিল বাংলার মসলিন। পৃথিবীব্যাপী এদেশের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সূক্ষ্ম বস্ত্র মসলিনের মাধ্যমে।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, এখানে আছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত যা অবিচ্ছন্নভাবে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। তাছাড়া এখানে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ বন। যা আমাদের কাছে সুন্দরবন হিসেবে পরিচিত। এখানে রয়েছে অসংখ্য নদী-নালা, বৃক্ষ এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিচিত্র ধরণের প্রাণী। যা বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। বস্তুত ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ব-দ্বীপটি যেন প্রকৃতি সৃষ্ট এক নয়াভিরাম মিউজিয়াম। তাই কবি উচ্চারণ করেছেন:
আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে থাকে সারা মন
শ্যামল কোমল পরশ ছড়ায় নেই কিছু প্রয়োজন।
বাংলাদেশর অনুপম নিসর্গ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্য আদর্শ উপকরণ। এর অনুপম নৈসর্গিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অবলোকনের জন্য কাছের এবং দূরের বহু ভ্রমণ পিপাসু মানুষ এখানে এসেছে। তারা অবাক হয়ে দেখেছে এবং উপলব্ধি করেছে ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা, সবুজ শ্যামল আর সুখ-শান্তি সমৃদ্ধি দেশটিকে স্রষ্টা নিজের হাতে সাজিয়েছেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটন শিল্প: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশে পর্যটন শিল্প নানাভাবে অবদান রাখতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বাংলাদেশের যে সমস্ত খাত লাভজনক অবস্থায় আছে পর্যটন খাত তার একটি। ২০১০ সালে পর্যটন খাত থেকে বাংলাদেশ মোট ৫৫৬২.৭০ লক্ষ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। পর্যটন খাত বাংলাদেশের সুনাম অর্জনেও বিরাট অবদান রেখেছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন মানবসম্পদ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে। এ সংস্থাটি এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে প্রায় ২৫ হাজার যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষিত করেছে। তারা দেশে বিদেশে কাজ করছে। বিদেশে কর্মরতরা মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছে। পর্যটন খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারে তা দেখানো হলো:
ক. প্রাকৃতিক সম্পদের কাম্য ও টেকসই উন্নয়ন ; খ. নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্ব দূর; গ. মাঝারি ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন;
ঘ. অভিনব অর্থনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণ; ঙ. যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন; চ. বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ;
ছ. বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন জ. বিদেশে নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান ইত্যাদি।
২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে পর্যটন কর্পোরেশন কত টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে তা নিচের ছকে দেখানো হলো:
|
সাল |
২০১৫ |
২০১৬ |
২০১৭ |
২০১৮ |
২০১৯ |
২০২০ |
|
টাকার পরিমাণ (মিলিয়ন) |
৭৯৫০.৪৬ |
১০০৪৭.৩০ |
১১৩৪৮,১৯ |
১১৩৪৭.৪৩ |
৯৭৩৪.৪৫ |
৮৫৩৪.৩৪ |
উল্লিখিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন খাত কত বিশাল অবদান রাখছে। সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করলে এই পরিমাণ আরো কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। বস্তুত দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে হলে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
পর্যটনের ক্ষেত্র : বাংলাদেশের পর্যটনের ক্ষেত্র তথা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ধারায় ভাগ করা যেতে পারে:
১। পর্যটনের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র: অনেক পর্যটকদের কাছে বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আকর্ষণের বিষয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশের অনেক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে যা পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। ময়নামতি, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ঢাকার লালবাগের দুর্গ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় জাদুঘর, সোনারগাঁও জাদুঘর, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, নাটোর ও পুঠিয়ার রাজবাড়ি এবং এমনি আরো অনেক সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে যা বাংলাদেশের অনন্য ঐতিহ্যকে নির্দেশ করে।
২। পর্যটনের প্রাকৃতিক ক্ষেত্র: নাগরিক জীবনের একগেয়েমি দূর করতে অনেক পর্যটক প্রাকৃতিক পরিবেশে যেতে চায়। বাংলাদেশের অনেক প্রাকৃতিক স্থান রয়েছে যা বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পর্যটন ক্ষেত্রগুলো হলো: কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকত, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চল ও চা বাগান, তামাবিল, জাফলং, রাঙামাটির নয়নাভিরাম কৃত্রিম হ্রদ, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চল। এছাড়াও রয়েছে উপকূলীয় দীপাঞ্চল, বর্ণাঢ্য উপজাতীয় ও গ্রামীণ জীবনধারা।
৩। রোমাঞ্চকর পর্যটন ক্ষেত্র : মানুষ স্বভাবতই রোমঞ্চপ্রিয়। বাংলাদেশে অনেক রোমাঞ্চকর স্থান এবং বিষয় রয়েছে যা বিদেশি ও দেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। এগুলো হলো: সুন্দরবনের বিচিত্র প্রাণী ও উদ্ভিদ, রাঙামাটির হ্রদে নৌবিহার, মৎস শিকার, জলক্রীড়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ট্রাকিং, হাইকিং , সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইত্যাদি।
৪। নৌ পর্যটন : নদী চিরকালই যে কোনো মানুষকে আকর্ষণ করে, করে বিমোহিত। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এর রয়েছে ছোট-বড় প্রায় আড়াই শ নদী। তাছাড়া এর রয়েছে বিস্তৃত হাওর অঞ্চল। এই সমস্ত নদীতে ও হাওরে পর্যটনের সুবিধা বিস্তৃত করলে প্রচুর দেশি বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট হতে পারে।
৫। ধর্মীয় পর্যটন ক্ষেত্র : অনেক মানুষ শুধু ধর্মানুভূতি থেকেই বিভিন্ন তীর্থ স্থান ভ্রমণ করে থাকে। বাংলাদেশের এরকম অনেক ধর্মীয় স্থান রয়েছে যা ধর্মাানুভূতি সম্পন্ন মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো: মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মাজার, দরগাহ, মঠসহ বিভিন্ন নিদর্শন। এসব আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, ঢাকার সাতগম্বুজ মসজিদ, রাজশাহীর শাহ মখদুমের মাজার, পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার, মহাস্থানগড়, নবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, আর্মেনিয়ান চার্চ, চট্টগ্রামের বায়োজিদ বোস্তামীর দরগাহ, সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহ, কক্সবাজরের রামু মন্দির, রাজশাহীর তাহেরপুর রাজবাড়ি, লালবাগের মসজিদ ইত্যাদি।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সমস্যা: বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প একটি অসীম সম্ভাবনার শিল্প। কিন্তু এর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। পর্যটন শিল্প আশানুরূপ অগ্রগতি লাভ না করার পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। নিচে এর কয়েকটি আলোচনা করা হলো:
১। নিরাপত্তাহীনতা: পর্যটন শিল্প বিকাশের প্রথম শর্ত হলো নিরাপত্তা। কিন্তু বাংলাদেশের পর্যটন স্পটগুলোতে নিরাপত্তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে আসা পর্যটকরা প্রায়শই চুরি, ছিনতাই, হত্যা, রাহাজানি কিংবা সহিংসতার শিকার হন।
২। রাজনৈতিক অস্থিরতা: রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও আমাদের দেশের পর্যটন শিল্প বিকশিত হচ্ছে না। গত কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে হরতাল অবরোধ ছিল নিত্য দিনের বিষয়। এধরণের অস্থিরতার মধ্যে পর্যটকরা আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।
৩। যোগাযোগ ও যাতায়তের সীমাবদ্ধতা : সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্পের জন্য যাই আধুনিক, দ্রুতগামি, সস্তা, যোগাযোগ ও যাতায়ত ব্যবস্থা। বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা এখনও প্রাচীন আমলের। যোগাযোগ ও যাতায়ত ব্যবস্থায় রয়েছে প্রচুর দুর্বলতা। এখানকার রাস্তাঘাট সংকীর্ণ, অনেক জায়গায় রাস্তা বিপজ্জনক। আমাদের মহাসড়কগুলোতে প্রায়শই যানজটে অযথা সময় নষ্ট হয়।
৪। উন্নত আবাসিক ব্যবস্থার অভাব: সাধারণত বিত্তবান বিলাসীরাই পর্যটক হয়ে থাকে। তারা পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশে থাকতে চায়। কিন্তু আমাদের দেশের হোটেল ও মোটেলগুলো মান-সম্মত নয়। তাই অনেক পর্যটক এখানে আসতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না।
৫। মানসম্মত সেবার অভাব: পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও মার্জিত জনবল। কিন্তু আমাদের দেশে দক্ষ ও মার্জিত জনবলের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
৬। সাংস্কৃতিক সমস্যা : আমাদের দেশীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণের সঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যের কারণেই অনেক পর্যটককে প্রায়শই বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। তাছাড়া অনেক সময় পর্যটকরা মন্দ লোকের পাল্লায় পড়ে আর্থিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৭। প্রচারের অভাব : যে সমস্ত দেশের পর্যটন শিল্প খুব উন্নত তাদের রয়েছে পরিকল্পিত প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচার ব্যবস্থা তত উন্নত নয়। আমরা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ভৌগোলিক সৌন্দর্যকে অনেক সময় যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারি না। ফলে আমাদের পর্যটন শিল্প কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নত হয় নি।
পর্যটন শিল্পকে কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত করার উপায়: আমাদের পর্যটন শিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এই শিল্পকে যথার্থ মানে উন্নীত করতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত: পর্যটন স্পটগুলোকে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত: আবাসন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। তৃতীত: যাতায়তের ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ করতে হবে। চতুর্থত: রাজনৈতিক অস্থিরতা দূরীকরণে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পঞ্চমত: মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ষষ্ঠত: স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সপ্তমত: উন্নত জনবল তৈরির মাধ্যমে পর্যটকদের সেবার মান বাড়াতে হবে।
অষ্টমত: পর্যটকদের সবধরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নবমত: পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। দশমত: ঐতিহ্য ও ইতিহাসাশ্রয়ী স্থানগুলোকে নান্দনিক করে গড়ে তুলতে হবে।
সরকারি উদ্যোগ : আশার কথা বাংলাদেশ সরকার পর্যটন শিল্পের যথাযথ বিকাশে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ক. পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক্সক্লুসিভ জোন করার পরিকল্পনা গ্রহণ। খ. আগামী ২০২১ সালের মধ্যে দেশের পর্যটন শিল্পকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার জন্য একটি খসড়া নীমিলা প্রস্তুত। গ. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার প্রচারণার উদ্যোগ। ঘ. যাতায়তের জন্য রাস্তাঘাটের উন্নয়ন। উল্লেখ্য, কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়নে ইতোমধ্যে ৩০২ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ইনানি থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের পাশাপাশি সেন্টমার্টিন দ্বীপের উন্নয়নে মাস্টার প্লানের কাজ চলছে। আশা করা যায় এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে পর্যটন শিল্পের প্রভূত উন্নতি হবে।
উপসংহার: অসীম সম্ভাবনার এক অর্থনৈতিক খাত পর্যটন শিল্প। এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া দরকার। আর আন্তরিকতার সাথে যদি আমরা সেই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে শুধু পর্যটন খাতই নয়, এর বহুমুখি বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচিত হবে। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশ।
+88 01713 211 910