
নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাসমূহের প্রাচ্য শাখার ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
প্রশ্ন: নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাসমূহের প্রাচ্য শাখার ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।
উত্তরঃ বিবর্তনই ভাষার ধর্ম । ভাষা প্রতিক্ষণই পরিবর্তিত হয় ধারণ করে নতুন রূপ, নতুন বৈশিষ্ট্য । ভারতীয় আর্য ভাষা সম্পর্কেও উল্লিখিত মূল্যায়ন সত্য। কেননা,ভারতীয় আর্য ভাষার অন্যতম শাখা ; নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার প্রাচ্য শাখায়। নিচে নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার প্রাচ্য শাখার ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো।
নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার প্রাচ্য শাখার ভাষাগুলো হলো- বাংলা, আসামি, উড়িয়া, মৈথিলি, মগহি এবং ভোজপুরিয়া। ড. সুনীতিকুমার চট্রোপধ্যায় এই শাখার ভাষাগুলোকে আধুনিক মাগধী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এগুলোকে নিম্নলিখিত তিনটি শাখায় বিভক্ত করেছেন। এগুলো হলো:
১। পূর্ব মাগধী
২। মধ্য মাগধী ও
৩। পশ্চিম মাগধী।
পূর্ব মাগধীর অন্তর্গত ভাষাগুলো হলো- বাংলা, আসামি ও উড়িয়া। মধ্য মাগধীর অন্তর্গত ভাষাগুলো হলো-মৈথিলি ও মগহি। পশ্চিম মাগধীর অন্তর্গত ভাষাগুলো হলো- ভোজপুরিয়া। তবে নাগপুরিয়াও এর অন্তর্গত।
উল্লিখিত ভাষা সমূহের মধ্যে কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণ বর্তমান। এই লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যগুলোই এই ভাষাগোষ্ঠীকে অন্যান্য ভাষা থেকে পৃথক পরিচিতি দান করেছে। নিচে এদের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো:
ধ্বনিতত্ত্ব
‘অ’- কারের উচ্চারণ সংবৃত ( অর্থাৎ Not এর o এর নায়)। কিন্তু বিহারীতে হিন্দি ইত্যাদির ন্যায় বিবৃত (AbÑ¡v but Hl u Hl ন্যায় বিবৃত )z
রূপতত্ত্ব
কর্তৃকারকে বিভক্তি লোপ বা ‘এ’- কারবিভক্তি ; করণে ‘এ’ বা ‘এঁ’ ; সম্বন্ধে ‘ক’ এবং ‘র’ ; অধিকরণে ‘এ’ ; অতীত কালে ‘ল’ প্রত্যয়ান্ত ক্রিয়ামূল এবং ভবিষ্যতে ‘ব’ প্রত্যায়ান্ত ক্রিয়ামূল।
পদক্রম
সকর্মক ক্রিয়ার অতীত কালে কর্তৃবাচ্যের প্রয়োগ হয়, অর্থাৎ হিন্দি ইত্যাদি ভাষার ন্যায় কর্মের সাথে ক্রিয়াপদের লিঙ্গ ইত্যাদির বিষয়ের অন্বয় হয় না। কিন্তু প্রাচীন বাংলা ভাষায় এইরূপ স্থলে কর্ম বাচ্যের প্রয়োগ ছিল। যথা- ‘তোহর অন্তরে মই ঘালিলি হাড়েরি মালি’ (চর্যাপদ)। অতীত ও ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়ামূলের সাথে পুরুষ ও বচনভেদে বিভক্তি যোগ হয়। এই বিভক্তিগুলো বিভিন্ন ভাষায় এক না হলেও বিভক্তি যোগের প্রয়োগটি সাধারণ। অবশ্য এদের মূল প্রাচ্য ভাষায় কোন পুরুষ বা বচনবাচক বিভক্তি ছিল না। এরকম স্থলে সকর্মক ক্রিয়ার সাথে কর্মের অন্বয় হত এবং অকর্মক ক্রিয়ার সাথে কর্তার অন্বয় হতো। যেমন- সংস্কৃতে- ময়া ইদং কর্ম কৃতম, ময়া ইয়ং ক্রিয়া কৃতা ; হিন্দি- উর্দুতে-মৈঁনে ভাত খায়া, মৈঁনে রোটি খায়ী।
শব্দকোষ
কতগুলো শব্দ হিন্দি ইত্যাদি হতে পৃথক এবং এই গোষ্ঠীর জন্য সাধারণ। যেমন- বাংলায় ‘চোখ’ কিন্তু হিন্দিতে ‘আঁখ’ ; বাংলায় ‘মাথা’ কিন্তু হিন্দিতে ‘সির’।
প্রাচ্য শাখার অন্তর্ভুক্ত ভাষাসমূহের তুলনা
পূর্ব মাগধী ভাষার সাধারণ লক্ষণ: এই ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- সম্বন্ধপদে ‘র’ বিভক্তির ব্যবহার । অতীত কালের ক্রিয়ামিূলে ব্যবহৃত হয় ‘ইল’ বিভক্তি। ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়ামূলে ‘ইব’ বিভক্তি। অধিকরণে ‘তে’ বিভক্তির ব্যবহার কেবল বাংলা ও আসামিতে দেখা যায়।
উড়িয়া ভাষার বিশেষ লক্ষণ: বহুবচনে ‘মানে’ প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়। যেমন- পুরুষ মানে. আম্ভে মানে ( আমরা)। অপাদানে ‘রু’ বিভক্তি ব্যবহৃত হয়। যেমন- ঘররু ( ঘর হতে)। সম্বন্ধের বহুবচনে ‘ঙ্ক’ , ‘ঙ্কর’ বিভক্তি ব্যবহৃত হয়। যেমন-পুরুষঙ্ক, পুরুষঙ্কর।
আসামী ভাষার বিশেষ লক্ষণঃ বহু বচনে ‘বিলাক’ , ‘বোর’ , ‘হোঁৎ’ বিভক্তি ব্যবহৃত হতো। আপাদানে ‘পরা’ বিভক্তি ব্যবহৃত হতো। যেমন-ঘরের পরা (ঘর হতে)।
বাংলা ভাষার বিশেষ লক্ষণঃ বহুবচনে ‘রা’ , ‘এরা’, ‘গুলি’, বিভক্তি ব্যবহৃত হয়। কর্মে বহুবচনে- ‘দিগকে’; সম্বন্ধের বহুবচনে ‘দিগের’ , ‘দের’ বিভক্তি হয়। অপাদান কারকে ‘হতে’ , ‘থেকে’, বিভক্তি হয়।
আধুনিক উড়িয়া, আসামি ও বাংলায় যত পার্থক্য দেখা যায়, প্রাচীন কালে সেইরূপ ছিল না।
মধ্য মাগধী ভাষার সাধারণ লক্ষণঃ কর্তা ও কর্মের সম্মান ভেদে ক্রিয়াপদের রূপ পরিবর্তন হয়। ক্রিয়াপদের ‘ন্ত’ স্থানে ‘থ’ ব্যবহৃত হয়। যেমন-মূল চলন্ত> চলথি ( বাংলায় চলনে ; মূল চলন্ত > চলথু ( বাংলায় চলুন)
পশ্চিম মাগধী ভাষার বিশেষ লক্ষণঃ ‘অ’ কারের বিবৃত উচ্চারণ ( অর্থাৎ but এর u এর ন্যায় বিবৃত)। বর্তমান কালের প্রথম পুরুষে ক্রিয়াপদে ‘অস’ বিভক্তি ব্যবহৃত হতো। যেমন-দেখস( সে দেখে) , দেখতাস ( সে দেখত)।
বিহারি ভাষার সাধারণ লক্ষণ: মৈথিলি, মগহি, ভোজপুরিয়া সাধারণত বিহারি নামে পরিচিত। এই ভাষায় বর্তমান কালে ‘থ’ ধাতু ব্যবহৃত হয়। যেমন- ‘থিক’,‘থক’ ( আছে অর্থে)। বাংলায় এখনও থাক্ ধাতুর ব্যবহার হয়।
#
ড. এ. আই. এম. মুসা
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর।
+88 01713 211 910