
বাংলা ভাষায় অনার্য প্রভাবের স্বরূপ
প্রশ্ন: বাংলা ভাষায় অনার্য প্রভাবের স্বরূপ আলোচনা কর।
আলোচনা: পৃথিবীর কোন ভাষাই একাকী বিকশিত হয় নি। বরং একটি ভাষা অপর ভাষার ধ্বনি.রূপমুল,পদক্রম এবং বাক্যরীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েই বিকশিত হয়েছে। নব্য ভারতীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত বাংলা ভাষা সম্পর্কেও উল্লিখিত মুল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। কেননা ,আধুনিক বাংলা যেমন রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতি ও ধর্মীয় কারণে আরবি, ফারসি, পর্তুগীজ, ইংরেজি ইত্যাদি ভাষা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, তেমনি প্রচীন বাংলাও বিভিন্ন অনার্য এবং আর্য ভাষা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিভিন্ন অনার্য ভাষার মধ্যে মুন্ডা বা কোল ভাষার প্রভাবই বাংলার উপর বেশি বলে মতে প্রকাশ করেছেন। বাংলা ভাষার উপর অনার্য এই ভাষার প্রভাব সর্ব ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়। ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, পদক্রম ও শব্দকোষ গঠনে অনার্য প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। নিচে এ সমস্ত প্রভাবের স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হলো।
ধ্বনিতত্ত্ব
১। বাংলা ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর দ্বিস্বরধ্বনির সংখ্যা বেশি। যেমনঃ ঐ, ঔ, অয়, অও, ইই, ইউ, উই, এই ইত্যাদি। সংস্কৃতে এই বৈশিষ্ট্য না থাকলেও মুন্ডা ভাষায় এই প্রভাব আছে।
২। বাংলা ভাষায় যে কোন স্বরধ্বনিই অনুনাসিক হতে পারে। মুন্ডা ভাষাতেও এরূপ হয়ে থাকে।
৩। প্রচলিত বনানে সব সময় দেখা না গেলেও বাংলায় স্বরসঙ্গতি আছে। যেমন:
উ > ই –ছুরি, তুমি;
কিন্তু উ > আ > ও> আ = ছোরা, তোমার।
ই > ই –লিখি;
কিন্তু ই > আ > এ > আ = লেখা ইত্যাদি।
এখানে স্বরসঙ্গতির মধ্যে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনি বা পরবর্তী স্বরধ্বনি পরিবর্তন দেখা যায়। ড. সুনীতিকুমার এই বিষয়ে সাওতালী কুরকু এবং কোল মুন্ডা ভাষার সঙ্গে বাংলার সম্বন্ধ দেখিয়েছেন।
৪। কোনও বাংলা শব্দই যুক্তব্যঞ্জনের সাহায্যে শুরু হয় না। বাংলা ভাষায়ও এরূপ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
৫। কোনও খাঁটি বাংলা শব্দই অন্তঃস্থ ‘য়’ এবং অন্তঃস্থ ‘ব’ দিয়ে শুরু হয় না। কোল মুন্ডা ভাষায়ও এরূপ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
৬। বাংলা ভাষায় সংস্কৃত উষ্মধ্বনি তিনটিই শ-কার রূপে উচ্চারিত হয়। মুন্ডারী ভাষায়ও এরূপ উচ্চারণ দেখা যায়।
৭। বাংলা ভাষার অনেক শব্দের প্রথম ‘ল’ ও ‘ন’ ধ্বনি পরস্পর স্থান পরিবর্তন করে। এই পরিবর্তন উপভাষায় যেমন হয় তেমনি মান ভাষায়ও ঘটে থাকে। যেমন:
ল>ন: নুন < স. লবণ।
নাল <স. লাল।
নোঙ্গর <ফা.লঙ্গর
ন >ল: লাঙ্গা (প্রা.বাং) <স.নগ্ন।
লাচার < ফা.নাচার।
বাংলা ভাষার উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য অনার্য মুন্ডা ভাষায়ও দেখা যায়।
৮। ‘ণ’ , ‘ড়’ ‘ঢ়’ দ্বারা বাংলা ভাষায় কোন শব্দ শুরু হয় না। কোল মুন্ডা ভাষায়ও উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
৯। মহাপ্রাণ ঘোষধ্বনি ও অঘোষধ্বনি বাংলা ও মুন্ডা উভয় ভাষাতেই ব্যবহৃত হয়।
রূপতত্ত্ব
১। তদ্ভব ও দেশি বাংলা শব্দে বিশেষণের অন্বয় বিশেষ্যের বচন, লিঙ্গ ও কারকের সাথে হয় না। যেমন: ‘ছোট নদী’, ‘ছোট পাখি’, ‘ছোট মেয়েরা’।এই ক্ষেত্রে বাংলা সাথে মুণ্ড ভাষারও সাদৃশ্য রয়েছে।
২। মুন্ডা ভাষার মত বাংলা ভাষাতেও উভয় লিঙ্গ বাচক শব্দের পূর্বে পুরুষ বা স্ত্রীবাচক কোন শব্দ ব্যবহার করে লিঙ্গ নির্দেশ করা হয়ে থাকে: ‘বেটা ছেলে’, ‘মেয়ে ছেলে’ ইত্যাদি।
৩। বাংলা মূল শব্দের সাথেই কারক বিভক্তি যুক্ত হয়, অকর্তৃকারকের রূপে নহে। মুন্ডা ভাষাতেও এই রূপ বৈশিষ্ট্য আছে। দ্রাবিড় ভাষাসমূহের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না। কতিপয় বিভক্তির মধ্যেও উভয় ভাষার সাদৃশ্য আছে। যেমন:
|
কারকের নাম |
বাংলা ভাষা |
মুন্ডা ভাষা |
|
কর্তৃকারক |
বিভক্তি নেই |
বিভক্তি নেই |
|
কর্মকারক |
বিভক্তি নেই |
বিভক্তি নেই |
|
সম্প্রদান ও কর্ম |
কে |
কে (মাহেলে, মুন্ডারী, তুরি,করকী,নাহালি), কো (কুরকু), কু (শবর) |
|
করণ |
তে |
তে (সাঁওতালী, মুন্ডারী) |
|
অপাদান |
তে, ত (প্র. ও ম. বাংলা) |
অতে, এতে (মুন্ডারী), তন, তে, তেন (কুরকু) , তেই (খড়িয়া) |
|
সম্বন্ধ |
তে, ত (প্র. ও ম. বাংলা) |
রেন(সাঁওতালী, মুন্ডারী), কা (কুরকু) |
|
অধিকরণ |
তে । রে (উড়িয়া) |
রে, (সাঁওতালী, মুন্ডারী) |
উল্লিখিত বিভক্তি সমূহ শুধু এক বচনে নয়, বহু বচনেরও ব্যবহৃত হয়। মুন্ডা ভাষাতেও এরূপ হয়ে থাকে।
৪। ভারতীয় আর্যগোষ্ঠীর ভাষায় যে অনার্য ভাষার বিভক্তি গৃহীত হতে পারে, এর প্রমাণ আসামি ভাষাতেও পাওয়া যায়। আসামিতে বহুবচনের বিভক্তি ‘বিলাক’ গারো ‘পিলাক’ হতে গৃহীত হয়েছে।
৫। বাংলার ধাতুরূপ লক্ষ করলে দেখা যায় যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রিয়ার সাথে কর্তৃকারকের সর্বনাম যৌগিক আকার ধারণ করে। প্রাচীন বাংলায় যেমন এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে তেমনি মুন্ডা ভাষায়ও এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
৬। বাংলায় বিশেষ্য ও সংখ্যাবাচক শব্দের সাথে নির্দেশক ‘টা’ , ‘টি’ ব্যবহৃত হয়। যেমন: একটা, একটি, বইটা, বইটি ইত্যাদি। মুন্ডা ভাষাতেও এরূপ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন: ‘সাঁওতালী মিতটেচ’ , ‘মিতটেন’ = এক, একটা।
৭। বাংলায় কখনও কখনও বিশেষণ বোঝাতে সম্বন্ধের প্রয়োগ হয়ে থাকে। যেমন: ‘দয়ার সাগর’।
পদক্রম
১। বাংলা বাক্যে শব্দের প্রচলিত ক্রম হচ্ছে (ক) সম্বোধন পদ, (খ) সম্বন্ধ পদ, (গ) কর্তৃকারক,(ঘ) কর্মকারক,(ঙ) ক্রিয়াপদ। মুন্ডা ভাষাতেও এরূপ দেখা যায়।
২। মুন্ডা ভাষার মতো বাংলায় পরোক্ষ উক্তি ব্যবহৃত হয় না। ‘ বালিয়া’ শব্দেযোগে মুন্ডার ন্যায় বাঙ্গালায় কখনও কখনও পরোক্ষ উক্তি করা হয়ে থাকে। যেমন: ‘তাসনিম ভাল মেয়ে বলিয়া তাকে সকলে ভালবাসে।
৩। বাংলা ভাষায় শব্দদ্বৈতের প্রয়োগ বাহুল্য দেখা যায়। যেমন: অলিগলি, রকমসকম, হাট-বাজার ইত্যাদি। প্রাচীন বাংলায়ও এরকম দেখা যায়। সাঁওতালী ও অন্যান্য মুন্ডা ভাষাতেও অনুরূপ প্রয়োগ দেখা যায়।
৪। বাংলা ক্রিয়া রূপগুলো বিশেষণ রূপেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন: তৈরী চা, আসছে শনিবার। প্রাচীন ও মধ্য বাংলায়ও এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। মুন্ডাভাষাতেও অনুরূপ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। মুন্ডা গোষ্ঠীর অন্যান্য ভাষাতেও অনুরূপ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।
শব্দকোষ
বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কিছু শব্দ মুন্ডা ভাষাতেও পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাংলার কিছু শব্দ মুন্ডা ভাষা থেকে আগত বলে পন্ডিতগণ মনে করে থাকেন। ড.সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, কাঁড়া (মহিষ), হো কের ( মেনী বিড়াল) শব্দ দুটি মুন্ডা ভাষা থেকে এসেছে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ মুন্ডা ভাষার কিছু শব্দের তালিকা তাঁর বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত গ্রন্থে উপস্থাপন করেছেন। যেমন:
|
বাংলা |
মুন্ডা (সাঁওতালী) |
|
আকাল/আখড়া/বড়শী (দুর্ভিক্ষ) |
বাড়সি |
|
বট |
বেড়ে |
|
চাউল |
চাউলি |
|
চুলা |
চুলহা |
|
নেঙ্গা |
লেঙ্গা |
ড. এ. আই. এম. মুসা
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ।
+88 01713 211 910