
এইচএসসি রচনা: কৃষি কাজে বিজ্ঞান
এইচএসসি রচনা: কৃষি কাজে বিজ্ঞান
ভূমিকা: পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো শিল্প কৃষি; আর সবচেয়ে প্রাচীন শ্রমিক কৃষক। প্রতিদিনের খাদ্যের জন্যে আমরা কৃষকের কাছে ঋণী। কৃষক তার কাজ বন্ধ করলে অন্য সব শিল্প অচল হয়ে যাবে এবং সমগ্র জতিকে তখন ফিরে যেতে হবে আদিম যুগে। অতএব, সভ্যতার অগ্রগতির নেপথ্যে যে কৃষির ভূমিকা বিরাট ও ব্যাপক সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
অতীতের কথা: আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে কৃষক বা কৃষি কিছুই ছিল না। মানুষ ফল-মূল, মাছ ও শিকার করে এবং জন্তু-জানোয়ারের মাংস খেয়ে জীবন ধারণ করত। দুর্ভিক্ষ ছিল তাদের সব চেয়ে বড় শত্রু। বুনো খাদ্যসম্ভার অনেক সময় একবারেই জুটত না। ফলে মানুষকে খাদ্যের সন্ধানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হত। খাদ্যের দখল নিয়েও মারামারি, কাটাকাটি হত প্রতিবেশীর সঙ্গে। যে-যুগ স্থায়ী আস্তানা ছিল না কারোর। তাই উন্নতির সম্ভাবনা ছিল সামান্য। অবশেষে মানুষ পশু-পালন ও বীজ বপন করতে শেখে। ফলে খাদ্যদ্রব্য সুলভ এবং জীবনযাত্রা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। মানুষ তখন সমাজবদ্ধভাবে বাস করেছে। একদল মন দিয়েছে খাদ্যদ্রব্য উপাদানে; আর -অন্যদের অনেকেই ব্যবসায়-বাণিজ্যে অথবা হাতে তৈরি পণ্য উৎপাদনে আত্মনিয়োগ করছে। কৃষির উপর ভিত্তি করে এ ধরনের শ্রম বিভাগ কালক্রমে সভ্যতাকে দিয়েছে গতি।
শিল্পবিপ্লব ও কৃষি: প্রস্তর যুগের শেষদিক থেকে কৃষিকার্যের সূচনা। কিন্তু এর প্রকৃত উন্নতি গত দুই শতাব্দীর মধ্যেই ঘটেছে। আদিম যুগে যে-পরিশ্রমে মানুষ এক একর জমি চাষ করত, দু-শতাব্দী আগে সে পরিশ্রমেই চাষ হয়েছে পঞ্চাশ একর জমি; আর আজ ঠিক একই পরিমাণ শ্রমের বিনিময়ে এক হাজার একর জমি চাষ করা সম্ভব। শ্রম সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর কিছু আবিষ্কার মানুষকে আজ বিরাট শক্তির অধিকারী করেছে। সন্দেহ নেই, হাল-লাঙলই কৃষিকাজের ক্ষেত্রে মানুষের ব্যবহৃত প্রথম যান্ত্রিক উপকরণ। অতীতে চাষাবাদ মূলত গরু-মোষ জাতীয় গৃহপালিত পশুদের সাহায্যেই হত। অবশেষে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে এবং উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে শিল্পবিল্পব কৃষি কর্মে যুগান্তর এনেছে। এ সময় থেকেই কৃষকদের হাতে এসেছে উন্নত ধরনের যন্ত্রপাতি এবং কৃষিপদ্ধতিতেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
কৃষিযন্ত্র ও সুবিধা: অসংখ্য নিড়ানি সমন্বিত এক-একটি কৃষি যন্ত্র চাষাবাদের জন্যে জমি তৈরিতে মানুষকে বিপুল সাহায্য করেছে। নিড়ানি দিয়ে একজন কৃষক সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমেও খুব অল্প জমিই চাষ করতে পারে। কাস্তে দিয়ে ফসল কাটার তুলনায় শস্যছেদনকারী যন্ত্র(মোয়ার) ব্যবহারে সুবিধা অনেক। দাঁতাল র্যাদারযুক্ত মই বা আঁকড়শিগুলো জমি মসৃণ করা এবং শস্য, খড় ইত্যাদি গাদা করার কাজে যুগান্তর এনেছে। এছাড়া, কপিকল জাতীয় যন্ত্র কৃষিকার্যে অশেষ সহযোগিতা করছে। কৃষিক্ষেত্রে আজ হামেশা ব্যবহৃত হয় নানা ধরনের ফসল-কাটা যন্ত্র (রিপার) অসংখ্য রকম ফসল বন্ধনকারী যন্ত্র (বাইন্ডার) এবং ফসল-সংগ্রহের বিশেষ-বিশেষ যন্ত্র (হারভেসটিং ম্যাশিনস)। শস্যাদি মাড়াইয়ের যন্ত্রগুলো থ্রেশিং ম্যাশিনস) কয়েকজন মাত্র লোকের পরিচালনায় দু-তিন দিনে যে পরিমাণ কাজ করেছে, এক-একটি পরিবার সারা ঋতু জুড়ে পরিশ্রম করেও সম্পন্ন করতে পারবে না। সেকেলে পদ্ধতিতে বজি বপন করতে যেখানে দশ ঘণ্টা সমযয় লাগত, এখন উন্নত ধরনের যন্ত্রপাতির সাহায্যে সেখানে আধ ঘণ্টারও কম সময়ে কার্যোদ্ধার করা যায়। এ যুগে শস্য-ছেদকযন্ত্র এক ঘন্টারও কম সময়ে যে পরিমাণ কাজ করে কাস্তের সাহায্যে সে কাজ করতে গেলে সময় লাগবে সাত ঘণ্টারও অধিক। নিড়ানির কাজে যন্ত্রের ব্যবহার আলু-উৎপাদকের কর্মদক্ষতা আট-দশ গুন বাড়িয়ে দিয়েছে।
মিল্কার, কুলার ইত্যাদি: খামারের অন্যান্য যন্ত্রপাতির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য বৈদ্যুতিক দোহক-যন্ত্র (মিল্কার), শীতলকারী যন্ত্র (কুলার), মাখন তোলা যন্ত্র (ক্রিম-সেপারেটর) ভোজ্যদ্রব্য-পেষক যন্ত্র (ফিড গ্রাইণ্ডার) এবং সার ছাড়ানোর যন্ত্র (ম্যানিউর স্প্রেডার) ইত্যাদি। সম্প্রতি কৃষিকার্যে নানা ধরনের যন্ত্রকে কাজে লাগানো হচ্ছে পেট্টোল-চালিত ইঞ্জিন অথবা ট্রাক্টরের সাহায্যে।
সেলফ বাইণ্ডার, ক্রাইন হারভেস্টর: সেলফবাইণ্ডার বা স্বয়ং বন্ধনকারী যন্ত্র ফসল কাটার সঙ্গে-সঙ্গে আঁটি (শস্যের) বাঁধে। তবে ফসল কাটার যন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘ক্রাইন হারভেস্টর’। যন্ত্রটি একই সঙ্গে ফসল কাটে এবং ঝাড়াই মাড়াই করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের খামারগুলিতে শক্তিশালী এক-একটি ট্র্যাক্টর তিন-চারটি পর্যন্ত ফসল কাটার যন্ত্রকে এক সঙ্গে কাজে লাগায় এবং ১০০ একর পর্যন্ত জমির কাজ একদিনে সারতে পারে।
কৃষি পদ্ধতি ও পশু পালন: বিজ্ঞানের বদৌলতের শুধু কৃষিপদ্ধতি ও চাষাবাদের কায়দা কানুন বদলায় নি। খামার জাত ফসলে এবং সেখানে উৎপাদিত জীব-জন্তুর আকৃতিতেও এসেছে বিরাট পরিবর্তন। বহু শতাব্দী ধরে কৃষিকার্যে এবং গৃহপালিত জীব-জন্তুর প্রজননে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা ফসল উৎপাদনে ও পশু পালনে যুগান্তর এনেছে। আজ তাই সহজেই বিচিত্র ধরনের শস্য ও ফলমূল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। গৃহপালিত জীবজন্তুর চেহারায়ও আনা সম্ভব হয়েছে এমন সব উন্নত পরিবর্তন যা তাদের বন্য পূবসূরিদের থেকে বিস্ময়কর ভাবে স্বাতন্ত্র্য। বিজ্ঞানের অবদানের ফলেই ফসলের গুণগত সমৃদ্ধি ঘটেছে এবং উৎপাদনও বাড়ছে। আধুনিক কালের বৈজ্ঞানিক গবেষণা কৃষকদের অশেষ কল্যাণ সাধনে তৎপর। ফসল-উৎপাদনে উন্নয়ন-সাধন ও বৈচিত্র সৃষ্টির তালিম কৃষকরা বিজ্ঞানবিদ্যার কাছে থেকেই পাচ্ছে। এছাড়া, বিজ্ঞানের আশীর্বাদে পশুপালন সম্পর্কে কৃষকদের ধারণা বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
গবাদিপশু উৎপাদনে বৈচিত্র্য: যে ঘোড়া মাল টানবে আর যে ব্যবহৃত হবে দ্রুত ছোটার কাজে, তাদের প্রজননপদ্ধতি আজ আলাদা। গবাদি-পশুর প্রজননেও এসেছে বৈচিত্র্য। কোথাও ভালো মাংসের দিকে নজর রেখে, আবার কোথাও বেশি দুধ উৎপাদনের কথা ভেবে ওদের প্রজনন এবং লালন-পালনে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ভেড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ব; কোথাও তার মাংসের উপর, কোথাও আবার তার পশমের উৎকর্ষ ও পরিমাণের উপর। এছাড়া, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণের ফলেই আজ ডিম উৎপাদনে বিশেষ উন্নতি সাধন সম্ভবপর হয়েছে।
শস্য ও ফলমুলঃ ফলমূল ও শস্যাদি-উৎপাদনে বিস্ময়ের উপাদান নানা দিকে। বীজ নির্বাচনে সতর্কতা নতুন ও উন্নত ধরনের গাছপালার প্রজনন ব্যবস্থা এবং বীজ-অঙ্কুরণ ও গাছের কলম ব্যবহারে নতুন নতুন ব্যবস্থা কৃষিকাজে বিল্পব এনেছে। আলু উৎপাদনের সময় লক্ষ্য রাখা হচ্ছে, যাতে তার ফলন বাড়ে, তার গা মসৃণ হয় এবং উৎপাদিত ফসল আকারে হয় অপেক্ষাকৃত বড়। বুনো টক আপেলের জায়গায় আজ এক হাজারের বেশি প্রজাতির আপেল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। আকারে, বর্ণে, গন্ধে এই বিশেষ ফলটিতে যে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে, এক কথায় তা চমৎকার। আঙুর উৎপাদনেও এসেছে যুগান্তর। অম্লয়, বীজে ভরা ছো-ছোট ফলের জায়গায় এখন এমন সব আঙুর ফলানো হচ্ছে যেগুলি স্বাদে মধুর, রসে পরিপূর্ণ এবং বীজের আধিক্য থেকে প্রায় মুক্ত। এমনকি কোন-কোন শস্যের গঠনমূলক উৎপাদনে পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে, যাতে বেশি পরিমাণ প্রোটিন শর্করা বা তেল জাতীয় বস্তু প্রয়োজন অনুযায়ী লাভ করা যায়। এ ধরণের প্রয়াসে কৃষি রসায়নবিদ্যা বা ‘এগ্রিকালচারাল-কেমিষ্ট্রি’ পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে। বিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখাটির সাহায্যে আমরা জানতে পারি, বিশেষ কোন প্রকারের মাটিতে গাছপালার কী কী বিশেষ খাদ্য বিরাজ করছে এবং নিকৃষ্ট মানের মাটি বা জমির উন্নতিকল্পে কী কী সার -পদার্থ প্রয়োজন।
ভেটেনারি সায়েন্স অ্যানাট্যামালজি: পশুরোগ-সংক্রান্ত বিজ্ঞান (ভেটেনারি সায়েন্স) খামারের পশুদের মধ্যে রোগজনিত মৃত্যুহার বিপুল পরিমাণে কমিয়েছে। গাছপালা ও শস্যাদির মধ্যে নানা ধরনের পতঙ্গের উৎপাত, জীবাণু-সংক্রামণ ও রোগ থেকে যে সব ক্ষতি হয়, সাম্প্রতিকালে সে-সম্পর্কে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। পতঙ্গবিভাগ জানতে সাহায্য করেছে, কোন কোন ধরনের পতঙ্গ কৃষি-উৎপাদনে সহায়ক এবং কোন গুলো ফসল ও গাছপালার পক্ষে ক্ষতিকর। কৃষকরা বিপজ্জনক পতঙ্গ বা পোকা-মাকড় সম্পর্কে আজকাল আগে থাকতেই সাবধান হওয়ায় সুযোগ পায় অপরদিকে যারা কৃষিকার্যের অনুকূলে তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় আগ্রহ দেখায়।
অতীতের উন্নত জাতি ও তাদের কৃষিকাজ: ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অতীতের উন্নত জাতিগুলো কৃষিকার্যেও উন্নত ছিল। প্রাচীন মিসরবাসী পালাক্রমে ভিন্ন ভিন্ন শস্যের চাষ জানত। কৃত্রিম জলসেচন-পদ্ধতির সঙ্গে তারা পরিচিত ছিল। এছাড়া, কৃত্রিম উপায়ে ডিম ফোটানোর কার্যক্রমও তাদের অজানা ছিল না। উন্নত ধরনের জলসেচন-পদ্ধতি প্রাচীন ভারত ও ব্যাবিলনে প্রচলিত ছিল। পারস্যে এক সময় চালু ছিল প্রগাঢ় ধাঁচের ক্ষেত (ইনটেন্সিভ ফার্মিং)। জলসেচন পদ্ধতি, জমিচাষ-প্রক্রিয়া, সার ব্যবহার প্রভৃতি কাজে প্রাচীন রোমানরা ছিল অগ্রদূত।
প্রকৃত উন্নতির কাল: কৃষিকার্যে প্রকৃত যুগান্তর সূচিত হল অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে। শালগম জাতীয় সমূল উদ্ভিদের চাষ এই পর্বেই শুরু হয়। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ রবার্ট বেক ওয়েল কৃত্রিম প্রজনন-পদ্ধতির রীতিনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। সেই থেকেই খামারে পশু পালনের ক্ষেত্রে যুগান্ত এল। বিভিন্ন গৃহপালিত পশুর জন্মদানের সময় পশু-নির্বাচনের যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হল: এবং এদের লালন-পালন এবং খাদ্যের উপরেও গুরুত্ব আরোপ করা হল বিশেষভাবে। ওদিকে উন্নত ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার পশু-পালনের কাজকে আগের তুলনায় অনেক সহজ করল এবং যন্ত্র মানুষের হয়ে তো বটেই, পশুর হয়েও অনেক কাজ করতে লাগল। হাঁস-মুরগির খামারে বিদ্যুৎশক্তির সাহায্যে দিনের মতো আলোকজ্জ্বল পরিবেশ সৃষ্টির ফলে প্রকারান্তরে দিনই প্রতিভাত হয় এবং ডিম-পাড়া, ডিম-ফোটানো ইত্যাদির অনুকূল পরিবেশ গড়ে ওঠে।
উপসংহার: অতি আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে দু-ঘন্টারও অনেক কম সময়ে এক একর গমের জমির চাষাবাদ-সংক্রান্ত সমস্ত কাজ শেষ করা যায়। পুরোনো পদ্ধতি এই একই কাজ করতে সময় লাগত ৬০ ঘন্টার বেশি। বস্তুত, বিজ্ঞান আজ যেন অসাধ্য সাধন করছে। উষর মরুভূমি, হাজার বছরের পতিত জমি-যেসব জায়গায় ফসল ফলানোর কল্পনাও করা যেত না এক সময়, সেখানেও আজ অতি প্রয়োজনীয় সব ফসল ফলছে। এক কথায়, অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে ক্রমোন্নতিশীল বিজ্ঞান শক্তি। কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে আমাদের দেশেও যদি কৃষিতে বিজ্ঞানের সামগ্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় তবে আক্ষরিক অর্থেই আমরা পৃথিবীর অন্যতম কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এই প্রত্যাশা আমাদের সবার।
+88 01713 211 910