
এইচএসসি রচনা: স্বদেশ প্রেম অথবা মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি
এইচএসসি রচনা: স্বদেশ প্রেম অথবা মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি
সূচনা : নিজের দেশের প্রতি গভীর অনুরাগ আর ভালবাসার বোধই হল স্বদেশপ্রেম। একটি সাধারণ পাখি সন্ধ্যায় ঠিক ফিরে আসে নীড়ে। নীড়ের প্রতি তার টান প্রখর, মমত্ববোধ তীক্ষ্ণ। তেমনি স্বদেশের প্রতি মানুষের একটি সহজাত নিষ্কলুষ ভালবাসা থাকবেই।
স্বদেশপ্রেম-এক আন্তরিক অনুভব : একেবারে বুকের গভীরে যার জন্য পরম মমতা, আন্তরিকতা আর ভালবাসা সঞ্চিত থাকে, আবহমান কাল ধরে যার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, চৈতন্য বা স্বর্ণালি অনুভব কখনও এতটুকু কমে না, যারে নিয়ে দেখা বর্ণিল স্বপ্নের কল্পনার রং এতটুকু ফিকে হয় না কোনদিন, তার মধ্যে স্বদেশ অন্যতম। স্বদেশের প্রতি এই গভীর ভালবাসায় মিশে আছে অনেক শ্রদ্ধাবোধ, স্নিগ্ধতা আর কল্পিত স্বপ্নের অরুণিমা। দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে একটু ভেবে দেখুন তো, চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে শৈশবের বর্ণালি দিনগুলোর কথা চিন্তা করুন, চোখ মেলে ঐ হাত-পা ছড়ানো ছিপছিপে সুন্দর কৃষ্ণচূড়ার পল্লবগুলো একবার প্রাণ ভরে দেখুন দিগন্তবিস্তৃত ঐ নীল আকাশটাকে একবার হৃদয় দিয়ে প্রত্যক্ষ করুন কী স্বদেশের সোঁদা গন্ধ, স্বদেশের মিষ্টি অনুভব, স্বদেশের রূপের ঝলক কি আপনাকে নাড়া দেয় না?
"জননী গো জন্মভূমি তোমারি পবন
দিতেছে জীবন মোরে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে!
সুন্দর শশাঙ্কমুখ, উজ্জ্বল তপন,
হেরেছি প্রথমে আমি তোমারি আকাশে।’’(জন্মভূমিঃ গোবিন্দচন্দ্র দাশ)
দেশপ্রেম ও আল্লাহভক্তি : কেউ কেউ আল্লাহকে প্রেমপ্রীতি নিবেদনের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়ে সংসারে বিরক্ত হয়ে ওঠেন, আবার কেউ কেউ নিমগ্নচিত্তে জ্ঞানার্জনের মধ্যে জীবনের চরম সার্থকতা খুঁজে বেড়ান। কিন্তু মনে হয় স্বদেশ বা মাতৃভূমিকে প্রেমপ্রীতি নিবেদনের আদর্শ ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলে জীবন মহিমাময় হয়ে উঠতে পারে। স্বদেশ আমার মা। দেশের প্রতিটি ধূলিকণায় আল্লাহর অধিষ্ঠান, আবার আল্লাহর সাধনা বা জ্ঞানার্জন দেশের মানুষের মুক্তির জন্য। এই মনোভাব যদি হৃদয়ে প্রোথিত করা যায় তবে আমাদের ভেতরকার অবরুদ্ধ সদ্গুণগুলো প্রবাহের পথ আপনা থেকেই খুঁজে পাবে। মনে রাখি যেন খোদাপ্রেমের সাথে দেশপ্রেমের কোন বিরোধ নেই। Devotness - এর মতই Patriotism হল ’One of the finest & noblest sentiments of the human heart'.
মাতৃভক্তি ও স্বদেশপ্রেম : আসলে যিনি মা তিনিই মাতৃভূমি, জগৎমাতা, মহামায়া তাঁরই মধ্যে বিরাজিতা। আজীবন ভক্তি শ্রদ্ধাতেও যেমন মায়ের ঋণ শোধ করা যায় না তেমনি ” We can never be too grateful to the land where we were born. তাই কবি বলেন- ’’
হে স্বদেশ
তুমি আমার মায়ের মত
আমার আশ্রয় শেষ আশ্রয়
অন্তিম আকাঙ্ক্ষার উষ্ণ প্রস্রবণ।’’
সুতরাং ’জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরিয়সী’ জ্ঞানীর অতিশয়োক্তি মাত্র নয়, জীবনের যথার্থ সত্যোপলব্ধি।
শিল্প ও স্বদেশপ্রেম : দেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে স্বদেশপ্রেমের ভূমিকা ব্যাপক ও বিস্তৃত। স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ দেশীয় শিল্পের প্রতি এবং উৎপাদিত দ্রব্যের প্রতি আকৃষ্ট হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, মালিকরা যথাসম্ভব লাভবান হবে। সর্বোপরি শিল্পায়নে আমূল পরিবর্তন ঘটবে যদি মানুষ স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে উপলব্ধি করে-
‘পাকা হোক, ভাই, পরের ও বাসা
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।’-স্বাধীনতার সুখ : রজনীকান্ত সেন
স্বদেশপ্রেম ও সংস্কৃতি : ইংরেজি Culture বলতে আমরা বুঝি সংস্কৃতি। আচার্য সুনীতিকুমার চ্যাটার্জি বোঝেন ’মার্জিত মানসিকতা’ যাতে প্রকাশ পায় আধ্যাত্মিকতা। আর বুঝি পূর্ণতার সাধনা (Perfection of life)| এর পরিপুষ্টির জন্য প্রয়োজন-
(i) Freedom of mind (মনের স্বাধীনতা) , (ii) Universalism (বিশ্বাত্মবোধ), (iii) Urbanity (শালীনতা)। -এ তিনটি সত্যই যে জাতির মধ্যে পরিপুষ্ট তারাই স্বাজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ।
কিন্ত আজ বাংলার লোকসংগীত, কুটির শিল্প, লোকসাহিত্য ইত্যাদি নিমগ্ন উপাদানগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন বিজাতীয় ভাবধারায় পুষ্ট যে ”বাবু সংস্কৃতি’ গড়ে উঠেছে তার সাথে দেশের মাটি ও মানুষের যোগ সামান্যই। তাই বিশ্বের দরবারে আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য সমুজ্জ্বল করতে দেশীয় সংস্কৃতি নবধারায় এগিয়ে নিতে হবে এবং দেশপ্রেমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে হবে-
’ও আমার দেশের মাটি
তোমার বুকে ঠেকাই মাথা।’
দেশপ্রেম ও শিক্ষা : সুষ্ঠু সুন্দর শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এতে মানুষ স্বদেশের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। আগামী দিনের নাগরিক নবীন শিক্ষার্থীকে জানাতে হবে-
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি।’
কবিতায় দেশপ্রেম : যুগে যুগে কবিতায় দেশপ্রেম ধরা দিয়েছে সৌন্দর্যে। দেশপ্রেমী সব মানুষের কাছেই-
’ আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন
মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন।’
কবি জীবনানন্দের স্বদেশ ধরা দিয়েছে এভাবে-
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর; অন্ধকারে জেগে ওঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড় পাতাটির নীচে বসে আছে
ভোরের দোয়েল-
এছাড়া রবি ঠাকুর, নজরুল, সুকান্ত , জসীম উদ্দীন, মধুসূদন- এর কবিতায়ও স্বদেশপ্রেম দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রকৃত দেশপ্রেমিক : প্রকৃত দেশপ্রেমিকের কাছে দেশের সবকিছুই পরম পূত ও পবিত্র। দেশের জন্য তাঁরা সববিছু ত্যাগ করতে, হাসিমুখে আত্মোৎসর্গ করতে পারেন। তাদের সাহস, শৌর্য, দৃঢ়তা যুগে যুগে জাতিকে প্রেরণা যোগায়, জাতীয় মূল্যাবোধের চরম অবক্ষয়ের অমানিশায়ও ধ্রুব নক্ষত্রের দীপ্তি নিয়ে আশা ও আদর্শের আলোকে অনির্বাণ করে রাখে।
দেশপ্রেম ও রাজনীতি : দেশপ্রেমিক না হলে খাঁটি রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। কিন্তু যেখানে ক্ষমতা লোলুপতাই মুখ্য আর দেশ গৌণ সেখানে রাজনীতির মহৎ উদ্দেশ্য লাঞ্ছিত হয় মাত্র। হিটলার ও মসোলিনীর মত রাষ্ট্রনায়করা দেশপ্রেমিক নিশ্চয়ই নন; ভ্রান্ত রাজনীতিবিদ মাত্র। আর দেশপ্রেমহীন রাজনীতির ফলশ্রুতিতে ধ্বংস আর সর্বনাশ। আইনস্টাইনের '' How long shall we tolerate the politicians hungry for power?'' এই আর্জিতে যে ক্ষোভ ও বেদনা পুঞ্জীভূত সত্যের খাতিরে কোন বিবেকবান মানুষ কি তা সমর্থন না করে পারেন ?
প্রবাস জীবনে স্বদেশপ্রেম : ‘তোমার যেখানে সাধ চলে যাও আমি এই বাংলার পারে র'য়ে যাব’; কবি জীবনানন্দ স্বদেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চাননি। তবে যাঁরা গেছেন তাঁরা মর্মে মর্মে টের পায় স্বদেশের জন্য কী কষ্ট প্রবাসজীবনে। আসলেও তাই। সারা পৃথিবী জুড়ে স্বদেশের মত সুন্দর জায়গা কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না -
’মিছা মণি মুক্তা হেম স্বদেশের প্রিয় প্রেম
তার চেয়ে রত্ন নাই আর- -ঈশ্বরগুপ্ত
মধুসূদন ও স্বদেশপ্রেম : দেশপ্রেম ছাড়া মানুষের জীবন যে কত অর্থহীন তা জীবন দিয়ে বুঝে ছিলেন বাংলা কাব্যে সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক ইংরেজিতে পারঙ্গম কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। ইংরেজি ভাষায় কবিতা লিখে তাঁর যশস্বী হবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তাঁর ভাগ্যে যশ খ্যাতি কোনটিই জোটে নি। তাই তখন স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফিরে আসেন বাংলায়। এখানে তিনি শান্তি ও যশ সবই পান। তাঁর সমাধিস্তম্ভে তাঁরই লেখাটি শোভা পায়-’’
দাঁড়াও পথিক বর’ জন্ম যদি তব
বঙ্গে। তিষ্ঠ ক্ষণকাল। এ সমাধি স্থলে’
পরাধীন বাংলাদেশে স্বদেশপ্রেম : ১৭৫৭ সালে পলাশীতে দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের সাথে সাথে দু’শ বছরের পরাধীনতার আঁধার নেমে আসে বাংলায়। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লায় সে কী যুদ্ধ! ক্ষুদিরাম করলেন হাসিমুখে নজীরবিহীন আত্মদান। মাস্টার দ্যা সূর্যসেন ফাঁসির পূর্বরাত্রে দেশবাসীকে জানালেন’ আমার শেষ বাণী আদর্শ ও একতা।’ ভাষা আন্দোলনে সালাম-বরকত-রফিকের তাজা রক্তের উপর দিয়ে এল স্বাধীনতা যুদ্ধ।’ ৭১-এর লক্ষ লক্ষ দেশপ্রেমিক শহীদের রক্তের বন্যা নিয়ে এল বাংলার স্বাধীনতা। দেশপ্রেমিক মাওলানা ভাসানী, ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান-এদের কথা কি কোনদিন বাঙালি ভুলতে পারে?
স্বাধীন বাংলাদেশ ও দেশপ্রেম : স্বাধীন বাংলাদেশে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। এখন ভাঙ্গার প্রয়োজন যতটা গড়ার প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি।’ পশ্চিমী হটাও’-এর বদলে জাতীয় কন্ঠে আজ নতুন শ্লোগান’ গরীবী হটাও’। কিন্তু শ্লোগান যদি হয় শুধু উচ্ছ্বাস আর ভাঁড়, তবে গরীবীর আগে গরীবরা হটবে। আজও এদেশের অনেক লোক দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে, যাপন করে করুণ মানবেতর জীবন। তাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য চাই সত্যিকারের দেশপ্রেমিক নওজোয়ানের দল।
ইতিহাসে দেশপ্রেমিক : যুগে যুগে বহু দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্ব আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁরা সবাই আজ অমর ইতিহাসে। মহামানব হযরত মুহম্মদ (স) বলেছেন, ’ হুব্বুল ওয়াতানে মিনাল ঈমান।’’ জর্জ ওয়াশিংটন, নেলসন মেন্ডেলা, মাও সেতুং, মহাত্মা গান্ধী, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, টিপু সুলতান, সম্রাট আকবর, খলিফা ওমর (রা) এর সবাই স্বদেশপ্রেমের মহিমায় চির অম্লান।
দেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম : স্বদেশপ্রেমের সাথে বিশ্বপ্রেমের কোন বিরোধ নেই। বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ স্বদেশকে ভালবেসেছিলেন বলেই না বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে বিশ্বপ্রেমের মুক্তিমন্ত্র উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন। কবিগুরু যে বিশ্ব মানবধর্মের কথা বলেছিলেন, স্বদেশিকতা তা থেকেই উদ্ভব ও পরিপুষ্ট। তাই ’ যথার্থ দেশপ্রেমের মধ্যেই বিশ্বপ্রেমের অঙ্কুর।’ প্রথম প্রবৃত্তিটি শেষোক্তের পরিপূরক মাত্র।
উপসংহার : স্বদেশপ্রেম বিমূর্ত একটি আদর্শই তো নয়, আদর্শের নামে কিছু অপপ্রচার বা বক্তৃতাবাজীও নয়, স্বদেশ বা মাতৃভূমির কল্যাণ বিধানের জন্য যে সংকল্প ও কর্মোদ্যম তারই মধ্যে এর উদ্ভব, বিকাশ ও পরিপুষ্ট। তাই আমাদের সকলের স্বদেশকে মনপ্রাণ দিয়ে অনুভব করে চিনে নিতে হবে। তবে নিঃস্বার্থ ভালবাসা দিতে হবে, তার সেবা করতে হবে আর আকাঙ্ক্ষা জাগাতে হবে-
‘ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমি ধরি
এদেশেতে জন্ম, যেন এদেশেতেই মরি। ’
+88 01713 211 910