
এইচএসসি বাংলা ১ম পত্র: অনুধাবনমূলক প্রশ্ন : নাটক-সিরাজউদ্দৌলা- সিকান্দার আবু জাফর
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন : নাটক-সিরাজউদ্দৌলা
প্রশ্ন-১। শুভ কাজে অযথা বিলম্ব করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়- কে, কেন একথা বলেছে ?
উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক “সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর দ্বিতীয় অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যের অন্তর্গত ।
আলোচ্য উক্তিটি অপচিত কিংবদন্তীর পুরুষ বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর আলী খান এর । ইংরেজ কোম্পানি প্রতিনিধি ক্লাইভ কর্তৃক প্রণীত দলিলের শর্ত নিয়ে রাজবল্ল ও জগৎশেঠের সাথে ক্লাইভের মতবিরোধ দেখা দেয়। সেই মতবিরোধ প্রশমিত করার জন্য ক্লাইভ আলোচ্য উক্তি করেন ।
নবাব আলীবর্দী খাঁ এর মৃত্যু হলে বাংলার সিংহাসনের আসীন হন তাঁরই স্নেহভাজন দৌহিত্র সিরাজ-উ-দ্দৌলা। কিন্তু সিরাজের এ সিংহাসন লাভকে কেউই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেন নি । তাঁর আত্মীয় স্বজনসহ রাজ অমাত্যগণ তাঁর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । ঘসেটি বেগম, মীর জাফর, জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ সকলই স্বীয় স্বার্থ ও স্বপ্ন চরিতার্থ করার প্রয়াসে নবাবকে ক্ষমতা চ্যুত করতে চান। এই লক্ষকে বাস্তবায়নের জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা কুচক্রী ও ক্ষমতালোভী ইংরেজ কোম্পানীর সাথে এক চুক্তিতে উপনীত হন । এই চুক্তি পত্র সকলের স্বাক্ষর ও অনুমোদনের জন্য কোম্পানী প্রতিনিধি ক্লাইভ মীরনের আবাসে আসেন। নবাবের পতনের পর কে কি পাবেন তা এই চুক্তিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী নবাব সিরাজের পতনের পর বাংলার নবাব হলেন মীরজাফর আর রাজ্য চালাবেন ইংরেজ কোম্পানী। রাজবল্লভ ও জগৎশেঠ চুক্তির এই শর্ত মানতে চান না। অতঃপর মীর জাফরের মধ্যস্থতায় সকলেই চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি পত্রে স্বাক্ষরের প্রাক মুহুর্তে সকলের মধ্যে উদ্বৃত মতবিরোধ প্রশমিত করার জন্য মীর জাফর উচ্চারণ করেন - শুভ কাজে অযথা বিলম্ব করা বুদ্ধি মানের কাজ নয়।
বস্তুত আলোচ্য উক্তি অবতারণার মধ্য দিয়ে নাট্যকার একদিকে বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের স্বরুপ যেমন উন্মোচিত করেছেন তেমনি অন্য দিকে উল্লিখিত চুক্তি পত্রের প্রতি ও ঘৃণা প্রকাশ করেছেন।
প্রশ্ন-২। ‘তারা চায় মসনদের অধিকার-কারা, কেন মসনদের অধিকার চায়?
উত্তর:- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অঙ্কের চতুর্থ দৃশ্যের অন্তর্গত ।
আলোচ্য উক্তিটি করেছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা । দরবারে সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই উক্তি করেছেন। পলাশীর যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি এই উক্তি করেছিলেন ।
প্রতারকদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকদের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উ-দ্দৌলার সেনাবাহিনীর পরাজয় ঘটে । অতঃপর দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহনলালের পরামর্শে সিরাজ রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন দেশের স্বাধীনতা সুসংহত করার জন্য । সেই উদ্দেশ্যেই রাজদরবারে সাধারণ জনগণের সমাবেশ ঘটান । তিনি সমবেত জনতাকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এগিয়ে আসার আহবান জানান। তিনি তাদের কাছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার যৌক্তিকতাও বিশ্লেষন করেন । তিনি বলেন যে, আজ সমস্ত অপশক্তি নবাবের বিরুদ্ধে এক হয়েছে। মুসলমান মীর জাফর, ব্রাহ্মণ রাজবল্লভ, কায়স্ত রায়দুর্লভ জৈন মহাতাব চাঁদ শেঠ, উমিচাঁদ, ফিরিঙ্গি খৃষ্টান ওয়াটসন, ক্লাইভ এক জোট হয়ে মসনদের অধিকার পেতে চায়। শাসন ক্ষমতা স্থায়ী করতে চায়। এর মধ্য দিয়ে তারা দেশ ও জনগণের উপর লুঠতরাজের একচেটিয়া অধিকার কায়েম করতে চায়
প্রশ্ন-৩ । ‘দেশের স্বার্থের জন্য নিজেদের স্বার্থ তুচ্ছ করে আমরা নবাবের আজ্ঞাবহ হয়েই থাকব।'-উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের অন্তর্গত ।
আলোচ্য উক্তিটি করেছেন বিশ্বাসঘাতক ও প্রতারক মীর জাফর আলী খান। নবাব আলিবর্দী খাঁ এর মৃত্যু হলে বাংলার সিংহাসনে আসীন হন তারই স্নেহভাজন দৌহিত্র সিরাজ-উ-দ্দৌলা । কিন্তু সিরাজের সিংহাসন লাভকে কেউ-ই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেন নি । সিরাজের আত্মীয়- স্বজনসহ রাজ অমাত্যগণ সিরাজের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । সিরাজ এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। মীরজাফর, রায়দুর্লভ প্রমুখ সেনাপতিকে কয়েদ করে তিনি এই ষড়যন্ত্র নির্মূল করতে পারতেন । কিন্তু সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দেয়ার আশঙ্কার তিনি তা করেন নি। তবে নবাব বিচক্ষণতার সাথে কৌশলে কার্য সিদ্ধির পথে অগ্রসর হন । তিনি সকল অমাত্যদের নিয়ে এক মন্ত্রণাসভার আয়োজন করেন। সে সভায় তিনি এক লবণ ব্যবসায়ীর উপর ইংরেজ অত্যাচারের নমুনা প্রদর্শন করে ইংরেজদের সমস্ত অত্যাচার নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেন । এক্ষেত্রে নবাবের লক্ষ্য ছিল, ষড়যন্ত্রকারী অমাত্যদের মধ্যে দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধ জাগ্রত করে তাদের সৎপথে ফিরিয়ে আনা । অতঃপর মীর জাফরসহ সকলেই নবাবের অনুগত থাকার অভিমত ব্যক্ত করেন । নবাব তাদেরকে সাবধান করেছেন যেনতারা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নবাবকে বিভ্রান্ত না করেন। এর জবাবেই মীর জাফর উচ্চারণ করেন- দেশের স্বার্থের জন্যে নিজেদের স্বার্থ তুচ্ছ করে আমরা নবাবের আজ্ঞাবহ হয়েই থাকব । বস্তুত, এই উক্তির মধ্য দিয়ে নাট্যকার মীর জাফরের প্রতারক মনোভাবকেই উন্মোচন করেছেন ।
প্রশ্ন-৪ । “শুভ হোক আমার বাংলার জন্যে। নিশ্চিন্ত হোক বাংলা প্রত্যেকটি নর-নারী। -বুঝিয়ে বল।
উত্তর:- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক “সিরাজউদ্দৌলা” (১৯৬৫)-এর চতুর্থ অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যের অন্তর্গত ।
আলোচ্য বাক্যগুলো বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার প্রার্থনা । জাফরগঞ্জের কয়েদ খানায় বন্দী অবস্থায় বাংলার জনগণের কল্যাণার্থে তিনি প্রার্থনা করেন ।
পলাশীর প্রান্তরে পাতানো যুদ্ধে সিরাজ পরাজিত হন এবং পরবর্তীতে ইংরেজ বাহিনীর কাছে বন্দী হন । বন্দী সিরাজকে কয়েদ করা হয় জাফরগঞ্জের নিঃসীম অন্ধকার করা কক্ষে । নবাবকে হত্যা করার জন্য একদিন সেখানে প্রবেশ করে হায়নারুপী মীরন এবং অকৃতজ্ঞ নরঘাতক মোহাম্মদী বেগ। এই দুই নরঘাতক কারা কক্ষে প্রবেশ করার সময় কিঞ্চিৎ পরিমাণ আলোও প্রবেশ করে । তা দেখে নবাব ভাবেন প্রভাত বুঝি হয়ে এলো। আর তখনই প্রজাদরদী নবাব মোনাজাতের ভঙ্গীতে পরম করুণাময়ের উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করেণ- শুভ হোক বাংলার জন্যে। নিশ্চিন্ত হোক বাংলার প্রত্যেকটি নর-নারী । আলহামদুলিল্লাহ ।
বস্তুত উপনিবেশবাদের পোষক এবং ইংরেজদের খয়ের খাঁ শ্রেণীর ঐতিহাসিকগণ বাংলার নবাব সিরাজকে কলঙ্কিত করে অঙ্কন করলেও এই উচ্চারণের মধ্যদিয়ে সিরাজের জনদরদী ও প্রজাবৎসল স্বরূপকেই নাট্যকার উন্মোচন করেছেন ।
প্রশ্ন-৫। ‘উদ্দেশের দিক থেকে বিচার করলে আমরা আপনাদের সমগোত্রীয়।'- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর। অথবা, 'আমি বাংলাদেশে আসিয়াছি অর্থ উপার্জনের জন্য।'- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর :- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর প্রথম অংকের দ্বিতীয় দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে ।
আলোচ্য উক্তিটি অর্থলোভী উমিচাঁদের । এই উক্তিটি ড্রেককে লিখা উমিচাঁদের একটি চিঠির অংশ বিশেষ। ইংরেজদের সাথে স্বার্থ ও উদ্দেশ্যের প্রশ্নে নিজের সমান্তরালতা বোঝাতেই সে এই উক্তি করেছিল ।
কলকাতার যুদ্ধে নবাব বাহিনীর নিকট ইংরেজ বাহিনীর পরাজয় ঘটে । নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কারণে নবাব বাংলাদেশে ইংরেজেদের বানিজ্য করার অনুমতি প্রত্যাহার করে । শুধু তাই নয়, নবাব ইংরেজদেরকে কলকাতা থেকেও বিতাড়িত করে । অতঃপর ইংরেজগণ ভাগীরথী নদীতে ফোর্ট ঊনলিয়াম জাহাজে আশ্রয় গ্রহণ করে । সেখানেই উমি চাঁদ ক্রেককে এক পত্র লিখে । পত্রে সে জানায় যে, সে ইংরেজদের বন্ধু এবং চিরকালই বন্ধু থাকবে । সে আরো জানা যে, মানিক চাঁদকে বার হাজার টাকা নজর দিয়ে তাদের জন্য বাংলাদেশের বাণিজ্য করার অনুমতি আদায় করেছে । তাই এখন সে নিজের প পারিশ্রমিক বাবদ পাঁচ হাজার টাকাসহ ইংরেজদের কাছ থেকে সতের হাজার টাকা পেতে চায় । এই টাকা দিতে ড্রেক যেন মোটেও কুণ্ঠিত না হন । কারণ টাকার জন্যই সে সুদুর লাহোর থেকে বাংলাদেশে এসছে যেমন, ইংরেজগণ এসেছেন সুদুর বৃটেন থেকে । সুতরাং উদ্দেশ্য আর স্বার্থের দিক থেকে উভয়ই এক । আর এ সত্য বিবেচনা করেই উমিচাঁদ আলোচ্য মন্তব্য করেছিল ।
বস্তুত আলোচ্য উক্তির মধ্যদিয়ে স্বার্থান্ধ ও অর্থ ঘৃন্ধু উমিচাঁদের হীন চরিত্র যেমন প্রকাশিত হয়েছে তেমনি ইংরেজদের ষড়যন্ত্রকারী হীন মনোভাব ও উন্মোচিত হয়েছে ।
প্রশ্ন-৬। ‘ফরাসীরা ডাকাত আর ইংরেজরা অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি কেমন?'- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর ।
উত্তর :- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে ।
আলোচ্য উক্তিটি নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার । ইংরেজ হাতুড়ে ডাক্তার হলওয়েলকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই উক্তি করেছিলেন ।
ইংরেজগণ নবাবের দেয়া শর্ত ভঙ্গ করে। এদেরে বাণিজ্য অব্যাহত রাখে। শুধু তাই নয়, তারা এদেশের নিরীহ জনগণের উপরও নির্যাতন ও জুলুম চালাতে থাকে । নবাব এসমস্ত বিষয়ের প্রতি বিধান করার জন্য কলকাতার দুর্গ আক্রমণ করেন এবং ইংরেজদের পরাস্ত করেন । অতঃপর ইংরেজ পক্ষের সেনাপতি হাতুড়ে ডাক্তার হলওয়েলের নিকট কৈফিয়ৎ চান কেন তাঁরা এদেশের জনগণের উপর অত্যাচার জুলুম চালাচ্ছে, কেন তারা কাশিম বাজারে গোলাগুলি আমদানি করেছে । আর কেনই বা তারা নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও কলকাতার দুর্গ সংস্কার অব্যাহত রেখেছে । তখন হলওয়েল কৈফিয়তের সুরে বলেছিল যে, ফরাসী ডাক্তারদের হাত থেকে রক্ষা জন্যই তারা দুর্গ সংস্কারের কাজ অব্যাহত রেখেছে । হলওলের এই জবাবের প্রেক্ষিতেই নবাব ব্যঙ্গাত্মক সুরে আলোচ্য উক্তি করেছিলেন ।
বস্তুত এই উক্তির মধ্যদিয়ে একদিকে ইংরেজদের হীন চরিত্রের যেমন উন্মোচন ঘটেছে তেমনি অন্যদিকে ইংরেজদের প্রতি নবাবের ক্ষোভ এবং ঘৃণা প্রকাশিত হয়েছে ।
প্রশ্ন-৭। “ইংরেজদের হয়ে যুদ্ধ করছি কোম্পানীর টাকার জন্য। তা বলে বাঙালি কাপুরুষ নয়।' উক্তিটির তাৎপর্য লেখ ।
উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৫)-এর প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের অন্তর্গত ।
আলোচ্য উক্তিটি ইংরেজ পক্ষের বাঙালি সৈনিক ওয়ালী খানের।
ইংরেজদের ঔদ্ধত্যের সমূচিত শান্তি দেয়ার জন্য নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা কলাকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ আক্রমণ করেন। নবাবের ক্ষীপ্ত আক্রমণের মুখে ইংরেজ বাহিনী বিপর্যন্ত। কিন্তু এর পরও ক্যাপ্টেন ক্লেটন গুটিকয়েক সৈনিক নিয়ে নবাব বাহিনীকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থ প্রয়াস চালান। এসময়ে ইংরেজ পক্ষের বাঙালি সৈনিক ওয়ালী খান ক্লেটনকে যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শ দেন । কারণ, নবাব বাহিনী দুর্গের খুব কাছা কাছি এসে পড়েছে । কাজেই যুদ্ধ করে কোনো লাভ নেই । কিন্তু ক্লেটন ওয়ালী খানের এই পরামর্শে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এবং তাকে বেঈমান গালি দিয়ে বলেন - কাপুরুষ বাঙালি কথার যুদ্ধ বন্ধ হবে না। ক্লেটনের এই উক্তির জবাবেই ওয়ালী খান আলোচ্য উক্তিটি করে ছিলেন । -
বস্তুত এই উক্তির মাধ্যমে নাট্যকার ওয়ালী খানের বীরত্বেকে যেমন প্রকাশ করেছেন তেমনি সমগ্র বাঙালির বীরত্বকেও উন্মোচন করার প্রয়াস পেয়েছেন ।
প্রশ্ন-৮। “ইনি কি নবাব, না ফকীর?'-কার সম্বন্ধে বলা হয়েছে?
উত্তর:- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর চতুর্থ অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের অন্তর্গত ।
নব্য নবাব মীর জাফরকে উদ্দেশ্য করে রবার্ট ক্লাইভ আলোচ্য উক্তিটি করেন । সিংহাসনে না বসে সিংহাসনের হাতল ধরে দাড়িয়ে থাকলে তিনি উল্লিখিত উক্তি করেন।
প্রতারকদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উ-দ্দৌলার সৈন্য বাহিনীর পরাজয় ঘটে এবং পরবর্তীতে সিরাজ বন্দী হন । বাংলার সিংহাসনের উত্তরসুরী এখন মীর জাফর আলী খান। তার সিংহাসনে আহোরণের সকল বাধা অপসারিত । তার সিংহাসন আরোহণ সকল প্রস্তুতি সুসম্পন্ন হয়েছে। তারপরও তিনি সিংহাসনে বসছেন না। সিংহাসনের পাশে দাড়িয়ে আছেন কোম্পানীর প্রতিনিধি রবার্ট ক্লাইভের অপেক্ষায় । ক্লাইভ তাকে হাত ধরিয়ে বসিয়ে দিলে কেবল তিনি সিংহাসনে বসবেন, এটা তার একান্ত ইচ্ছা। কারণ, ক্লাইভের চাতুর্যের কারণেই তিনি আজ সুবে বাংলার নবাব। অতঃপর ক্লাইভ দরবারে আগমন করেন ক্লাইভ দরবারে প্রবেশ করেই দেখতে পান যে, মেরুদন্ডহীন মীর জাফর সিংহাসনের পাশে দাড়িয়ে আছেন । আর তখনই ক্লাইভ চরম বিদ্রুপের সাথে উচ্চারণ করেন- “ ইনি কি নবাব না ফকীর?” বস্তুত এই উক্তির মধ্যদিয়ে ব্যক্তিত্বহীন পরতান্ত্রিক মীর জাফরের চরিত্রই নাট্যকার সুস্পষ্ট ভাবে উন্মোচন করেছেন ।
প্রশ্ন-৯।‘সেখানে যুদ্ধ হয়নি, হয়েছে যুদ্ধের অভিনয়- ব্যাখ্যা কর।
অথবা, ‘আবার যুদ্ধ হবে, আর সৈন্য পরিচালনা করব আমি নিজে- বক্তার এ মনোভাবের কারণ কী?
উত্তর :- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অঙ্কের চতুর্থ দৃশ্যের অন্তর্গত ।
আলোচ্য উক্তিটি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার । পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এবং সমবেত জনতাকে স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় উৎসাহ দানের জন্য তিনি এই উক্তি করেছিলেন । প্রতারকদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকদের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উ-দ্দৌলার সেনাবাহিনীর পরাজয় ঘটে। অতঃপর দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহনলালের পরামর্শে সিরাজ রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন দেশের স্বাধীনতা সুসংহত করার জন্য। সেই উদ্দেশ্যেই রাজদরবারে সাধারণ জনগণের সমাবেশ ঘটান । তিনি সমবেত জনতাকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এগিয়ে আসার আহবান জানান। তিনি তাদের কাছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার যৌক্তিকতাও বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন ক্লাইভ ও মীর জাফরের হাতে রাজধানীর পতন হবে জনগণের জীবনে নেমে আসবে অনন্ত আঁধার । তাই দেশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে তাদেরকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে । তখন সমবেত জনতার পক্ষ থেকে এক ব্যক্তি বলেন তাদের তো সৈন্য পরিচালনার যোগ্য সেনাপতিও নেই । কী দিয়ে তারা যুদ্ধ করবে। এক জবাবে নবাব সিরাজ বলেন যুদ্ধ তিনি নিজেই পরিচালনা করবেন । নবাব আলিবর্দির আমল থেকেই তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং জয়লাভ করেছেন । কোথাও পরাজিত হননি । একমাত্র পলাশীতে পরাজিত হয়েছেন। কারণ- সেখানে যুদ্ধ হয়নি হয়েছে যুদ্ধের অভিনয় ।
বস্তুত, এই উক্তির মধ্য দিয়ে নাট্যকার সিরাজের একনিষ্ঠ দেশপ্রেম এবং বীরত্বকেই উন্মোচন করেছেন ।
প্রশ্ন-১০। ‘আসামীর সে অধিকার থাকে না-কি? - কে, কাকে একথা বলেছে?
উত্তরঃ প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর চতুর্থ অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যের অন্তর্গত ।
আলোচ্য উক্তিটি করেন বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের পুত্র দুশ্চরিত্র মীরন । জাফরগঞ্জের কয়েদ খানার নবাব সিরাজ তাঁর মৃত্যুদন্ডাজ্ঞা দেখতে চাইলে মীরন উল্লিখিত উচ্চারণ করেন ।
পলাশীর প্রান্তরে পাতানো যুদ্ধে সিরাজ পরাজিত হন এবং পরবর্তীতে ইংরেজ বাহিনীর কাছে বন্দী হন। বন্দী সিরাজকে কয়েদ করা হয় জাফরগঞ্জের নিঃসীম অন্ধকার করা কক্ষে। নবাবকে হত্যা করার জন্য একদিন সেখানে প্রবেশ করে হায়নারুপী মীরন এবং অকৃতজ্ঞ নরঘাতক মোহাম্মদী বেগ। এই দুই নরঘাতক কারা কক্ষে প্রবেশ করার কিঞ্চিৎ পরিমাণ আলোও প্রবেশ করে । তা দেখে নবাব ভাবেন প্রভাত বুঝি হয়ে এলো । আর তখনই প্রজাদরদী নবাব মোনাজাতের ভঙ্গীতে পরম করুণাময়ের উদ্দেশ্যে প্রজাসাধারণের শুভ কামনা করেন । কিন্তু হঠাৎ সেখানে মীরন ও মোহাম্মদী বেগের উপস্থিতিতে তিনি চমকে উঠেন । তিনি জানতে চান কেন তারা কারা কক্ষে প্রবেশ করেছে। এর জবাবে তারা বলেন যে, নবাবের তথা মীর জাফরের দন্ডাজ্ঞা শোনাতে তারা এখানে এসেছে । তখন সিরাজ দন্ডাজ্ঞা দেখতে চাইলে মীরন উচ্চারণ করে - আসামীর সে অধিকার থাকে নাকি ?
বস্তুত, এই উক্তির অবতারণার মধ্যদিয়ে নাট্যকার সিরাজের প্রতি পক্ষের অন্যায় আচরণের স্বরূপকেই উন্মোচন করেছেন ।
প্রশ্ন-১১। ‘Public এর মনে Terror জাগিয়ে রাখতে পারাটাই শাসন ক্ষমতার granite foundation - কে, কেন এ কথা বলেছে?
উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর চতুর্থ অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে।
আলোচ্য উক্তিটি মীরজাফরের উদ্দেশ্যে ক্লাইভের । পরাজিত ও বন্দী সিরাজকে মুখে থুথু দিয়ে অপমান ও নৃসংসভাবে সাজা দেয়ার প্রস্তাবে মীরজাফর দ্বিধা প্রকাশ করলে ক্লাইভ এই উক্তি করেছিলেন ।
পলাশীর প্রান্তরে পাতানো যুদ্ধে সিরাজ পরাজিত হন এবং পরবর্তীতে ইংরেজ বাহিনীর কাছে বন্দী হন । অতঃপর বাংলার সিংহাসনে আসীন হন বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর । মীরজাফরের অভিষেক অনুষ্ঠানে ক্লাইভ ব্যাখ্যা করেন কিভাবে সিরাজকে শাস্তি দেয়া হবে । তিনি বলেন সিরাজ শিকল বাধা অরস্থায় পায়ে হেঁটে জাফর্র গঞ্জের কয়েদ খানায় যাবে । কেউ যদি সিরাজের জন্য এতটুকু সহানুভূতি দেখায় তবে তার গর্দান যাবে । মীরজাফর ক্লাইভের সে মতকে সমর্থন করেন । ক্লাইভ আরো বলেন, সিরাজ যখন মুর্শিদাবাদের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবে তখন রাস্তার দু পাশের লোক তার মুখে থুথু দিবে । কিন্তু ক্লাইভের এই প্রস্তাব সমর্থনে মীরজাফর দ্বিধা প্রকাশ করেন । তখন ক্লইভ বলে ছিলেন, সিরাজ এখন dead horse, তাকে শাস্তি দিয়েই জনগণের মনে ভয় জাগাতে হবে। আর তা না করলে জনগন নতুন নবাব মীরজাফরকে ভয় করবে না। সেই জন্য জনগণের মনে ভয় জাগ্রত করেই শাসন ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে হবে । কেননা অবৈধ তথা স্বৈর শাসনের মূল ভিত্তিই হল ভীতি বা ত্রাস। তাই ক্লাইভ ও পাবলিকের মনে Terror জাগিয়ে রাখতে পারাটাই শাসন ক্ষমতার granite foundation বলে মনে করেন। --
বস্তুত, এই উক্তির মধ্যদিয়ে নাট্যকার ক্লাইভের ঔপনিবেশিক ও ফ্যাসিবাদী চরিত্রকেই উন্মোচন করেছেন ।
প্রশ্ন-১২। ‘অস্ত্র আমাদেরও আছে, কিন্তু তার চেয়ে যা বড়, সবচেয়ে যা বড়, আমাদের আছে সেই দেশ প্রেম এবং স্বাধীনতা রক্ষার সংকল্প।' -উক্তিটি ব্যাখ্যা কর । অথবা, ‘হাজার মানুষ একযোগে রুখে দাঁড়াতে পারলে কৌশলের প্রয়োজন হবে না।'-উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
অথবা, “বিক্রম দিয়েই আমরা শত্রুকে হতবল/করতে পারব।'- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর ।
উত্তর:- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অঙ্কের চতুর্থ দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে ।
আলোচ্য উক্তিটি করেছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। দরবারে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি এই উক্তি করেছিলেন । সমবেত জনতাকে দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় উৎসাহ দেয়ার জন্যই সিরাজ-উ-দ্দৌলা এই তত্ত্বপূর্ণ উক্তিটি করেছিলেন ।
প্রতারকদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকদের বিশ্বাঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উ-দ্দৌলা সৈন্য বাহিনী পরাজয় ঘটে । অতঃপর দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহনলালের পরামর্শে সিরাজ রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন দেশের স্বাধীনতা সুসংহত করার জন্য । সেই উদ্দেশ্যেই সিরাজ রাজদরবারে সাধারণ জনগণের সমাবেশ ঘটান । রাজকোষ উন্মুক্ত করে দেন আরেকটি সৈন্য বাহিনী গঠন করার জন্য । কিন্তু বার্তা বাহক এসে খবর দেয় যে, অনেকেই টাকা নিয়ে সৈন্য সংগ্রহের পরিবর্তে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। এ সংবাদ সমবেত জনতা হতোদ্যম হলে তাদের অনুপ্রেণা দেয়ার জন্য সিরাজ বলেন, ভীরু প্রতারকের দল চিকালই পলায় তাতে বীরের মনোবল ক্ষুণ্ণ হয় না। তাই তিনি সমবেত জনতাকে সব দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানান। তিনি আরো বলেন, আজ একদিকে দেশের সমস্ত সাধারণ মানুষ আর অন্যদিকে কতিপয় বিদ্রোহী । বিদ্রাহীদের হাতে অস্ত্র আছে; আর আছে ছলনা ও মাঠ্য । কিন্তু সাধারণ মানুষের হাতে অস্ত্র না থাকলেও তাদের আছে দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতা রক্ষার সংকল্প। আর এই সংকল্প নিয়ে রুখে দাড়ালে এবং হাজার মানুষ একত্র হলে যুদ্ধ জয়ের জন্য কৌশলের প্রয়োজন হবে না । বিক্রম দিয়েই তারা যুদ্ধ জয় করতে পারবে এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংহত করতে পারবে । বস্তুত এই উক্তির মধ্যদিয়ে সিরাজের একনিষ্ট দেশপ্রেম এবং স্বাধীনচেতা মনোভাবের উন্মোচন ঘটেছে। তাছাড়া একটি দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্যতা উন্মোচনের জন্যই নাট্যকার আলোচ্য উক্তির অবতারণা করেছেন।
প্রশ্ন-১৩ । ‘ঘরের লোক অবিশ্বাসী হলে, বাইরের লোকের পক্ষে সবই সম্ভব।'- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর ।
উত্তর :- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌল' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অংকের প্রথম দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে। একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে নবাব পত্নি লুৎফাকে উদ্দেশ্য করে সিরাজউদ্দৌলা, এ উক্তি করেছিলেন । সিরাজ-উ-দ্দৌলার খালা ঘসেটি বেগম এবং রাজ অমাত্যদের ষড়যন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে সিরাজ-উ-দ্দৌলা । আলোচ্য উক্তি করেন ।
নবাব আলিবর্দী খাঁ'র মৃত্যু হলে বাংলার সিংহাসনে আসীন হন তাঁরই স্নেহভাজন দৌহিত্র সিরাজ-উ-দ্দৌলা । কিন্তু সিরাজের সিংহাসন লাভকে কেউ-ই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেন নি। সিরাজের আত্মীয়- স্বজনসহ রাজ অমাত্যগণ সিরাজের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । আর এ ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতিতেই ইংরেজগণ একমাস যেতে না যেতেই আলীনগরের সন্ধি অস্বীকার করে এবং পলাশীতে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে । সিরাজের মুখে লুৎফা যখন এই খবর শুনতে পান তখন তিনি জানতে চান যে, কতিপয় বিদেশী বিনিয়ার এ স্পর্ধা কি করে সম্ভব? এর উত্তরে সিরাজ বলেছিলেন যে, ঘরের লোক অবিশ্বাসী হলে বাইরের লোকের পক্ষে সবই সম্ভব। কেননা, নবাবের পরম আপনজন মাতৃতুল্য খালা ঘসেটি বেগম নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত । তার সাথে যুক্ত হয়েছে মীরজাফর, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ জগৎশেঠের মত কতিপয় স্বার্থান্বেষী রাজ অমাত্যগণ । আর এদের আশ্রয়- প্রশ্রয়েই মুষ্টিমেয় ইংরেজ সিরাজকে গদিচ্যুত করতে উদ্যোত হচ্ছে । মোট কথা ঘরের লোক ঘসেটী বেগম ও রাজ অমাত্যগণ সিরাজের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণেই কতিপয় ইংরেজ নবাবকে সিংহাসন-চ্যুত করতে সক্রিয় হয়ে উঠে ।
বস্তুত এই উক্তির মধ্যদিয়ে সিরাজের প্রতি ঘসেটী বেগম ও রাজ অমাত্যদের ষড়যন্ত্রের স্বরুপটি উন্মোচিত হয়েছে। আবার এদের প্রতি সিরাজের ক্ষোভ এবং দুঃখ প্রকাশিত হয়েছে ।
উল্লেখ্য যে,একটি দেশ ও জাতির স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং জাতীয় ঐক্য যে একান্ত অপরিহার্য তা উন্মোচনের জন্যই নাট্যকার আলোচ্য উক্তির অবতারণা করেছেন । -
প্রশ্ন-১৪। 'দেশের কল্যাণ, দেশবাসীর কল্যাণ। শুধু এই একটি পথেই আবার আমরা উভয়ে উভয়ের কাছা-কাছি আসতে পারি।' উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর দ্বিতীয় অংকের প্রথম দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে । মীর জাফরকে উদ্দেশ্য করে নবাব সিরাজউদ্দৌলা আলোচ্য উক্তিটি করেছিলেন । মীর জাফরসহ কতিপয় বিশ্বাসঘাতক ও পথ ভ্রষ্ট রাজ অমাত্যদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করে তাদেরকে সৎপথে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যেই নবাব এই উক্তি করেছিলেন ।
নবাব আলিবর্দী খাঁ এর মৃত্যু হলে বাংলার সিংহাসনে আসীন হন তারই স্নেহভাজন দৌহিত্র সিরাজ-উ-দ্দৌলা । কিন্তু সিরাজের সিংহাসন লাভকে কেউ-ই স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন নি । সিরাজের আত্মীয়- স্বজনসহ রাজ অমাত্যগণ সিরাজের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । সিরাজ এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র সম্বদ্ধে অবগত ছিলেন । মীরজাফর, রায়দুর্লভ প্রমুখ সেনাপতিকে কয়েদ করে তিনি এই ষড়যন্ত্র নির্মূল করতে পারতেন । কিন্তু সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দেয়ার আশঙ্কায় তিনি তা করেন নি । তবে নবাব বিচক্ষণতার সাথে কৌশলে কার্য সিন্ধির পথে অগ্রসর হন । তিনি সকল অমাত্যদের নিয়ে এক মন্ত্রনাসভার আয়োজন করেন । সে সভায় তিনি এক লবণ ব্যবসায়ীর উপর ইংরেজ অত্যাচারের নমুনা প্রদর্শন করে ইংরেজদের সমস্ত অত্যাচার নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেন । এক্ষত্রে নবাবের লক্ষ ছিল, ষড়যন্ত্রকারী অমাত্যদের মধ্যে দেশপ্রম ও দেশাত্মবোধ জাগ্রত করে তাদের সৎপথে ফিরিয়ে আনা । কিন্তু চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী। রাজবল্লভ, জগৎশেঠ মীরজাফরসহ রাজ অমাত্যগণ নবাবের এই আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন । এবং মিরজাফর উচ্চারণ করেন নবাবের সন্দিগ্ধ মনোভাবের পরিবর্তন না হলে দেশের কল্যাণের কথা ভেবে আমরা উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠব। আর তখনই সিরাজ প্রতি উত্তরে বলেন, দেশের কল্যাণ দেশবাসির কল্যাণ । শুধু ঐ একটি পথেই আবার আমরা উভয় উভয়ের কাচা- কাছি আসতে পারি ।
বস্তুত নবাবের এই উক্তির মধ্যদিয়ে দেশের সমস্ত বিরুদ্ধ শক্তিকে এক করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের মনোভাব উন্মোচিত হয়েছে । তাছাড়াও নবাবের দেশপ্রেম ও স্বজাত্যপ্রীতিও প্রকাশিত হয়েছে ।
প্রশ্ন-১৫। ‘দেশ প্রেমিকের রক্ত যেন আবর্জনার স্তূপে চাপা না পড়ে'-উক্তিটির তাৎপর্য লেখ।
অথবা, ‘স্বার্থান্ধ প্রতারকের কাপুরুষতা বীরের সংকল্প টলাতে পারেনি'- উক্তিটির তাৎপর্য লেখ ।
অথবা, ‘দেশের স্বাধীনাতর জন্য, দেশবাসীর মর্যাদার জন্য, তারা জীবন দিয়ে গেছেন'- উক্তিটির তাৎপর্য লেখ ।
উত্তরঃ প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর চতুর্থ অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে।
আলোচ্য উক্তিটি করেছে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। দরবারে সমবেত জনতার উদ্দেশ্য তিনি এই উক্তি করেছিলেন। সমবেত জনতাকে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার উৎসাহ দেয়ার জন্য এবং পলাশীর প্রান্তরে আত্মত্যাগী দেশ- প্রেমিক সৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই তিনি এই উক্তি উচ্চারণ করেন।
প্রতারকদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকের বিশ্বাস ঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উ-দ্দৌলা সৈন্য বাহিনীর পরাজয় ঘটে। অতঃপর দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহনলালের পরামর্শে সিরাজ রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন দেশের স্বাধীনতা সুসংহত করার জন্য। সেই উদ্দেশ্যেই সিরাজ রাজদরবারে সাধারণ জনগণের সমাবেশ ঘটান । রাজকোষ উন্মুক্ত করে দেন আরেকটি সৈন্য বাহিনী গঠন করার জন্য । কিন্তু বার্তা বাহক এসে খবর দেয় যে, অনেকেই টাকা নিয়ে সৈন্য সংগ্রহের পরিবর্তে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। এ সংবাদে সমাবেত জনতা হতোদ্যম হলে তাদের অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য সিরাজ বলেন, ভীরু প্রতারকের দল চিকালই পলায় তাতে বীরের মনোবল ক্ষুণ্ণ হয় না । এর প্রমান পলাশীর প্রান্তরেই আছে । মীর মর্দান, মোহনলাল, বদ্রে আলী, প নৌবে সিং জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করে গেছেন । দেশের স্বাধীনতার জন্য দেশ বাসীর মর্যাদার জন্য তারা প্রাণ দিয়ে গেছেন । মীরজাফর, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভদের মতো তারা প্রতারণা করেনি । দেশের সাথে দেশবাসীর সাথে তারা বেঈমানী করেনি । কোন প্রকার লোভ- লালসা তাদের আকৃষ্ট করতে পারেনি সুতরাং যারা বীর, যারা দেশ প্রেমিক তাদের রক্ত যেন আবর্জনার স্তূপে চাপা না পড়ে । তাদের ত্যাগের মহিমা ও ইতিহাস যেন প্রতারকদের প্রতারণার আড়ালে ঢাকা না পড়ে । দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেই তাদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে । উল্লেখ্য, এখানে আবর্জনা বলতে লেখক প্রতারক ও বিশ্বাস ঘাতককে বুঝিয়েছেন।
বস্তুত এই উক্তির মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন প্রতারক বিশ্বাসঘাতদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশিত হয়েছে তেমনি অন্যদিকে দেশপ্রেমিক বীরদের প্রতি প্রকাশিত হয়েছে গভীর শ্রদ্ধা। তাছাড়া সিরাজের দেশপ্রেমিক স্বাধীনচেতা সত্তার উন্মোচনের জন্যই নাট্যকার এইরূপ সংলাপের অবতারণা করেছেন ।
প্রশ্ন-১৬। ভীরু প্রতারকের দল চিরকালই পালায়'- উক্তিটির তাৎপর্য লেখ ।
উত্তরঃ প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর চতুর্থ অঙ্কের প্রথম দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে।
আলোচ্য উক্তিটি করেছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। দরবারে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি এই উক্তি করেছিলেন । সমবেত জনতাকে দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় উৎসাহ দেয়ার জন্য এবং দেশের শত্রু ও প্রতারকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট উন্মোচনের জন্যই সিরাজ-উ- দ্দৌলা এই উক্তি করেছিলেন। প্রতারকদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকের বিশ্বাস ঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উ-দ্দৌলার সৈন্য বাহিনীর পরাজয় ঘটে । অতঃপর দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহনলালের পরামর্শে সিরাজ রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন দেশের স্বাধীনতা সুসংহত করার জন্য । সেই উদ্দেশ্যেই সিরাজ রাজদরবারে সাধারণ জনগণের সমাবেশ ঘটান । রাজকোষ উন্মুক্ত করে দেন আরেকটি সৈন্য বাহিনী গঠন করার জন্য । কিন্তু বার্তা বাহক এসে খবর দেয় যে, অনেকেই টাকা নিয়ে সৈন্য সংগ্রহের পরিবর্তে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। এ সংবাদ সমাবেত জনতা হতৌদ্যম হলে তাদের অনুপ্রেণা দেয়ার জন্য সিরাজ বলেন, ভীরু প্রতারকের দল চিরকালই পলায় তাতে বীরের মনোবল ক্ষুন্ন হয় না । এর প্রমাণ পলাশীর প্রান্তরেই আছে । মীর মর্দান, মোহনলাল বন্দ্রে আলী, নৌবে সিং জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করে গেছেন । দেশের স্বাধীনতার জন্য দেশ বাসীর মর্যাদা জন্য তারা প্রাণ - দিয়ে গেছেন । মীর জাফর রাজ বল্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভদের মতো তারা প্রতারণা করেনি । দেশের সাথে দেশবাসীর সাথে তারা বেঈমানী করেনি । কোন প্রকার লোভ-লালসা তাদের আকৃষ্ট করতে পারেনি । স্বার্থপরদের স্বার্থদ্ধতা, কাপুরুষদের কাপুরুষতা তাদেরকে স্বীয় সংকল্প থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি ।
বস্তুত এই উক্তির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন প্রতারক বিশ্বাসঘাতকদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশিত হয়েছে তেমনি অন্যদিকে দেশপ্রেমিক বীরদের প্রতি প্রকাশিত হয়েছে গভীর শ্রদ্ধা ।
প্রশ্ন-১৭। ‘সবাই মিলে সত্যিই আমরা বাংলাকে বিক্রি করে দিচ্ছি না ত?'- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর দ্বিতীয় অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে ।
আলোচ্য উক্তিটি বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর আলী খান এর । ইংরেজ কোম্পানীর প্রতিনিধি ক্লাইভ কর্তৃক প্রণীত দলিলে সই করার পূর্বে মীর জাফর দ্বিধান্বিত এবং মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে আলোচ্য উক্তি করেন।
নবাব আলীবর্দী খাঁ এর মৃত্যু হলে বাংলার সিংহাসনে আসীন হন তারই স্নেহভাজন দৌহিত্র সিরাজ-উ-দ্দৌলা । কিন্তু সিরাজের এ সিংহাসন লাভকে কেউই স্বাভাবিকভাবে মনে নিতে পারেন নি । তাঁর আত্মীয় স্বজনসহ রাজ অমাত্যগণ তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । ঘসেটি বেগম, মীর জাফর জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ সকলেই স্বীয় স্বার্থ ও স্বপ্ন চরিতার্থ করার প্রয়াসে নবাবকে ক্ষমতা চ্যুত করতে চান । এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের জন্য ষড়যন্ত্রকারীর কুচক্রী ও ক্ষমতালোভী ইংরেজ কোম্পানীর সাথে এক চুক্তিতে উপনীত হন । এই চুক্তি পত্র সকলের স্বাক্ষর ও অনুমোদনের জন্য কোম্পানী প্রতিনিধি ক্লাইভ মীরনের আবাসে আসেন । নবাবের পতনের পর কে কি পাবেন তা এই চুক্তিপত্রে উল্লেখ্য রয়েছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী নবাব সিরাজের পতনের পর বাংলার নবাব হবেন মীরজাফর আর রাজ্য চালাবেন ইংরেজ কোম্পানী। রাজবল্লভ ও জগৎশেঠ চুক্তির এই শর্ত মানতে চান না । অতঃপর মীর জাফরের মধ্যস্থতায় সকলেই চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করেন । কিন্তু যখন মীর জাফর নিজে চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করতে যাবেন তখন তার মধ্যে আসে দ্বিধা এবং মানসিকতা দুর্বলতা । কুশের অঙ্কুরসম তাঁর মধ্যে যে বিবেকবোধ ছিল তা জাগ্রত হয় । আর এই জাগ্রত বিবেকবোধ থেকেই মীর জাফর উচ্চার করেন- সবাই মিলে সত্যিই আমরা বাংলাকে বিক্রি করে দিচ্ছি না তো ?
বস্তুত এই উক্তির মধ্যদিয়ে নাট্যকার মীর জাফর চরিত্রের মানবীয় দিকটিকেই উন্মোচন করতে চেয়েছেন ।
প্রশ্ন-১৮ । ‘গুপ্তচরের কাজ করেছি দেশের স্বাধীনতার খাতিরে। সে কি বেঈমানীর চেয়ে খারাপ? মোনাফেকীর চেয়ে খারাপ?'- কে, কেন এ কথা বলেছে?
উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে।
ক্লাইভ, মীর জাফর, রায়দুর্লভ, রাজবল্লভকে উদ্দেশ্য করে রাইসুল জুহালার ছদ্মবেশধারী নারাণ সিং এ উক্তি করেন।
এ উক্তির মাধ্যমে একদিকে স্বদেশে, স্বজাতির প্রতি রাইসুল জুহালার তথা নারান সিং এর মমত্ববোধ প্রকাশিত হয়েছে আবার অন্যদিকে ক্লাভ, মীর জাফর, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ ও জগৎশেঠের প্রতি প্রচন্ড ঘৃণার মনোভাব উন্মোচিত হয়েছে ।
নারাণ সিং এর ছদ্মনাম রাইসুল জুহালা। তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান গুপ্তচর । গুপ্তচরবৃত্তি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ন কাজ। তাতে জীবন পর্যন্ত বিপন্ন হতে পারে । কিন্তু নারস সিং তাতে দমে যান নি । বরং স্বদেশ ও স্বজাতির স্বাধীনতার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ও গুপ্তচরের দায়িত্ব পালন করেছেন । অন্যদিকে মীর জাফর, রাজবল্লভ রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ প্রমুখ নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেছে । নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তারা স্বদেশের স্বাধীনতাকে ইংরেজ বেনীয়াদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে । তারা দেশের সাথে বেঈমানী করেছে, মোনাফেকী করেছে । কিন্তু নারাণ সিং ছিলেন এর বিপরীত তিনি দেশের স্বার্থের জন্য জীবন দিয়েছেন । ক্লাইভ ও মীরজাফরের কাছে নারান সিং এর পরিচয় যখন প্রকাশ হয়ে যায় তখন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয় । মৃত্যুর পূর্বে ক্লাইভ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল - গুপ্তচরের মৃত্যু এভাবেই হয় । এর উত্তর নারাণ সিং বলেছিল- এভাবে মৃত্যু হলেও তার কোন কষ্ট নেই কারন দেশের স্বার্থেই সে প্রাণ দিচ্ছে। দেশের স্বার্থেই সে গুপ্তচরের কাজ করেছে- দেশের সাথে সে বেঈমানী বা মোনাফেকী করেনি ।
প্রশ্ন-১৯ । ‘মাঝে মাঝে ভেবেছি এই বাধা যদি দূর হয়ে যেত। নিশ্চিন্ত সাধারণ গৃহস্থের ছোট্ট সাজানো সংসার আমরা পেতাম।'-উক্তিটির তাৎপর্য লেখ ।
উত্তর প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অংকের প্রথম দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে ।
একান্ত ঘেরোয়া পরিবেশে নবাব পত্নী লুৎফাকে উদ্দেশ্য করে সিরাজ-উ-দ্দৌলা এ উক্তি করেন ।
এ উক্তির মাধ্যমে অবিশ্বাস ষড়যন্ত্র আর সন্দেহ ভরা রাজ্য শাসনের প্রতি সিরাজের অনীহা যেমন প্রকাশিত হয়েছে তেমনি উন্মোচিত হয়েছে তার একান্ত মানবীয় অনুভব ।
নবাব আলীবর্দী খাঁ এর মৃত্যু হলে বাংলার সিংহাসনে আসীন হন তাঁরই স্নেহভাজন দৌহিত্র সিরাজ-উ-দ্দৌলা । কিন্তু সিরাজের সিংহাসন লাভকে কেউই স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেনি । সিরাজের আত্মীয় স্বজন সহ রাজ - আমাত্যগণ সিরাজের বিরুদ্ধের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় । ঘসেটি বেগম, মীর জাফর, জাগৎশেঠ, রায়দুলর্ভ রাজবল্লভ স্বীয় স্বার্থ ও স্বপ্নকে চরিতার্থ করার মানসে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুৎ করতে চায় । তাদের ক্ষুদ্র ও হীন স্বার্থ চিন্তা নবাবের অস্তিত্বকে সংখটময় করে তোলে এবং তাঁর জীবনকে সৃপতিত করে যন্ত্রনা আর অনিশ্চয়তার গভীর আবর্তে । ফলে রাজ্য শাসন ও সিংহাসন সিরাজের সুখময় দাম্পত্য জীবনের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল রুপে প্রতিষ্ঠিত হয় । তাই নবাব তার প্রিয়তমা পত্নী লুৎফ্ফার প্রতি ও কোনো মনোযোগ দিতে পারেনি । এমনকি লুৎফাকে নবাব সাধারণ সৌজন্য পর্যন্ত দেখাতে পারেনি এবং পারেনি পরিপূর্ণ স্ত্রীর মর্যাদা দিতে । অথচ সিরাজ চেয়ে ছিলেন নির্বিঘ্ন রাজ্য শাসন, প্রজাদের সুখ- শান্তি ও সমৃদ্ধি, স্বদেশ ও স্বজাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, এবং সর্বোপরি স্ত্রী - কন্যাসহ স্বাচ্ছন্দ্যময় সংসার জীবন। কিন্তু কতিপয় ক্ষমতালোভী ও স্বার্থপর রাজ আমাত্য এবং ষড়যন্ত্রকারী ইংরেজদের কারণে সিরাজের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবরূপ পায়নি । বরং তার জীবনকে করে তোলে বিষাদময় । তাই নবাব ভেবেছেন এই রাজ্য শাসনের বাধা যদি দুর হয়ে যেত তাহলে তিনি সুখময় সংসার জীবন পেতেন । ছোট গৃহস্থের সংসার জীবনের মতো সেখানে আছে শান্তির নিশ্চয়তা ।
প্রশ্ন-২০। ‘আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে কেবল যেন দেয়ালের ভিড়।'-উক্তিটির তাৎপর্য লেখ ৷
উত্তরঃ প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অংকে- প্রথম দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে ।
নবাব পত্মি লুৎফাকে উদ্দেশ্য করে নবাব সিরাজ- উ দ্দৌলা বিরুদ্ধে ঘসেটি বেগম, মীরজাফর আলী খান, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, ইয়ারলুক প্রমুখ রাজআমাত্যের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাছাড়া এখানে নবাবের অস্তিত্বের সংকট এবং বাংলার স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ।
নবাব আলীবর্দী খাঁ এর মৃত্যু হলে বাংলার সিংহাসনে আসীন হন তাঁরই স্নেহভাজন দৌহিত্র সিরাজ-উ-দ্দৌলা। কিন্তু সিরাজের এ সিংহাসন লাভকে কেউই স্বাভাবিক ভাবে যেনে নিতে পারেননি। তার আত্মীয় স্বজনসহ রাজ আমাত্যগণ তাঁর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । ঘসেটি বেগম, মীর জাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুলর্ভ সকলই স্বীয় স্বার্থ ও স্বপ্ন চরিতার্থ করার প্রয়াসে নবাবকে ক্ষমতা চ্যুত করতে চান । তাহাদের ক্ষুদ্র অথচ হীন স্বার্থ চিন্তা নবাবের সংকটান্ন করে তোলে। দেশের স্বাধীনতা ও বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়। বস্তুতঃ রাজ-আমাত্যদের অনাস্থা আর ষড়যন্ত্রই অদৃশ্যদেয়াল রুপে নবাবকে আড়াল করে দেয় তার সমস্ত অস্তিত্ব থেকে । অদৃশ্য অথচ অনতিক্রমযোগ্য দেয়াল নির্মিত হয় নবাব ও ঘসেটি বেগমের মধ্যে " নবাব ও মীর জাফরের মধ্যে, নবাব ও রাজ আমাত্যদের মধ্যে এবং নবাব ও তাঁর শাসন ব্যবস্থাপর মধ্যে। নবাব একের পর এক অদৃশ্য দেয়াল ভেঙ্গে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলেও প্রতিনয়তই নতুনতর অনাস্থ আর ষড়যন্ত্রের দেয়াল তাকে অক্টোপাসের মতো ঘিরে ধরেছে। ফলে বিপন্ন হয়েছে নবাবের জীবন, বিপন্ন হয়েছে বাংলার স্বাধীনতা ।
প্রশ্ন-২১। ‘এ প্রাণ দান আমরা ব্যর্থ হতে দেবো না।'-উক্তিটির তাৎপর্য লেখ।
উত্তরঃ- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক “সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অংকের চতুর্থ দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে।
দেশবাসীদের উদ্দেশ্য করে সিরাজ-উ-দ্দৌলা এ উক্তি করেন ।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা বোধ প্রকাশ পেয়েছে এ বাক্যে। তাছাড়া এ বাক্যের উচ্চারণের দেশবাসীর মধ্যে দেশাত্ববোধ জাগরনের চেষ্টা করা হয়েছে।
ইংরেজগণ একমাস যেতে না যেতেই আলীনগরের সন্ধি অস্বীকার করে। এবং পলাশিতে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে । শুধু তাই নয়। তারা রাজধানী মুর্শিদাবাদও আক্রমনের পরিকল্পনা করে । নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা এ সংবাদ শুনতে পেরে পলাশিতেই ইংরেজ বাহিনীকে বাধা দানের জন্য যুদ্ধের আয়োজন করেন । তিনি প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের নেতৃত্বে এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে পলাশির যুদ্ধে অবতীর্ণ হন । কিন্তু পলাশিতে যুদ্ধ হয়নি, হয়েছে যুদ্ধের নামে প্রহসন । বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর, রায়দুর্লভ এর নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশ যদ্ধ থেকে বিরত থাকে । কিন্তু মোহনলাল মীর মদান, বদ্রেআলী, নৌবেসিং এর নেতৃত্বাধীন বাহিনী স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ পণে যুদ্ধ করেন। অবশেষে তারা স্বদেশ ও স্বজাতির স্বাধীনতার জন্য বীরের ন্যায় প্রাণদান করেন। অতঃপর পলাশীতে নবাব বাহিনীর পরাজয় যখন নিশ্চিত প্রায় তখন নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন এবং সাধারণ দেশবাসীর সমন্বয়ে একটি নতুন বাহিনী গঠনের প্রয়াস চালান । সাধারণ দেশবাসীর প্রেরণা ও উৎসাহ দানের উদ্দেশ্যে নবাব বলেন-- যারা স্বদেশে ও স্বজাতির স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন তাদের প্রাণদান বৃথা যেতে দেয়া যায়না। স্বদেশে ও স্বজাতির স্বাধীনতা রক্ষা এ মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। i
প্রশ্ন-২২। ‘মৃত্যু যখন আমার স্বামীকে কুকুরের মতো তাড়া করে ফিরছে তখন আমার কিসের কষ্ট?-কে, কেন একথা বলেছে?
অথবা, বাংলার নবাব যখন পরের সাহায্যেও আশ্রয় লালায়িত তখন আমার কিসের অহঙ্কার।'-কে, কেন একথা বলেছে? অথবা, ‘আমি যাবো, আমি সঙ্গে যাবো।' অথবা, ‘পারবো! আমাকে পারতেই হবে।’--কে, কেন একথা বলেছে?
উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অঙ্কের চতুর্থ দৃশ্য থেকে নেয়া হয়েছে ।
পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে নবাব সিরাজের জীবন হয়ে পড়ে বিপন্ন, বিপর্যন্ত । এই বিপন্ন ও বিপর্যন্ত জীবন থেকে নবাব পালাতে প্রস্তুত হন৷ পলাতক জীবনের কষ্টের কথা ভেবে নবাব স্বীয় পত্নী লুৎফাকে সঙ্গে নিতে না চাইলে লুৎফা নবাবকে উদ্দেশ্য করে আলোচ্য উক্তি করেন ।
প্রতারকদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকদের বিশ্বাস ঘাতকতায় পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উ-দ্দৌলার সৈন্য বাহিনীর পরাজয় ঘটে। অতঃপর দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহনলালের পরামর্শে সিরাজ রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন দেশের স্বাধীনতা সুসংহত করার জন্য। সেই উদ্দেশ্যেই সিরাজ রাজদরবারে সাধারণ জনগণের সমাবেশ ঘটান । রাজকোষ উন্মুক্ত করে দেন আরেকটি সৈন্য বাহিনী গঠন করার জন্য। (কিন্তু বার্তা বাহক এসে খবর দেয় যে, অনেকেই টাকা নিয়ে সৈন্য সংগ্রহের পরিবর্তে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে এবং পলাশীতে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য মোহনলালের শেষ চেষ্টা ও ব্যর্থ হয়েছে এ সংবাদে সমাবেত জনতা হতোদ্যম হয়ে পড়ে এবং তারা দরবার ছেড়ে চলে যায় । ফলে অবসন্ন ও হতাশ হয়ে নবাব একাকী অন্ধকার দরবারে বসে থাকেন এ সময়ে নবাব পত্নী লুৎফ্ফার দরবারে প্রবেশ করেন । লুৎফার আগমনে নবাব চমকে উঠেন । লুৎফর নবাবকে উদ্দেশ্য করে বলেন ঐ অন্ধকারে ফাঁকা দরবারে বসে থেকে কোন লাভ নেই । বরং অন্যত্র যেয়ে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টা করা উচিত। লুৎফর এ পরামর্শে নবাব পাটনা যাওয়ার জন্য প্রস্তত হন । লুৎফাকে তিনি দরবারে অবস্থান করতে বলেন । কারণ, মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে চোরের মতো তাকে পথ চলতে হবে । এত যে কষ্ট হবে তা হয়ত লুৎফা সইতে পারবেনা। এর উত্তরে লুৎফা বলেন, পারো আমাকে পারতেই হবে । বাংলার নবাব যখন পরের সাহায্যের আশ্রয়ে লালায়িত তখন আমার কিসের অহঙ্কার ? মৃত্যু যখন আমার স্বামীকে কুকুরের মতো তাড়া করে ফিরছে তখন আমার কিসের কষ্ট? আমি যাব আমি সঙ্গে যাব ।
বস্তুত এই উক্তির মধ্যদিয়ে লুৎফার একনিষ্ঠ স্বামীপ্রেম এবং নিস্বার্থ মানসিকতারই উন্মোচন ঘটেছে ।
প্রশ্ন-২৩। ‘তোমাদের প্রাণ বিপন্ন হবে অথচ দেশের স্বাধীনতা রক্ষিত হবে না, এই চিন্তাটাই আজ বেশি করে পীড়া দিচ্ছে।'-বক্তার এরূপ মনোভাবের কারণ কী? উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যের অন্তর্গত ।
আলোচ্য উক্তিটি নবাব সিরাজউদ্দৌলা'র। তিনি এই উক্তি করেছিলেন তার দুই প্রিয় ও বিশ্বস্ত সেনাপতি মীর মর্দান ও মোহনলালকে উদ্দেশ্য করে । মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে তিনি এই উক্তি করেছিলেন।
ইংরেজদের ঔদ্ধত্য যখন সীমালঙ্ঘন করে তখন নবাব তাদের সমূচিত শান্তি দানের জন্য প্রক্তন হন। সে উদ্দেশ্যেই পলাশীতে যুদ্ধের আয়োজন। যুদ্ধের পূর্ব রাত্রে মীর মর্দান ও মোহনলাল যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নবাবকে বিশ্লেষণ করে দেখান। তারা নবাবকে আশ্বস্ত করেন যে, যুদ্ধে তাদের জয় নিশ্চিত। কিন্তু, দূরদর্শী নবাব জানতেন সে মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ সেনাপতি গণ ইংরেজদের সাথে গোপনে হাত মিলিয়েছে। তারা আগামী কালের যুদ্ধে নবাবের পক্ষে তো নয়- ই বরং নবাবের বিপক্ষে অবস্থান নিবে। তাই নবাব পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন । আর তখনই মীর মর্দান নবাবকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন যে, তাদের প্রাণ থাকতে নবাবের কোন ক্ষতি হবে না। মীর মর্দানের এই উক্তির জবাবেই নবাব আলাচ্য উক্তিটি করে ছিলেন ।
বস্তুত: এই উক্তির মিথ্যা দিয়ে একদিকে যেমন নবাবের গভীর দেশাত্মবোধ উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে দেশপ্রেমিক সেনাপতিদের প্রতি প্রকাশিত হয়েছে গভীর মমত্মবোধ ও ভালবাসা।
প্রশ্ন-২৪। ‘বাংলার বুকে দাড়িয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার স্পর্ধা ইংরেজ পেলো কোথা থেকে, আমি তার কৈফিয়ৎ চাই।' কে, কেন একথা বলেছে?
উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর প্রথম,অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের অন্তর্গত ।
ইংরেজ ডাক্তার হলওয়েলকে উদ্দেশ্য করে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা আলোচ্য উক্তিটি করেন।
ইংরেজগণ নবাবের দেয়া শর্ত ভঙ্গ করে এদেশে বাণিজ্য অব্যাহত রাখে। শুধু তাই নয়, তারা এদেশের নিরীহ জনগণের উপরও নির্যাতন ও জুলুম চালাতে থাকে । নবাব এসমস্ত বিষয়ের প্রতি বিধান করার জন্য কলকাতার দুর্গ আক্রমণ করেন এবং ইংরেজদের পরাস্ত করেন। অতঃপর ইংরেজ 7 পক্ষের সেনাপতি হাতুড়ে ডাক্তার হলওয়েলের নিকট কৈফিয়ৎ চান কেন তারা এদেশের জনগণের উপর অত্যাচার জুলুম চালাচ্ছে, কেন তারা কাশিম বাজারে গোলাগুলি আমদানি করেছে। মোট কথা ইংরেজদের সকল প্রকার অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন আর জুলুমকে স্মরণ রেখেই নবাব উচ্চারণ করেন বাংলার বুকে দাড়িয়ে বাঙ্গালির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার স্পর্ধা ইংরেজ পেলো কোথা থেকে আমি তার কৈফিয়ৎ চাই ।
বস্তুত এই উক্তির মধ্যদিয়ে একদিকে যেমন নবাবের দেশপ্রেম ও, স্বাজাত্য প্রীতি, ও প্রজাবৎসল প্রকাশ পেয়েছে তেমনি অন্যদিকে নবাবের বীরত্ব ও উন্মোচিত হয়েছে ।
বস্তুত এই উক্তির মধ্যদিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের লোভী মনোভাবের-ই-উন্মোচন ঘটেছে।
প্রশ্ন-২৬। সময় থাকতে একযোগে মাথা তুলে দাঁড়ান। আপনারা অবশ্যই জয়লাভ করবেন।'- কে, কোন প্রসঙ্গে কেন এ কথা বলেছে?
উত্তর:- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক 'সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অঙ্কের চতুর্থ দৃশ্যের অন্তর্গত আলোচ্য উক্তিটি করেছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। দরবারে সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই উক্তি করেছেন। সমবেত জনতাকে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য তিনি এই উক্তি করেছিলেন ।
প্রতারকদের প্রতারণা আর বিশ্বাসঘাতকদের বিশ্বাসঘাতকতার পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ- দ্দৌলার সেনাবাহিনীর পরাজয় ঘটে । অতঃপর দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহনলালের পরামর্শে সিরাজ রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন দেশের স্বাধীনতা সুসংহত করার জন্য। সেই উদ্দেশ্যেই রাজদরবারে সাধারণ জনগণের সমাবেশ ঘটান । তিনি সমবেত জনতাকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এগিয়ে আসার আহব্বান জানান। তিনি তাদের কাছে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার যৌক্তিকতা ও বিশ্লেষণ করেন । তিনি বলেন যে, আজ সমস্ত অপশক্তি নবাবের বিরুদ্ধে এক হয়েছে । মুসলমান মীর জাফর, ব্রাহ্মণ রাজবল্লভ, কায়ন্ত রায়দুর্লভ, জৈন মহাতারব চাঁদ শেঠ, শিখ উমিচাঁদ, ফিরিঙ্গি খৃষ্টান ওয়াটসন, ক্লাইভ এক জোট হয়ে মসনদের অধিকার পেতে চায়। শাসন ক্ষমতা স্থায়ী করতে চায়। এর মধ্য দিয়ে তারা দেশ ও জনগণের উপর লুঠতরাজের একচেটিয়া অধিকার কায়েম করতে চায়। জনগণের জীবনে ক্লাইভ ও মীরজাফরের অত্যাচারে ফলে নেমে আসবে এক অনন্ত আধার । তাই নবাব দেশের জনগণকে ঐক্যবন্ধ হয়ে তা প্রতিহত করার জন্য আহবান জানান । সময় থাকতে সকলকে একযোগ হয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে বলেন। সমস্ত জনগণ যদি ঐক্যবন্ধ হয় তবে অপশক্তির বিরুদ্ধে অবশ্যই তারা জয়লাভ করবে ।
বস্তুত, এই উক্তির মধ্যদিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার জাতীয় ঐক্যচেতনা এবং দেশাত্মবোধ উন্মোচিত হয়েছে ।
প্রশ্ন-২৫। ‘আমার শেষ যুদ্ধ পলাশীতেই- কে, কাকে, কেন এ কথা বলেছে?
উত্তর:- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা' (১৯৬৫)-এর তৃতীয় অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যের অন্তর্গত।
এই আত্মা-প্রত্যয়ী উক্তিটি করেছিলেন নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা বিশ্বস্ত ও প্রিয় সেনাপতি মোহনলাল। পলাশীর যুদ্ধের প্রান্তরে নবাবকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই উক্তি করে ছিলেন।
পলাশীর প্রান্তরে নবাব পক্ষের সেনাপতিদের একে একে পতন ঘটলে নবাব নিজেই যখন যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন তখন মোহনলাল নবাবকে মুর্শিদাবাদে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই উক্তি করেছিলেন ।
ঘসেটি বেগম,রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদের ষড়যন্ত্রে এবং মীরজাফর, রায়দুর্লভ এর বিশ্বাসঘাতকতার পলাশীর প্রান্তরে নবাব বাহিনীর পরাজয় আসন্ন হয়ে উঠে। একে একে পতন ঘটে নবাবের বিশ্বস্ত ও চৌকুষ সেনাপতি মীর মর্দান, বদ্রে আলী, নৌবে সিং প্রমুখের। এ সংবাদ নবাব শিবিরে পৌঁছলে নবাব বিচলিত হয়ে উঠেন । অতঃপর তিনি নিজেই যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। আর তখনই নবাবের সম্মুখে উপস্থিত হন নবাবের বিশ্বস্ত ও প্রিয় সেনাপতি এবং পরামর্শ দাতা মোহনলাল। মোহনলাল নবাবকে সম্মুখে উপস্থিত হন নবাবের বিশ্বস্ত ও প্রিয় সেনাপতি এবং পরামর্শ দাতা মোহনলাল। মোহনলাল নবাবকে জানান, পলাশীতে যুদ্ধ শেষ হয়েছে; এখন আর আত্মাভিমানের সময় নেই। তাছাড়া এখানে যুদ্ধ জয়েরও কোন সম্ভাবনা নেই । তাই তিনি নবাবকে মুর্শিদাবাদে ফিরে যেতে পরামর্শ দেন । সিরাজ তখন তাকে বলেন তিনি কি একাই ফিরে যাবেন । তখন মোহনলাল বলেছিলেন আমার শেষ যুদ্ধ পলাশীতেই ।
বস্তুত এ উক্তির মধ্য দিয়ে মোহনলালের একনিষ্ঠ দেশপ্রেম ও স্বজাত্য প্রীতি উন্মোচিত হয়েছে।
+88 01713 211 910