
এইচএসসি বাংলা ১ম পত্র, অনুধাবনমূলক প্রশ্ন:অনুধাবনমূলক প্রশ্ন: লালসালু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন: লালসালু
সহজে এবং কম সময়ের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য এবং ১০০% কমনের নিশ্চয়তায় সংগ্রহ করুন মুসা স্যারের বাংলা ১ম ও দ্বিতীয় পত্র সাজেশন ও সমাধান গ্রন্থসমূহ
;
বি. দ্র. প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্ন লেখায় সহায়তা হবে এই জন্য অনুধাবনমূলক প্রশ্নগুলো একটু বড় করে লেখা হয়েছে। পরীক্ষায় এত বড় করে লেখার প্রয়োজন নেই
প্রশ্ন-১. ‘লালসালু’ উপন্যাসের মজিদের জন্মভূমির অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার পরিচয় দাও।
অথবা, শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের আগাছা বেশী।- ব্যাখ্যা কর। অথবা, এরা তাই দেশ ত্যাগ করে। - কারা কেন দেশ ত্যাগ করে?
অথবা, তাই তারা ছোটে ছোটে।’ - কারা কেন ছোটে? অথবা, ‘দেশটা কেমন মরার দেশ।’-কার দেশ, এর অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা দাও।
উত্তর: ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু স্বদেশ ও স্বজাতি সংলগ্ন বাস্তবাদী ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১। রচিত 'লালসালু' উপন্যাস থেকে গৃহীত হয়েছে । ...
ধর্ম ব্যবসায়ী প্রতারক মজিদের জন্ম-ভূমির অর্থনৈতিক দীনতা এবং সামাজিক পশ্চাৎপদতার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে লেখক আলোচ্য মন্তব্য করেন। মজিদের জন্মভূমি বাংলাদেশের একটি দারিদ্র্য- পীড়িত অঞ্চল। এটি একটি জনসংখ্যা বহুল এলাকা। জনসংখ্যার তুলনায় জমির পরিমাণ এখানে অনেক কম । তার উপর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রায়ই ফসল হানি ঘটে। ফলে উৎপাদিত শস্য মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারে না । তাই দেশটাকে কেমন মরার দেশ মনে হয়। আর এর জনগণকে অনাহারে অর্ধাহারে জীবন যাপন করতে হয়। এর জন্য তারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে না । অজ্ঞানতা আর কুসংস্কারে তাদের জীবন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে । অতি সামান্য ধর্মীয় শিক্ষাই তাদের একমাত্র সম্বল । প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞান তাদের মধ্যে বিস্তার লাভ করে না । ধর্মের নামে ধর্মীয় ব্যবসাই তাদের জীবিকার উপায় হয় । এ শ্রেণীর লোককেই লেখক ধর্মীয় আগাছা বলেছেন । আর তারাই দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে চলে স্বচ্ছল জীবনের আশায়।
বস্তুত, লেখক আলোচ্য অংশে মজিদ চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিত চিত্রিত করেছেন এবং মজিদের ধর্ম ব্যবসায়ী প্রতারক ও মিথ্যাবাদী হওয়ার আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা নির্মাণ করেছেন। ফলে বাক্যের প্রয়োগটি হয়েছে সুন্দর ও শৈল্পিক।
প্রশ্ন-২. ‘বয়স হলে এরা আর কিছু না হোক শক্ত করে গিট্টা দিতে শেখে।'-উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত বাক্যটি স্বদেশ ও স্বজাতি সংলগ্ন বাস্তববাদী ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। ১৯২২-১৯৭১; রচিত 'লালসালু' উপন্যাস থেকে গৃহীত হয়েছে ।
উদ্ধৃত অংশের মাধ্যমে লেখক মজিদের জন্মভূমি অঞ্চলের মানুষের জীবনাচরণ, জীবনবিশ্বাস ও জীবিকার প্রসঙ্গটিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন । সেই সাথে এদের অর্থনৈতিক জীবনের পরিচয়ও উন্মোচন করেছেন।
মজিদের জন্মভূমি বাংলাদেশের একটি দারিদ্র্য-পীড়িত অঞ্চল। এটি একটি জনসংখ্যা বহুল এলাকা। জনসংখ্যার তুলনার জমির পরিমাণ এখানে অনেক কম। তার উপর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রায়ই ফসল হানি ঘটে। ফলে উৎপাদিত শস্য মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারে না । তাই দেশটাকে কেমন মরার দেশ মনে হয়। আর এর জনগণকে অনাহারে অর্ধাহারে জীবন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। অতি সামান্য ধর্মীয় শিক্ষাই তাদের একমাত্র সম্বল। প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞান তাদের মধ্যে বিস্তার লাভ করে না । ধর্মের নামে ধর্মীয় ব্যবসাই তাদের জীবিকার উপায় হয়। এ শ্রেণীর লোককেই লেখক ধর্মীয় আগাছা বলেছেন । আর তারাই দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে চলে স্বচ্ছল জীবনের আশায়। জীবিকার অন্বেষণে তারা অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা করে রেলগাড়ীর মাধ্যমে । রেলগাড়ীতে উঠার সময় প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে ঠেলাঠেলি করে উঠে । প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে অনেক সময় গলার তাবিজটা ছাড়া শরীরে কোনো বস্ত্র থাকে না। বয়েসে এরা অধিকাংশই তরুণ। বড় হলে তারা জীবনে আর কিছু না শিখলেও ভালভাবে গিট দিতে শিখে। লেখক তাই উচ্চারণ করেছেন--
‘বয়স হলে এরা আর কিছু না হোক শক্ত করে গিট্টা দিতে শেখে ।
বস্তুত লেখক আলোচ্য অংশে মজিদ চরিত্রের পরিপ্রেক্ষিত চিত্রিত করেছেন। এবং মজিদের ধর্মব্যবসায়ী, প্রতারক ও মিথ্যাবাদী হওয়ার আর্থ- সামাজিক বাস্তবতা নির্মাণ করেছেন। ফলে বাক্যের প্রয়োগটি হয়েছে সুন্দর ও শৈল্পিক।
প্রশ্ন-৩. 'মানুষের রসনা বড় ভয়ানক বস্তু সে রসনা বিষাক্ত সাপের রসনার চেয়েও ভয়ঙ্কর হতে পারে।'- এ কথা কেন বলা হয়েছে?
উত্তরঃ ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু স্বদেশ ও স্বজাতি সংলগ্ন বাস্তবাদী ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ | ১৯২২-১৯৭১) রচিত ' লালসালু’ উপন্যাস থেকে গৃহীত হয়েছে ।
এ উক্তি ‘লালসালু” উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মজিদের। এক সালিশী সভায় সমবেত জনতা এবং তাহের- কাদেরে পিতার উদ্দেশ্যে এ উক্তি করে। রসনা শব্দের সাধারণ অর্থ হলো জিহবা। কিন্তু এখানে রসনা বলতে মানুষের কথাকেই বুঝানো হয়েছে। তবে বিশেষ অর্থে মানুষের কুৎসা রটনার প্রবণতাকে বুঝানো হয়েছে। এবং একে সাপের বিষের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
তাহের ও কাদেরদের সংসার দারিদ্র্যে-পীড়িত। সংসারে ঝগড়া ফ্যাসাদ লেগেই থাকে । একদিন ঝগড়া করার সময় তাহেরের মা রাগের বশে তার সন্তানদের জন্মের শুদ্ধতা সম্বদ্ধে প্রশ্ন তোলে । লজ্জাজনক ও গরহিতকর এ প্রসঙ্গটি হাসুনির মার মাধ্যমে মজিদের কানে আসে। মজিদ এ প্রসঙ্গটি তাহেরের বাপকে জিজ্ঞাস করলে, সে বাড়ি গিয়ে হাসুনির মাকে শারীরিক ভাবে নির্যাতন করে ফলে হাসুনির মা মজিদের নিকট বিচার প্রার্থী হয় । বিচার বসে, বিচার সভায় অত্যন্ত সুকৌশলে মজিদ উল্লিখিত উক্তি করে । সে জানায় মানুষের রসনা সাপের বিষের চেয়েও ভয়ানক তা মানুষের পরিবারে এমনকি সারা পৃথিবীতেও আগুন ধরিয়ে দিতে পারে । তাই মজিদ উচ্চারণ করে-
‘মানুষের রসনা বড় ভয়ানক বস্তু, সে রসনা বিষাক্ত সাপের রসনার চেয়েও ভয়ঙ্কর হতে পারে ।’
তাছাড়া, প্রসঙ্গক্রমে মজিদ হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর স্ত্রী বিবি আয়েশার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও উত্থাপিত করে । বিবি আয়েশা হারিয়ে গেলে তার সম্বন্ধে মানুষ যে কুৎসা রটনা করে এবং নবীর মনে যে কষ্ট হয় তাও মজিদ উল্লেখ করে ।
বস্তুত তাহেরের বাপের বিদ্রোহী মনোভাবকে দমন ও তাকে শাস্তি দেয়ার লক্ষ্যেই মজিদ উল্লিখিত তাত্ত্বিক বাক্যের অবতারণা করে এবং বিবি আয়েশার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে ।
প্রশ্ন-৪. 'নাফরমানি করিও না । খোদার উপর তোয়াক্কাল রাখো।'- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: নির্বাচিত অংশটুকু স্বদেশ ও স্বজাতি সংলগ্ন বাস্তবাদী ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। ১৯২২-১৯৭১। রচিত ‘লালসাসু' উপন্যাস থেকে গৃহীত হয়েছে। এটি মজিদের উক্তি। গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে সে এই উক্তি করে।
ঝড় শিলাবৃষ্টিতে ধ্বংস-যজ্ঞের পরেও মজিদের উপর এবং তার মাজারের উপর যেন বিশ্বাস থাকে, সে জন্য মজিদ এ উক্তি করে । লেখক এখানে মাজার ব্যবসায়ী ভণ্ড প্রতারকদের উপর গ্রামীণ মানুষের উত্তর উত্তর বিশ্বাস স্থাপনের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন ।
জমিলার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও বিদ্রোহী মনোভাবের জন্য মজিদ তাকে শাস্তি দিতে চায়। তাই মজিদ জমিলাকে একরাত্রে মাজার ঘরে বেঁধে রাখে। সেই রাতে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয় । ঝড় থামতে না থামতেই শুরু হয় শিলাবৃষ্টি। ঝড় আর শিলা বৃষ্টিতে ধানের জমিসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সমস্ত শস্যভূমি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ঝড় থামলে এবং ভোর হলে মজিদ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শস্য জমির উপর দিয়ে হাটতে থাকে। ইতোমধ্যে গ্রামের লোকজনও মাঠে এসে জমা হয় । বিধ্বস্ত ফসলের জমি দেখে তাদের, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। অনিশ্চয়তা আর হতাশার অন্ধকারে তারা নিমজ্জিত হয় । মাজার অধিপতি মজিদকে দেখে তারা প্রশ্ন করে - তাদের তো সবই ধ্বংস হয়েছে, এখন কিভাবে বাঁচবে তারা । আর কিভাবেই বা বাঁচাবে তাদের সন্তানদের। মজিদ তাদের খোদার উপর বিশ্বাস রাখতে বলে । সে তাদের ধমক দিয়ে বলে - ‘নাফরমানি করিও না । খোদার উপর তোয়াক্কাল রাখো।”
গ্রামের লোকেরা তার কথায় আশ্বস্ত হয়। মজিদের অলৌকিকতায় আর মাজারে ক্ষমতায় বিশ্বাস স্থাপন করে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে ফসলের ধ্বংসস্তূপের ধ্বংসস্তূপের দিকে চেয়ে থাকে। চোখে কোনো প্রকার ভাব নেই । লেখক এ চোখকেই বিশ্বাসের পাথরে খোদাই চোখের সঙ্গে তুলনা করেছেন । বস্তুত আধা সামন্তবাদী ও পুজিঁবাদী সমাজ ব্যবস্থা মানুষকে প্রতিবাদ-বিমুখ করে গড়ে তোলে। যুক্তিহীন জীবনাচরণে মানুষ অভ্যস্ত হয়। মহব্বত নগর গ্রামের মানুষও তাই হয়েছে । তারা মজিদ ও মাজারের অ- লৌকিকতায় বিশ্বাস করেছে। গ্রামের মানুষের এই মনোভাবকেই লেখক আলোচ্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন-৫. আক্কাছ কে? তার পরিচয় দাও। অথবা, ‘হাওয়ায় ক-দিন একটা কথা ভাসে’ - কোথায়, কী কথা ভাসে?
অথবা, ‘তোমার দাড়ি কই মিঞা?’ কে, কাকে, কেন এই প্রশ্ন করে?
উত্তর : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত লালসালু উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র আক্কাছ। সে মহব্বত নগর গ্রামের মোদাব্বের মিয়ার ছেলে। গ্রামের একমাত্র শিক্ষিত ও সংস্কারমুক্ত লোক আক্কাছ। সে ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করেছে। সে দীর্ঘ দিন বিদেশেও থেকেছে। বিদেশে থেকে সে চাকুরী করেছে। চাকুরী করে বেশ টাকা পয়সা জমিয়েছে। এখন সে গ্রামে ফিরে এসেছে । গ্রামে সে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার কথাটাই গ্রামের হাওয়া ভাসতে থাকে।
আক্কাছের ধারণা স্কুলে না পড়লে মুসলমানের ছেলের উন্নতি হবে না। গ্রামে মক্তব আছে বটে, কিন্তু শুধু মক্তবে পড়লে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে। তাই তাদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হলে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমে গ্রামের মানুষ আক্কাছের প্রচেষ্টায় সন্দেহ প্রকাশ করলেও আক্কাছের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া দেখে তারা আশ্বস্ত হয়। গ্রামে সভা বসে । সেই সভায় মজিদও উপস্থিত হয়। মজিদ ভাবে গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা হলে গ্রামের মানুষ শিক্ষিত হবে, সংস্কার মুক্ত হবে। তাকে তখন কেউ মানবে না। সে ভিতরে ভিতরে ফন্দি আঁটে। স্কুল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই মজিদ হঠাৎ আক্কাছকে প্রশ্ন করে বসে-
‘তোমার দাড়ি কই মিঞা?’
আক্কাছ এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে সভার সবার মুখের দিকে তাকায়। দেখে, দাড়ি নেই, এমন মানুষ সভায় নেই। সে মাথা নত করে চুপ করে থাকে। এক সময় মজিদের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে সভা ছেড়ে, সে চলে যায়। মহব্বত নগর গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টাও ভেস্তে যায়।
প্রশ্ন-৬. সংক্ষেপে রহিমার পরিচয় দাও।
অথবা, ‘তার আনুগত্য ধ্রুবতারার মত অনড়, তার বিশ্বাস পর্বতের মত অটল। সে তার ঘরের খুঁটি।’ -কে, কীভাবে?
উত্তর : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত লালসালু উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র রহিমা। সে উপন্যাসের নায়ক মজিদের প্রথমা স্ত্রী। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার উপস্থিতি। সে শক্তিময়ী, ল¤বা চওড়া। তবে সম্ভাবনাময় ব্যক্তিত্ব নিয়ে তাকে এই উপন্যাসে দাড়াতে দেখি না। তার শক্তি তার চওড়া দেহ তার বাইরের খোলস মাত্র। বাইরে সে ভীতু ঠাণ্ডা মানুষ। মজিদ ও মজিদের মাজারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভয়ই ভীতু ও ঠাণ্ডা হওয়ার কারণ।
রহীমা স্বামীর প্রতি খুবই অনুগত। স্বামী তাকে ধীরে হাটতে বললে, সে তা-ই করে, আস্তে কথা বলতে বললে সে প্রতিবাদ করে না। এবং মাজার সম্পর্কে ধর্ম সম্পর্কে মজিদ সত্য-মিথ্যা যাই বলুন না কেন তাই সে বিশ্বাস করে। সে এও বিশ্বাস করে যে মাজারটির অলৌকিক শক্তি আছে এবং তার স্বামী একজন অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন মানুষ। তার এই প্রশ্নহীন আনুগত্যই মজিদকে মহব্বত নগর গ্রামে প্রতাপ-প্রতিপত্তি বিস্তার করতে সহায়তা করে। আর এ কারণেই লেখক উচ্চারণ করেছেন-
‘তার আনুগত্য ধ্রুবতারার মত অনড়, তার বিশ্বাস পর্বতের মত অটল। সে তার ঘরের খুঁটি।’
মানবিক দিক থেকেও রহীমা ছিল অনন্য। কেননা, গরীব দুঃখীর প্রতি তার দয়া মায়া ছিল অসীম। হাসুনির মায়ের ব্যথায় সেই সমব্যথী হয়। সন্তান কামনার আশা মজিদের মাজারে প্রদক্ষিণ করতে এসে খালেক ব্যাপারীর স্ত্রী অসুস্থ হলেও সে-ই সেবা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলে।
সতীনের প্রতি মেয়েদের সাধারণত থাকে রাগ ঈর্ষা। কিন্তু জমিলাকে সে নিজের সন্তানের মতো ভালবাসতো। জমিলাকে শাস্তি দেয়ার জন্য মজিদ যখন ঝড়-বৃষ্টির রাতে মাজার ঘরে বেঁধে রাখে তখন সে প্রতিবাদ করে বলেছে-
‘ধান দিয়ে কি হইব, মানুষের জান যদি না থাকে? আপনে ওরে নিয়া আসেন ভিতরে।’
আর এই উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এই চরিত্রের মধ্যে প্রাণ-ধর্মের স্ফ‚রণ লক্ষ করি। যা এই চরিত্রটিকে শৈল্পিক মহিমায় মহিমান্বিত করেছে।
প্রশ্ন-৭. হাসুনির মা কে? তার পরিচয় দাও।
উত্তর : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত লালসালু উপন্যাসের ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হাসুনির মা। কেননা, উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহে গতি আনার প্রশ্নে এই চরিত্রটি পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছে। তার নিবাস মহব্বত নগর গ্রামে। সে বিধবা। বাপের বাড়িতেই সে অবস্থান করে। সম্পর্কের দিক থেকে সে তাহের-কাদেরের বোন। সে মজিদের বাড়িতে কাজকর্ম করে। মাঝে মাঝে সে রহিমার মাধ্যমে মজিদের কাছে বিভিন্ন আর্জি জানায়। বিশেষত তার পিতা-মাতা সম্পর্কে। তার পিতামাতার জীবন ছিল দারুণ সংকটময়। তার পিতামাতার মধ্যে সারাক্ষণই কোনো না কোনো কারণে ঝগড়া লেগে থাকত। অশ্রাব্য গালাগালি আর মারামারি ছিল তাদের নিত্যদিনের কর্তব্য। তার পিতামাতার ঝগড়ার ভাষা কখনও কখনও খুবই কদর্য হয়ে পড়ত। বুড়ি বুড়োকে আঘাত করার জন্য মাঝে মাঝে সন্তানদের জন্ম নিয়ে কথা বলত। সে বুড়োকে বলত, তার যে সন্তান তা বুড়োর ঔরসের নয়। এ কথা শুনে বুড়ো প্রচণ্ড ক্ষীপ্ত হতো। ক্ষীপ্ত হয়ে সে বুড়িকে মারধর করতো। হাসুনি মা তার পিতা মাতার এ হেন আচরণে খুবই আহত হতো। সে তাই রহিমার মাধ্যমে মজিদের কাছে আর্জি জানাতো , তার পিতামাতর যে মৃত্যু হয়। এবং তাকেও যেন খোদা-তা’লা পৃথিবী থেকে তুলে নেন।
প্রশ্ন-৮. “বিশ্বাসের পাথরে যেন খোদাই সে চোখ।'-উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত বাক্যটি স্বদেশ ও স্বজাতি সংলগ্ন বাস্তবাদী ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১] রচিত “ লালসালু” উপন্যাস থেকে গৃহীত হয়েছে এটি এ উপন্যাসের সর্বশেষ বাক্য ।
অশিক্ষা, কুসংস্কার অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত গ্রামীণ মানুষ সবকিছুকেই নির্বিবাধে, অন্ধভাবে বিশ্বাস করে। গ্রমীণ মানুষের সেই বিশ্বাসের প্রতি ইঙ্গিত করতে গিয়ে লেখক আলোচ্য মন্তব্য করেন।
জমিলার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও বিদ্রোহী মনোভাবের জন্য মজিদ তাকে শাস্তি দিতে চায় । তাই মজিদ জমিলাকে একরাত্রে মাজার ঘরে বেঁধে রাখে । সেই রাতে প্রচন্ড ঝড় শুরু হয় । ঝড় থামতে না থামতেই শুরু হয় শিলাবৃষ্টি। ঝড় আর শিলা বৃষ্টিতে ধানের জমিসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় । সমস্ত শস্যভূমি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় । ঝড় থামলে এবং ভোর হলে মজিদ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শস্যের জমির উপর দিয়ে হাটতে থাকে । ইতোমধ্যে গ্রামের লোকজনও মাঠে এসে জমা হয় । বিধ্বস্ত ফসলের জমি দেখে তাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় । অনিশ্চয়তা আর হতাশার অন্ধকারে তারা নিমজ্জিত হয় । মাজার অধিপতি মজিদকে দেখে তাঁরা প্রশ্ন করে - তাদের তো সবই ধ্বংস হয়েছে, এখন কিভাবে বাঁচবে তারা । আর কিভাবেই বা বাঁচবে তাদের সন্তানদের । মজিদ তাদের খোদার উপর বিশ্বাস রাখতে বলে । খোদার উপর বিশ্বাস হারানো নাফরমানি- পাপ। গ্রামের লোকেরা তার কথায় আশ্বস্ত হয় । মজিদের অলৌকিকতায় আর মাজারের ক্ষমতায় বিশ্বাস স্থাপন করে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে ফসলের ধ্বংসস্তূপের দিকে চেয়ে থাকে । চোখে কোনো প্রকার ভাব নেই । লেখক এ চোখকে নির্দেশ করতে গিয়েই উচ্চারণ করেছেন-
“বিশ্বাসের পাথরে যেন খোদাই সে চোখ।'
বস্তুত, আধা সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা মানুষকে প্রতিবাদ-বিমুখ করে গড়ে তোলে। যুক্তিহীন জীবনাচরণে মানুষ অভ্যস্থ হয়। মহব্বত নগর গ্রামের মানুষও তাই হয়েছে । তারা মজিদ ও মাজারের অ-লৌকিকতায় বিশ্বাস করেছে । আলোচ্য উক্তির মধ্য দিয়ে লেখক এই বিষয়টিকেই অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন-৯. সংক্ষেপে খালেক ব্যাপারীর পরিচয় দাও।
উত্তর : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত লালসালু উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র খালেক ব্যাপারী। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিতি এই চরিত্রটির। তবে চরিত্রটি যথাযথ বিকশিত হয় নি।
খালেক ব্যাপারী মহব্বত নগর গ্রামের ভূস্বামী। তাই গ্রামের সামাজিক নেতৃত্ব তারই হাতে। ধর্ম-কর্ম, শিক্ষা-দীক্ষা, উৎস-পার্বণ সবই চলে খালেক ব্যাপারীর নির্দেশে। মহব্বত নগর গ্রামে এসে মজিদ প্রথমে খালেক ব্যাপারীর বাড়িতেই আশ্রয় নেয়। ক্রমে মজিদ মানুষের ধর্মভীরুতার সুযোগ নিয়ে নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তৃত করে। খালেক ব্যাপারী এ সকল কখনই বিরোধিতা করে নি। এমন কি নিজের প্রথমা স্ত্রী আমেনা বিবিকে তালাক দিতে বললেও সে মাজিদের হুকুম নির্দ্বিধায় মেনে নেয়।
এই দিক থেকে দেখতে গেলে খালেক ব্যাপারীকে দুর্বল চরিত্রের লোক বলতেই হয়। কারণ, নিয়ম হলো সামন্ত প্রভুর অনুগত হবে পুরোহিত। এখানে তার উল্টো। কেননা, খালেক ব্যাপারীকে আমরা কখনও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের হতে দেখি না। বরং, সর্ব ক্ষেত্রেই আমারা দেখি মজিদের কথার সুরে সুর মেলাতে পারলেই যেন খালেক ব্যাপারীর আনন্দ। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খালেক ব্যাপারী চরিত্রটি আলোচ্য উপন্যাসে যথাযথ বিকশিত হয়ে ফুটে উঠে নি।
প্রশ্ন-১০. মজিদের মহব্বত নগর গ্রামে প্রবেশের দৃশ্য বর্ণনা কর।
উত্তর : ‘লালসালু’ উপন্যাস সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মজিদ এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই চরিত্রটি নির্মাণের জন্যই এই উপন্যাসটি অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। মজিদের জন্ম নোয়াখালী জেলায়। সেখানে জীবিকা নির্বাহ করতে না পেরে সে ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ে যায়। সেখানেও তার জীবিকা নিশ্চিত না হলে মহব্বত নগর গ্রামে আসে। মজিদের মহব্বত নগর গ্রামে প্রবেশ ছিল বেশ নাটকীয়। মজিদ অত্যন্ত সুচতুর ও কৌশলী। সে জানে গ্রামের মানুষ নাটকীয়তা পছন্দ করে। তাই সে মহব্বত নগর গ্রামে প্রবেশের ঘটনাটিকে নাটকীয় করে তোলে।
মহব্বত নগর গ্রামের অদূরেই মতিগঞ্জ সড়ক। মতিগঞ্জ সড়কে মজিদ আসে। সেখানে সে আকাশের দিকে মোনাজাতের ভঙ্গিতে হাত তুলে দাড়িয়ে থাকে মুহূর্তের পর মুহূর্ত, যেন তার কোনো চেতনা নেই। তাহের-কাদেরসহ নিরাক পড়া বিলের অন্য মাছ শিকারীরাও বিষয়টি লক্ষ করে। এক সময় মজিদ মোনাজাত শেষ করে। পাশে রাখা পুটলিটা নিয়ে বড় বড় পা ফেলে উত্তর দিকে হাটা দেয়। সেই দিকেই মহব্বত নগর গ্রাম। এই ভাবেই সে মহব্বত নগর গ্রামে প্রবেশ করে। গ্রামে প্রবেশ করেই সে
একটি টাল খাওয়া ভাঙা কবর আবিষ্কার করে। এবং ঘোষণা দেয়, এটি মোদাচ্ছের পীরের মাজার। এই মাজারকেই তারা অযত্নে অবহেলায় ফেলে রেখেছে। তারা জাহেল, বেএলেম আন্পাড়হ্ বলেই মোদাচ্ছের পীরের মাজারকে এমনি অবহেলায় ফেলে রেখেছে। খালেক ব্যাপারী, মাতব্বর রেহান আলী এবং তাহের-কাদেরের বাপও মজিদের আচরণে অভিভূত হয়ে পড়ে। মজিদের এই নাটকীয় প্রবেশই মহব্বত নগর গ্রামে তার অবস্থানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
প্রশ্ন-১১. আমেনা বিবি কে ? সংক্ষেপে তার পরিচয় দাও। অথবা, ‘মেয়ে লোকের মনের মস্করা সহ্য করবে অতটা দুর্বল নয় সমাজ’ - ব্যাখ্যা কর। অথবা, ‘তানারে তালাক দেন’ - কে কাকে কেন তালাক দিতে বলেছে?
উত্তর : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত লালসালু উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আমেনা বিবি। সে মহব্বত নগর গ্রামের জোতদার খালেক ব্যাপারীর প্রথমা স্ত্রী। দেখতে সে অপরূপা সুন্দরী কিন্তু নিঃসন্তান। সন্তান কামনায় সে অধীর। সে শুনেছে আওয়াল পুরের পীরের পানি পড়া খেয়ে অনেকেরই কোলে সন্তান এসেছে। তাই সে আওয়াল পুরের পীরের পানি পড়া খেতে চায়। কথাটা সে ব্যাপারীর কানে তোলে। ব্যাপারী প্রথমে মজিদের কথা মনে করে তার আবেদনে সায় দেয় না। পরে বিবির চোখের জলের কাছে পরাজিত হয়ে ধলামিঞাকে পানিপড়া আনতে আওয়াল পুরে পাঠানো ব্যবস্থা করে। কিন্তু ধলা মিঞা বিষয়টি মজিদকে জানিয়ে দিলে মজিদ মনে মনে খালেক ব্যাপারীর উপর ক্ষীপ্ত হয়। মজিদ বলে বিবির সন্তান হয় না, বিষয়টি আমাকে জানালেই পারতেন। ঠগ পীরের কাছে যাবার দরকার ছিল না। ঠগ পীরের পানিপড়া খেয়ে তো তানার পেটের বেড়ি যাবে না। আর বেড়ি না ছুটলে তানার সন্তান হবে না। আগে জানতে হবে তানার কয় প্যাঁচ পড়েছে ; পাঁচ, সাত, চৌদ্দ না তারও বেশি। সাত প্যাঁচের কম হলে সন্তান হবার সম্ভাবনা থাকে, বেশি হলে সন্তান হয় না । সে বেড়ির প্যাঁচ জানার উপায়ও বলে দেয় খালেক ব্যাপারীকে। সেহেরি না খেয়ে রোজা রাখতে হবে। সারাদিন কারো সাথে কথা বলো যাবে না, শুধু কোরআন পাঠ করতে হবে। সন্ধায় মাজারে আসতে হবে। ইফতার না করে মাজারে সাত পাক দিতে হবে। সাত প্যাচ থাকলে পেট ব্যথায় টন টন করবে। ব্যথা না উঠলে জানতে হবে তার আরো বেশি প্যাঁচ। আমেনা বিবি খালেক ব্যাপারীর নিকট এসব শুনে বেশ উৎসাহিত হয়। সন্তানের মা হবার স্বপ্নে উদ্বেলিত হয়। মজিদের কথা মত আমেনা বিবি রোজা রাখে। সব আয়োজন সম্পন্ন হয়। কিন্তু মাজারে যাবার প্রাক কালে আমেনা বিবির মন যেতে সায় দেয় না। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবে, একবার যেহেতু সে যাবার বিষয়ে রাজী হয়েছে সেহেতু তার আর ফিরে যাবার উপায় নেই। কারণ, মেয়ে লোকের মনে মস্করা সহ্য করবে এতটা দুর্বল নয় সমাজ। আমেনা বিবি মাজারে যায়। মজিদের পানিপড়া খেয়ে মাজারে পাক শুরু করে। কিন্তু আড়াই পাক দেয়ার পরই আমেনা বিবি মূর্ছা যান। মজিদ মনে মনে ফন্দি আঁটে। তাকে উপেক্ষার করার শাস্তি দেয়ার জন্য মজিদ খালেক ব্যাপারীকে ইঙ্গিতে জানিয়ে দেয়, আমেনা বিবির চরিত্রে দোষ আছে। খোদার কালামের সাহায্যে যা জানা যায় তা সূর্যের রোশনাইয়ের মতো পরিষ্কার। মজিদ খালেক ব্যাপারীকে বলে, ‘আর বেশী কিছু কমু না, তানারে তালাক দেন।’
মজিদের চাতুর্য, লোভ আর ভণ্ডামীর কাছে আমেনা বিবির দীর্ঘ দিনের দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
প্রশ্ন-১২. ‘এখন সে ঝড়ের মুখে উড়ে চলা পাতা নয়, স্বচ্ছলতার শিকড় গাড়া বৃক্ষ'- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু স্বদেশ ও স্বজাতি সংলগ্ন মানবতাবাদী ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।১৯২২-১৯৭১] রচিত 'লালসালু' উপন্যাস থেকে গৃহীত হয়েছে।
উদ্বৃত অংশটুকু মজিদের স্বগতোক্তি । মহব্বতনগর গ্রামে মজিদের দারিদ্র্য-পীড়িত অতীত জীবনের সাথে বর্তমানের প্রভাব- প্রতিপত্তিময় জীবনকে লেখক এখানে একটি শৈল্পিক উপমার মধ্যদিয়ে তুলে ধরেছেন।
মজিদের জন্ম বাংলাদেশের একটি দারিদ্র অঞ্চলে। সেখানে জনসংখ্যার চেয়ে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ অনেক কম। সেখানে শস্যের চেয়ে টুপি বেশী, ধর্মের আগাছা বেশী । সে অঞ্চলের মানুষ জীবিকার সন্ধানে দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে চলে । মজিদও সকলের মত ভাগ্যান্বেষণে এ মহব্বতনগর গ্রামে ছুটে এসেছিল । সে ছিল ঝড়ের মুখে উড়ে চলা পাতার মত। কিন্তু বর্তমানে সে প্রচুর জোত- জমি, মান সম্মান আর প্রভাব প্রতিপত্তির মালিক। কোন এক ফাল্গুন মাসে দমকা হাওয়ায় উড়ে চলা বালুকণা দেখে তার অতীত জীবনের কথা মনে হয় । সেখানে দু' বেলা খেয়ে বাঁচার কোন সংস্থান ছিল না। জীবন ছিল অনিশ্চয়তা আর শূন্যতায় ভরপুর। অথচ মহব্বর্ত নগর গ্রামে সে ব্যাপক ক্ষমতার মালিক । এ গ্রামে ধনী-গরীব প্রতিটি মানুষের জীবনে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। তাহাদের ব্যাপক ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, আক্কাসের স্কুল প্রতিষ্ঠার উদযোগ, আমেনা বিবির অবিশ্বাস আর অনাস্থাকে সে অত্যন্ত কঠোর এবং কৌশলে দমন করেছে। এমনকি ব্যাপক জোত-জমি প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক খালেক ব্যাপারীও মজিদের বুদ্ধি আর কৌশলের কাছে পুতুল বিশেষ । তাই মজিদ ভাবে-
‘এখন সে ঝড়ের মুখে উড়ে চলা পাতা নয়, স্বচ্ছলতার শিকড় গাড়া বৃক্ষ।'
বস্তুত, মজিদের বর্তমান ও অতীত জীবনের তুলনা আলোচ্য বাক্যের মধ্যদিয়ে অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ও শৈল্পিক ভাবে ফুটে উঠেছে ।
প্রশ্ন-১৩. ‘দুনিয়াটা বড় বিচিত্র জায়গা। সময় অসময় মিথ্যা কথা না বললে নয়'-কার, কেন এই উপলব্ধি হয়েছে?
উত্তরঃ ব্যাখ্যার জন্য নির্বাচিত অংশটুকু স্বদেশেও স্বজাতি সংলগ্ন বাস্তববাদী ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [১৯২২-১৯৭১] রচিত ‘লালসালু’ উপন্যাস থেকে নেয়া হয়েছে।
এ উক্তি ‘লালসালু' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মজিদের । এটি মজিদের স্বগতোক্তি । উপন্যাসের একটি চরিত্র, কালু মিঞার বাবার নিকট মিথ্যা কথা বলার পিছনে মজিদ মনে মনে এ যুক্তি প্রতিষ্ঠা করে ।
মজিদের প্ররোচনায় উদ্দীপ্ত হয়ে মহব্বত নগর গ্রামের কতিপয় যুবক আওয়াল পুরে আগত পীরকে বিতারিত করার জন্য সেখানে যায় এবং মারামারি করে। মারামারিতে আহত হয়ে কয়েকজন করিম গঞ্জের হাসপাতালে ভর্তি হয়। মজিদ খবর পেয়ে আহতদের দেখতে যায় । সে হাসপাতালে গিয়ে দেখে সেখানে চিকিৎসার তেমন কোন ব্যবস্থা নেই । তাই কম্পাউন্ডারকে ডাক্তার মনে করে আহতদের সুচিকিৎসার অনুরোধ জানায়। কম্পাউন্ডার মজিদের কথায় কর্ণপাত করেনা । কিন্তু মজিদ বাড়ি ফিরে গিয়ে আশঙ্কাজনক ভাবে আহত কালুমিয়ার পিতাকে জানায়, তার দুঃশ্চিন্তার কোন কারণ নেই । কারণ, মজিদ তার ছেলেকে দেখতে গিয়েছিল এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে এসেছে । মজিদ নিজের প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রচার করার জন্য এ প্রসঙ্গে একটি মিথ্যা কথাও বলে। সে কালু মিঞার পিতাকে জানায়, হাসপাতালের বড় ডাক্তার তার মুরিদ, তাই সেখানে তার খুব খাতির । এ কথা বলার পর মজিদ মনে মনে উচ্চারণ করে-
“দুনিয়াটা বড় বিচিত্র জায়গা । সময় অসময়ে মিথ্যা কথা না বললে নয় ।”
তবে এর জন্য মজিদ মনে মনে তওবা করে নেয়।
বস্তুত, এর মধ্যদিয়ে মজিদ চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বের স্বরূপটি উন্মোচিত হয়। মজিদ ভন্ড, প্রতারক,শুঠ এবং ধর্মব্যবসায়ী। কিন্তু ধর্মে তার অবিশ্বাস নেই, সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার কোন সন্দেহ নেই। তবুও সে ভণ্ডামী, প্রতারণা, শঠতার আশ্রয় নিয়েছে সচ্ছল ভাবে দু' বেলা খেয়ে বাঁচার জন্য অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য ।
মুসা স্যার, বাংলা, 01713211910
+88 01713 211 910