
NTRCA (School) :‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য
NTRCA (School) প্রশ্ন:- ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য/মূলসুর/মূলভাব/বিষয়বস্তু তোমার নিজের ভাষায় লিখ।
অথবা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালা ভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধ অবলম্বনে ভাষার গতি-প্রকৃতির পরিচয়পূর্বক আদর্শ ভাষার স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা কর।
অথবা, “বিষয়বস্তু অনুসারেই ভাষার উচ্চতা ও সামান্যতা নির্ধারিত হওয়া উচিত। রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন সরলতা ও সুস্পষ্টতা।”-এ উক্তির আলোকে বঙ্কিমচন্দ্রের মতামত লিপিবদ্ধ কর।
অথবা, “যে রচনা সকলেই বুঝিতে পারে এবং পড়িবা মাত্র যাহার অর্থ বুঝা যায়, অর্থগৌরব থাকলে তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট রচনা।” এই উক্তির আলোকে বাংলা ভাষার উৎকৃষ্ট রচনা রীতি সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের মতামত আলোচনা কর।
অথবা, বাঙ্গালা ভাষা প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা রচনার উৎকৃষ্ট রীতি বলতে কী বুঝিয়েছেন-বিশদভাবে আলোচনা কর।
উত্তর : ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। বাংলা ভাষার প্রকৃত স্বরূপ তথা সাহিত্য রচনার আদর্শ কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আলোচ্য প্রবন্ধে তিনি যুক্তিনিষ্ঠ মতামত তুলে ধরেছেন। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের মতে বাংলা ভাষার গতি-প্রকৃতি কী হওয়া উচিত সে বিষয়েই আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
পৃথিবীর অপরাপর ভাষার মতো বাংলা ভাষাতেও দুটি রূপ বর্তমান। এর একটি হলো সাধু ভাষা এবং অন্যটি হলো চলিত ভাষা। একটি লেখার ভাষা অপরটি মুখের ভাষা। এই লেখ্য ভাষা এবং চলিত ভাষা বহুকাল ধরেই একটি দ্বন্দ্বমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিকশিত হচ্ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ই শেষপর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব অবসানের পথ নির্দেশ করেন।
বাংলা গদ্যের আদি পর্বে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁরা সকলেই ছিলেন সংস্কৃতের অনুরাগী। তাই অতীতের সাহিত্য বলতেই ছিল সংস্কৃতবহুল সাধু ভাষায় রচিত সাহিত্য। সংস্কৃত জানাটা তখন ছিল গৌরবের বিষয়। সংস্কৃত না জানলে সাহিত্য চর্চা করা সম্ভব নয়- এরূপ একটা ভ্রান্ত ধারণা প্রায় সবার মধ্যেই বদ্ধমূল ছিল। সংস্কৃত না জানলে সেই সংস্কৃতবহুল দুর্বোধ্য পাঠ সাধারণের জন্য ছিল খুবই কঠিন।
সংস্কৃত অনুসারীদের ধারার বিপরীতে বাংলা গদ্যে আরেকটি নতুন ধারার আগমন ঘটল-এই ধারার নাম কথ্য ভাষা; যার সার্থক রূপায়ণ ঘটান প্যারীচাঁদ মিত্র। তিনি তাঁর ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্রন্থের মধ্য দিয়ে এই পথের সূচনা করেন। সেই পথের আরেকজন অনুসারী হলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ্ তিনি রচনা করেন “হুতোম প্যাঁচার নকশা”। তখন থেকেই বাংলা ভাষা প্রবাহিত হয় প্রকৃত গতিপথে। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়-
“সেই দিন হইতে বাঙ্গালা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি।”
সংস্কৃত পণ্ডিতেরা তাঁদের বিপরীতে কথ্য /ভাষায় সাহিত্য রচিত হতে দেখে ক্ষীপ্ত হন। তাদের বক্তব্য, কথ্য ভাষা কখনো ভদ্রজনের ভাষা হতে পারে না। আর সে ভাষায় সাহিত্য রচনার অধিকার একেবারেই নেই। অন্য দিকে সংস্কৃত বিদ্বেষীদের কথা সংস্কৃত অচল। কারণ সে ভাষা সাধারণের বোধগম্য নয়। আর সাধারণদের বোধগম্যতা ছাড়া কখনো সাহিত্য রচিত হতে পারে না।
সংস্কৃতানুসারী প্রাচীনপন্থীদের প্রতিনিধি রামগতি ন্যায়রত্ন কথ্য ভাষায় রচিত সাহিত্য সম্পর্কে বলেন,-
“আলালের ঘরের দুলাল বল, হুতোম পেঁচা বল, মৃণালিনী বল-পত্নী বা পাঁচজন বয়স্যের সহিত পাঠ
করিয়া আমোদ করিতে পারি- কিন্তু পিতাপুত্রে একত্র বসিয়া অসঙ্কুচিত মুখে কখনই ও সকল পড়িতে পারে না।”
মোটকথা তাদের দৃষ্টিতে সংস্কৃত ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাতে সাহিত্য রচিত হতে পারে না।
নব্যপন্থীদের অন্যতম শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি কলকাতা রিভিউতে একটি প্রবন্ধ লিখে সংস্কৃতের সমালোচনা করেন। তিনি বহুবচন বোঝানোর জন্য ‘গণ’ শব্দ দিয়ে বাংলা ভাষায় লিঙ্গভেদ মানতে চান না। ভ্রাতা, কল্য, তাম্র, স্বর্ণ, পত্র, মস্তক, অশ্ব ইত্যাদি শব্দ বাংলা ভাষায় ব্যবহারের ঘোর আপত্তি জানান। তবে যে সব ক্ষেত্রে সংস্কৃত ভাষার শব্দ রূপান্তরিত হয়ে প্রচলিত ভাষায় পরিণত হয়েছে সে সব শব্দ ব্যবহারে তার আপত্তি নেই। ত্ব-প্রত্যয়ান্ত এবং য-প্রত্যয়ান্ত শব্দ ব্যবহারেও তিনি নারাজ। মোট কথা সংস্কৃতকে বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা করাই তাদের লক্ষ্য।
লেখকের দৃষ্টিতে প্রাচীনপন্থী ও নব্যপন্থী উভয়েই চরমপন্থী। তিনি বাংলা ভাষাকে সুষ্ঠু ও সুন্দররূপে গড়ে তোলার জন্য উভয় পন্থীদের মতকে একেবারে গ্রহণ করেননি আবার বাদও দেননি। তাঁর মতে রচনা হবে সহজ, সরল ও স্পষ্ট। ভাষাকে সুন্দর ও সাবলীলরূপে গড়ে তুলতে তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন। ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজনে প্রচলিত সংস্কৃত শব্দ যেমন গ্রহণ করতে হবে তেমনি অপ্রয়োজনে একে বাদও দিতে হবে।
মোট কথা যেটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সে ভাষাটিই ব্যবহার করতে হবে। লেখকের প্রত্যক্ষ উক্তিতে বলতে হয়-
“রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন, সরলতা এবং স্পষ্টতা।
যে রচনা সকলেই বুঝিতে পারে এবং পড়িবা-মাত্র যাহার অর্থ বুঝা যায়,
যাহার অর্থগৌরব আছে তাহাই সর্বোৎকৃষ্ট রচনা।”
বিষয় অনুযায়ী সঙ্গত শব্দচয়ন এবং তা সর্বজন গ্রহণযোগ্য ভাষা হলে সে ভাষা হবে সমৃদ্ধ ভাষা। তাই এরূপ ভাষার জন্য প্রাচীনপন্থী অথবা নব্যপন্থী এবং বঙ্কিমচন্দ্রের কাছ থেকে যতটুকু ঋণগ্রহণের প্রয়োজন তা করতে হবে আর যতটুকু বাদ দেওয়ার তা দিতে হবে।
তাই পরিশেষে বলা যায়, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের মননশীল চিন্তা-চেতনা ও যুক্তিনিষ্ঠ বিচার বিশ্লেষণ ভাষাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট পরিমাণে সক্ষম। তবেই হবে-“ভাষা শক্তিশালী, শব্দৈশ্বর্যে পুষ্ঠা এবং সাহিত্যলঙ্কারে বিভূষিতা।’
মুসা স্যার
বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910