
NTRCA School, প্রশ্ন- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার
NTRCA School, প্রশ্ন- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার কর।
অথবা, জৈবিক প্রবৃত্তির আদিমতা ও মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পে যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে তা গল্পটির নামকরণের তাৎপর্য ব্যাখ্যাসূত্রে আলোচনা কর।
অথবা, ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা নিরূপণ কর।
উত্তর : বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বিশিষ্ট নাম। তাঁর বিবিধ সৃষ্টির মধ্যে ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্প বিভিন্ন কারণে বহুল আলোচিত এবং নন্দিত। এই গল্পের নামকরণেও লেখক প্রখর মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তবে এই গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচারের পূর্বে সাহিত্য শিল্পের নামকরণের ব্যবহারিক ও নান্দনিক প্রসঙ্গ সম্বন্ধে পরিপূর্ণ ধারণা নেয়া আবশ্যক। অন্যথায় আমাদের বিবেচনা বিভ্রান্তির অতলে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
সাহিত্য শিল্পের নামকরণের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি দিককে বিবেচনা করা হয়। প্রথমতঃ সাহিত্য বা শিল্পের পরিচিতি তথা ব্যবহারিক দিক। দ্বিতীয়তঃ এর অর্ন্তনিহিত বক্তব্যের দিক।এ বিশ্বে নামহীন বস্তুর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। নামই একটি বস্তুকে আরেকটি বস্তু থেকে পৃথক হলেও কেবল নাম উচ্চারণের মাধ্যমেই এরা আমাদের কাছে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে উদ্ভাসিত হয়। তেমিনি সমাজ জীবন একজন ব্যব্তি বা বস্তুর নাম উচ্চারনের সাথে সাথেই এর ব্যবহারের দিকটি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। এদিক থেকে নামই ব্যক্তি বা বস্তুর পরিচিতির অনির্বার্ষ স্মারক। সাহিত্যের অন্যতম শাখা ছোট গল্প সম্বন্ধে ও উল্লিখিত মুল্যায়ণ প্রাসঙ্গিক। কারণ নামের কারণেই একটি গল্প সমজাতয়ি সকল গল্প থেকে পৃথক। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসক’ গল্পও নামের কারণে অন্য সব গল্প থেকে স্বতন্ত্র।
দ্বিতীয়তঃ গল্পের অর্ন্তনিহিত দিকেটিকে প্রাধ্যন্য দিয়েও নামকরণ হয়ে থাকে। একজন গল্পকার গল্প লেখেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত বক্তব্যকে সৃষ্ট গল্পে তুলে ধরার জন্য। জড়ৎ ও জীবন সম্বন্ধেও এ সত্য প্রাসঙ্গিক।
প্রাগৈতিহাসিক গল্পের নামকরণ : আলোচ্য গল্পে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের আদিম প্রবৃত্তির স্বরূপ তুলে ধরার প্রয়াস পেছেন। প্রাগৈতিহাসিক অর্থাৎ মানব সভ্যতার পূর্ব ইতিহাসই হলো প্রাগৈতিহাসিক। সে ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসে লেখা হয় নি। মানুষ আধুনিকতার পরশে উজ্জীবিত হলেও তার মধ্যে যে আদিম প্রবৃত্তির তাড়না বহমান থাকে, তাই এখানে ব্যক্ত হয়েছে। কাম ও ভোগস্পৃহার সেই জীবন্ত নগ্নরূপ ভিখু চরিত্রের মধ্য দিয়ে তুলে ধরে লেখক আলোচ্য গল্পের নামকরণ যথার্থ করেছেন বলে বিবেচিত হয়। সভ্য সমাজে রক্তের স্রোতধারায় ভিখুদের সেই আদিম থাবা যে সমাজে সর্বকালেই বিদ্যমান সেই সত্যই গল্পে উদ্ভাসিত হয়ে গল্পের নামকরণকে যথার্থ হয়েছে। গল্পে ভিখু, পাঁচী, বসির, পেহলাদ, সবার মধ্যেই প্রাগৈতিহাসিক সেই চেতনা বহমান। তারা জীবনের যে ক্লেদাক্ত অধ্যায়কে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে তা প্রাগৈতিহাসিক যুগের। এজন্যই লেখক বলেছেন, “হয়ত ওই চাঁদ আর এই পৃথিবীর ইতিহাস আছে। কিন্তু যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংসল আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক।”
এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভিখু। সে আদিম প্রবৃত্তির নগ্ন প্রতিনিধি। ডাকাতি করা আর মানুষ খুন করা তার পেশা ও নেশা। এক বার বৈকুন্ঠ সাহার গদিতে ডাকাতি করতে গিয়ে খুন করে পালায়। পালানোর সময় বর্শার খোঁচা খেতে হয়েছে তাকে সেখান থেকে সে আশ্রয় নিয়েছে বন্ধু পেহলাদের বাড়িতে। নারী দেহের প্রতি লোভ ভিখুর বরাবরই ছিল। তাইতো একটু সুস্থ হলেই সে হাত বাড়ায় বন্ধু পেহলাদের স্ত্রীর প্রতি। সেখান থেকে সে মার খেয়ে পেহলাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে চলে আসে মহকুমা শহরে। এখানে এসে সে বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তি; নজর পড়ে তারই পাশে অবস্থানরত ভিখারিনী পাঁচীর ওপর। পাঁচী বসিরের সাথে বসবাস করে। পাঁচীকে পাওয়ার জন্য এক রাতে বসিরকে হত্যা করে সে নির”দ্দেশের পথে পা বাড়ায়। প্রাগৈতিহাসিক চরিত্রের অধিকারী ভিখুকে নিয়েই এভাবে আবর্তিত হয়েছে গল্পের আখ্যানভাগ।
গল্পের অন্তর্নিহিত ভাব ও তাৎপর্য : ইতিহাসের পাতায় অলিখিত মানুষের নগ্ন সত্য রূপই প্রাগৈতিহাসিক। মানুষ তার সুকুমার বৃত্তির টানে পৃথিবীকে যতই সভ্য মানুষের বাসযোগ্য করে গড়ে তুলুক না কোন, তার মধ্যে আদিম পশুবৃত্তির নগ্ন রূপটি রচির ধারার মতো দেহ ও মনের গোপন কোটরে থেকেই থাকে। সুযোগ পেলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিখু চরিত্রের মতো। ভিখুর ন্যায় হাজারো ভিখুরা সভ্যতার মুখোশ পরে সমাজে এই সত্যকে পরোক্ষভাবে লালন করে যাচ্ছে। সভ্য সমাজে রক্তের অণু-পরমাণুর মতো এই প্রাগৈতিহাসিকতা ছুটে চলেছে যুগা-যুগান্তর ধরে। মানুষের ভিতরকার এই পশুবৃত্তিকে গল্পকার ভিখু চরিত্রের মধ্য দিয়ে সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।
নামকরণ কেন সার্থক : গল্পের নামকরণ ভিখু কিংবা পাঁচী হতে পারত। কিন্তু তা হলে গল্পের অন্তর্নিহিত বিষয়টি বাদ পড়ে যেত এবং নামকরণ সার্থক হতে পরত না। অপরদিকে প্রাগৈতিহাসিক অর্থাৎ সভ্যতার আগের আদিম-অসভ্য-নগ্ন জীবনের ছবিই ফুটে উঠেছে এ গল্পে, যা আধুনিক সমাজ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রেও প্রবাহিত। এই অসভ্য-নগ্নতা মনুষ্য চরিত্রের অভ্যন্তরে লুকায়িত থাকে। সুযোগ আর পরিবেশ পেলেই সে ভিখুদের মতো আত্মপ্রকাশ করে। ভিখু, পাঁচী ও বসির চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক এ সমাজের অন্ধকার জীবনের বৈশিষ্ট্য্ এভাবে তুলে ধরেছেন-যা প্রাগৈতিহাসিক।
উপসংহার : আলোচনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে একথাই সর্বশেষে বলা যায়, প্রাগৈতিহাসিক গল্পের নামকরণ সর্বাঙ্গ-সুন্দর ও সার্থক হয়েছে।
Musa Sir
Bangla
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910