
NTRCA School, প্রশ্ন: ‘পুঁই মাচা’ গল্প অবলম্বনে ক্ষেন্তি চরিত্র
NTRCA School, প্রশ্ন: ‘পুঁই মাচা’ গল্প অবলম্বনে ক্ষেন্তি চরিত্র আলোচনা কর।
অথবা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘পুঁই মাচা’ গল্প অবলম্বনে ক্ষেন্তি চরিত্র আলোচনা কর।
অথবা, ‘বাড়ির সেই লোভী মেয়েটির স্মৃতি পাতায় পাতায়, শিরায় শিরায় জড়াইয়া তাহার কত সাথের নিজের হাতে পোঁতা পুঁই গাছটি মাচা জুড়িয়া বাড়িয়া উঠিয়াছে। এই উক্তির আলোকে ক্ষেন্তি চরিত্র আলোচনা কর।
উত্তর: রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় একজন স্বতন্ত্র ধারার গল্পকার হিসেবে পরিচিত। তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘পুঁই মাচা’। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ক্ষেন্তি। ক্ষেন্তিও, আচার-আচরণ, আশা-হাতাশা এবং দুঃখ-কষ্টকে আশ্রয় করেই আলোচ্য গল্পের কাহিনি বিস্তৃতি লাভ করেছে। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে ক্ষেন্তি চরিত্রের সেই বৈশিষ্ট্যকেই তুলে ধরার প্রয়াস পাব।
ক্ষেন্তি কে : ক্ষেন্তি দরিদ্র ব্রাহ্মণ সহায়হরি চাটুয্যের চার মেয়ের একজন। সে সবার বড়। তার বয়স চৌদ্দ কি পনেরো। তৎকালীন সামাজিক রীতিতে সেটিই বিয়ের বয়স পার হয়ে যাওয়ার মতো বয়স। তার বয়স হলেও শিশুসুলভ আচরণ তখনও বন্ধ হয় নি। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো, পিতার সাথে মাছ মারা, রস পাড়া, জঙ্গল থেকে আলু তুলে আনা ইত্যাদি কাজে তাকে দেখা যায়। ভোজনপটু হিসাবেও তার পরিচয় রয়েছে।
ক্ষেন্তি নিরীহ স্বভাবের : ক্ষেন্তি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। তবে সে ছিল শান্তস্বভাবের। অভাবের সংসারে তারা চার চারটি বোন হলেও ক্ষেন্তিকে কখনো কারও সাথে ঝগড়া বা গন্ড গোল করতে দেখা যায় নি। সমযে অসময়ে সে মায়ের বকুনি শুনেছে, কিন্তু কখনো প্রতিবাদ করেনি। রায়দের বাড়ি থেকে পুঁই ডাটা নিয়ে এলে এবং পিতার সঙ্গে বরজ পোতার জঙ্গল থেকে আলু তুলে আনায় মা প্রচন্ড রেগে গেলেও সে একটি কথা বলে নি কিংবা কোনো বাদ-প্রতিবাদ করে নি। সে সর্বদাই শান্ত নিরীহ স্বভাবের। মা অন্নপূর্ণা এজন্যেই সস্নেহে তাকে বলেছেন, “ক্ষেন্তি আমার যার ঘরে যাবে, তাদের অনেক সুখ দেবে।
পিতৃভক্ত ক্ষেন্তি : ক্ষেন্তি ছিল পিতা সহায়হরির একান্ত স্নেহের এবং আনুগত্যের। পিতাকে সে যেমন ভালোবাসত তেমনি অনুসরণও করত। আর সে জন্যে পিতাও তাকে সকল কাজে সাথে রাখতেন।
পুঁইভক্ত ক্ষেন্তি : ক্ষেন্তি পুঁইশাক খুব ভালোবাসত। একবার অরন্ধনের আগের দিন তার মা পুঁই শাক রান্না করলে ক্ষেন্তি মাকে বলেছেল, “মা অর্ধেকগুলো কিন্তু একা আমার অর্ধেক সব মিলে তোমাদের।” আবার লোভ সামলাতে না পেরে রায়দের ফেলে দেওয়া পুঁই ডাঁটা সে কুড়িয়ে এনেছে। মা তার এহেন কাজে র্ভৎসনা করে পুঁই ডাঁটা ফেলে দিতে বললে তার মন খারাপ হয়। মা গোপনে মেয়ের এই শখের পুঁই ডাঁটার চচ্চড়ি করে পাতে তুলে দিলে সে খুবই খুশি হয়। আরেকটু নিতে বললেও সে ঘাড় নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করে। পুঁই শাকের প্রতি ক্ষেন্তির এতই দুর্বলতা ছিল যে সে এক শীর্ণকায় পুঁই চারা উঠানের এক পাশে লাগিয়ে রোজ রোজ তাতে পানি দিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য সে পুঁই চারা যখন তার লকলকে ডগা ছাড়িয়ে মাচা ভরে তুলেছে তখন আর ক্ষেন্তি নেই। সে তখন সবাইকে ছেড়ে অনেক অনেক দূরে চলে গেছে।
মাতৃভীতু ক্ষেন্তি : পিতার সাথে ক্ষেন্তির সখ্য থাকলেও মায়ের প্রতি ছিল তার প্রচন্ড ভীতি। ও পাড়ার রায়দের বাড়ি থেকে পুঁই ডাটা নিয়ে এলে অন্নপূর্ণা কড়া স্বরে সেগুলো ফেলে দিতে বললে মেয়েটি “ভয়-মিশ্রিত দৃষ্টিতে মার দিকে চাহিয়া হাতের বাঁধন আলগা করিয়া দিল।”
সহজ-সরল ও লোভী : ক্ষেন্তি ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল গোবেচারি প্রকৃতির। খাওয়ার ব্যাপারে সে কখনো না করতে না। পুঁই শাকের চচ্চড়ি খাওয়ার জন্য সে রায়দের বাড়ি থেকে পাকা পুঁই ডাঁটা নিয়ে এসেছে। মার নারকেল কোরা দেখে মার চোখের দিকে তাকিয়ে মিনতির সুরে বলেছে, “মা নারকেল কোরা একটু নেব?” আবার খেঁদিদের বাড়ি গেলে পাটিসাপটা পিঠে খেতে দিলে সে একবারের জন্যেও না করে নি।
সত্যবাদী ও শাস্ত্রমান্যকারী ক্ষেন্তি : ক্ষেন্তি কখনো মিথ্যা কথা বলতো না। বরোজপোতার জঙ্গল থেকে পিতার সাথে মেটে আলু গোপনে তুলে আনার পর স্ত্রীর ভয়ে সহায়হরি মিথ্যা কথা বললেও মেয়ে ক্ষেন্তি কিন্তু মিথ্যে বলেনি। সে মার কাছে সত্য কথাটাই বলে দেয়।
ছোট বোনদের প্রতি ভালোবাসা : ছোট বোনদের প্রতি ক্ষেন্তির ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। সে রাধী ও পুঁটিকে নিয়ে একসাথে খেলা করেছে, পিঠা তৈরির সময় মার সঙ্গে একসাথে বসে সহযোগিতা করেছে, পুঁই এর চারা লাগিয়েছে। কখনো বোনদের সাথে ঝগড়া-বিবাদ করেনি।
হতভাগিনী ক্ষেন্তি : এক হতভাগিনী শান্ত নিরীহ মেয়ের নাম ক্ষেন্তি। বিয়ের বয়স না হতেই আশীর্বাদ হয়ে সে বিয়ে ভেঙে গেল। দ্বিতীয়বার চলিশোর্ধ এক পাত্রের সাথে বিয়ে হয়। যৌতুকের টাকা পরিশোধ না হওয়ায় সেখানেও চলে তার ওপর নানারূপ লাঞ্ছনা-গঞ্জনা অবশেষে বসন্ত রোগে বিনা চিকিৎসায় তাকে মরতে হয়।
মোটকথা, অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতায় বিভূতিভূষণ একটি বাস্তব চরিত্র হিসেবেই ক্ষেন্তিকে নির্মাণ করেছেন।
Musa Sir
Bangla
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910