
NTRCA School, প্রশ্ন- ‘হুযুর কেবলা’ গল্প অবলম্বনে হুযুর কেবলার চরিত্র বিশ্লেষণ
NTRCA School, প্রশ্ন- ‘হুযুর কেবলা’ গল্প অবলম্বনে হুযুর কেবলার চরিত্র বিশ্লেষণ কর।
অথবা, আবুল মনসুর আহমদ রচিত ‘হুযুর কেবলা’ গল্প অনুসরণে পীর সাহেবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দাও।
উত্তর : বিভাগ-পূর্বকালীন যে কয়জন মুসলিম সাহিত্যিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় আবুল মনসুর আহমত (১৮৯৮-১৯৭৯) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধানে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠকীর্তি ‘আয়না’ (১৯৩৫) গল্পগ্রন্থ।
‘আয়না’ গল্পগ্রন্থের বিশিষ্ট রচনা ‘হুযুর কেবলা’ গল্প। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হুযুর কেবলা। অসাধারণ শৈল্পিক মুন্সিয়ানা ও বাস্তব চেতনা দিয়ে এই চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন আবুল মনসুর আহমদ। এই চরিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে গল্পকার তৎকালীন সমাজের ভন্ড আর প্রতারক ধর্ম ব্যবসায়ীর স্বরূপই অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। নিচে হুযুর কেবলার চারিত্রিক বৈশিষ্টসমূহ তুলে ধরা হলো।
হুযুর কেবলার পরিচয় : গল্পে হুযুর কেবলা একজন বড় পীর বলে পরিচিত। ধর্মের বাণী আওড়িয়ে সে সবাইকে প্রতারিত করে। গল্পে লেখক তার প্রকৃত পরিচয় দেন নি। সে বয়সে প্রবীণ। মুখে মেহেদি রঙে রাঙান দাড়ি। সে পা তুলে রাখে, মুরিদরা তার পায়ে মুখ-বুক ঘষে। তার একতলা পাকা বাড়ি। বৈঠকখানাটি একটি প্রকান্ড খড়ের আটচালা ঘর। সেখানে মুরিদরা তার সামনে জানু পেতে বসে থাকে। ধর্মগুর” হিসাবে সে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে ভান করে কিন্তু আসলে সে ভন্ড ।
প্রতারক পীর সাহেব : ‘হুযুর কেবলা’ গল্পের পীর সাহেব ছিলেন একজন ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ী। নিজের স্বার্থের জন্য সে যে কোনো হীন কাজ করতে পিছপা হতো না। সে একদিকে যেমন ছিল প্রতারক তেমনি ছিল কুচক্রী এবং কুকর্মের দোসর। তার কুকর্মের সহযোগিতা করেছে কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগী। সে তাদের মাধ্যমে সহজ-সরল গ্রামবাসীকে প্রতারণার মাধ্যমে কেরামতি দেখিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করত। যেমন এমদাদের আগমন সম্পর্কে সুফি সাহেবের কাছ থেকে আগেই জানতে পেরে মজলিসে মুরিদদের মাঝে এমনভাবে প্রকাশ করছে তাতে মনে হলো সে তার আধ্যাত্ম শক্তি দিয়ে আগেই জেনেছে এমদাদের আগমন সম্বন্ধে। এ ছিল তার প্রতারণার কৌশলী দিক।
পীর সাহেব ভোজনপটু: পীর সাহেব নামে হুযুর কেবলা ছিলেন বেশ ভোজনপটু। নানা ধরনের খাবারে ছিল তার আসক্তি। একবার তার এক দূরবর্তী মুরিদানের বাড়িতে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে এক মণ ঘি, আড়াই মণ তেল, দশ মণ সর” চাল, তিনশত মুরগি, সাত সের অম্বুরি তামাক ইত্যাদি বজরায় তুলে রওয়ানা হলো। বিভিন্ন মুরিদদের বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার ধরণ দেখে এমদাদের মনে হয়েছিল, “পীর সাহেবের রুহানী শক্তি যত বেশিই থাকুক না কেন, তাঁর হজমশক্তি নিশ্চয়ই তার চেয়ে বেশি।”
নারীলোলুপ : বয়সে বৃদ্ধ হলেও পীর সাহেব ছিল নারীলোলুপ। পীর সাহেব নির্ধারণ করেছিল মাগরিবের পর পুরুষদের আর এশার নামাজের পর মেয়েদের ওয়াজ হবে। মেয়েদের ওয়াজে পুরুষের গমণাগমন ছিল একেবারে নিষিদ্ধ। দেখা গেল মেয়েদের সামনে ওয়াজ করতে করতে প্রায়ই তার জয্বা আসত অর্থাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলত। এতে মেয়েরা তার গা, হাত-টিপবে এটিই তার জয্বা আনার উদ্দেশ্য ছিল। বাড়িওয়ালার ছেলে রজবের সুন্দরী স্ত্রী এ ওয়াজে আসত। তাকে দেখে পীর সাহেবের মনে আলাদা লোভ জাগে। সে রজবের স্ত্রী কলিমনের দিকে ঘন ঘন তাকায় এবং তার মেধার প্রশংসা করে। অবশেষে মোরাকাবা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কৌশলে রজবের দ্বারা কলিমনকে তালাক দিয়ে নিজে কলিমনকে বিয়ে করে। কলিমনের আর্তনাদ রজবের বুকফাটা কান্না কোনো কিছুই পীর সাহেবকে দয়াদ্র করতে পারে নি।
ভন্ড পীর সাহেব : পীর সাহেব ছিল অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির মানুষ। সে চোখ বুজে এমন কেরামতির ভাব দেখাতো যা বিশ্বাস না করে আর উপায় থাকত না। আর সে জন্যেই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এমদাদও তার মুরিদ হতে বাধ্য হয়েছিল। সে প্রায়ই দেহে জয্বা এনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলত এবং জ্বলে গেলাম, পুড়ে গেলাম বলে চিৎকার করতে। জয্বার সময় কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে হাত-পা টিপে দিতে বলত। খলিফার সাথে গোপন পরামর্শে সে নিজের ইচ্ছাটা বলবৎ করেছে।
চরিত্রহীন পীর সাহেব : পীর সাহেব ছিল লম্পট ও চরিত্রহীন। নিজের কাম লালসাকে চরিতার্থ করার জন্য সে কৌশলে বদরুদ্দীন খলিফাকে মোরাকাবায় বসিয়ে রজবের স্ত্রী কলিমনকে পাওয়ার কূটকৌশল হাস্লি করেছে। এক পর্যায়ে রজবকে দিয়ে তার নিরপরাধ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে নিজেই বিয়ে করেছে। খলিফাকে দিয়ে সে ঘোষণা দিয়েছে কলিমন শুধু তার জন্য ফরজ। তার বিয়ের জন্য নবীজী খোদার আরশে তার নাম দেখে এসেছে এবং পীর সাহেব এ বিয়ে না করাতে তার পীরত্ব পূর্ণ হচ্ছে না। এভাবে চরিত্রহীন পীর সাহেব কূটকৌশলের মধ্য দিযে তার ইচ্ছাগুলো পূরণ করত।
মোটকথা, আবুল মনসুর আহমদ তাঁর নিপুণ তুলিতে তথাকথিত পীর সাহেবের চরিত্র তুলে ধরেছেন। আর এর মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজের ভন্ড-প্রতারক পীরদের স্বরূপই আমাদের সামনে অত্যন্ত সুন্দর ও বাস্তবভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
Musa Sir
Bangla
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910