
NTRCA School, প্রশ্ন: ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতায় মধুসূদন দত্তের যে মর্মবেদনা প্রকাশিত হয়েছে তার স্বরূপ
NTRCA School, প্রশ্ন: ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতায় মধুসূদন দত্তের যে মর্মবেদনা প্রকাশিত হয়েছে তার স্বরূপ নির্ণয় কর।
অথবা, ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতায় কবির মর্মবেদনার স্বরূপ উদ্ঘাটন কর।
ভূমিকা : আধুনিক জীবনবোধ ও শিল্প-চেতনায় সমৃদ্ধ মাইকেল মধুসূদন ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ত্রাতা। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ তাঁর অমর কীর্তি। তবে গীতিকবিতা রচনার ক্ষেত্রেও তিনি অসাধারণ শৈল্পিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। ‘আত্ম-বিলাপ’ তাঁর এরকমই একটি কবিতা। এ কবিতায় যন্ত্রণাপীড়িত কবি-জীবনের না পাওয়ার হাহাকার মর্মস্পর্শী ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে।
দ্বিধান্বিত কবিচিত্ত : মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই। মানুষ জীবনে যা আশা করে তার সবটুকুই সে পায় না। কবিও জীবনে যা চেয়েছেন তার সামান্যই তিনি পেয়েছেন। অর্থ, যশ, প্রভাব, প্রতিপত্তি, নারীর প্রেম ইত্যাদি নানাবিধ কামনার মোহ এবং বিচিত্র আশার কুহকে কবি হোঁচট খেয়েছেন বার বার। চরম হতাশার যন্ত্রণা নিয়ে ফিরে এসেছেন।
কবির হৃদয় যাতনার হেতু : দুটো নিয়তি নির্ধারিত মানবীয় প্রবণতার মধ্যে কবির আত্মবেদনার কারণ নিহিত রয়েছে। এক, মানুষ আশার কুহক থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না; দুই, মানুষ নিয়তির হাতের পুতুল। মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার সৃষ্টি এ দুটো কারণেই হয়ে থাকে। কবির মর্মবেদনার এ দ্বৈতরূপ আত্মা-বিলাপ কবিতায় চিরকালীন সত্যে পরিণত হয়েছে। ফলে কবিতাটি ব্যক্তির রোমান্টিক ভাবনা হয়েও সর্বজনীনতা লাভ করেছে।
কবির হৃদয় যাতনার স্বরূপ : পদ্মপাতার শিশির বিন্দুর মতোই ক্ষণস্থায়ী মানুষের জীবন, যা যেকোনো সময়ে শেষ হয়ে যেতে পারে। তবু ক্ষণস্থায়ী এ জীবনের প্রতি মানুষের প্রতি মানুষের কত মায়া। এই মায়ার বশবর্তী হয়ে মানুষ আশার কুহকে পড়ে কত কি যে করে তার ইয়ত্তা নেই। কবি এই সত্যে উপনীত যে, মানুষ তার জীবনের স্থায়িত্ব সম্পর্কে জানা সত্তে¡ও কেন মায়াজালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে কবিও এই ভুল স্বীকার করেছেন। এই ভুলের জন্য তিনি অনুশোচনায় দগ্ধ হয়েছেন এবং ভুলকে তিনি সহজভাবে নিয়ে ক্ষমা করতে পারেন নি।
আশাবাদী কবি : মানুষ আশাবাদী। আশা নিয়েই সে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। কবিও ছাত্র অবস্থায় এই আশার বশবর্তী হয়ে ভুল পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু আশা তাঁর সাথে ছলনা করেছে। ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে তাঁকে দিনযাপন করতে হয়েছে। এই আশাই তাকে স্বধর্ম, স্বভাষা, পৈত্রিকবন্ধন ছিন্ন করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। কবি সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বেদনায় মর্মাহত।
বেদনাহত কবি : যৌবনের দিনগুলো কবি পার করেছেন চরম উত্তেজনায়। বিশ্বখ্যাত কবি হবার বাসনা নিয়ে কবি বাংলা ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি ভাষাকে সাহিত্যের উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করেন। ঈধঢ়ঃরাব খধফু নামে একখানি গ্রন্থও রচনা করেন। কিন্তু ইংরেজ পাঠক গ্রন্থটিকে সমাদরে গ্রহণ করে নি। ভালোবাসা পাবার আশায় ইংরেজ নীলকর কন্যাকে বিয়ে করেন। সেখানেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এভাবে বহু বেদনা ও আঘাত তাঁর জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে। কবির এ আত্মদহন প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতায়।
কবির হৃদয়বেদনা : আত্ম-বিলাপ কবিতায় কবি তাঁর হতাশা, ব্যর্থতা ও হাহাকারের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। অর্থ, যশ, প্রভাব, প্রতিপত্তির মোহে পড়ে কবি সারা জীবন কাটিয়েছেন। জাতি, ধর্ম, দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি ত্যাগ করে বিজাতীয় উন্নত সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে তার জীবন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ক্রমাগত ছুটাছুটির কারণে তাঁর আয়ু ক্ষয় হয়ে গেছে। সে কথায় তিনি বলেছেন-
“দিন দিন আয়ুহীন, হীন বল দিন দিন,
তবু এ আশার নেশা ছুটিল না, এ কি দায়।”
কিন্তু আশা তবুও মানুষের পিছু ছাড়ে না। বিস্তৃত জীবন থেকে যৌবন ফুরিয়ে গেলেও মানুষের মন থেকে এ ভ্রান্তি দূর হয় না। কেবল না পাওয়ার হাহাকার গুমরে ওঠে-
“নারিলি হরিতে মণি দংশিল কেবল ফণী!
এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি, মন, কেমনে!”
কবির আত্মচেতনাবোধ : শেষ বিকেলে উপনীত হয়ে কবি হারানো দিনগুলোর কথা স্মরণ করে আক্ষেপ করেছেন। আজ কবি ভূলের কথা মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারছেন। এই জন্য নিজে নিজে দগ্ধীভূত হয়েছেন। তাঁর বুক ফেটে কান্না আসছে। এই ব্যর্থতার বেদনাকে কবি বুকে চাপা দিয়ে রাখতে না পেরে প্রলাপ শুর” করে দিয়েছেন। এ বিলাপ তাঁর আত্ম-বিলাপ। কবির কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে-
“রে প্রমত্ত মন মম! কবে পোহাইবে রাতি? জাগিবি রে কবে?”
উপসংহার : মানুষ আশার মায়বী জালে বন্দী হয়ে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। অনন্ত কাল থেকে মানুষ এই ভুল করে আসছে। মধুসূদন নিজেও এই ভুল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নি। এই ভুলের বাণী-বন্দনার শৈল্পিক নির্যাস ‘আত্ম-বিলাপ’ কবিতা।
Musa Sir
Bangla
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910