
NTRCA College: বিদ্যাসগরের অনুবাদমূলক সাহিত্য
প্রশ্ন: বিদ্যাসগরের অনুবাদমূলক সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য।
উত্তর: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য জীবনাদর্শ পরিস্রুত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) ছিলেন মানবতাবদী শিল্পী। তিনি একদিকে ছিলেন সমাজ সংস্কারক এবং তেমনি অন্যদিকে সাহিত্যিক। সাহিত্য ক্ষেত্রে অনুবাদক হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। যদিও তাঁর মৌলিক রচনার পরিমাণ নিত্যান্ত কম নয়। আবার তাঁর অনুবাদমূলক রচনাও ছিল মৌলিক রচনার পর্যায়ভুক্ত। কেননা, বিষয়ের ক্ষেত্রে তিনি মূল রচনার কাছে ঋণী হলেও উপস্থাপন, শিল্প-শৈলী এবং জীবনবোধের প্রশ্নে ছিলেন স্বকীয় বৈশিষ্ট্য পরিস্রুত। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে বিদ্যাসাগরের অনুবাদমূলক রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পী সত্ত্বার পরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস পাব।
শুধু শিল্প সাধনার অভিপ্রায়ে বিদ্যাসাগর সাহিত্য রচনা করেন নি। প্রয়োজনের গরজেই বিদ্যাসাগর সাহিত্য সাধনা শুরু করেন। প্রধানত অনুবাদের মাধ্যমেই বিদ্যাসাগরের সাহিত্য সাধনার সূচনা। বিদ্যাসাগরের অনুবাদমূলক রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা’, ‘সীতার বনবাস’, ‘কথামালা’, ‘অখ্যানমঞ্জরী’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘চরিতাবলী’, ‘বোধোদয়’, ‘জীবনচরিত’, ইত্যাদি। পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা পূরণের জন্যই তিনি এসমস্ত সাহিত্য রচনা করে। সংস্কৃত, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষা থেকে তিনি এই সমস্ত গ্রন্থ অনুবাদ করেন। তবে বিদ্যাসাগরের অনুদিত গ্রন্থ তাঁর মননশীলতা এবং অনুবাদ কর্মের নিপুণতার কারণে মৌলিক রচনার বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করা গৌরব অর্জন করেছে। বিশেষত এই সমস্ত রচনার গদ্য শৈলী বাংলা গদ্যকে নবযুগের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করে। যদি চিহ্নের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে এই সমস্ত সাহিত্যের গদ্য হয়ে উঠে প্রবহমাণ, গতীশীল এবং ছন্দময়। আর এ কারণেই বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের জনক হিসেবে বাঙালি পাঠকের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।
‘বেতালপঞ্চবিংশতি’ বিদ্যাসাগরের অন্যতম অনূদিত গ্রন্থ। এটি তিনি হিন্দি ‘বেতালপচ্ছিসী’ থেকে অনুবাদ করেন। এ গ্রন্থের বিদ্যাসাগর যথার্থ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। সমসাময়িক সাহিত্য সাধনার প্রভাবে এতে সংস্কৃত শব্দের আধিক্য থাকলেও এর গদ্য ছিল প্রবহমাণ এবং গতিশীল। কালীদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম নাটক থেকে অনূদিত বিদ্যাসাগরের শকুন্তলা গ্রন্থের গদ্যও বেতলাপঞ্চবিংশতি গ্রন্থের অনুরূপ। তবে এখানে চরিত্র অনুযায়ী ভাষা প্রয়োগ করে বিদ্যাসাগর যথার্থ সাহিত্যিকের পরিচয় তোলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। সংস্কৃত গ্রন্থ থেকেই বিদ্যাসাগর সীতার বনবাস অনুবাদ করেন। তবে এই গ্রন্থে শকুন্তলার লালীত্য নেই।
তার পরিবর্তে এখানে এসেছে গাম্ভীর্য। অর্থাৎ ভাষা এখানে হয়ে উঠেছে বিষয়ানুগ। বিদ্যাসাগর যে সচেতন শিল্পী ছিলেন এখানেই তার প্রমাণ মেলে। বিষয় অনুযায়ী ভাষা গড়ে তোলা যে কোন সাহিত্যিকের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয়। একজন সাহিত্যিকের আসল পরীক্ষা এখানেই। তবে বিদ্যাসাগর এই পরীক্ষায় স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই উত্তীর্ণ হয়ে ছিলেন। বোধোদয় বিদ্যাসাগরের আরেকটি অন্যতম রচনা। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যাসাগর বালক বালিকাদের বুদ্ধির দ্বার খোলে দিয়েছেন। এর আবেদন হৃদয়ের কাছে নয়, বুদ্ধির কাছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়কে তিনি এখানে আবেগশূন্য অথচ ঝরঝরে ভাষায় তোলে ধরেছেন। আর এ গ্রন্থের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তবুদ্ধি চর্চার দ্বারকেও করেছেন উন্মোচিত। ১৮৬৯ সালে বিদ্যাসাগর শেক্সপীয়ারের নাটক কমেডি অব ইরোর এর গদ্যানুবাদ করেন ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নামে। শুকুন্তলার মতো এটিও উপন্যাস আকারে রচিত। এখানেও বিদ্যাসাগর যথার্থ শিল্পীর ভূমিকায় আবির্র্ভত। ‘জীবনচরিত’ ও ‘চরিতাবলী’র মধ্য দিয়ে বিদ্যাসাগর বাংলা সাহিত্যের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। কেননা, এর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে জীবনী সাহিত্য রচনার সূচনা ঘটে। মোটকথা অনুবাদ মূলক রচনার মধ্য দিয়েও বিদ্যাসাগর মৌলিক শিল্পীর বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করার গৌরব অর্জন করেছেন।
তবে অনেক সমালোচক বিদ্যাসাগরকে শুধু অনুবাদক হিসেবেই দেখেছেন, যথার্থ সাহিত্যকর মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত হয়েছেন। তবে সমালোচকদের এই মূল্যায়ন সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। কেননা, বিদ্যাসাগর শুধু অনুবাদকই ছিলেন না, তিনি অনেক মৌলিক সাহিত্যও রচনা করেছিলেন। আবার বিদাসাগরের প্রতিভার গুণে অনেক অনুবাদ সাহিত্যও মৌলিক সাহিত্যের চরিত্র-লক্ষণকে স্পর্শ করেছে।
শুধু অনুবাদক হিসেবেই যাঁরা বিদ্যাসাগরকে মূল্যায়ন করেছেন, তাঁরা বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ইতিহাসকে বিস্মৃত হয়েই তা করেছেন। বাংলা সাহিত্য অনুবাদ বা অনুকরণের মাধ্যমেই বিকশিত হয়েছে। অনুবাদ-অনুকরণ বাদ দিলে মধ্যযুগে কোন সাহিত্যই পাওয়া যাবে না। কেননা, সমগ্র মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যই অনুবাদধর্মী রচনায় পূর্ণ। মধ্যযুগে আরবি, ফারসি, সংষ্কৃত ও হিন্দি ভাষা থেকে যেমন অনুবাদ হয়েছে তেমনি বিভিন্ন কাহিনী বা বিষয়ের অনুবৃত্তিও ঘটেছে। অথচ সে সময়কার কবিগণ প্রতিভাহীন ছিলেন না, বরং তারা স্বীয় প্রতিভাগুণে ছিলেন দীপ্যমান। কৃত্তিবাস, কাশীরামদাশ, আলাওল, দৌলত কাজী, মুকুন্দরাম, ভারতচন্দ্র আমাদের সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র। আবার একই বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেও বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।
তাঁদের মৌলিকতা তাঁদের কাব্যের প্রকাশে, ভাষায়, ছন্দে, উপমা নির্বাচন ও প্রয়োগে, শিল্প মাধুর্য ও রস পরিণামে-বিষয় বৈচিত্র্যের স্বকীয়তায় নয়। যদিও শিল্প বিচারে লেখকের ভাব অবশ্যই বিশিষ্টতার দাবী রাখে, কিন্তু ভাবই সব নয়। পরের ভাবকে আপন করে তা আবার পরের জন্য রসমন্ডিত করে উপহার দিতে পারলেই তা সার্থক সাহিত্য হয়ে উঠে। বিদ্যাসাগর সেই কাজটি করেছিলেন অতি নিপুণ হাতে, বিদ্যাসুন্দর কাহিনী উপহার দিয়ে যেমন করে ছিলেন ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর। ভারতচন্দ্র মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, অথচ তাঁর মৌলিক রচনার জন্য নয়, বরং ছন্দ, অলঙ্কার ও ভাষা নির্মাণ দক্ষতার জন্য। আর এ কারণেই ভারতচন্দ্রকে বলা হয় ভাষার কবি, ভাবের নয়। বিদ্যাসাগর সম্বন্ধ্যেও আলোচ্য মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। তিনি সার্থক শিল্পী, অনুবাদক মাত্র নন। তাঁর এই সার্থকতা পুরাতন বিষয়কে নতুন করে উপস্থাপন করার দক্ষতার উপর নির্ভশীল। বিদ্যাসাগরের ভাষা সৃষ্টির কৌশল, ছন্দ প্রবাহ সৃষ্টির দক্ষতা, ধ্বনিময় শব্দসংযোজনার পারঙ্গমতা, সুষম ললিত পদবিন্যাসের ক্ষমতা এবং বিষয় অনুযায়ী ভাষা নির্মাণের কারুকর্ম তাঁকে বাংলা গদ্যের জনকের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস বা শকুন্তরায় অলৌকিতা নেই, এগুলো শাব্দিক অনুবাদ নয়, ভাবানুবাদ। এই ভাবানুবাদ একান্তই বিদ্যাসাগরের শিল্পপ্রতিভার স্পর্শে শেল্পিক সুষমা লাভ করেছে।
ভাষা ব্যবহারে বিদ্যাসাগর ভারতচন্দ্রীয় রীতিকেই অনুসরণ করেছেন। তিনি বিষয়, চরিত্র ও পরিবেশ অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার করে কাহিনীকে বাস্তবতা দিয়েছেন এবং ললিত মধুর শব্দ ব্যবহার করে শৈল্পিক মহিমা দান করেছেন। মূলের অলৌকিকতাকে বিদ্যাসাগর তাঁর অনুবাদে স্থান দেয় নি এবং দেব মহিমার পরিবর্তে মানব মহিমাকে বড় করে তোলেছেন। বর্ণনার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর জটিলতাকে পরিহার করে সহজতাকেই ধারণ করেছন। ফলে অনুবাদ সত্ত্বেও বিদ্যাসাগরের রচনা মৌলিক রচনার বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করার গৌরব অজর্ন করেছে।
***********************************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910