
NTRCA College: বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে শিল্পবোধ ও সমাজ চৈতন্যের দ্বন্দ্বের স্বরূপ
প্রসঙ্গ : বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে শিল্পবোধ ও সমাজ চৈতন্যের দ্বন্দ্বের স্বরূপ আলোচনা কর।
উত্তর: সময়, সমাজ, ইতিহাস ও সভ্যতার আন্তর-সত্যকে আত্মীকরণ করেই শিল্পীর উদ্ভব বিকাশ। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহিত্য-শিল্পী ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) সম্বন্ধেও এ সত্য প্রাসঙ্গিক। কারণ, ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫) থেকে শুরু করে ‘সীতারাম’ (১৮৮৭) পর্যন্ত তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে সময় ও সাজের ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট। তাছাড়া সময় ও সমাজের সত্যকে স্বীকার করার ফলেই তাঁর কোনো কোনো উপন্যাস জীবনবোধ ও শিল্পবোধের প্রশ্নে হয়ে পড়েছে অসঙ্গতিপূর্ণ। আবার কোনো কোনো উপন্যাস পরিণত হয়েছে, অনন্য শিল্প কর্মে। তবে তাঁর উপন্যাস জীবনবোধ ও শিল্পরোধের দ্বন্দ্বে হয়েছে দীর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বঙ্কিমচন্দ্রের সামজিক উপন্যাস। আবার কিছু রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক উপন্যাসও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। আমাদের আলোচ্য নিবন্ধে বঙ্কিমের শৈল্পিক দ্বন্দের স্বরূপ নির্ণয়ের প্রয়াস পাব।
বঙ্কিমচন্দ্রের শিল্পচৈতন্য ও জীবন-বোধ গঠনে তিনটি বিষয় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। এই বিষয় তিনটি হলো-
প্রথমত; বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাই হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস, ভারতীয় দর্শন ও ঐতিহ্য তাঁর মধ্যে গ্রথিত ছিল।
দ্বিতীয়ত; তিনি ছিলেন পাশ্চাত্য জীবনবোধ ও আধুনিক জীবন চেতনায় পরিস্রুত। উপরক্ত রেনেসাঁসায়ী জীবন দর্শন তাঁর মধ্যে বিশেষ ভাবে ক্রিয়াশীল ছিল।
তৃতীয়ত; তিনি ছিলেন ইংরেজ সরকারের চাকুরে, ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট।
উল্লিখিত তিনটি বিষয়ই প্রত্যক্ষে কিংবা পরোক্ষে বঙ্কিমচন্দ্রের সমস্ত সাহিত্য কর্মে ক্রিয়াশীল ছিল। যে সাহিত্য কর্ম এই তিনটি বিষয় সামঞ্জস্য লাভ করেছে, শৈল্পিক বিবেচনায় সেটিই অনন্যতা লাভ করেছে। এবং এর বিপরীতে শিল্পকর্মটি হয়ে উঠেছে সংকট দীর্ণ।
বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন মূলত জগৎ ও জীবন রসিক এবং সুক্ষ্ম ও তীক্ষ্ম দৃষ্টি সম্পন্ন পর্যবেক্ষক। প্রতীচ্য বিদ্যায় উচ্চ শিক্ষিত বঙ্কিমচন্দ্র মিল-বেন্থাম কোঁতের হিতবাদ মানবতাবাদে ছিলেন বিশ্বাসী। কোঁতের মত বঙ্কিমও সমাজের অসীম গুরুত্ব স্বীকার করতেন এবং মানুষের প্রতিও তাঁর ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা ও সহানূভূতি। মানুষের কল্যাণ কামনাই তিনি করেছেন-ভাব চিন্তা কর্মে। জগৎ ওজীবন সম্পর্কে সংস্কারমুক্ত স্বচ্ছ ও উদার ধারণা নিয়েই তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরু। তাঁর সামাজিক উপন্যাসে এই চেতনার প্রবাহ থেকেছে অব্যাহত।
তবে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে শিল্প ও সংকল্পের বিরোধ বেঁধেছে বারবার। যে আপাত সংকল্প নিয়ে তিনি একটি উপন্যাস রচনায় হাত দিয়েছেন রচনা কালে তার বিস্মৃতি ও বিচ্যুতি ঘটেছে। শিল্পী তাই জয়ী, সংকল্প লক্ষ্যভ্রষ্ট, দিশেহারা। তিনি দেশ, জাতি ও শাস্ত্র সমাজের নীতি প্রবক্তার হিতকামীর ও মঙ্গল সাধকের পবিত্র কাঠোর সংকল্প ও দায়িত্ব নিয়ে উপন্যাস রচনায় হাত দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কাহিনীর শুরু থেকে পরিণামপূর্ব পর্যন্ত মানবজীবনের রহস্য আবিস্কারে থেকেছেন ব্যস্ত। তখন তিনি একজন নিবিষ্ট চিত্ত নিপুণ শিল্পীমাত্র। তারপর তাঁর কাঙক্ষিত জীবন চিত্রের সমাপ্তি মুখে তিনি সম্বিৎ ফিরে পান; তখন দায়িত্ব ও কতর্ব্য সচেতন বঙ্কিম তাঁর উদ্দিষ্ট বক্তব্য আকস্মিক ও অসঙ্গত ভাবে শেষ পরিচ্ছেদে যেমন তেমন করে সন্নিবেশ করেছেন। ফলে বঙ্কিমের শিল্পবোধ ও সমাজচেতনার মধ্যে সৃষ্টি হয় শৈল্পিক দ্বন্দ্ব। বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যান্য উপন্যাসের মত ‘বিষবৃক্ষ’, ‘রজনী’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ সম্পর্কেও এ সত্য প্রাসঙ্গিক।
‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ বঙ্কিমচন্দ্রের পরিপূর্ণ সামাজিক উপন্যাস। আলোচ্য দুটি উপন্যাসের পরিণতিই করুণ রসাত্মক। এদের ট্রাজিক পরিণতির মূলে রয়েছে অনিবার্য রূপতৃষ্ণা ও রমণীরূপমুগ্ধ পুরুষের প্রবৃত্তি দমনে অক্ষমতা। চিত্ত শুদ্ধি বা আত্মসংযমের যে নীতি বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রায় সব উপন্যাসে প্রচার করেছেন তার সূচনা হয় ‘বিষবৃক্ষে’। হিন্দু ধর্মের বিধান অনুযায়ী বিধবা বিবাহ পাপ, অন্যায়-তা সুনীতি বিরুদ্ধ এবং এর জন্য শাস্তি অনিবার্য। আমাদের আলোচ্য বিষবৃক্ষ উপন্যাসে বিধবা কুন্দনন্দিনীকে বিবাহ করার ফলে নগেন্দ্রনাথের জীবনে যে বিপর্যয় নেমে আসে তাই চিত্রিত হয়েছে।
আত্মীয় পরিজনহীন বিধবা কুন্দনন্দিনী নগেন্দ্রনাথের গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করলে, নগেন্দ্রনাথ রূপমুগ্ধ হয়ে কুন্দনন্দিনীকে বিবাহ করে। এই বিয়ের ফলে নগেন্দ্রনাথ ও সূর্য্যমুখীর জীবন সংকট নেমে আসে। কুন্দনন্দিনীর আত্মহত্যার মধ্যদিয়ে সংকটের অবসান ঘটে। অনেকের ধারণ কুন্দনন্দিনীর এই আত্মহত্যা অশৈল্পিক। এখানে কুন্দনন্দিনীর অপরাধ তার রূপ ও নগেন্দ্রের প্রতি প্রেমাসক্তি। তাঁদের যুক্তি নীতিবোধ শাসিত বঙ্কিমই কুন্দনন্দিনীর মৃত্যুর ঘটনাটা ঘটিয়েছে। আদর্শবাদী বঙ্কিমের নীতিকতা প্রচারই যে উদ্দেশ্য তা বিষবৃক্ষের শেষ চরণটি লক্ষ করলেই বুঝা যায়-
“আমরা বিষবৃক্ষ সমাপ্ত করিলাম। ভরসা করি ইহাতে ঘরে ঘরে অমৃত ফলিবে।”
কিন্তু যথার্থ অর্থে বিচার করলে দেখা যাবে যে, কুন্দনন্দিনীর প্রতি বঙ্কিমের এ সিদ্ধান্ত ছিল সময় শাসিত, নীতি শাসিত নয়। কুন্দনন্দিনীর মৃত্যুর মধ্যদিয়ে সময়ের একটি দাবীই প্রতিষ্ঠিত হলো মাত্র। একজন শিল্পী হিসাবে বঙ্কিমচন্দ্র বরং কুন্দনন্দিনীর প্রতি মমত্ববোধেরই পরিচয় দিয়েছেন। কুন্দনন্দিনীর প্রতি বঙ্কিমের মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায় কুন্দর মৃত্যুর পর দু’টি উপমা প্রয়োগের মাধ্যমে। যেমন:
১। ক্রমে ক্রমে তৈন্যভ্রষ্টা হইয়া স্বামীর চরণ মধ্যে মুখ রাখিয়া, নবীন যৌবনে
কুন্দনন্দিনী প্রাণত্যাগ করিল। অপরিস্ফুট কুন্দকুসুম শুকাইল। (ঊনপঞ্চাশতম পরিচ্ছেদ)
২। পরে নগেন্দ্র ধৈর্য্যাবলম্বনপূর্ব্বক কুন্দকে নদীতীরে লইয়া যথাবিধি
সৎকারে সহিত সেই অতুল স্বর্ণপ্রতিমা বিসর্জন করিয়া আসিলেন।
উল্লেখ্য, এ কথা স্বীকৃত যে, উপমা-রূপকের মধ্যদিয়ে শিল্পীর যথার্থ চৈতন্য প্রতিফলিত হয়।
বঙ্কিমচন্দ্র কৃষ্ণকান্তের উইলে বিধবা বিবাহের বিরোধিতা করেছেন, একথা ঠিক নয়। উপন্যাসে আভ্যন্তর সত্য এই সাক্ষ্য বহন করে না। কৃষ্ণকান্তের উইলে বিধবা রোহিণীকে ঘিরেই উপন্যাসের সঙ্কট পেয়েছে গতিময় পরিণতি। গোবিন্দলালের অসংযত রূপতৃষ্ণার কারণেই গোবিন্দলাল, ভ্রমর ও রোহিণীর জীবনে নেমে আসে করুণ পরিণতি। গোবিন্দলালের মনোবিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখক তাই বলেন-
ভ্রমরকে ত্যাগ করিয়া রোহিনীকে গ্রহণ করিলেন-রোহিণীকে গ্রহণ করিয়াই
জানিয়াছিলেন যে, এ রোহিণী ভ্রমর নহে, এ রূপতৃষ্ণা, এ স্নেহ নহে –এ ভোগ,
এ সুখনহে-ভ্রমর অন্তরে রোহিণী বাহিরে। (পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ)
গোবিন্দলালের এই উপলব্ধিই পরিণামে রোহিণীর জীবনে নিয়ে আসে চরম বিপযর্য। রোহিণী চরিত্রের এই পরিণাম ও বিপর্যয় হয়ে উঠে বিতর্কিত। অনেকের ধারণা বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনী এবং কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের রোহিনীর জীবনের পরিণাম নীতিবোধ শাসিত বঙ্কিম-মানসের ফল। শেষোক্ত ধারণায় যারা বিশ্বাসী তাঁদের মধ্যে শরৎচন্দ্র অন্যতম। তাঁর মতে হিন্দুত্বের চেতনায় বিশ্বাসী হয়েই বঙ্কিমচন্দ্র গোবিন্দলালকে দিয়ে রোহিণীকে হত্যা করিয়েছেন। তিনি আরো দেখান যে, গোবিন্দলালের প্রতি রোহিণীর ছিল গভীর প্রেম ও ভালবাসা এবং গোবিন্দলালের জন্য সে আত্মবিসর্জন দিতে প্রয়াস পায়। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে রোহিণী আত্মবিসর্জণ দিতে উদ্যোত হয়েছে-নৈরাশ্য, পরাজয় চেতনা ও জিগীষাবোধ থেকে। রোহিণীর মধ্যে ছিল এক প্রবল জিগীষাবোধ। আর এজন্য তার মুখে শুনি-
“নারী হইয়া জেয় পুরুষ দেখিলে কোন, নারী না তাহাকে জয় করিতে কামনা করিবে?
এই রোহিণীই গোবিন্দলালকে প্রলুব্ধ করে বিজয়ের পূর্ণতা উপলব্ধি করে ছিল এবং সেই উপলব্ধিই তাকে নিশাকর সম্ভোষণে প্রণোদিত করেছিল।
তাছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র রোহিণীকে যথার্থ মানবিক গুণে গুণান্বিত করে অঙ্কন করতে প্রয়াসী ছিলেন। ফলে রোহিণী হয়ে উঠে রক্তে মাংসে গড়া এক বাস্তব মানুষ। কামনা বাসনা নিয়ে এক জীবন্ত মানুষ হিসাবে সে আমাদের সম্মুখে উন্মোচিত হয়। এর পিছনে মধ্যে সক্রিয় ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের পাশ্চাত্য জীবনাদর্শন ও স্রষ্টাসুলভ উপলব্ধি। তাই বিধবা পাপিষ্ঠা বলে রোহিনীর প্রতি বঙ্কিমের কোন বিদ্ধেষ নেই। বরং তার প্রতি যথার্থ মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায় নিম্নলিখিত বর্ণনায়-
রোহিনীর অনেক দোষ-তার কান্না দেখে কাঁদিতে ইচ্ছে করে কি ? করে না।
কিন্তু অত বিচারে কাজ নাই! পরের কান্না দেখিলেই কাঁদা ভালো। দেবতার মেঘ কণ্টক ক্ষেত্র দেখিয়া বৃষ্টি সম্ভরণ করে না?
উল্লিখিত বর্ণনায় বিধবা যৌবনাবতী রোহিণীর প্রতি বঙ্কিমের মমত্ববোধই উন্মোচিত হয়েছে। তাই আমরা বলতে পারি, জ্ঞকৃষ্ণকান্তের উইলঞ্চ উপন্যাসে আমরা যে রোহিণীর পরিচয় পাই তা সময় ও সমাজের অনিবার্য ফলমাত্র, নীতিবোধ ও ধর্মীয়চেতান পরিস্রুত বঙ্কিম মানসের সৃষ্টি নয়। সুতরাং কৃষ্ণকান্তের উইলে রোহিণীর পরিণাম অসঙ্গতিপূণ নয়, বরং শিল্প সঙ্গতিপূণ।
সুতরাং উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, বঙ্কিমের উপন্যাসে পরিণামগত যে অসামঞ্জস্য দেখা যায় তা নীতিবোধ শাসিত বঙ্কিম-মানসের ফল নয়। তাছাড়া বঙ্কিমচন্দ্র বিধবা বিবাহের বিরোধী ছিলেন, উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ তা প্রমাণ করে না। বরং রূপজ মোহ এবং অনিয়ন্ত্রিত কামচেতনাই যে উল্লিখিত উপন্যাস সমূহের সংকটের জন্য দায়ী তাই প্রমাণিত হয়। তাই আমরা বলতে পারি যে, শিল্পী বঙ্কিম ও নীতিবাদী বঙ্কিমের দ্বন্দ্বে শিল্পী বঙ্কিমই শুদ্ধতার সীমায় উত্তীর্ণ।
**********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910