
NTRCA College : উপন্যাস হিসেবে বিষাদ সিন্ধুর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
প্রসঙ্গ: উপন্যাস হিসেবে বিষাদ সিন্ধুর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা কর।
উত্তর: বঙ্কিম-রবীন্দ্র যুগে আবিভূর্ত হয়েও যে কয়জন সাহিত্যিক আপন স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পেরে ছিলেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বিষয় বৈচিত্র্য, জীবন-চেতনা ও শিল্প-শৈলীর প্রশ্নে তিনি উনিশ-বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র ভুবনের স্রষ্টা। ‘বিষাদ সিন্ধু’ এই স্বতন্ত্র ভুবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। চরিত্র সৃষ্টি, ভাষা নির্মিতি, কাহিনী বিন্যাস ও জীবনচেতনার প্রশ্নে ‘বিষাদ সিন্ধু’ শুধু মীর মশাররফ হোসেনের নয়, বাংলা সাহিত্যেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অভিনব সৃষ্টি। ‘বিষাদ সিন্ধু’ কারবালার বিষাদময় ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে রচিত গদ্য কাব্য জাতীয় এক ধরনের সংকর রচনা। তবে কোনো কোনো সমালোচক ‘বিষাদ সিন্ধু’-কে উপন্যাসে হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের এই মূল্যায়ন যে অমূলক তা নয়, কেননা, উপন্যাসের যথার্থ পরিমাণ গুণে এই রচনায় একটু অভিনিবেশের সাথে লক্ষ করলেই অনুধাবন করা যায়। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে ‘বিষাদ সিন্ধু’র শিল্প-শৈলী বিবেচনার প্রশ্নে উপন্যাস হিসেবে এর গুণাগুন বিচারের প্রয়াস পাব।
রচনাগুণের কারণে ‘বিষাদ সিন্ধু’ মীর মশাররফ হোসেনের এক অভিনব সৃষ্টি। এটি তিন পর্বে রচিত এক সু-বিশাল গ্রন্থ। এর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ এবং ১৮৯০ সালে। উপক্রমনিকা ও উপসংহারসহ একষট্রি প্রবাহে রচিত এর অধ্যায় সংখ্যা মোট তেষট্রি। সম্ভবত উনিশ শতকের অন্যতম জনপ্রিয় গ্রন্থ এটি। কাহিনী বিন্যাসের অভিনবত্বই এই জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। তাছাড়া হাসান-হোসেন ও এজিদের ঐতিহাসিক কাহিনীর সাথে অলৌকিক ঘটনাবলীও একে দিয়েছে জনপ্রিয়তার ভিন্নমাত্রা। অন্যদিকে অলৌকিক ও কাল্পনিক ঘটনা প্রবাহ পাঠকের আকাশচারী কল্পনাকেও করেছে প্রবল ভাবে পরিতৃপ্ত।
‘বিষাদ সিন্ধু’ রচনার মধ্য দিয়ে লেখক ইতিহাস রচনা করতে চান নি কিংবা ধর্মীয় সাহিত্যও রচনা করতে চান নি। এরুপ কোনো উদ্দেশ্য লেখকের ছিল না। বরং এই গ্রন্থে লেখক প্রচুর পরিমাণে অনৈতিহাসিক, অলৌকিক ও কাল্পনিক ঘটনার সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ইতিহাসকে অনেকাংশেই বিকৃত করেছে। কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান, ঐতিহাসিক কয়েকটি চরিত্র এবং কারবালায় হোসেনের হত্যা ব্যতীত এই সুবিশাল গ্রন্থে মশাররফ হোসেন কল্পলোকের কাহিনীই বর্ণনা করেছেন। তাই ‘বিষাদ সিন্ধু’ পাঠে কখনই মনে হয় না লেখক কোনো ধর্মীয় চেতনা নিয়ে বা কোনো আদর্শ প্রচারের জন্য সাহিত্য সাধনাব্রতী হয়েছেন। বরং আধুনিক মানবীয় চেতনা থেকেই লেখক এই গ্রন্থ রচনা করেছেন। ফলে আমরা এই গ্রন্থে লক্ষ করি যে, রসুল দৌহিত্র ইমাম ভ্রাতৃদ্বয় ও আবু হানিফা নির্জীব পুতুল মাত্র। অন্যদিকে ধর্মদ্রোহী এজিদ হয়ে উঠেছে রক্তে-মাংসে গড়া বাস্তব জীবন্ত মানুষ।
প্রকৃত পক্ষে মশাররফ হোসেনের ছিল খাঁটি ঔপন্যাসিক প্রতিভা। তাই ‘বিষাদ সিন্ধু’ ইতিহাস আশ্রয়ী কাহিনী হওয়া সত্ত্বেও লেখক ঐতিহাসিক সত্যতা রক্ষায় মোটেও সতর্ক ছিলেন না। গ্রন্থটি ধমীর্য় কাহিনীর আবরণে আবৃত হলেও ধর্মগ্রন্থ হয়ে উঠেনি। বরং হয়ে উঠেছে পরিপূর্ণ মানবমুখী সাহিত্য, উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য পরিস্রুত যথার্থ শিল্প সফল রচনা। এ প্রসঙ্গে সমালোচক মুস্তাফা নুরউল ইসলাম বলেন-
‘আখ্যান বিকাশে, চরিত্র সৃষ্টিতে, সংলাপ রচনায় এবং রস পরিবেশনায় এ গ্রন্থ উপন্যাসের মযার্দা লাভ করেছে। মশাররফ হোসেনের জাগর চিত্তের বাসনা যাই থাকুক না কেন মানবতাভাগ্যের করুণ অবশ্যম্ভাবী পরিণতি অংকেনেই তাঁর শিল্পী সত্তা স্বাচ্ছান্দ্য পেয়েছে।’
‘বিষাদ সিন্ধু’র উপন্যাসগুণ সর্বাধিক বিকাশ লাভ করেছে এজিদ চরিত্রটিকে অবলম্বন করে। এ উপন্যাসের উজ্জ্বতম চরিত্র এজিদ। এজিদের মনোদুঃখের সাথে ‘বিষাদ সিন্ধু’র সূত্রপাত এবং এজিদের ট্রাজিক পরিণতিতে এ গ্রন্থের উপসংহার। এজিদই এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং কাহিনীর ক্ষমতাধর নিয়ন্তা। বলা যেতে পারে সামগ্রিকভাবে ‘বিষাদ সিন্ধু’ এজিদেরই কাহিনী। হোসেনের ভূমিকা এই গ্রন্থে গৌণতর-কাহিনী ও ঘটনা নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত ক্ষীণ।
এজিদের অন্তরের অপ্রতিরোধ্য রূপতৃষ্ণা ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু। রিপু শাসিত আবেগময়, পৌরষদৃপ্ত একটি বলিষ্ঠ মানুষ লেখকের শিল্পদৃষ্টিতে নায়কের মহিমায় উদ্ভাসিত। তাই ইতিহাসের মরু প্রান্তর নয়, এজিদের প্রেমদীর্ণ হৃদয়ই এখানে কারবালায় রূপান্তরিত হয়েছে। বিষাদের উত্তাল তরঙ্গ সমূহের উৎস এজিদের হৃদয়-সিন্ধু। ঔপন্যাসিক সমস্ত শৈল্পিক আবেগ দিয়ে অত্যন্ত যত্নের সাথে এজিদ চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন। এজিদ মর্ত্যবাসী মানুষের গুণেগুনান্বিত। একদিকে সে দুঃসাহসী বীর, অন্যদিকে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত হৃদয়। সে পরিপূর্ণ মানবিক কিন্তু নিমর্মতাও তার চরিত্রের ভূষণ। লেখক তাঁর গ্রন্থে এজিদকে দুর্বৃত্ত বলে চিহ্নিত করেন নি, তাকে অপরাধী প্রতিপন্ন করেন নি। এই গ্রন্থে নিয়তি মানব ভাগ্য নিয়ে নিষ্ঠুর ক্রীড়ায় উন্মত্ত। আর এই নিয়তির দুর্বোধ্য স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হতভাগ্য মানুষ এজিদ। উদ্ধার পর্বে তাই অসহায় নিজেদের স্বাগত প্রশ্ন।
‘কেন হেরিলাম? সে জ্বলন্ত রূপরাশির প্রতি কেন চাহিলাম? হায়! হায়! সেই একদিন, আর আজ একদিন! কি প্রমাদ। প্রেমের দায়ে কি না ঘটিল!’।
উপন্যাসটির রচনা রীতির ক্ষেত্রে লেখকের একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। প্রথম সুযোগেই অবিলম্বে পাঠক চিত্তের সাথে অন্তরঙ্গতার যোগসূত্র স্থাপনে লেখক অত্যন্ত ব্যগ্র। আর এর কারণেই অতি সহজেই পাঠক স্বয়ং সমগ্র কাহিনীর অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে। অতঃপর ঘটনা প্রবাহের বিচিত্র উত্থান পতন, চরিত্রসমূহের দ্বন্দ্ব, সংকট, জয় পরাজয়ের সাথে পাঠকের চিত্ত সমভাবেই আন্দোলিত হতে থাকে। আর পাঠক তখন ঘটনা প্রবাহের নিরব দ্রষ্টা থাকেন না, বরং কাহিনীর সুখ দুঃখের সাথে হয়ে উঠেন সমভাগী।
উপন্যাসের প্রাণ প্রবাহ হলো এর ভাষা। যথার্থ ভাষা নির্মিতির মধ্যদিয়ে একটি উপন্যাস হয়ে উঠে গতিশীল। এর বিপরীতে উপন্যাসের গতি হয় শ্লথ, বিরুক্তি উৎপাদক। কিন্তু ‘বিষাদ সিন্ধু’ সে সীমাবদ্ধতাকে অতি সহজেই অতিক্রম করেছে। শব্দযোজনায়, উপমা অলঙ্কারের ব্যবহারে, বাগধারার বহুমাত্রিক প্রয়োগে, সন্ধি সমাসযুক্ত বাক্য রচনায় ‘বিষাদ সিন্ধু’র ভাষা হয়ে উঠেছে গীতশীল, প্রাণবস্ত। তাছাড়া ‘বিষাদ সিন্ধু’র ভাষা কখনও কখনও হয়ে উঠেছে আবেগময় কাব্যিক। যা কাহিনীর মূল সুরকে প্রবল ভাবে অভিব্যঞ্জিত করেছে। উদাহরণের মাধ্যমে এই বক্তব্যের সমর্থন নেয়া যেতে পারে।
‘আশা মিটিবার নহে। মানুষের মনের আশা পূর্ণ হইবার নহে। ঘটনার সূত্রাপাত হইতে শেষ পর্যন্ত অনেকের মনে অনেক প্রকারের আশার সঞ্চার হয়। আশার কুহক মাতিয়া অনেকে পথে অপথে ছুটিয়া বেড়ায়।’
অর্থাৎ উপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রতিপন্ন হয় যে, ‘বিষাদ সিন্ধু’ গ্রন্থ অনেকটাই উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য পরিস্নাত। তবে এ কথা সত্য যে, উপন্যাসের অনেক বৈশিষ্ট্য আলোচ্য গ্রন্থে নেই। আর এ দিক লক্ষ রেখেই মুহম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান কৃত বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে উচ্চারিত হয়েছে-
‘বিষাদ সিন্ধু’ খাঁটি ঐতিহাসিক নয়, জীবনচরিত্রও নয়, তেমনি আঁটঘাট বাঁধা বিধিবদ্ধ organic plot -এর উপন্যাসও নয়। এ ইতিহাস, উপন্যাস, সৃষ্টিধর্মীয় রচনা ও নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের সর্ববিধ সংমিশ্রণে রোমান্টিক আবেগমাখানো এক শংকর সৃষ্টি। এতে উপন্যাসের চেষ্টা আছে, একটা মূল আবেগও আছে, শিথিল বিন্যস্ত প্লটকে একীকরণের চেষ্টা আছে, সংলাপ আছে এবং সমগ্র আখ্যানকে একটা পরিণতি দেবার সজ্ঞান প্রচেষ্টা আছে। তবু ‘বিষা্দ সিন্ধু’ সমালোচনার মাপকাটিতে কোন বিশেষ এক ধরনের সৃষ্টি নয়।’
তবুও অনেক সমালোচক ‘বিষাদ সিন্ধু’-কে উপন্যাস হিসেবেই মূল্যায়ন করেছেন। উপন্যাসের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য এতে উপস্থিত না থাকলেও মৌল কাঠামোতে এটি একটি উপন্যাস। বিশেষ করে চরিত্র সৃষ্টি, কাহিনী নির্মাণ, ভাষা সৃষ্টি ও জীবনবোধের সমগ্রতায় ‘বিষাদ সিন্ধু’ অনেকাংশেই উপন্যাসের লক্ষাণাক্রান্ত মহকাব্যিক সৃষ্টি।
**************************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910