
NTRCA College: বাংলা গদ্যে মীর মশাররফের অবদান
প্রশ্ন : বাংলা গদ্যে মীর মশাররফের অবদান।
উত্তর: উনিশ শতকের যে কয়জন মুসলিম সাধকের শ্রম ও সাধনা বাংলা গদ্যকে ঋদ্ধি দান করে ছিল, মীর মশাররফ (১৮৪৭-১৯১২) ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। তবে প্রধানত ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক হিসেবেই তিনি আমাদের কাছে সমাধিক পরিচিত। বিষয় বৈচিত্র্যে, জীবন-চেতনা এবং শিল্প শৈলীতে তিনি বাংলা গদ্যে একটি স্বতন্ত্র ধারা নির্মাণে সক্ষম হয়ে ছিলেন।
মশাররফের পূর্বে বাংলা গদ্যে উল্লেখযোগ্য কোন মুসলমান সাহিত্যিক দেখা যায় না। উনিশ শতকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হলে, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন হয়। পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকে পরিস্নাত হয়ে অনেক হিন্দু সাহিত্যিক উন্নত রস ও রুচিসম্মত সাহিত্য সৃষ্টিতে সক্ষম হন। কিন্তু মুসলমানগণ তখনও পুঁথিরে জগতেই বিচরণমীল এবং পুঁথি সাহিত্য সৃষ্টিতেই ব্যস্ত। ঠিক এমন সময়ে সময় ও সমাজের পরিবর্তনের ধারাকে স্বীকার করে নিয়েই বাংলা সাহিত্যে আবির্ভত হন অনন্য প্রতিভাধর সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।
মশাররফের উল্লেখযোগ্য গদ্য হলো- উপন্যাস : `রত্নাবতী‘ `বিষাদসিন্ধু‘, `উদাসীন পথিকের মনের কথা‘, `গাজী মিয়ার বস্তানী`, `এসলামের জয়`; নাটক ও প্রহসন : `বসন্তকুমারী নাটক`, `জমদিার দপর্ণ,` `বেহুলাগীতাভিনয়` `টালাভিনয়`, এর উপায় কি, ভাই ভাই এইতো চাই`, `ফাঁস কাগজ`, `এ কি`, প্রবন্ধ: `গোজীবন`, `আমার জীবনী`, `হযরত ইউসুফ`, `বিবি কুলসুম বা আমার জীবনী `।
বিষাদ সিন্ধু মশাররফের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। এটি মহরমের বিষাদময় ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত উপন্যাসর স্বাদ ও আবেগযুক্তগদ্য উপাখ্যান। এটি খাঁটি ঐতিহাসিক নয়, জীবন চরিত্র নয়, তেমনি আঁটঘাট বাঁধা বিধিবদ্ধ ঘক্ষফতশভদ ষরষড়-এর উপন্যাসও নয়। এটি ইতিহাস, উপন্যাস, সৃষ্টিধর্মী রচনা ও নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের সর্ববিধ সংমিশ্রণে রোমান্টিক আবেগমাখানো এক শংকর সৃষ্টি। এতে উপন্যাসের লক্ষণ আছে প্রচুর, একটা মুল আবেগও আছে, শিশিল বিন্যস্ত প্লটকে একীকরণের চেষ্টা আছে, সংলাপ আছে এবং সমগ্র আখ্যানকে একটা পরিণতি দেয়ার সজ্ঞান প্রচেষ্টাও আছে। তবু সমালোচকের মাপকাঠিতে কোন বিশেষ এক ধরনের সৃষ্টি নয়। তবে এর গদ্য গতিশীল ও প্রবহমাণ। বাংলা সাহিত্যে আবেগঘন গদ্য সৃষ্টির এক অনন্য উদাহরণ হলো বিষাদ সিন্ধু।
গাজী মিয়ার বস্তানী মীর মশাররফ হোসেনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। এটি উপন্যাস জাতীয় রস রচনা, সুলিখিত উপন্যাস নয়। এতে একটি মূল ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরিত্রগুলো বিকশিত হয় নি। অসংখ্য নর-নারী এখানে ভীড় করেছে। কাহিনী অংশের কতগুলো ক্ষীণ সূত্র ধরে চরিত্রগুলো তাদের ক্রিয়াকলাপ ঘোষণা করেছে। কাহিনীর সুসংবদ্ধতা, তার দৃঢ়-পিনদ্ধ বন্ধন দ্রুত বিস্তার এবং স্বাভাবিক পরিণতি এতে নেই। একটা মূল কাহিনীকে ভিত্তি করে চরিত্রগুলো আসা যাওয়া করতে পারত। কিন্তু মশাররফের দৃষ্টিতে স্থীর সংযমের অভাবই এ গ্রন্থখানির একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হবার পথে অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে। গাঁথুনির দিক থেকে আলালের ঘরের দুলালের সাথে এর সামঞ্জস্য লক্ষযোগ্য, আর সামাজিক নকসা হিসেবে এ গ্রন্থটি আলালের ঘরের দুলাল, হুতোম প্যাঁচার নকসা এবং কমলা কান্তের দপ্তর জাতীয় রচনা। অবশ্য এ কথা অনস্বীকার্য যে, কমলাকান্তের গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং স্বচ্ছ হাস্যরসিকতা গাজী মিয়ার বস্তানীতে নেই। এর কাহিনী শ্লথবিন্যস্ত ও বিশ্লিষ্ট, ঘটনাংশ পরস্পর নির্ভরশীল নয় বরং বিক্ষিপ্ত; তবু প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত গাজীমিয়ার সমাজ সচেতন দৃষ্টি একটি প্রধান ঘটনাকে অবলম্বন করে ধীর মন্থর গতিতে উন্মিলিত হয়েছে। এতেই আলালের মতো একটি শিথিল বিন্যস্ত উপন্যাসের রস এখানেও পাওয়া যায়।
বস্তানীতে বর্ণিত জীবন মশাররফ হোসেনের কাছে শঠতায় ও প্রবঞ্চনায় ভরা বিভীষিকাময়। বাংলাদেশের এক কালের বেদনার্ত সমাজ জীবনের ব্যর্থাজর্জর রূপ সার্থক শিল্পীর তুলিকায় অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে তিনি এঁকেছেন। এর বর্ণিত জগতের এক বিরাট অংশ ‘অরাজকপু’. ‘নচ্ছারপুর’, ‘আল্লাদগঞ্জ’ ‘খামখেয়ালীগঞ্জ’, ‘জমাদ্বার গ্রাম’, ‘পাতাল গ্রাম’, ‘নেংটি চোরা গ্রাম’, ‘কুলকুচ নগর’। আত্মীয় বন্ধুতে সেখানে কলহ, বাসনাস্বার্থের পীড়ায় সে সমাজের মানুষগুলো অন্ধ-মোহজড়িত। ভাইয়ে ভাইয়ে বিচ্ছেদ। বোনে বোনে স্বার্থের দ্বন্দ্ব। তার সমাজ উচ্চমধ্যবিত্তও ভঙ্গুর-সামন্ততন্ত্রের অপসৃয়মান ঐশ্বর্য-গৌরবের অহমিকা-মেঘাচ্ছন্ন সমাজ। নারীর রূপ যৌবন নিয়ে সেখানে মানুষ ছিনিমিনি খেলে, অন্যকে সম্পদ বঞ্চিত করার জন্য জালজুয়াচুরি করে, মামলায় লিপ্ত হয়। আমলা, হাকিম, উকিল ও অভিশ্প্ত পুলিশ-বরকন্দাজদের দল সুযোগ বুঝেই সেখানে ছোঁ মারে এই মোহ লিপ্ত স্বার্থান্ধ মানুষনামধারী এক একটি জীবকে মোশাররফ হোসেন কলমের এক একটি খোঁচায় যে নামে ফুটিয়ে তোলেছেন, তাদের নামই তাদের চরিত্রকে পাঠক সাধারণের কাছে সুস্পষ্ট করে দেয়। সমাজ নিষ্ঠ রচনা হওয়ার কারণে এর ভাষাও হয়েছে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। যদিও হুতোম প্যাঁচার নকসা বা আলালের ঘরের দুলালের মতো গদ্য ভাষা গাজী মিয়ার বস্তানীতে পাওয়া যাবে না। তবে একটি বিশিষ্ট গদ্য ভঙ্গি সৃষ্টিতে এ গ্রন্থটির গুরুত্ব অপরিসীম।
‘উদাসীন পথিকের মনের কথ’, ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’র মতই আত্নজীবনীমূলক রচনা। বস্তানীতে যেমন হাস্য রস ও রসিকতা বর্তমান এখানে তা নেই। এখানে ব্যক্তিগত পটভূমি বিস্তৃত হলেও একমাত্র নয়। পারিবারিক ইতিহাস, বাস্তব ঘটনা এবং উপন্যাসের একটা মিশ্রিত রূপ এতে ধরা পড়েছে। কুষ্টিয়া অঞ্চলের নীলকরদের অত্যাচারের চিত্র অঙ্কনই ছিল এই গ্রন্থ রচনার মৌল অন্বিষ্ট। তবে নীলকরদের সাথে এদেশের লোকও যে এদেশের ক্ষতি করছে, তা তিনি বিভিন্নভাবে তোলে ধরেছেন। উদাসীন পথিকের মনের কথায় লেখক বর্ণনা করেছেন-
‘এদেশের লোকই দেশের শত্রু, দেশের অনিষ্টকারী। কোন বিলাত হইতে লোকজন সঙ্গে করিয়া এদেশে আসেন নাই।দেশের লোকদিয়াই স্বদেশীদের সর্ব্বস্বান্ত করিতেছেন।’
মীর মশাররফ হোসেন রচিত ‘এসলামের জয়’ ইতিহাসও নয়, উপন্যাসও নয়-ইসলামের প্রাথমিক যুগের কতগুলো ধারাবাহিক এবং বিচ্ছিন্ন কাহিনী নিয়ে রচিত আন্তরিকতাপূর্ণ আবেগময়-সন্দর্ভ। এর গদ্যে আরবি ফারসি শব্দের ব্যবহার অন্যান্য রচনার চেয়ে বেশি।
বাংলা গদ্য নিমার্ণ-পদ্ধতিতে মীর মশাররফ হোসেন একই সঙ্গে সমধর্মী কুশলতায় সাধু বাচনভঙ্গী এবং চলিত বাচনভঙ্গী প্রয়োগ করেছেন। একপ্রান্তে সাধুরীতির সুশৃঙখল বিন্যাসে প্রদীপ্ত জ্ঞবিষাদ সিন্ধুর অন্য প্রান্তে চলিত রীতির বিচিক্ষণ গাজী মিয়ার বন্তানীর। উভয় রীতিতেই তিনি সমভাবে সফল হয়েছেন। বিষাদ সিন্ধুতে সুশৃঙখল অন্বয় বন্ধনে একটি আবেগময় ভাষার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। অন্যদিকে গাজী মিয়ার বস্তানীতে চটুল কথায় সাধারণ জীবনের উজ্জীবন ঘটেছে।
মোটকথা, বাংলা গদ্য সাহিত্যে মীর মশাররফ হোসেন এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। আরবি ফারসি শব্দের পাশাপাশি তৎসম শব্দ ব্যবহার করে তিনি বাংলা গদ্যে নির্মাণ করেন এক নতুন মাত্রা। আর এ কারণেই বাংলা সাহিত্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
বিষাদ-সিন্ধু সম্বন্ধে জানতে:
***********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910