
NTRCA College : আত্মজীবনীমূলক রচনা এবং মীর মশাররফ হোসেনের সমাজ মনস্কতা
প্রশ্ন : গাজী মিয়ার বস্তানী ও উদাসীন পথিকের মনের কথা অবলম্বনে মশাররফ হোসেনের সমাজ চেতনার পরিচয় দাও।
অথবা, আত্মজীবনীমূলক রচনা অবলম্বনে মীর মশাররফ হোসেনের সমাজ মনস্কতার পরিচয় দাও।
উত্তর: সাহিত্য সময় ও সমাজ বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং সময় ও সমাজ থেকে সত্য ও শক্তি শোষণ করেই সাহিত্য উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করে। উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন ১৮৪৭-১৯১২ রচিত সাহিত্য, বিশেষ করে আত্মজীবনীমূলক রচনা, সম্পর্কেও উল্লিখিত মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। কেননা, তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনায় আপন জীবনের ঘটনা প্রবাহ বর্ণনার মধ্যদিয়ে সমকালীন সময় সমাজকে জীবন্ত করে তুলেছেন। বস্তুত, উদসীন পথিকের মনের কথা ১৮৯০, গাজী মিয়ার বস্তানী ১৮৯৯, আমার জীবনী ১৯০৮-১৯১০ ও আমার জীবনীর জীবনী কুলসুম জীবনী (১৯১০) এই চারটি আত্মজীবনীমূলক রচনায় মীর মশাররফ হোসেনের সমাজ মনস্কার পরিচয়টি অত্যন্ত সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। সমকালীন শিক্ষা, মুসলমান জমিদারদের জীবনাচরণ, লোকসংস্কার, প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, সমাজের নারীর স্থান, হিন্দু সমাজের সতীদাহ প্রথা, বিধবা বিবাহ সমস্যা, মুসলিম বিবাহ পদ্ধতি, কৃষক বিদ্রোহ, নীলচাষ সমস্যা, হিন্দু-মুসলমানের পারস্পারিক সম্পর্ক, পণ প্রথা, বর্ণভেদ প্রথা, দাসত্ব প্রথা প্রভৃতি মীর মশাররফ হোসেনের রচনায় প্রাণবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে।
মীর মশাররফের আত্মজীবনীতে গ্রাম্য পাঠশালার যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতে তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের একটি সুন্দর ধারণা জন্মে। সে সময়ে শিশুদের আনুষ্ঠানুকিতা ছাড়া বিদ্যালয়ে পাঠানো হতো না। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজেই এই প্রথানপ্রচলিত ছিল। হিন্দু সমাজে এই প্রথার নাম ছিল ‘হাতেখড়ি’ এবং মুসলমান সমাজে এই অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘তাক্তি’। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুদের হাতে একটি শ্লেট ও পেন্সিল তুলে দেয়া হতো। মীর মশাররফ হোসেনের বিদ্যাভ্যাস এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই শুরু হয়ে ছিল।
শুধু তাই নয়, মীর মশাররফ হোসেনের ‘গাজী মিয়ার বস্তানী’ থেকে তৎকালীন মুসলিম নারী শিক্ষা সম্বন্ধেও জানা যায়। সেই সময়ে মুসলমান মেয়েরা বিদ্যালয়ে যেত না। কারণ, বিদ্যা অর্জনের জন্য তাদের জন্য কোনো প্রকার ব্যবস্থা তখন ছিল না। ভাল মন্দ বিচার করার শক্তিও তাদের ছিল না। এই প্রসঙ্গে মীর মশাররফ হোসেন উল্লিখিত গ্রন্থে বলেন-
‘মুসলমান রমণীমধ্যে বিদ্যার্চ্চা ও শিখিবার সুপ্রশস্ত পথ নাই, জ্ঞান লাভের কোন উপায় নাই; ভালমন্দ বিবেচনা করিবার শক্তি নাই; সংসার ক্ষেত্রে বিচরণ করিবার বুদ্ধি নাই----সাধারণ স্ত্রীলোক বিষয়ে ভাবিলে, তাহাদের বুদ্ধি বিবেচনার প্রতি লক্ষ্য করিলে, মুসলমান রমণীর ন্যায় অবোধ সরল মূর্খ আর কোন জাতির মধ্যে নেই।’ [ গাজী মিয়ার বস্তানী]
ইংরেজি শিক্ষা সম্বন্ধে তৎকালীন মুসলমান সমাজে কী ধারণা ছিল তাও মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক রচনা থেকে জানা যায়। ইংরেজি শিখলে পাপ হবে, মৃত্যুর সময় কষ্ট কবে সমাজে এই ধারণা প্রচলিত ছিল। মশাররফ হোসেন তাঁর জীবনীতে বলেন-
‘কুমারখালীতে ইংরেজী স্কুল হইয়াছে। বাড়ী হইতে ছয় মাইল ব্যবধান। তাহার পর ইংরেজী পড়িলে পাপ তো আছেই। আর মরিবার সময় গিডী মিডী করিয়া মরিতে হইবে। আল্লাহ-রসুলের নাম মুখে আসিবে না। তাহার পরেও আত্মীয় স্বজন গুরুজনগণের ধারণা ও বিশ্বাস যে ইংরেজী পড়িলেই একরূপ ছোটখাট শয়তান হয়।’
শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি লোকসংস্কার ও প্রচলিত রীতিনীতি সম্পর্কেও জানা যায় মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক রচনা থেকে। সে যুগের গ্রামবাসীরা অতিপ্রাকৃত ভূতপ্রেত ইত্যাদিতে বিশ্বাস করত। শুধু গ্রামবাসী নয়, মশাররফ হোসেন নিজেও এই অতিপ্রাকৃত বিষয়ে বিশ্বাস করতেন। সে সময়ে ধারণা ছিল যে, মানুষ মরার পর ভূত এবং প্রেতে পরিণত হয়। মানুষের শ্রেণী অনুযায়ী ভূতপ্রেতেরও শ্রেণী নির্ধারিত হত। যেমন-ব্রাহ্মণ মরার পর ব্রহ্মদৈত্যে রূপান্তরিত হতো, চন্ডাল বা নিম্নশ্রেণীর লোকেরা দুষ্চভূতে পরিণত হতো এবং নারীর মৃত্যুর পর প্রেতনী বা পেন্তীতে রূপান্তরিত হতো। আবার নিম্ন শ্রেণীর মুসলমানেরা মামাদো ভূত, লাল্লু ভূত, কাল্লু ভূত, লেলুয়া, ভুতুয়া ইত্যাদিতে পরিণত হতো।
এই সমস্ত অপ বিশ্বাসই নয়, সে সময়ে বিভিন্ন প্রকার তেল পড়া, পানি পড়া,ইত্যাদিতে বিশ্বাস ছিল। গাজী মিয়ার বস্তানীতে দেখা যায় যে, সোনাবিবি জনৈক গুরুজীর সহায়তায় তার বিরূপ সন্তানকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। গুরুজীর মাধ্যমে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে হাততালি দিয়ে পাতা জুড়া দিতে পারে এরকম বেদেনীর সহায়তায় সন্তানকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। উদাসীন পথিকের মনের কথায় দেখা যায়, দৌলতুন্নেসার মাতা তার কন্যার রোগমুক্তির জন্য শিরনী দিচ্ছে।
তৎকালীন সমাজে নারীর স্থান ছিল পুরুষের নিচে। স্বামী সম্পর্কে স্ত্রীর মূল্যবোধ এমন ছিল যে, স্বামীর চরিত্র যেমনই হউক স্ত্রীর কর্তব্য হচ্ছে স্বামীর সেবা করা। উদাসীন পথিকের মনের কথায় মীর মশাররফ হোসেন বর্ণনা করেছেন-
‘ভারতের স্ত্রী নিকট স্বামীর বড় উচ্চ মান ও আদর। বড় করিয়া কথা কহিতেও ভয় করে। স্বামী দেবতা।’ (উদাসীন পথিকের মনের কথা)
পারিবারিক জীবনে মেয়েদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। কোনো ব্যাপারের স্ত্রীর কোনো বক্তব্য শোনা হতো না। এবং স্বামীরা ইচ্ছা করলে স্ত্রীদের যে কোনো শাস্তি দিতে পারতেন। গাজী মিয়ার বস্তানীতে জনৈকিা নারীর উক্তি এরূপ :
‘বোন! আমার বিয়ে সুখের ব্যাপার নয়, বড়ই দুঃখের কথা। যে মুসলমান মেয়ে বিয়েকে সুখের সম্বন্ধ মনে করে সে নিতান্ত হাবা।–আগাগোড়া দুঃখ। ---একশতর মধ্যে দু’টি স্ত্রীলোক স্বামীসুখে সুখী কিনা বলিতে পারি না।’ (গাজী মিয়ার বস্তানী)
মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক রচনার মাধ্যমে তৎকালীন মুসলমান জমিদারদের আচরণ সম্পর্কেও জানা যায়। গাজী মিয়ার বস্তানী, আমার জীবনীতে সেই সময়কার জমিদারদের উচ্ছৃঙখলতার স্বরূপটিকে মশাররফ হোসেন অত্যন্ত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে তাঁর এক জ্ঞাতিভ্রাতা জনৈক নবাব ও জমিদারের কাহিনী বণর্না করেছেন, যিনি যাবতীয় দুষ্কর্ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার পৃষ্টপোষক ছিলেন। গাজী মিয়ার বস্তানীতে দুই মুসলিম মহিলা জমিদারের সংঘর্ষের বিবরণ আছে। আছে তাঁদের উশৃঙ্খল ও বেহিসেবী জীবনের বিবরণ। জমিদারদের জীবনাচরণ নিয়ে মীর মশাররফ হোসেনের পূর্বে আর কেউ কিছু লিখেন নি।
উনিশ শতকের বাংলার কৃষকদের সবচেয়ে দুঃখের কারণ ছিল নীলচাষ। নীলকার সাহেবেরা বলপ্রয়োগ করে চাষীদের নীল চাষ করতে বাধ্য করত। কিন্তু উৎপাদিত নীলের যথাযথ মূল্য দিত না। এতে চাষীরা নীল চাষ করতে অস্বীকৃতি জানালে চাষীদের উপর অমানবিক অত্যাচার চলত। অনেক সময় মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদেরকে জেলে ঢুকানো হতো। নীলচাষ সংক্রান্ত এই অত্যাচারের কাহিনী মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীতে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ভাবে উঠে এসেছে। আর এটিই মীর মশাররফ হোসেনের একান্ত সমাজ নিষ্ঠতার পরিচয়টিকে স্পষ্ট করে তুলেছেন।
উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও মীর মশাররফ হোসেনের আত্মজীবনীমূলক রচনায় তৎকালীন হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক, পরস্পরের উপর পরস্পরের প্রভাব প্রভৃতি বিষয়ে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করা যায়। অন্যদিকে তাঁর রচনার মাধ্যমে পণপ্রথা, দাসত্বপ্রথা, এদেশীয় মানুষের খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পাওয়া যায়।
বস্তুত, মীর মশাররফ হোসেনের ন্যায় সময় সমাজ নিষ্ঠ সাহিত্যিক সে যুগে দুর্লভ ছিল। তিনি তাঁর রচনায়, বিশেষ করে আত্মীজীবনীমূলক রচনায়, সময় সমাজ যে ভাবে চিত্রিত করেছেন, তাতে এগুলো শুধু সাহিত্যই থাকে নি বরং হয়ে উঠেছে বাংলার সমাজ বিকাশের বিশ্বস্ত দলিল।
****************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910