
NTRCA College : মহাকাব্য রচনায় কায়কোবাদের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
প্রসঙ্গ : মহাকাব্য রচনায় কায়কোবাদের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা কর।
উত্তর: কবি কায়কোবাদ ১৮৫৭-১৯৫২ দীর্ঘজীবী ছিলেন। তবে তাঁর জীবনের এক বিরাট অংশ বিশ শতকে ব্যয় হলেও সাহিত্য সাধনায় তিনি উনিশ শতকী বৈশিষ্ট্যকে পরিত্যাগ করতে পারেন নি। বিশ শতকের তৃতীয় দশকেও তিনি কাহিনী কাব্য আর মহাকাব্য রচনায় মগ্ন ছিলেন। তবে শিল্প চেতনার প্রশ্নে কায়কোবাদ পশ্চাতপদ হলেও জীবন চেতনায় ছিলেন আধুনিক এবং ইতিহাস নিষ্ঠ। ইতিহাস অবলোকনের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক। আর এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই কায়কোবাদ রচনা করেন তাঁর অমর সৃষ্টি ‘মহাশ্মাশান’ শীর্ষক মহাকাব্য। তবে কাব্যটি যথার্থ মহাকাব্য কি না এর নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে পতপার্থক্য বিদ্যমান। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা মহাকাব্য হিসেবে মহাশ্মশানের সাফল্য এবং সীমাবদ্ধতাই চিহ্নিত করার প্রয়াস পাব।
সাধারণভাবে দেখতে গেলে মহাশ্মশান অবশ্যই মহাকাব্য। কেননা, মহাকাব্য বলতে সাধারণত আমরা বিরাট আয়তনের কাব্যের কথাই ভেবে থাকি। কিন্তু বিরাট অঙ্গ হলেই তা মহাকাব্য হয় না। মহাকাব্যের সূত্র নির্ধারণ করতে যেয়ে সংষ্কৃত অলঙ্কারিকেরা বলেছেন-
‘অতি কথন: ক্ষমাবান অতি গম্ভীরো: মহাসত্ত্ব:
স্থেয়ান নিগূঢ় মানো ধীরোদাত্ত দৃঢ় কথিতং।’
প্রথমত, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মহাকাব্যের যে পরিচয় পাওয়া যায় তাতে একটি বিষয়ে অন্তত সাদৃশ্য দেখা যায়-তা হলো মহাকাব্যের পরিসর। মহাকাব্যের পরিসর যে বিরাট আয়তানের হবে সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। শুধু একটি কাহিনী তাতে মুখ্য হলেও সে কাহিনীকে কেন্দ্র করে আরো অনেক উপকাহিনী ও শাখা কাহিনী গড়ে উঠবে। শাখা ও উপকাহিনীগুলোর বৈশিষ্ট্য হবে এমন যে, যেন তারা মূল কাহিনীকে ঘিরেই আবতির্ত হচ্ছে। এ দিক থেকে মহাশ্মশানকে আমরা মহাকাব্য বলতে পারি। কেননা, শাখা কাহিনীসহ এর আয়তন মহাকাব্যোচিত।
দ্বিতীয়, মহাকাব্যের কাহিনী জাতীয় ইতিহাস থেকে গৃহীত হতে পারে, যদি সে বিশেষ কাহিনীর সাথে জাতীয় ঐতিহ্য জড়িত থাকে। তা যদি National Heritage এর সাথে সম্পর্কিত হয়। এবং একটি নিশ্চত সহজ সরল ঘটনা না হয়ে বিচিত্র ঘটনার সমষ্টি হয়। ইতিহাস মহাকাব্যের কাহিনী হতে পারে শুধু তখনই যখন ইতিহাস কাব্যিক সত্যতা (Poetic truth) দ্বারা জাতীয় ঘটনা স্মরণ করতে সহায়তা করতে পারে। আর এ দিক থেকেও ‘মহাশ্মশান’ একটি সফল মহাকাব্য।
তৃতীয়ত, মহাকাব্যের মধ্য দিয়ে মানব ভাগ্যের একটি ভবিষ্যৎ চিত্র আমরা দেখতে পাই। ভাগ্যের যে পরিণাম থাকে, তা পূর্বনিধারিত, কোনো অবস্থাতেই তার পরিবর্তন করা যায় না। মানুষের এই অসহায় অবস্থা গ্রিক কবি অঙ্কন করেছেন। আমামাদের আলোচ্য ‘মহাশ্মশান’ কাব্য এই বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্টত না হলেও আভাসে ব্যক্ত করেছেন। তাই এই দিক থেকেও এটি মহাকাব্য।
‘মহাশ্মশান’ কাব্যকে আমরা বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঐতিহাসিক মহাকব্যের মর্যাদা দিয়ে থাকি। ঐতিহাসিক মহাকাব্য নামে পরিচিত নবীনসেনের ‘পশাশীর যুদ্ধ’, যোগীন্দ্রনাথ বসুর ‘পৃত্বিরাজ’, ‘শিবাজী’ ঐতিহাসিক বিষয় নির্ভর হলেও ইতিহাসকে সেখানে বিকৃত করা হয়েছে। কিন্তু কায়কোবাদ কোথাও ভুলক্রমেও ইতিহাসের ঘটনার সত্যতা লঙ্ঘন করতে চেষ্টা করেননি। আর এ দিক থেকে ‘মহাশ্মাশান’ কাব্য একটি যথার্থ মহাকাব্যের মর্যাদা দাবী করতে পারে।
কিন্তু ‘মহাশ্মাশান’ কাব্যের এত সব গুণ থাকা সত্ত্বেও আমরা এর এমন কতগুলো মারাত্মক দোষক্রটি দেখতে পাই যা এর মহাকাব্যত্বের দীপ্তিকে ম্লান করে দিয়েছে।
প্রথমত, মহাকাব্য হিসেবে ‘মহাশ্মাশান’ এর প্রথম ক্রটি হলো এর ঘটনা ও কাহিনীর বিচ্ছিন্নতা। নিরবচ্ছিন্ন ধারায় এর কাহিনী প্রবাহিত হয় নি। এর কাহিনীর সুষ্ঠু কোনো পরিণতিও নির্দেশিত হয় নি। মনে হয় যেন প্রত্যেকটি কাহিনী একটি স্বতন্ত্র আখ্যানভাগ নিয়ে রচিত। জোহরা ইব্রাহিম কার্দির জীবনের বিপর্যয়, বিশ্বনাথ-কৌমুদী বাঈ-এর জীবনের বিপর্যয়, অমরেন্দ্র-হিরণবালার জীবনের বিপযর্য, রত্নজীব-লবঙ্গ লতার জীবনের বিপযরয়, সুজাউদ্দৌলাহ-সেলিনা বেগমের জীবনের বিপর্যয় এই পানিপথেই নেমে আসে। কিন্তু সমগ্র ঘটনা মিলে একটি বিরাট গাম্ভীর্য এবং মহাত্ন্যের মধ্য দিয়ে কাব্যের পরিসমাপ্তি ঘটে নি। পাঠকের মন কাব্য পাঠান্তে কোন স্থির প্রশান্তিতে ভরে উঠে না। সব কিছু মিলে কোন সুনির্দিষ্ট ভাব-ব্যঞ্জনার সার্থক রূপ কাব্যে নেই।
দ্বিতীয়ত, ‘মহাশ্মাশান’ কাব্যের অপর দোষ হলো এর ভাষা। মাহাকাব্যের ভাষায় থাকবে একটি অবিচ্ছিন্ন অনর্গল গতি প্রবাহ। ভাব এবং ঘটনাপ্রবাহকে ভাষা যেন টেনে নিয়ে চলে; েএর গতি হয় দুবার্র। ভাষার মধ্যে এমন একটি ঝঙ্কার, এমন একটা গাম্ভীর্য থাকে যাতে অতি সহজেই সে ভাষাকে গীতিকবিতার ভাষা থেকে পৃথক করা যায়।
মহাকাব্যের ভাষায় শব্দ-যোজনার মধ্যে থাকে একটি বিরাট আদর্শ এবং পরিকল্পনা যা ছন্দকে দেয় অপূর্ব অদ্ভুত ব্যঞ্জনা। এই ব্যঞ্জনার ফলেই ভাষার সর্বত্র একটা গাম্ভীর উদাত্ত সুর নেমে আসে, যে সুরের মাহাত্ন্যে কবির সমস্ত কল্পনা রূপ পরিগ্রহ করে একটি পরিপূর্ণ মূর্তিতে। এই ভাব ‘মহাশ্মাশান’ কাব্যে খুব কমই পরিলক্ষিত হয়।
কায়কোবাদ মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ছন্দের অনুসরণ করতে গিয়ে অধিকাংশ স্থানেই তাকে নিছক সাধারণ গদ্যে পরিণত করেছেন। শব্দ-যোজনা এবং ভাষায় ভাব-যোজনা সৃষ্টি সম্বন্ধে কোনরূপ সুষ্ঠু ধারণা করিব ছলে বলে মনে হয় না। ‘মহাশ্মাশান’- এর ভাষাকে অনেক স্থানেই গদ্য থেকে পৃথক করা যায় না। যেমন-
ক) বিশেষত : দেখিলে দিলীপে-দশ হাত দূরে তু্ই যাইস চলিয়া।
খ) রাত হল যাও বাবা শুয়ে থাক যেয়ে, আমিও যাইব এবে নামাজ পড়িতে।
এই জাতীয় নমুনা কাব্যের প্রায় সবর্ত্রই দেখা যায়।
‘মহাশ্মাশান’ এর ভাষা যে শুধু গদ্যাত্নক তা-ই নয়, অনেক জায়গায় চটুল গ্রাম্য শব্দ ঢুকিয়ে ভাষার গাম্ভীর্যকে নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া রুমাল, হাটর্ফেল, ব্যাটন, বেয়নেট, ব্যাটেলিয়ান ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগের ফলে কাব্যে শিল্পগুণ নষ্ট হয়েছে।
তৃতীয়ত, এই কাব্যের চরিত্রগুলোও মহাকাব্যোচিত চরিত্র নয়। অর্থাৎ এমন একটি চরিত্রও নেই যে মহাকাব্যের নায়ক হতে পারে। মহাকাব্যের নায়ক হবেন-ধীরোদাত্ত গুণ সম্পন্ন। তাঁর দোষগুণ মিলে এমন একটি শক্তিশালী চরিত্র হবে যাকে আশ্রয় করে অন্যান্য চরিত্র ও ঘটনা প্রবাহ ক্রমবিকাশ লাভ করবে। এই নায়কের জীবনকে মাহাকাব্যের কিদ দর্শনের ভূমিকা পালন করতে হবে। কিন্তু এরুপ চরিত্র ‘মহাশ্মাশান’ কাব্যে দেখা যায় না। নজীবউদ্দৌল্লার মধ্যে এই সমস্ত গুণাবলী কিঞ্চিৎ আভাস লক্ষ করলেও তা যথার্থ পরিণতি লাভ করে নি।
চতুর্থত, এই কাব্যে আরেকটি দোষ হলো অতিকথন। মহাকাব্যের মধ্যে কথা থাকবে অল্প এবং প্রত্যেকটি কথা একটি বিরাট মাহাত্নকে প্রকাশ করবে। অর্থাৎ সে কথা নিছক কথা নয়, তা হবে বাণী। যে বাণী কাব্যের পরিধিকে সম্প্রসারিত করবে আয়তনের দিক থেকে নয় ভাবের দিক থেকে। ‘মহাশ্মশান’ এর কবি সে দিকে কোনো মনোযোগ দেন নি।
পঞ্চমত, এই কাব্যের আর একটি ক্রটি হলো আকস্মিকতা। হিরণবালাকে অমরেন্দ্র তিনবার আকস্মিক ভাবে আকস্মিকতার মধ্য দিয়ে শক্রর হাত থেকে রক্ষা করেছে। লবঙ্গলতিকা তিনবার আকস্মিকভাবে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাছাড়া অনেক চরিত্র এই কাব্যে আকস্মিকভাবে আবির্র্ভত হয়েছে এবং আকস্মিকভাবেই অন্তর্হিত হয়েছে। যা বাস্তব সম্মত হয় নি।
বস্তুত, সাহিত্য সাধনার এক অনিবার্য চেতনা থেকেই কায়কোবাদ ‘মহাশ্মাশান’ কাব্য রচনা করেন। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শরণের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় জীবনের জাগরণ ও মুক্তি প্রত্যাশা করেছেন। ফলে কোনো কোনো স্থানে ‘মহাশ্মাশান’ কাব্য শিল্প চ্যুতি ঘটলেও সামগ্রিকভাবে কায়কোবাদের সাহিত্য সাধনা বাঙালি পাঠকের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।
*************************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910