
NTRCA College : বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের অবদান
প্রশ্ন : বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের অবদান মূল্যায়ন কর।
উত্তর: বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ‘ছোটগল্প’ সবচেয়ে নবীনতম শাখা। উনিশ শতকের শেষভাগে এই শাখাটির উদ্ভব ঘটে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনই এ ধারার উদ্ভবকে অনিবার্য করে তুলে। প্রধানত বঙ্কিমচন্দ্র, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত এবং স্বর্ণকুমারী দেবীর হাতে ছোটগল্পের সূচনা ঘটে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ১৮৬১-১৯৪১ হাতেই বাংলা ছোটগল্প যথার্থ অর্থে বিকশিত হয়। ভাব, বিষয়, আঙ্গিক এবং জীবন-চেতনার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোটগল্পকে পূর্ণতা দান করেন।
বহু প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার গল্প প্রচলিত ছিল। এই প্রাচীন যুগটিকে ড. শিশির কুমার দাস চূর্ণক, আখ্যান, নক্সা ও নভেলার যুগ বলে অভিহিত করেছেন। এই যুগের গল্প উনিশ শতকীয় গল্প থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিল। উনিশ শতকীয় বৈশিষ্ট্যে প্রথম গল্প লিখেন স্বর্ণকুমারী দেবী ১৮৫৫-১৯৩২ ও নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ১৮৬১-১৯৪০। বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেও ছোটগল্প রচনার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা আকৃতিতে ছোট হলেও তা ছিল উপন্যাসধর্মী। এই সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মধুমতি’; সঞ্জিবচন্দ্রের ‘রামেশ্বর অদৃষ্ট’ ও ‘দামিনী প্রভৃতি আকৃতিতে ছোট হলেও উপন্যাস লক্ষণাক্রান্ত রচনা।
এই সময়ের কিছু পরে স্বর্ণকুমারী দেবী কিছু গল্প লেখার প্রায়াস চালিয়েছিলেন। তিনি তাঁর সমস্ত গল্পকে ‘নবকাহিনী’ নামক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাঁর রচিত গল্পগুলো যথার্থ অর্থে শিল্প সফল না হলেও প্রথম পর্বের গল্প হিসাবে সার্থক প্রয়াস।
পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে, ভাব, বিষয় আঙ্গিক এবং জীবন চেতনার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথই বাংলা ছোট গল্পকে পূর্ণতা দান করেন। বাংলা সাহিত্যে ‘ছোটগল্প’ শব্দটিও তিনি ব্যবহার করেন। তাই তাঁকে বাংলা ছোটগল্পের জনক বললেও বেশি বলা হবে না। রবীন্দ্রনাথের প্রথম গল্পের নাম “ভিখারিনী”। গল্পটি প্রকাশিত হয় ‘ভারতী পত্রিকায় ১২৮৪ বঙ্গাব্দে। এরপর ১৮৮৪-৮৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘ঘাটের কথা’। ‘রাজপথের কথা’, ‘মুকুট’ নামক গল্প। তবে দেনাপাওনা গল্পই রবীন্দ্রনাথের প্রথম সার্থক ছোটগল্প। যা ১৮৯০ সালে হিতবাদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে অব্যাহত ধারায় রবীন্দ্রনাথের গল্প রচনা চলতে থাকে। এবং বাংলা ছোট গল্পকে তিনি সমৃদ্ধির শীর্ষ শিখরে পৌঁছে দেন।
বিচিত্র বিষয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গল্প লিখেছেন। তিনি শহর জীবন নিয়ে গল্প লিখিছেন আবার গ্রাম জীবন নিয়েও গল্প লিখেছেন। প্রাকৃতিক শোভা সৌন্দর্য তাঁর গল্পে বারবার এসেছে আবার অতিপ্রাকৃত আবহাওয়াও তাঁর গল্পে স্থান করে নিয়েছে। তাঁর গল্পের চরিত্রের তালিকায় আছে, রাজরাণী, ভিখারিনী, ক্ষমতা লুপ্ত জমিদার, মধ্যবিত্ত সমাজ, দরিদ্র কৃষক ইত্যাদি। ভ্রাতৃস্নেহ, মাতৃস্নেহ পিতৃস্নেহ, যেমন তাঁর গল্পে স্থান পেয়েছে তেমনি প্রেমও বিরাট জায়গা জুড়ে রয়েছে। তিনি বতর্মান জীবন নিয়ে যেমন গল্প লিখেছেন তেমনি অতীত জীবন নিয়েও গল্প লিখেছেন। বস্তুত, বিষয় বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথের গল্প ছিল অসাধারণ।
বিষয়, ভাব ও জীবন চেতনার প্রশ্নে অনেক সমালোচক রবীণ্দ্রনাথের সমগ্র ছোট গল্পকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন। এগুলো প্রথম পর্যায়ের গল্প-যা সূচনা থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয় পর্যায়ের গল্প-যা ১৯০১ সাল থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং তৃতীয় পর্যায়-যা ১৯১৪ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত।
প্রথম পর্যায়ের ছোটগল্পকে অনেকে পদ্মা পারের ছোট গল্প হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। এই পর্বের গল্প গ্রামীণ জীবন অত্যন্ত সুন্দর ও শিল্পিতভাবে উন্মোচিত হয়েছে। তাছাড়া ও পূর্বের গল্প প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে নিবিড়ভাবও প্রকাশিত হয়েছে। এই পর্বের উল্লেখযোগ্য গল্পগুলো ‘পোস্টমাস্টার’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘একরাত্রি’, ‘জীবিত ও মৃত্যু’, ‘সুভা’, ‘মহামায়া’, শাস্তি, ‘মধ্যবর্তিনী’, ‘অতিথি’, ‘আপদ’ ইত্যাদি। ভাষা নির্মিতির প্রশ্নে এই পর্বের গল্প ছিল গীতধর্মী।
দ্বিতীয় পর্যায়ের গল্পের বিষয় ও জীবন চেতনা প্রথম পর্বের গল্পের অনুরূপ হলেও শৈলীর প্রশ্নে ভিন্নতা দেখা যায় কিন্তু তৃতীয় পর্যায়ের গল্প রবীন্দ্রনাথের গল্পের ধারায় সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা তৈরি করে। বিষয়-ভাব, জীবন দৃষ্টি এবং শৈলীর প্রশ্নে এই পর্বের গল্প সর্ম্পণ স্বতন্ত্র। এই পর্বের গল্পকে অনেকে সবুজ পত্র যুগের গল্প হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে বিষয়ের দিক থেকে এই পর্বের গল্পে পূর্বেরই অনুবর্তন লক্ষণীয়। যদিও জীবন দৃষ্টি ও গঠন শৈলীতে এই পর্বের গল্পসমূহ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এই পর্বের উল্লেখযোগ্য গল্পগুলো হলো ‘হালদার গোষ্ঠী’, ‘হৈমন্তী’, ‘বোষ্টমী’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘পয়লা নম্বর’ ইত্যাদি। এই পর্বের গল্পে নারী-ব্যক্তিত্ব উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে। এখানে বিষয়ের দিক থেকে গল্পগুলো দেশীয় হলেও বক্তব্যের প্রশ্নে বৈশ্বিক চেতনাকে স্পর্শ করেছে।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলো কাব্যধর্মী। কল্পনার প্রাচুর্য, অলঙ্কারবহুলতা প্রভৃতি কাব্যগুণ তাঁর গল্পে দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট্যে তাঁর ছোট গল্পকে ত্রুটিযুক্ত করে নি; বরং এমন বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যা অন্য গল্পকারের মধ্যে দুলর্ভ।
গল্প সূচনার ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্যতিক্রম। কেননা, তিনি সরাসরি গল্প শুরু করতে এবং মুর্হুতের মধ্যেই পাঠকের মনকে ঘটনা প্রবাহের সাথে সম্পৃক্ত করে দিতেন। ফলে পাঠক মুল কাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে শিল্প রসে সিক্ত হন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের গল্পের প্রস্তাবনা, উপস্থাপনা এবং পরিণতিও সামঞ্জস্যপূর্ন এবং রচনারীতির দিক থেকেও বৈচিত্র্যপূর্ণ। ফলে উত্তর কালে বাংলা ছোট গল্পের ধারায় রবীন্দ্রনাথ ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়েছেন।
বাংলা ছোট গল্পের ধরায় রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক কালেই বেশ কিছু গল্পকারের পরিচয় পাওয়া যায়। এদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন প্রবলভাবে রবীন্দ্র অনুসারী। আবার কেউ কেউ বিষয়, বক্তব্য শৈলী এবং জীবন চেতনায় ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্যবিলাসী। এই পর্বে যাঁরা গল্প রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন-প্রভাতকুমার মুখপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী, রাজ শেখর বসু, প্রমুখ।
তবে এ কথা সত্য যে বিষয়, ভাব, জীবনচেতনা এবং শৈলীর প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথই বাংলা ছোটগল্পকে সমৃদ্ধির বলয়ে উন্নীত করেন। উত্তর কালে কাজী নজরুল ইসলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বন্ধুদেব বসু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভুতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ ছোটগল্পকারণ একটি স্বতন্ত্র গল্পধারা নির্মাণ করলেও রবীন্দ্রনাথের হাতেই ছোটগল্পের যথার্থ ভিত্তি নির্মিত হয়। আর এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোটগল্পের জনক হিসাবে অভিহিত হয়ে থাকেন।
************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910