
NTRCA College: গল্পগুচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি-চেতনা
প্রসঙ্গ : গল্পগুচ্ছ অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি-চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ছিলেন আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের স্থপতি। তাঁর হাতেই বাংলা ছোট গল্প যথার্থ অর্থে মুক্তি লাভ করে। ভাব-ভাষা আঙ্গিক এবং জীবন-চেতনায় তিনিই বাংলা ছোটগল্পকে সমৃদ্ধি দান করেন। তাঁর শ্রম ও সাধনাই বাঙলা ছোটগল্প বিশ্বামানের পর্যায়ে উন্নীত হয়। এই জন্য তাঁকে বাংলা ছোটগল্পের জনকও বলা হয়ে থাকে।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জীবন-ঘনিষ্ট শিল্পী। জীবনের কোনো খন্ডরূপকে নয়, জীবনের সামগ্রিক রূপকেই তিনি তাঁর সাহিত্যে রূপায়ণ করেছেন। তাঁর রচিত ছোটগল্প সম্বন্ধেও এ সত্য প্রাসঙ্গিক। কেননা, গল্পগুচ্ছ তিনি বিশ্বপ্রকৃতির পটভূমিতে প্রসারিত মানবজীবনকেই অবলোকন করেছেন। বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে যে চিরন্তনতা, বৈচিত্র্য, নিত্যপরিবর্তণশীলতা ও নিত্যনবীনতা বর্তমান, তা গল্পগুচ্ছেও বর্তমান। গল্পগুচ্ছের মানবজীবন তাই প্রকৃতির সাথে একাকার। মানবজীবনকে এখানে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার অবকাশ নেই। প্রকৃতিই যেন মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এখানে প্রকৃতি কখনও কখনও যেন একটি চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। গল্পগুচ্ছে ব্যবহৃত প্রকৃতির এই স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অরুণকুমার মুখপাধ্যায় তাঁর রবীন্দ্র মণীষা গ্রন্থ বলেন-
গল্পগুচ্ছে ক্ষুদ্র মানবজীবনকে বৃহৎ উদাসীন নির্বিকার বিশ্বজীবনের পটভূমিতে স্থাপন করে, রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।যেখানে প্রকৃতি ও মানবজীবন এক সুরে বাঁধা, সেখানে চিরমানুষের সঙ্গ লাভের ব্যাকুলতার সুর বেজে উঠেছে। সে সুর আমাদের মুগ্ধকরে,আচ্ছন্ন করে, নবতর জীবনচেতনায় উদ্বোধিত করে।
গল্পগুচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিচেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণের পূর্বে সময়ের দিক থেকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রবীন্দ্র গল্পসমূহকে কয়েকটি পর্বে বিভাজন করা আবশ্যক। বিষয়, শৈলী ও জীবন চেতনার প্রশ্নে রবীন্দ্রগল্পসমূহকে নিম্নলিখিত তিনটি পর্বে বিভাজন করা যায়-
১) উনবিংশ শতাব্দীর কালসীমায় রচিত গল্প ১৮৯১-১৯০০
২) বিংশ শতাব্দীর সূচনা কাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী গল্প ১৯০১-১৯১৩
৩) প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধোত্তর পর্বের গল্প ১৯১৪-১৯৩৩
প্রথম পর্বে রচিত গল্পগুচ্ছের প্রায় সব গল্পই পল্লিকেন্দ্রিক। এই পর্বের উল্লেখযোগ্য গল্প হলো “পোস্টমাস্টার”, “খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন”, “দলিয়া”, “কঙ্কাল”, “এক রাত্রি”, “জীবিত ও মৃত”, “কাবুলিওয়ালা”, “ছুটি”, “সুভা”, “মহামায়া”, “মধ্যবর্তিনী”, “শাস্তি”, “সমাপ্তি”, “মেঘ ও রৌদ্র”, “নিশীথে”, “ক্ষুধিত পাষাণ”, “অতিথি” ইত্যাদি। এই পর্বের গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের হৃদয় রহস্য ও মানবমনের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় ঐকাত্ন্য। এখানে গল্পের চরিত্রের বিকাশ ও পরিণামী ব্যঞ্জনাসৃষ্টিতে প্রকৃতি পালন করেছে মুখ্য ভূমিকা। “পোস্টমাস্টার”, “খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন”, “সুভা”, “অতিথি” প্রভৃতি গল্প এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। গল্পগুচ্ছের প্রথম পর্বে পদ্মাতীরবর্তী প্রকৃতি পূর্ববাংলার প্রকৃতি রবীন্দ্রচেতনায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। দুরন্ত পদ্মা কোনো কোনো গল্পে হয়ে উঠেছে পরিণাম নির্দেশক।
প্রকৃতির সঙ্গে মানব জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও আত্মিক । তাই প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মানব জীবনে নেমে আসে চরম বিপযর্য়। প্রকৃতির সাথে বিচ্ছেদ জনিত কারণে মানুষের আত্মিক মৃত্যু ঘটে। এই অনুষঙ্গটিকেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই পর্বের বেশ কিছু গল্পে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। তবে এই দিক থেকে উল্লেখযোগ্য হলো- ছুটি, সুভা, সমাপ্তি, অতিথি ইত্যাদি গল্প।
সমাপ্তি গল্পেও প্রকৃতির অনুরূপ রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। এখানে প্রকৃতি যেন মানব চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিশোরী স্বভাবের যুবতী নারীকে রমণীতে পরিণত করার পিছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে প্রকৃতি। যেমন-
‘এই যে একটি গম্ভীর স্নিগ্ধ বিশাল রমণীপ্রকৃতি মৃন্ময়ীর সমস্ত শরীর ও সমস্ত অন্তরে রেখায় রেখায় ভরিয়া উঠিল, ইহা তাহাকে বেদনা দিতে লাগিল।’
এই পর্বে গল্পগুচ্ছে প্রকৃতির স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অরুণকুমার মুখপাধ্যায় বলেন-
“কেবল ঘটনা নয়, সেই সঙ্গে প্রকৃতিও গল্পগুচ্ছের অপরিহার্য অঙ্গ। বোধ হয় এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, প্রাক সবুজপত্র পর্বে রচিত সকল গল্পে প্রকৃতি প্রধান চরিত্র।”
দ্বিতীয় পর্বের গল্পে রোমান্টিকতার মোহনীয় জগৎ ছেড়ে রবীন্দ্রনাথ ক্রমশ বাস্তবের কঠিন মাটিতে পা রেখেছেন। এই পর্বের উল্লেখযোগ্য গল্প হলো ‘নষ্টনীড়’। এখানে প্রকৃতি থাকলেও প্রথম পর্বের গলেপ মতো ব্যপকতা নিয়ে উপস্থিত নয়। এখানে প্রকৃতি মানব জীবনের দুঃখ বেদনার প্রতীকে আবাসিত। যেমন নষ্টনীড় গল্পে চারুর অজানা বেদনার প্রতীক হিসেবে প্রকৃতির স্বরূপটি চিত্রায়িত হয়েছে এভাবে-
“উত্তর দিকের পাঁচিলের গায়ে নর্দমার ধারে কোন গতিকে একটাগাবগাছ জন্মেছে। যে দিন দেখতুম সেই গাবের গাছের নতুন পাতাগুলি রাঙা টক টকে হয়ে উঠেছে, সেই দিন জানতুম ধরা তলে বসন্ত এসেছে বটে।”
মোটকথা রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছে প্রকৃতি নিছক প্রকৃতির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় নি। প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান তথা নদী, বর্ষা, বসন্ত, ঋতু, ঝড়, জ্যোৎস্না, প্রায় প্রতিটি গল্পেই একটা বিশেষ মেজাজ নিয়ে ও একটা বিশেষ সংকেত বহন করে উপস্থিত হয়েছে।
***************************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910