
NTRCA College: রবীন্দ্রনাথের মানসী কাব্যের বৈশিষ্ট্য
প্রশ্ন : ‘মানসী’ কাব্যেই প্রথম কবির সাথে একজন শিল্পী এসে যোগ দিল’-এই উক্তির আলোকে ‘মানসী’ কাব্যের বৈশিষ্ট্য বিচার কর।
অথবা, “মানসী” কাব্য প্রকৃত প্রস্তাবে রবীন্দ্রনাথের বহু বিচিত্র কাব্য প্রয়াসের সূচিপত্রাঙ্ক’ আলোচনা কর।
উত্তর: করণ, প্রকরণ ও জীবনবোধের প্রশ্নে ‘মানসী’ রবীন্দ্রনাথের এক অনন্য সৃষ্টি। বিচিত্র ভাব এবং বিষয় এ কাব্যে অনন্য শৈল্পিক পরিণতি লাভ করেছে। প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ভাবনাসহ বিচিত্র বিষয় এই কাব্যে স্থান লাভ করেছে। শুধু বিষয় নয়, ভাবের প্রশ্নেও এ কাব্যে কবি অনন্যতা লাভ করেছেন। তাই অনেক সমালোচক বলেন, ‘মানসী’ কাব্য প্রকৃত প্রস্তাবে রবীন্দ্রনাথের বহু বিচিত্র কাব্য প্রয়াসের সূচিপত্রাঙ্ক।’
উত্তরকালের অনেক ভাব ও বিষয় এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠলে কোনো কোনো সমালোচক ‘মানসী’কে রবীন্দ্রকাব্যের অনুবিশ্ব বলা যায়’ বলেও মন্তব্য করেছেন। ছন্দে নতুনত্ব সৃষ্টিতে এবং অলঙ্কার নির্মাণের মুন্সিয়ানা কবি এখানে অনন্য শিল্প মহিমা লাভ করেছেন। তাই প্রখ্যাত রবীন্দ্র সমালোচক আবু সয়ীদ আইয়ুব তাঁর আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে মন্তব্য করেন-
‘মানসী’ই রবীন্দ্রনাথের সর্ব প্রথম কাব্য গ্রন্থ যাতে, কবির সঙ্গে একজন শিল্পী এসে যোগ দিল’।
আমরা আলোচ্য নিবন্ধে ‘মানসী’ সম্পর্কে সমালোচকদের উল্লিখিত মূল্যায়ন বিচার করার প্রয়াস পাব।
প্রকৃতপক্ষে ‘মানসী’ থেকেই একজন যথার্থ শিল্পীর যাত্রা শুরু। এ কাব্যে কবির ভাবের কুয়াশা কেটেগেছে, ভাষার গাঁথুনি শক্ত হয়েছে, আবেগ সংযতরূপ লাভ করেছে এবং প্রকাশের অতিবিস্তৃতি লুপ্ত হয়েছে। প্রেমের কবিতাই ‘মানসী’র শ্রেষ্ঠ সম্পদ। প্রেম বিষয়ক কবিতাই এ কাব্যকে অনন্যতা দান করেছে। কারণ প্রেম সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের একটি পরিপূর্ণ ধারণা এ কাব্যে স্পষ্ট রূপ লাভ করেছে। আর এ জন্যই ‘মানসী’কে রবীন্দ্রনাথের ‘প্রেম কাব্য’ও বলা হয়ে থাকে।
প্রেম সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি হলো-
ভালোবাসো প্রেমে হও নম:
চেয়ো না তাহারে।
আকাঙক্ষার ধন নহে আত্মা মানবের।” (নিষ্ফল কামনা)
অর্থাৎ দেহসম্পৃক্ত নয়, দেহাতীত প্রেমই যথার্থ প্রেম। প্রেম সম্বন্ধে এ দার্শনিক মনোভঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ পূর্বাপর স্থতধী ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সৌন্দর্যের কবি। তার এই সৌন্দর্য চেতনা বিশেষভাবে নারী রূপের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে। ‘কড়িও কোমল’ কাব্যে এই চেতনার প্রথম উন্মেষ লক্ষ করা যায়। এখানে কবি নারী দেহের সৌন্দর্যের যে স্তোত্র পাঠ করেছেন, তাতে দেহ সম্ভোগের আকাঙ্খা নেই। নারী রূপরে মধ্যে সে, এক অপার্থিব সৌন্দর্য আছে, কবির দৃষ্টি তারই দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। স্থুলকে অবলম্বন করেই তিনি সূক্ষ্ম অতীন্দ্রিয়ের কামনা করেছেন দেহসীমাতেই দেহাতীত সুন্দরকে ধরার প্রেয়াস চালিয়েছেন। এই অপার্থিব রূপতৃষ্ণা, সৌন্দর্য আকাঙ্খা এবং ভাবময় সৌন্দর্য সাধনা থেকেই রবীন্দ্রনাথের প্রেমানুভূতির উদ্ভব হয়েছে। তাঁর এই প্রেম দেহসম্বন্ধবিচ্যুতি নর-নারীর বাস্তব ভোগ আকাঙ্খার উর্ধ্ধে এক অনিবর্চনীর আনন্দরস। ‘মানসী’ কাব্যেও এই প্রেম ভাবনাই রবীন্দ্রনাথের উত্তর কালের কাব্যে প্রবাহিত হয়েছে। তাই এই অর্থে মানসী রবীন্দ্রনাথের কাব্য যাত্রার সূচিপত্রাঙ্ক।
প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা রচনাতেও এই কাব্যে কবি অনন্যতা লাভ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক প্রকৃতিভাবনা এই কাব্য থেকেই শুরু। প্রকৃতির সাথে মানব-জীবনের যে, অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তাও এই কাব্যে মূর্ত করে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতে, প্রথম বাষ্প নিহারিকা, তরুলতা, সরীসৃপ, পশুপাখি বিচিত্র অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে বর্তমান মানব জীবন উন্মোষ লাভ করেছে। এই অনুভূতিই রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববোধের মূল প্রেরণা। বিশ্বের সমস্ত সৌন্দর্য ও আনন্দকে তিনি ব্যক্তিগত অনূভুতির মধ্য দিয়ে ধরতে পারেন, বিশ্বের সাথে তাঁর একাত্মতাও এক দেহতেত্ত্বের অনুভূতিতে। আর এই প্রকৃতিচেতনা ‘মানসী’তেই প্রথম মূর্ত হয়ে উঠে। মানসীতে প্রকৃতি আর মানুষ যেন একাকার-
‘ব্যাকুল বেগে আজি বহে বায়,
বিজুলী থেকে থেকে চমকায়
যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেল মনে
সে কথা আজি যেন বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়’-(বর্ষার দিনে)
রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র স্বদেশ ভাবনার সূচনাও মনসী’ কাব্য থেকে। স্বদেশের মানুষের ভীরুতা, কাপুরুতাও দুর্বলতার প্রতি কবির বিদ্রুপ যেমন আছে তেমনি দেশের মানুষের জন্য মমতাও অপরিসীম। তাই কবি উচ্চারণ করেন-
‘দূর হোক এ বিড়ম্বনা, বিদ্রুপের ভান
সবারে চাহে বেদনা দিতে বেদনাভরা প্রাণ।’ (দেশের উন্নতি)।
ছন্দ, অলঙ্কর এবং কাব্য ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্ববর্তী কাব্য ধারাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। এবং উত্তরকালে তিনি যে কাব্য ধারা নির্মাণ করেছেন তারও গাঁথুনি শুরু এ কাব্য থেকেই। ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার সচেতন সূচনা এখান থেকেই। ‘বিরহানন্দ’ কবিতায় তিনি যতিপাতের পরীক্ষা করেছেন। ‘নিষ্ফল উপহার’ কবিতায় বদ্ধাক্ষরকে দুই মাত্রা গণনা করার পরীক্ষা করেছেন। ছন্দ পরিবর্তনের এই ধারা পরবর্তী রবীন্দ্র সঙ্গীতে ও কাব্যে বিপন্টবের সূচনা করেছে। যেমন ‘বিরহানন্দ’ কবিতায় যতিপাতের পরীক্ষায় পাই-
‘ছিলাম নিশিদিন আশাহীন প্রবাসে
বিরহতপোবনে আনমনে উদাসী।’
মোটকথা, ভাবে-ভাষায়-আঙ্গিকে এবং জীবন চেতনায় রবীন্দ্রনাথের নব যাত্রার সূচনা এ কাব্য থেকেই। উত্তরকালে রবীন্দ্র সৃষ্টিধারায় যে মহিমান্বিত রূপ প্রত্যক্ষ করি তার আরাম্ভ ‘মানসী’ কাব্য থেকেই। আর এ দিক লক্ষ রেখেই কেউ কেউ ‘মানসী’ কে রবীন্দ্রকাব্যের অনুবিশ্ব বলেছেন। আবার কেউ একে রবীন্দ্রকাব্যের ‘সূচিপত্রাঙ্ক’ বলেছেন। ছন্দ ও ভাষার নবনির্মাণের দিকে লক্ষ রেখে কেউ বলেছেন। ‘কবির সঙ্গে একজন শিল্পী এসে যোগ দিল’। সুতরাং, সমালোচকদের উল্লিখিত মূল্যায়ন যথার্থ এবং যৌক্তিকতা অনায়াসেই বলা যায়।
***************************************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910