
NTRCA College : শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রে প্রেম ও সংস্কারের যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, তার স্বরূপ বিশ্লেষণ
প্রসঙ্গ : শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রে প্রেম ও সংস্কারের যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, তার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
উত্তর: রেনেসাঁসীয় জীবন-চেতনায় পরিস্রুত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬-১৯৩৭এর শিল্পী-মানস জারিত হয়েছে দ্বিবিধ সত্তায়। এর একদিকে ছিল পাশ্চাত্যের আধুনিক জীবন চেতনা এবং অন্যদিকে ছিল ভারতীয় জীবনাদর্শও সংষ্কার। এই দ্বিবিধ সত্তা যেখানে সামঞ্জস্য লাভ করেছে সেখানেই তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য অনন্য শৈল্পিক মহিমা লাভ করেছে। আর যেখানে এই সত্তার সম্মিলন ঘটে নি সেখানেই তাঁর সাহিত্য পরিণামের প্র্রশ্নে হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষত নারী চরিত্র চিত্রণে এই দ্বন্দ্বের স্বরূপটি অত্যন্ত স্পষ্ট। কেননা, শরৎচন্দ্রের প্রতিটি নারী চরিত্রই প্রেম ও সংষ্কারের দ্বন্দ্বে হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত এবং রক্তাক্ত। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে প্রেম ও সংস্কারের দ্বন্দ্বে শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রের স্বরূপ নির্ণয়ের প্রয়াস পাব।
শরৎ সৃষ্ট নারী চরিত্রে প্রেম ও সংষ্কারের যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে তার স্বরূপ নির্ণয় করতে গিয়ে প্রখ্যাত শরৎ সমালোচক হুমায়ন কবির তার ‘শরৎ-সাহিত্যের মূলতত্ত্ব’ গ্রন্থে বলেন-
‘শরৎচন্দ্রের মধ্যে বিপ্লবাত্মক প্রেরণা থাকা সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে এমন একটি রক্ষণশীলতার ভাব আছে, যার জন্যে সময়ে সময়ে মানুষ অবাক হয়ে যায়।এই বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায় তার নারীচরিত্র-চিত্রণে। তাঁর বহু নায়িকা সামাজিক রীতি-নীতির বিরোধিতা করেছে। তাদের কারুর কারুর মধ্যে এমনি বুদ্ধির চমক ঝলসে উঠে নিবে গেছে যা সত্যিই অদ্ভুত। সামাজিক জীবনে এবং চিন্তারাজ্যে সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েও অন্ত:সারশূন্য তুচ্ছ সংস্কারের প্রতি তাদের মোহ কাটেনি।’
এই প্রসঙ্গ মিমাংসার জন্য প্রথমেই আমরা উল্লেখ করতে পারি ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের কথা। আলোচ্য উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র রাজলক্ষ্মী। সে শ্রীকান্তের বাল্য প্রণয়িণী। বর্তমানে সে পতিতা, নাম পিয়ারী বাইজী। এক রাজকুমারের দরবারে রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তকে আবিস্কার করে। প্রেমের প্রবল আকর্ষণে রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তের সন্নিধ্যে আসতে চায় কিন্তু শ্রীকান্তের অনীহা এবং অনাগ্রহের কারণে তা আর হয়ে উঠে নি। পরবর্তীতে শ্রীকান্ত অসুস্থ হয়ে রাজলক্ষ্মীর বাড়িতে আশ্রয় নিলে তাদের মিলনে কোনো বাহ্যিক বাধা না থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজলক্ষ্মীর চিরায়ত সংস্কার। ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের অচলা-মহিম-সুরেশের প্রেমের সম্পর্ক নির্মাণেও শরৎচন্দ্র দ্বন্দ্ব-উত্তীর্ণ হতে পারেন নি। সুরেশের প্রেমের প্রবল আকর্ষণে অচলা স্বামী এবং স্বামীগৃহ ত্যাগ করলেও পরিণামে সংষ্কার মুক্ত হতে পারে নি। ডিহরীতে নির্জন বাড়িতে একাকী থেকেও অচলা সুরেশের ভোগের শিকার হয় নি। অত্যন্ত বলিষ্ঠতার সাথে সে সুরেশের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আর এর পিছনে সক্রিয় থেকেছে সমাজ ও সংস্কারের প্রতি অচলার প্রবল আস্থাবোধ।
‘শ্রীকান্তে’র অন্নদাদিদি ও ‘চরিত্রহীন’ এর সাবিত্রী সম্পর্কেও ঐ একই কথা খাটে। তার সকলেই সামাজিক অপরাধে অপরাধিনী নয়, বরং তারা হচ্ছে বিশুদ্ধ নারীত্বের মহিমময়ী দৃষ্টান্ত। তারা যে অন্ত:সারশূন্য সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ও কুসংস্কারগুলোকে আঁকড়ে থাকতে চায়, তা যে তাদের বিগত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ, এমন মন্তব্য করা চলে না। এটা আরও সুষ্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যখন আমরা অন্যান্য চরিত্রগুলোর বিষয় চিন্তা করি, যাদের জীবনে সামাজিক কলুষ একতটুকু স্থান পায় নি। ‘পথের দবী’র ভারতী, ‘শেষপ্রশ্ন’র কমল, ‘বিপ্রদাস’-এর বন্দনা, এরা সম্পূর্ণ পৃথক সামাজিক স্তরের চরিত্র। তারা শিক্ষিতা মার্জিত রুচিসম্পন্ন এবং বিগত জীবন বলে তাদের কিছু নেই। তারা বুদ্ধিমতী, এমন কি সমাজের কোন কোন বৃহত্তম আদর্শ সম্পর্কে তারা বিচারশীল, সন্দেহবাদী, সকল রকম স্বাধীনতা সত্ত্বেও তার কিন্তু গোঁড়া হিন্দু সমাজের আচার অনুষ্ঠান ও কুসংস্কারগুলোকে সংঘন করতে পারে নি।
সংস্কারের প্রতি শরৎচন্দ্রের যে অনুরাগ, তা তাঁর রচনায় অনেক ক্ষেত্রেই ত্রুটি ঘটিয়েছে এবং এ ত্রুটি যে অপরিশোধনীয় তাও সহজে অনুমান করা যায়। কখনও কখনও তিনি বাংলার সংস্কারের প্রতি মোহ ও আকর্ষণবশত তার নিগূঢ় শিল্পানুভূতির দাবিকে অস্বীকার করেছেন। ‘পল্লীসমাজ’ এ রমেশের প্রতি রমার ভালবাসা ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয়ে উপায় নেই, কারণ সে বিধবা এবং বাংলার রক্ষণশীল সমাজের বিধবার প্রেমের কোন স্বীকৃতি নেই। চরিত্রহীন-এ সাবিত্রীর ভালবাসা ব্যর্থ হয়েছে একই কারণে। এ প্রসঙ্গে শরৎ সমালোচক নারায়ণ চৌধুরীর বক্তব্য স্মরণযোগ্য। তিনি বলেন-
“সাবিত্রীকে চিরকাল দাসীবৃত্তি করেই যেতে হলো- তার অপরিমেয় ভালবাসার মূল্যই লেখক দিলেন না। ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও সরিয়ে দেয়’- এই উক্তি শরৎচন্দ্রের। কিন্তু দেখা গেল এই আপ্তবাক্য শুধু বঞ্চিতা, পতিতা শ্রেণীর নারীদের জন্য তোলা রইল; উচ্চবর্ণের নারীদের জন্য অন্য বিধান, অন্য পাঁতি সংরক্ষিত থাকলো।”
শরৎচন্দ্রের সৃষ্ট নারী-চরিত্রের মধ্যে যে সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমতী ও চিন্তাশীল, ‘চরিত্রহীন’ গ্রন্থে সেই কিরণময়ী সমাজের বিধি-নিষেধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, কিন্তু তার বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছে, আর তার প্রেমের তৃষ্ণাও মিটে নি। পরিশেষে, তার অত্যুজ্জ্বল বুদ্ধির বিলুপ্তি তার চিত্তবিকার ঘটায়। ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের রাজলক্ষ্মী চরিত্রের কথা তো পূর্বেই বলা হয়েছে। রাজলক্ষ্মী তার সমস্ত অন্তর দিয়ে শ্রীকান্তকে ভালবাসলেও তার নিকট সে আত্মসমপূর্ণ করতে পারে নি, কারণ সে বিধবা এবং সমাজচ্যুতা। অবশ্য, প্রেমকে সার্থক করে তুলতে তার যে অনিচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে, তাকে সে যুক্তির বেদিতে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে, কিন্তু তার সংকোচ ও ভয় কি সামাজিক বিধি নিষেধেরই ফল নয়? এর উত্তর অবশ্যই ইতিবাচক হতে বাধ্য।
বস্তুত শরৎচন্দ্র প্রগতিশীল মানবতাবাদী জীবন চেতনায় পরিস্রুত হয়েও নারী চরিত্র নির্মাণে প্রগতিশীল মানবতাবাদী চেতনায় স্থিতধী থাকতে পারেন নি। তাঁর সৃষ্ট অধিকাংশ নারী চরিত্র প্রেমে প্রগতিশীল হলেও পরিণামে সংস্কারবাদী, রক্ষণশীল। তবে একথা সত্য যে, চরিত্রের এই দ্বান্দ্বিক পরিণামই শরৎচন্দ্রকে লোকপ্রিয় সাহিত্যিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরঞ্জীব করে রেখেছে।
*******************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910