
NTRCA College : শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার কারণ
প্রশ্ন: শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার কারণগুলো আলোচনা কর।
আলোচনা : রেনেসাঁসীয় জীবন-চেতনায় পরিস্রুত শরৎচন্দ্রের প্রতিভা মূল্যায়ন করতে গিয়ে হুমায়ুন কবির তাঁর “শরৎ সাহিত্যের মূলতত্ত্ব” গ্রন্থে বলেন-
“বাংলাদেশে তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বা গুরুত্বপূর্ণ লেখক হয়ত হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর মত জনপ্রিয় দ্বিতীয় কোন লেখকের আর পরিচয় মেলে না।”
সমালোচকের উল্লিখিত মূল্যায়ন অনেকাংশেই সত্য। কেননা, বিষয়, ভাব, প্লট বা কাহিনী বিন্যাস, জীবন-চেতনা, চরিত্র নির্বাচন ও চরিত্র-সৃষ্টি, ভাষা-নির্মাণে শরৎচন্দ্র সারল্যধর্মী স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করেছেন; যার ফলে তিনি বাঙালি পাঠকের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিতে পেরেছেন। আর এ কারণেই তিনি বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয়তম কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন।
শরৎ-সাহিত্যের জনপ্রিয়তার প্রধানতম কারণ হলো তাঁর সাহিত্যের বিষয়। শরৎচন্দ্র ছিল বাঙালির জাতীয় লেখক। তাই বিষয় নির্বাচনে তিনি বরাবরই ছিলেন বাঙালির চিরায়ত জীবনকেন্দ্রিক। প্রকৃতপক্ষে তাঁর উপন্যাস ছিল শাশ্বত বাঙালি জীবনের শব্দ-ছবি। বাঙালি জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ আর বিশ্বাস –অবিশ্বাসকেই তিনি তাঁর উপন্যাসে জীবন্ত করে তোলেছেন। উনিশ শতকের নবজাগরিত মধ্যবিত্ত বাঙালি তাঁদের জীবনের স্বরূপ শরৎ সাহিত্যে প্রত্যক্ষ করে হয়েছেন বিমোহিত, বিমুগ্ধ। শরৎ সাহিত্যের জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উনিশ বিশঞ্জ গ্রন্থে বলেন-
মানুষের মনের গোপন কথাটি শরৎচন্দ্র ধরতে পেরেছিলেন, আর তাকে সহানুভূতির রঙে চিত্রিত করেছিলেন, বিবর্ণ বাস্তবের চারিদিকেও রোমান্স ও করুণ রসের আবরণ টেনে দিয়ে ছিলেন।
শরৎচন্দ্রের পরিণীতা, ‘বিরাজ বৌ, ‘পণ্ডিত মশাই’, ‘পল্লী সমাজ’, ‘বৈকুণ্ঠের উইল’, ‘চরিত্রহীন’, প্রভৃতি উপন্যাস উল্লিখিত মূল্যায়নকে ধারণ করেই সৃষ্টি হয়েছে।
ভাব ও জীবন-চেতনার দিক থেকে শরৎচন্দ্র ছিলেন রোমান্টিক ও মানবতাবাদী। রোমান্টিক আবেগ ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই তিনি মানব জীবনকে অবলোকন করেছেন। তিনি বুদ্ধির চেয়ে হৃদয়কেই প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। তাই হৃদয়ের মাপকাঠিতেই তিনি মানুষকে বিচার করেছেন। ফলে শরৎ-সাহিত্যের অতি সাধারণ মানুষের জীবনও পাঠকের কাছে মাহিমান্বিত মানুষের জীবন হিসাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক গোলাম সাকলায়েন বলেন-
‘শরৎচন্দ্র মানুষকে বিচার করেছেন তার হৃদয়ের মাপকাঠিতে। এই মানব-প্রেম, হৃদয় ধর্মই শরৎসাহিত্যের মূল শক্তি। এই শক্তিই পাঠক চিত্তকে উদ্বেলিত করে, মানব-প্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। উনিশ শতকের সাহিত্যের ভাবধারাই শরৎচন্দ্রের মধ্যে প্রকট, বিশশতকের মস্তিঙ্ক ভিত্তিক সাহিত্য তাঁর সৃষ্টির মধ্যে স্থান পায়নি।’
যে কোন উপন্যাসের ভিত্তি হলো প্লট বা কাহিনী। প্লট প্রধানত দু’ধরণের –সরল প্লট ও জটিল প্লট। সরল প্লটে পাঠক উপন্যাসের ঘটনার গতিধারাকে সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন। এর জন্য পাঠককে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার প্রয়োজন হয় না। সহজেই পাঠক হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন উপন্যাসের কাহিনীর গতিপ্রবাহকে এবং বিভিন্ন চরিত্রের আচরণকে। কিন্তু বিপরীত পক্ষে জটিল প্লটে কাহিনীর গতিধারাকে উপলব্ধি করতে হলে পাঠককে বেশ সতর্ক থাকতে হয়। অন্যথায় পাঠক উপন্যাসের কাহিনীর গতিপ্রবাহকে বোঝাতে সক্ষম হন নি। শরৎচন্দ্র তাঁর অধিকাংস উপন্যাসই সরল প্লট ব্যবহার করেছেন। আর এ কারণেই তার উপন্যাস সহজেই লোক প্রিয়তা লাভ করেছে।
শরৎ সাহিত্যের জনপ্রিয়তার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো তাঁর বর্ণনার পরিমিতি বোধ। শরৎচন্দ্রের জীবনী লেখক গোপালচন্দ্র রায় বলেন- তাঁর রচনার একটা বড় গুণ হলো তাঁর লেখার মধ্যে অসাধারণ সংযম। তাছাড়া তাঁর সাহিত্যে কোথাও অবাস্তব বা বাহুল্য আদৌ নেই। যেটুকু না বললে নয়, সেটুকুই তিনি কেবল বলেছেন, তার বেশি বলেন নি। কোন ঘটনাকে অহেতুক ফেনিয়ে বড় করাবার চেষ্টা তিনি মোটেই করেন নি। কি প্রকৃতির বর্ণনায়, কি নরনারীর রূপ বর্ণনায় আর কি মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণের সময়, তিনি কোথায় উচ্ছ্বাসের বশীভূত হননি। সর্বত্রই তাঁর রচনা সংযত ও পরিমিত। যেমন- শ্রীকান্তের অন্নদা দিদির বণনা দিয়েছেন দুটি বাক্যে:
‘যেন ভষ্মাচ্ছাদিত বহ্নি। যেন যুগ-যুগান্তব্যাপী কাঠোর তপস্যা সাঙ্গ করিয়া তিনি এই মাত্র আসন হইতে উঠিয়া আসিলেন।’
পিয়ারী বাইজী সম্বন্ধে শরৎচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থপূর্ণ বর্ণনা লক্ষ করবার মতো:
বাইজী সুশ্রী, অতিশয় সুকণ্ঠ এবং গান গাহিতে জানে।’
বস্তুত, শরৎচন্দ্র কোন কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করে বা সামান্য খুঁটিনাটি ঘটনারও উল্লেখ করে বক্তব্য বিষয়ের সবটাই বলে শেষ করে দিতেন না, পাঠক পাঠিকাদের জন্যেও কিছুটা রেখে দিতেন। ফলে পাঠক পাঠিকা উপন্যাসের ঘটনার সাথে নিজেকে একাকার করে নিতে পারতেন। আর এর মধ্য দিয়ে শরৎ কথাসাহিত্য হয়ে উঠেছেছিল লোকপ্রিয়।
চরিত্র সৃষ্টির প্রশ্নেও শরৎচন্দ্রের কথা সাহিত্য জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বিশ্বখ্যাত রুশ লেখক টুর্গেনিভ মনে করতেন যে, বাস্তবে একটা কোন চরিত্র না পেলে স্বাভাবিক চরিত্র নিমার্ণ সম্ভবপর নয়। সমারসেট মম এ প্রসঙ্গে বলেন- All the characters that we create are but copies of ourselves.শরৎচন্দ্রও হয়ত এই চেতনায় বিশ্বস্ত ছিলেন। তাই তিনি নিজের অভিজ্ঞতার ভিতর থেকেই চরিত্র নির্বাচন ও নির্মাণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র নিজে বলেন-
‘আমার চরিত্রগুলির নাইনটি পারসেন্ট বেসিস সত্য। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সত্য মাত্রই সাহিত্য নয়। এমন অনেক সত্য আছে, যা সাহিত্য হতে পারে না।---------আমি যে চরিত্র দেখেছি, পারিপার্শ্বিক অবস্থার ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তার যে পরিণতি দেখেছি, তাই লিখেছি। লোকে সেগুলোকে স্বাভাবিক বললেই আমি মানবো না। এই করে আমার সাহিত্য জীবন গড়ে উঠেছে।’
অন্যদিকে, যে সমস্ত নর-নারী সমাজে নিন্দিত ও অবজ্ঞাত শরৎচন্দ্র তাদেরকেই বিশেষভাবে গৌরবান্বিত করেছেন। মহত্ব দেখিয়েছেন তাদের চরিত্র সৃষ্টিতে। এই সমস্ত চরিত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন প্রাণবন্ত ও বাস্তব হয়ে উঠেছে যে, তার পাঠক কল্পনা ও অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
সাহিত্যের ভাষা সৃষ্টিতেও শরৎচন্দ্র ছিলেন সারল্য-বিলাসী। তিনি কারুকার্যময়, কঠিন ও গম্ভীর ভাষার পরিবর্তে সহজে বোধগম্য ভাষা ব্যবহার করেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্য পাঠকের কাছে সহজেই বোধগম্য হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে আধুনিক গদ্যভাষার জনক প্রমথ চৌধুরী বলেন-
‘গল্প গড়গড়িয়ে বলা চাই যাতে ক’রে কথাবস্তু পাঠকের মন আকৃষ্ট করে। ছোটগল্পে বাক্যের কারিগরির স্থান আছে, বড় গল্পে নেই। শরৎচন্দ্রের ভাষা সহজ, সরল ও সচল আর তার পরষং আছে।’
আর সহজ সরল ভাষার কারণেই শরৎসাহিত্য বাঙালি পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
বস্তুত, বাঙালি জীবনের সাথে শরৎচন্দ্রের ছিল নিবিড় পরিচয়। এই পরিচয় সূত্রেই তিনি বাঙালি জীবনকে তাঁর সাহিত্যে জীবন্ত করে তোলেছেন। যার ফলে তাঁর সাহিত্যও বাঙালি পাঠকের কাছে হয়েছে ব্যাপকভাবে লোকপ্রিয়।
*******************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910