
NTRCA College : কাজী নজরুল ইসলাম: প্রেম ও সৌন্দর্যের কবি
প্রশ্ন: প্রেম ও সৌন্দর্যের কবি হিসাবে কাজী নজরুল ইসলামের কবি মানসের পরিচয় দাও।
উত্তর: বাংলা কবিতার ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯-১৯৭৬ এক অবিসংবাদিত শিল্প-পুরুষ। তিনি ছিলেন যথার্থ অর্থেই মৌলিক কবি। বিষয়-ভাবনা ও শিল্পীশৈলীর প্রশ্নে তিনি বাংলা কাব্যে এক স্বতন্ত্র ধাররার স্রষ্টা। রোমান্টিক জীবনাবেগ নিয়ে তিনি যেমন উচ্চারণ করেছেন বিদ্রোহের অমোঘ বাণী, তেমনি গেয়েছেন প্রেম ও বিরহের সুললিত স্বরগ্রাম। প্রেমের তাত্ত্বিক দিকটি তাঁর যেমন কবিতায় রূপ লাভ করেছে, তেমনি এর আবেগগত দিকটিও উন্মোচিত হয়েছে অত্যন্ত শিল্প-সফল ভাবে।
নজরুল মূলত রোমান্টিক কবি। রোমান্টিকতার বিবিধ বৈশিষ্ট্য সঞ্চারিত হয়েছিল নজরুলের মানসলোকে। সূক্ষ্ম রহস্যবোধের চেতনা, মনন প্রধান উদ্দাম কৌতুহলবোধ, প্রকৃতিলোকে আত্মভাবের বিস্তারণ এবং অপ্রাপণীয়র জন্য নিরন্তর হাহাকার নজরুলের কবি-চৈতন্যের প্রধান রোমান্টিক বৈশিষ্ট্য। প্রেমের কবিতায় নজরুলের এই রোমান্টিক মানস-প্রবণতার উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে।
নজরুলের প্রেম ও সৌন্দর্য বোধের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর ‘দোলন-চাঁপা’ ১৯২৩, ‘ছায়ানট’ ১৯২৪, ‘পূবের হাওয়া’, ‘সিন্ধু হিন্দোল’ ১৯২৭ ও ‘চক্রবাক’ ১৯২৯ কাব্যে। প্রেম ও সৌন্দর্য পরস্পর নির্ভরশীল। নারীর রূপ-বর্ণনায় নজরুল বিশেষভাবে দৃষ্টি দিয়েছেন চোখে, চোখের ভূরুতে, চিবুকে আর চিবুকের তিলে। পাতলি পাতলি কাঁখের কিশোরী-আর তাদের শিরিনি শিরিন হাসি কবিকে মুগ্ধ করেছে গভীর ভাবে। নারী তাঁর দৃষ্টিতে তখনই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে যখন সে প্রেমে মুগ্ধ বিবশা।
নজরুল রিরংসা তাড়িত হয়ে তাঁর প্রেমের কবিতা রচনা করেন নি। তাই তাঁর কবিতায় নারী দেহের বর্ণনা শ্লীলতা হারায় নি। মধ্যযুগের কবিতার মতো তাঁর কবিতায় নারী পয়োধরের বর্ণনা নেই বললেই চলে। ফলে নারী দেহের বর্ণনার তাঁর কবিতায় কামনার মাদকতা ফুটে উঠে নি, বরং উন্মোচিত হয়েছে নির্ভেজাল সৌন্দর্য চেতনা ও আনন্দ। ‘দোদুল দুল’ বা ‘প্রিয়ার রূপ’ নামক কবিতায় উল্লিখিত বক্তব্যেরই সমর্থন মেলে যেমন-
অধর নিস পিস
নধর কিসমিস
রাতুল তুল তুল---
নাসায় তিলফুল
হাসায় বিলকুল
নয়ান ছল ছল উদাস
দৃষ্টি চোর চোর
মিষ্টি ঘোর ঘোর
বয়ান ঢল ঢল হুতাশ।
তাই তিনি প্রিয়াকে সাজাতে চেয়েছেন-‘তারার ফুলে’, ‘চাঁদের দুলে’ আর ‘রাম-ধনু-রঙ আলতায়’। এবং এভাবেই তিনি প্রিয়ার রূপ ও সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে চেয়েছেন।
নজরুল দৈহিক প্রেমে নয়, বরং রবীন্দ্রনাথ ও বৈষ্ণব পদকর্তাদের ন্যায় দেহোত্তীর্ণ প্রেমে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে প্রাক রবীন্দ্র পর্ব এবং রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের মধ্যে দেহ নির্ভর প্রেমই প্রাধান্য লাভ করেছে। তাঁদের প্রেমের মূল কথা ছিল।
“আমি তারে ভালোবাসি অস্তিমাংসসহ
-----------------------------------
বুঝি না আধ্যাত্মিকতা
দেহ ছাড়া প্রেম কোথা
কামুক লম্পট ভাই যা কহ তা কহ।”
তবে নজরুল দেহাতীত প্রেমেই ছিলেন স্থিতধী। তাই তিনি জন্ম জন্মান্তরেও প্রেমের স্থায়িত্ব কামনা করেছেন। প্রেমকেই শাশ্বত ভেবেছেন।
প্রেমের ক্ষেত্রে নজরুল মিলন নয়, বিরহকেই বড় করে দেখেছেন। যদিও প্রথমপর্বের কাব্যে প্রেমের প্রাঙ্গণে মানবাত্মার শাশ্বত বিরহকে তিনি আবিষ্কার করতে পারেন নি। কিন্তু উত্তরকালে কবি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেছেন; প্রেমের জগতে প্রাপ্তি নয়, বরং অপ্রাপ্তি-মিলন নয় বরং বিরহই চিরায়ত সত্য, শাশ্বত প্রাপ্তি।
প্রেমের জগতে অধরা নারীর জন্য কবির নিরুদ্দেশ পথপরিক্রমা শুরু হয়েছে কাব্যসাধনার প্রারম্ভ থেকেই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতো নজরুলও এই রহস্যময়ী নারীকে স্পর্শ করতে পারেন নি। ফলে রহস্যময়ীকে না পাওয়ার জন্য তাঁর হৃদয়ে জন্ম নিয়েছে তীব্রহাহাকার ও গভীর যন্ত্রণা। তবে কবির এই হাহাকারবোধ ও যন্ত্রণাবোধ চক্রবাক কাব্যের ‘তুমি মোরে ভুলিয়াছ’ কবিতায় এসে দর্শনাশ্রয়ী হয়েছে এবং প্রকাশ করেছে প্রেমের শাশ্বত সত্যকে। অপ্রাপ্তি যন্ত্রণার জন্য এখন আর হাহাকার নেই, নেই ব্যাকুলতা কিংবা বেদনার অলজ্জ চিৎকার- বরং এখানে পাই তত্ত্বলোকে উত্তীর্ণ হবার প্রশান্ত প্রতীতি- হাহাকার নেই, নেই ব্যাকুলতা কিংবা বেদনার অলজ্জ চিৎকার –বরং এখানে পাই তত্ত্বলোকে উত্তীর্ণ হবার প্রশান্ত প্রতীতি-----
‘এ যেন স্বপনে-দেখা কবেকার মুখ,
এ যেন কেবলি সুখ কেবলি এ দুখ
ইহারে দেখিতে হয়---ছোঁওয়া নাহি যায়,
এ যেন মন্দার পুষ্প দেব-অলকায়।’
বিরহ এবং বেদনার এই সৌন্দর্যসন্ধান নজরুলের প্রেমের কবিতায় শৈল্পিক দ্যুতি হয়ে ফুটেছে। এখানে নজরুল বাস্তব নয়, যেন উত্তীর্ণ হয়েছেন পরমার্থ চেতনায়। বেদনা-বিজয়ী-নজরুল প্রেমের রহস্যলোকে বিরহকে পরমসত্য, অনন্ত-মধুর রূপে গ্রহণ করেছেন এবং বিরহের সৌন্দর্যসন্ধ্যানকেই আপন কবিসত্তার মৌল ব্রত, পরম প্রাণনা হিসাবে আবিষ্কার করেছেন-
‘কত পায় বুকে কত সে হারায় তবু---
পায়নি যাহারে ভোলেনি তাহারে কভু
তাহারি লাগিয়া শত সুরে শত গানে
কাব্যে, কথায়, চিত্রে, জড় পাষাণে
লিখেছে তাহার অমর অশ্রলেখা’
নজরুলের ‘পূজারিনী’ কবিতাটিকে তাঁর প্রেম ও সৌন্দর্য বোধের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা যায়। কেননা, এই কবিতায় তাঁর প্রেম ও সৌন্দর্য বোধের পূর্ণরূপ প্রকাশিত হয়েছে। এখানে প্রেমের আদি, মধ্য ও পরিণতির একটা স্পষ্টরূপ ধরা দিয়েছে। দেহকামনা ও কাম-বিরহিত প্রণয়ানুভূতির সুন্দর সুষ্ঠু প্রকাশ এমন করে আর কোনো কবিতায় বা গানে দেখা দেয় নি। ‘পূজারিনী’ কবির অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। শুধু এই কবিতাটিও কবিকে অমরতা দান করতে পারে। এ প্রসঙ্গে ‘সমর্পণ’, ‘পূবের্র চাতক’, ‘চপল সাথী’, ‘অভিশাপ’, ‘অবেলার ডাক’ প্রভৃতি কবিতাও স্মরণীয়। ‘অনামিকা’ কাবতায় কবি পরমের সাথে অনন্ত প্রেমের সন্ধ্যান পেয়েছেন। এখানে কবি উচচারণ করেছেন-
‘প্রেম সত্য প্রেম পাত্র বহু অগণন;
তাই চাই বুকে, তবু কেঁদে উঠে মন,
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়,
যে পাত্রে ঢালিয়া খাও, সেই নেশা হয়।
----------------------------------
প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু,
বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম
সে সরাব লোহু।’
বস্তুত, নজরুল সংগ্রামে যেমন ‘বজ্রদপি কঠোরানি’ প্রণয়ে তেমনি ‘কোমলানি কুসুমাদপি’। তাঁর জীবনের স্বরূপ, তাঁর অন্তর ও কবি জীবনের পরিচয়, তাঁর সাধনা ও জীবনোপভোগের পদ্ধতি, তাঁর অন্তর্জগত ও বাহ্যজগত একটি মাত্র কথায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী,
আর হাতে রণতুর্য।
কবির প্রেম ও সৌন্দর্য বোধের, জীবন ও শিল্প সাধনার যথার্থ স্বরূপ এমনভাবে আর কোথাও প্রকাশিত হয় নি। মোটকথা, নজরুল একদিকে যেমন বিদ্রোহী, তেমনি অন্যদিকে প্রেমিক। তাঁর বিদ্রোহ যেমন সৃষ্টিশীল, তেমনি তাঁর প্রেম বিরহ ও ত্যাগের চেতনায় পরিস্নাত। আর এটিই হলো তাঁর প্রেমের কবিতাকে করেছে বিশিষ্ট ও স্বাতন্ত্র্যধর্মী।
***********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910