
বাংলা স্পৃষ্ট বা স্পর্শ ব্যঞ্জনধ্বনি এবং ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
প্রশ্ন: বাংলা স্পৃষ্ট বা স্পর্শ ব্যঞ্জনধ্বনিগুলোর ধ্বনিতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কর।
উত্তর: বাংলা ব্যঞ্জন ধ্বনি গঠনে ফুসফুস থেকে নির্গত বাতাস মুখের ভেতরে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ বাক্ প্রতঙ্গের সংস্পর্শের জন্যে সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে সাময়িক অবরুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন শ্রেণির ধ্বনি গঠন করে, এই ধ্বনিগুলোই হলো স্পৃষ্ট বা স্পর্শ (Stop, Plosive) ব্যঞ্জন ধ্বনি।
স্পৃষ্ট ধ্বনি: উচ্চারণ স্থানে বায়ুপথ কিছুক্ষণের জন্য রুদ্ধ এবং পর মুহূর্তেই উন্মুক্ত হয়ে স্পৃষ্ট বা স্পর্শ ব্যঞ্জন ধ্বনি গঠিত হয়। অর্থাৎ যে প্রত্যঙ্গগুলো উচ্চারণে অংশগ্রহণ করে, ফুসফুস আগত বাতাস তার পিছনে এসে জমা হয় এবং মুহূর্তকাল পরেই অংশগ্রহণকারী প্রত্যঙ্গদুটোকে পৃথক করে দিয়ে সজোরে বের হয়ে যায়। বাতাস বের হওয়ার সময় দু’ঠোঁট কিংবা তালু ও জিভের যে অংশ এ ধরণের বিশেষ ধ্বনি উচ্চারণে অংশ গ্রহণ করে, ফুসফুস চালিত বাতাস পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সে দুটোকে সজোরে পৃথক করে দেয়, ফলে স্পৃষ্ট ধ্বনির সৃষ্টি হয়।
বায়ু পথ রুদ্ধ হওয়ার ফলে স্পৃষ্ট ধ্বনি গঠনে তিনটি স্তর লক্ষ করা যায়। এগুলো হলো:
১. যখন প্রত্যক্ষ বাক প্রত্যঙ্গ উচ্চারণ স্থান স্পর্শ করে, তখন প্রাথমিকভাবে বায়ুপথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
২. মধ্যবর্তী পর্যায়ে বাতাস হঠাৎ করে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে নৈঃশব্দ বিরাজ করে। তবে বাতাস পিছনে জমা থাকে।
৩. শেষ পর্যায়ে বা প্রত্যঙ্গ উচ্চারণ স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অবরুদ্ধ বাতাস সজোরে বের হয়ে যায়।
উল্লিখিত প্রক্রিয়ায় বাংলায় ২০টি ব্যঞ্জন ধ্বনি উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ বাংলায় স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনির সংখ্যা হলো বিশ। নিচের তালিকায় তা দেখানো হলো-

উল্লিখিত স্পৃষ্ট ধ্বনিগুলোকে ঘোষতা এবং প্রাণতা দিয়েও বিশ্লেষণ করা যায়। এই অনুযায়ী বাংলা স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনধ্বনিকে নিম্নরূপ চার শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা:
(১) ঘোষ অল্প প্রাণ, (২) ঘোষ মহা প্রাণ এবং, (৩) অঘোষ স্বল্প প্রাণ ও, (৪) অঘোষ মহা প্রাণ ।
নিচে উল্লিখিত চার শ্রেণীর ব্যঞ্জনধ্বনির পরিচয় দেয়া হলো-
কথা বলার সময় যখন ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে আসে তখন স্বরতন্ত্রীগুলো কিছুটা বিশ্লিষ্ট হয়ে মুহুর্তের জন্য উন্মুক্ত এবং রুদ্ধ হলে সজোরে কিছুটা বাতাস বেরিয়ে আসে এবং স্বরতন্ত্রী গুলোতে অনুরণনের সৃষ্টি হয়, ফলে ঘোষ ধ্বনি সৃষ্টি হয় বাংলায় ঘোষ স্পৃষ্ট ধ্বনি হলো ১০টি। যথাঃ-
/g/, /gh/, /j/, /jh/, /d/, /dh/, /d/, /dh/, /b/, /bh/
/গ/, /ঘ/, /জ/, /ঝ/, /ড/, /ঢ/, /দ/, /ধ/, /ব/, /ভ/
অন্যদিকে স্বরতন্ত্রীগুলো নিশ্চেষ্টভাবে থাকলে তাদের মধ্যে কিছুটা ফাঁক এবং উন্মুক্ত পথ দিয়ে নিঃশব্দে বাতাস যাতায়াত করে। এই অবস্থায় অঘোষ ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় অঘোষ স্পৃষ্ট ধ্বনি ১০টি। যথাঃ-
/k/, /kh/, /c/, /ch/, /t/, /th/, / t/, /th/, /p/, /ph/,
/ক/, /খ/, /চ/, /ছ/, /ট/, /ঠ/, /ত/, /থ/, /প/, /ফ/
মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনি: ফুসফুস তাড়িত বাতাসের চাপ অধিক হলে মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনির সৃষ্টি হয়। বাংলায় মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনির সংখ্যা দশ। যথা:
/kh/, /gh/, /ch/, /jh/, /th/, /dh/, /th/, /dh/, /ph/, /bh/
/খ/, /ঘ/, /ছ/, /ঝ/, /ঠ/, /ঢ/, /থ/, /ধ/, /ফ/, /ভ/
স্বল্পপ্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনি: ফুসফুস তাড়িত বাতাসের চাপ স্বল্প হলে স্বল্পপ্রাণ ধ্বনির সৃষ্টি হয়। স্বল্প প্রাণ স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনির সংখ্যাও দশ। যথা:
/k/, /g/, /c/, /j/, /t/, /d/, /t/, /d/, /p/, /h/
/ক/, /গ/, /চ/, /জ/, /ট/, /ড/, /ত/, /দ/, /প/, /ব/
উল্লিখিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলা স্পৃষ্ট ব্যঞ্জন ধ্বনি গুলোর নিম্নরূপর বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়:
- /k/, /c/, /t/, / t/, /p/ - ধ্বনিগুলো হলো অঘোষ স্বল্পপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনি।
- /kh/, /ch/, /th/, /th/, /ph/- ধ্বনিগুলো হলো অঘোষ মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনি।
- /g/, /j/, /d/, /d/, /b/- ধ্বনিগুলো হলো ঘোষ স্বল্পপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনি।
- /gh/, /jh/, /dh/, /dh/, /bh/ - ধ্বনিগুলো হলো ঘোষ মহাপ্রাণ স্পৃষ্ট ধ্বনি।
-0-
+88 01713 211 910