
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি : খ ইউনিট, বাংলা ২য় পত্র, লিখিত অংশ, ভাবসম্প্রসারণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি : খ ইউনিট, বাংলা ২য় পত্র, লিখিত অংশ, ভাবসম্প্রসারণ
১. স্বদেশের উপকার নাই যার মন/কে বলে মানুষ তারে? পশু সেই জন।
স্বদেশে প্রেম মানবজীবনের একটি মহৎ বৈশিষ্ট্য। মাতৃভূমির প্রতিটি ধূলিকণা পর্যন্ত শিক্ষিত সংবেদনশীল হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধা ও আগ্রহের বিষয়। স্বদেশের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা প্রকাশ পায় এর শাশ্বত কল্যাণ আকাঙ্ক্ষায় একমাত্র মনুষ্যত্বহীন ব্যক্তির পক্ষেই এর বিরুদ্ধ বা বিরূপ চিন্তা পোষণ করা সম্ভব।
পাখি ভালবাসে তার নীড়কে, অরণ্যের ভয়াল জন্তুও ভালবাসে গহীন বনকে, মানুষও ভালবাসে তার দেশকে-পরিচিত পরিবেশকে, যেখানে সে লালিত হয় অপরিসীম মমতায়। মাতা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষার প্রভাব প্রতিটি মানুষের দেহে, মনে-প্রাণে বিদ্যমান। অন্তঃসলিল ফল্গুধারার মত মাতৃভূমি আমাদের জীবনের মর্মমূলে থেকে চালিত করেছে অনন্তকাল। দেশপ্রেম তাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। যে ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের মধ্যে মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং বেড়ে ওঠে; সে পরিবেশের প্রতি, সেখানকার মানুষের প্রতি তার একটা স্বাভাবিক মমতা ও আকর্ষণ গড়ে ওঠে, তাই আবেগে উদ্বেলিত হয়ে সে গেয়ে ওঠে-
“আমার এই দেশেতে জন্ম যেন, এই দেশেতেই মরি।”
এ পিরিস্থিতিতে ব্যক্তিমাত্রই যে দেশের কল্যাণের জন্য চিন্তা করবে সেটা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই পড়ে। স্বদেশের উপকার মানুষকে ক্ষুদ্র স্বার্থান্ধ থেকে রক্ষা করে তাকে ব্যাপক বৃহত্তের মধ্যে সুযোগ করে দেয়। মানুষের প্রবৃত্তিগুলো এর মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হবার সুযোগ পায়। তাই প্রতিটি মানুষ মাত্রেরই কর্তব্য দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়া। দেশপ্রেমিক মহান ব্যক্তি দেশের এবং তার দেশের অধিবাসীর কল্যাণের জন্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে থাকেন। দেশের কল্যাণের স্বার্থে তাদের চেষ্টার অন্ত থাকে না। মানুষের স্বদেশ প্রেমের এই বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে বর্তমান থাকে না তাকে প্রকৃত পক্ষে মানুষ বলে অভিহিত করা চলে না। স্বদেশ প্রেমহীনি ব্যক্তি পশুর মত বিবেচনাহীন এবং ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে। স্বদেশপ্রেম, মানবতার উদার বাণী এদের পাষাণ হৃদয় ভেদ করার জন্য পশুর মত আচরণ করতে এদের বাধে না। পারিপাশ্বিকতা তাকে বাধা দিলে অমানবিক ও হিংস্র হয়ে ওঠে তার আচরণ। তখন পশু এবং তার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। বিবেকবুদ্ধি-বর্জিত স্বার্থান্বেষী এসব পশুতুল্য মানুষগুলোর জন্যেই পৃথিবীর মানুষ ভোগ করে অবর্ণনীয় দুর্দশা।
প্রত্যেক ব্যক্তিরই মাতৃভুমির সার্বিক কল্যাণকামী হৃদয় হওয়া উচিত। কেননা, স্বদেশের প্রতি ভালবাসাই মানুষ ও পশুর মধ্যে প্রভেদ টেনে দেয়। পশুর দেশ না হলেও চলে কিন্তু রক্তমাংসের শুদ্ধ চেতনার মানুষের পক্ষে এ ধারণা দুঃখজনক এ জন্যই যে, দেশপ্রেম মানুষের মহত্ত্বের যথার্থ পরিচয় উন্মোচন করে।
২. সকলের তরে সকলে আমরা/প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
অথবা, পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না/পরের জন্য তোমার হৃদয় কুসুমকে প্রস্ফুটিত কর।
মানুষ যখন স্বার্থপরতার সংকীর্ণ প্রাচীর পেরিয়ে উদারতার বিশালতায় উত্তীর্ণ হয় তখন সে আনন্দ-বেদনার মধ্যে নিজেকে বিস্তৃত করে দেয়। আর তখনই আসে জীবনের চরম স্বার্থকতা। এই পরিস্থিতিতেই সাধিত হয় জগতের প্রভূত কল্যাণ।
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। বিধাতার এক অপূর্ব সৃষ্টি পুষ্প। প্রকৃতির হৃদয় নিংড়ানো এক মোহময় সৃষ্টি এটি। এই দুই অপরূপ সৃষ্টিকে কবি বাণীবদ্ধ করেছেন তাদের ত্যাগের মহিমা উদ্ধৃত করতে গিয়ে। পুষ্প শুধু একটি বীজের উত্তরসূরী হিসেবেই প্রকৃতিতে আবির্ভূত হয় না। দীর্ঘ সাধনার মধ্য দিয়ে আপন মহিমা নিয়ে প্রস্ফুটিত হয় পুষ্প। প্রস্ফুটিত পুষ্পের সুরভি বিতরণের মধ্যেই তার সার্থকতা নিহিত। তার সৌন্দর্য, সুবাস অন্যের পুলক ও আনন্দের জন্য উৎসর্গের মাঝেই তার চরম সার্থকতা। অথচ একটি কলিকে নানা প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে, হৃদয়ের রস নিংড়ে ফুটন্ত পুষ্পে রূপান্তরিত হতে হয়েছে। এক্ষেত্রে ত্যাগ শুধু ফুলের কিন্তু প্রাপ্তি সবার। ফুলের আদর্শ গ্রহণ করে মানুষও যদি তার সর্বস্ব অপরের কল্যাণের জন্য উৎসর্গ করতে পারে তবেই তার জীবন হয়ে উঠবে সুন্দর এবং সার্থক।
সুবিশাল এই পৃথিবীর বিস্তর মানবগোষ্ঠীর দুঃখ-বেদনা আজ পৃথিবীর বুকে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। মানবতাহীন অত্যাচারীরর স্বার্থপরতা পুষ্পের এই আদর্শকে ভূলণ্ঠিত করেছে বারংবার। কিন্তু প্রকৃত সত্য এই, বিশ্বের সবার কল্যাণ ব্রতের মধ্যেই উদযাপিত হয় জীবনের চরম সার্থকতা। যে মানুষ চরমভাবে আত্মসুখে নিমগ্ন এবং সংকীর্ণ স্বার্থের মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখে প্রকৃত অর্থে তার জীবন ব্যর্থ। কারণ, তার চেনা সংকীর্ণ জীবনের বাইরে পড়ে আছে বিশাল জগৎ, সেই বিশাল জনসমুদ্রে মানব হিতার্থ যদি কেউ সামিল হতে না পারে, তবে তার জীবনের উদ্দেশ্য পুর্ণতা পায় না। স্বার্থপর হিংসাপূর্ণ হৃদয়ের মধ্যে কখনও সুখের সন্ধান মেলে না, সেখানে অনুভূত হয় না নির্মল শান্তির বাতাস। এ প্রসঙ্গে লুৎফর রহমানের একটি উক্তি স্মর্তব্য-
“যতদিন না মানুষ পরকে সুখ দিতে আনন্দবোধ করবে তত দিন তার যথার্থ কল্যাণ নাই।”
এই যথার্থ কল্যাণের স্বার্থে প্রতিটি মানুষেরই প্রয়োজন নিজের মধ্যে ত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টি করা। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে তার গৌরবময় ইতিহাসের যে সমস্ত স্বাক্ষর আমরা পাই তার বাঁকে বাঁকে রয়েছে অসংখ্য জ্ঞানী-গুণীর অপরিসীম ত্যাগ। তাদের ত্যাগই সকল সুন্দরের শুভ সূচনা করেছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), তাপসী রাবেয়া, হাজী মুহম্মদ মুহসীন, দানবীর কার্নেগি প্রমুখ মহামানবেরা অপরের কল্যাণের জন্যে তাদের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে মানবজাতিকে সার্থক করেছেন। তাদের এই অপরিসীম ত্যাগের সাথে আপামর জনসাধারণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ত্যাগের মধ্যদিয়েই হতে পারে সুখের স্বর্গ।
প্রকৃতি ও মানুষ এক অপরের পরিপূরক। প্রকৃতি তার অকুণ্ঠ ত্যাগ দিয়ে আমাদের জীবন চলার পথকে সুষম রাখার প্রয়াসে সদা নিয়োজিত। মানুষ তার ব্যত্যয় করলে তার সুখও একদিন হুমকির সম্মুখীন হতে বাধ্য। এই অগাধ এবং নির্মম সত্য উপলব্ধি করে আমাদের উচিত পরাথে এবং পৃথিবীর স্বার্থে পুষ্পের ন্যায় জীবনকে উৎসর্গ করা।
৩. স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। অথবা, স্বাধীনতা অর্জন করা কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিনতর।
অগণিত লোকের প্রাণান্তকর সংগ্রাম এবং অঢেল রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। এর ত্যাগ ও কৃচ্ছ্রসাধনের পর যে স্বাধীনতা অর্জিত হয় তা রক্ষা করার জন্য অধিকতর সচেতনতা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন।
অন্যের অধিকার বা শাসনের বাইরে থাকার নাম স্বাধীনতা। স্বাধীনতা জাতীয় জীবনের অমূল্য সম্পদ। স্বাধীনতা অর্জন কঠোর শ্রম ও সীমাহীন ত্যাগের ফল বলে বিবেচনা করতে হয়। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং বহু প্রাণের বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এ স্বাধীনতা অর্জিত হয়। কারণ, শক্তিমান শাসকরা কখনও পদানত জাতিকে স্বাধীনতা দান করে না। কষ্টার্জিত এই স্বাধীনতা শুধু অর্জনের মধ্যে আবদ্ধ রাখলে তার যথার্থ রূপ প্রত্যক্ষ করা যায় না। স্বাধীনতাকে মর্যাদাশীল করে রাখতে হয়। আর মর্যাদাশীল করে রাখার কাজটিই সবচেয়ে দুরুহ ও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সংগ্রাম আর অপরিসীম আত্মত্যাগের যে স্বাধীনতার আগমন ঘটে তার সামনের দিনগুলো আরো ভয়াবহ ও সংকটময় বলে বিবেচিত হয়। তাই স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য আরো বেশি শক্তি প্রয়োজন। কারণ স্বাধীন দেশের ভেতর ও বাইরে শত্রুর অবধি থাকে না। বাইরের ও ভিতরের বিরোধিতা থেকে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার সাধনা যথার্থই কঠোর সাধনা। স্বাধীনতা পূর্বেকার শত্রুরা অদৃশ্যভাবে দেশের ক্ষতি করে। তাদের পরাজিত করা অত্যন্ত কষ্টের ব্যাপার। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্রীয় জীবনে হতাশা দেখা দেয়, কর্মোদ্দীপনা কমে যায় এবং জাতীয় উন্নতির পথ হয় কণ্টকাকীর্ণ। তখন স্বাধীনতার গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মর্ম রক্ষা করার প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়। তাই স্বাধীনতার রক্ষার জন্য দেশের আপামর জনসাধরণকে অশেষ চেষ্টা ও কর্তব্যপরায়ণতার সাথে মাঠে-ময়দানে, কলে-কারখানায় অবিরাম কাজ করতে হয়। দেশকে শিল্প ও বাণিজ্যে উন্নত করে দেশের আর্থিক স্বচ্ছলতা আনতে হয়। কৃষির উন্নতি বিধান করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হয়। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড যদি দৃঢ় থাকে এবং দেশ যদি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় তাহলেই জনসাধরণের মধ্যে প্রেরণা ও সচেতনতা পরিলক্ষিত হয়। তখন দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হবার ভয় থাকে না। কিন্তু জনগণকে সাথে নিয়ে কাজগুলো করা যথেষ্ট সহজ নয়। ১৯৭১ সালে আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধারা ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তাকে কি আমরা যথেষ্ট মর্যাদার সাথে রক্ষা করতে পারছি? স্বাধীনতা লাভের পরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেভাবে নীতিহীনতা, অত্যধিক ব্যয়ের প্রবণতা, অসামাজিক কার্যকলাপ, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বেড়ে চলছে-এ অবস্থা যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে তবে স্বাধীনতা রক্ষা করা কি সত্যিই সম্ভব হবে? অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট সচেতন ও শক্তিশালী না হলে স্বাধীনতা রক্ষা কর সত্যিই দুরুহ হয়ে পড়বে।
স্বাধীনতা হীনতায় এই পৃথিবীর কেউই বাঁচতে চায় না। ফলে স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি মানুষের মধ্যেই থাকে। কিন্তু একে রক্ষা করার বিষয়টি ও ভুলে গেলে চলবে না, সকলের সমবেত চেষ্টা ছাড়া স্বাধীনতাকে সত্যিকার অর্থে রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
৪. অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ-সম দহে
অন্যায় আমাদের সমাজে আজ প্রকটভাবে চেপে বসেছে। এজন্যে অন্যায়কারী তো অবশ্যই দায়ী, সেই সাথে অন্যায়কারীকে যিনি প্রশ্রয় দেন তিনিও দায়ী। অন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য তাই অন্যায়কারী এবং অন্যায় সাহায্যকারী দুজনেরই ন্যায়ের বিবেচনায় শাস্তি পাওয়া উচিত।
জীবনকে শুভ্র, সুন্দর, সুখকর রাখতে অন্যায় থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যায় থেকে বিরত থাকলেই জীবন সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে থাকে। কিন্তু স্বার্থপর, লোভী, বিবেকহীন মানুষ স্বীয় চরিতার্থের প্রচেষ্টায় অন্যায়ের দ্বারস্থ হয় এবং মানবসমাজকে নিপীড়ন ও বেদনায় বিষাক্ত করে তোলে। অন্যায়কারীরাই বাস করেন না, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরাও আছেন এবং সংখ্যায় তারা কম নয়। এসব ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা তাদের ন্যায়পরায়ন বিবেক দ্বারা সত্য, শুদ্ধ পথে পরিচালিত হন। জগতের সব কাজেই তার অন্তরের বিবেকবুদ্ধি থেকে আসে অমোঘ বিধান-অনড় নির্দেশ। কিন্তু ভীতি ও দুর্বলতার কারণে অনেক সময় মানবকুল ন্যায়ের সেই অমোঘ নির্দেশ পালনে হয় পশ্চাৎপদ। সেই মহান দায়িত্ব পালনে হয় কুণ্টিত এবং সংকুচিত। ন্যায়ের নির্দেশ পালনে এই অক্ষমতা বা দ্বিধা-দুর্বলতার অর্থ অন্যায়কে স্বীকার করা। অন্যায় সহ্য করা বা উপেক্ষা করাও প্রকারন্তরে অন্যায়কে উৎসাহিত করা হয়। এক সময় অন্যায়ের দুর্বিষহ অত্যাচারে আর্তনাদ করে উঠে পৃথিবী। ন্যায়বোধ পৃথিবী থেকে বিলুপ্তি হবার উপক্রম হয়। অন্যায়কারী অবাধে অন্যায় কাজ করে যেতে পারে যদি তার কাজে কোন বাধা না আসে। অন্যায় যার উপর হয় সে যদি প্রতিবাদ করে বা প্রতিরোধের উদ্যোগ নিয়ে অপরের সাহায্য কামনা করে তবে অন্যায় কর্ম অবাধে সংগঠিত হতে পারে না। সমর্থ থাকুক বা না থাকুক অন্যায়কে সহ্য করে চলবে না; শক্তি প্রয়োগ সম্ভব না হলে অন্তত ঘৃণার মাধ্যমে অন্যায় প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যায়কে প্রশ্রয়দানের ফলে আমাদের সমাজের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কী ধরনের অবনতি হতে পারে তা আমরা আমাদের সমাজের দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারব। আমরা আমাদের গা-বাঁচানোর স্বভাবের কারণে অন্যের আহ্বানে সাড়া দেই না। একদিন অন্যরাও আমাদের বেলায় একই কাজ করবে। এভাবে প্রতিরোধকারীদের মানসিকতা যদি ভেঙে যায় তবে অন্যায়কারীকে যেমন আমাদের ঘৃণা করা উচিত তেমনি অন্যায় প্রশ্রয়কারীকেও প্রচণ্ড ধিক্কার দেয়া উচিত, যাতে তার মধ্যে প্রতিরোধের প্রবল ইচ্ছা জেগে উঠে।
আমাদের সমাজে আজ অন্যায়কারীর চেয়ে অন্যায় প্রশ্রয়দাতার সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে অপরাধীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অবক্ষয় রোধ করা না গেলে সবাইকেই একদিন এ অব্যবস্থার জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।
৫. স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ/বৃহৎ জগৎ হতে সে কখনো শেখেনি বাঁচিতে।
মানুষ যখন স্বার্থপরতার সংকীর্ণ প্রাচীর পেরিয়ে বৃহত্তের বিশালায়তনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে সবার আনন্দ-বেদনার মধ্যে নিজেকে বিস্তৃত করে দেয় তখনই জীবনে আসে চরম সার্থকতা। ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে মানবতার স্বার্থকে বড় করে দেখার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ পৃথিবীতে শুধু নিজের মঙ্গল-অমঙ্গলের কথা চিন্তা করতেই আসে নি। পৃথিবীতে তার রয়েছে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু সংকীর্ণ ও অনুদার স্বার্থপরতায় মগ্ন হয়ে অনেকেই পৃথিবী থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। স্বার্থমগ্ন মানুষ ভুলে যায় আজকে সভ্যতার যে উৎকর্ষ আমাদের চোখ ঝলসে দেয় তা এ পৃথিবীর মানুষের তৈরি। সেসব মানুষ শুধু নিজের কথা চিন্তা না করে পৃথিবীর সবার সুখ-শান্তির কথা ভেবেছেন ফলে নিজের সুখ-শান্তি অন্যের জন্য উৎসর্গ করেছেন। পৃথিবী তাদেরকে মনে রেখেছে এবং রাখবে। মৃত্যুকে বরণ করেও পৃথিবীতে তারা অমর। সংসারে এদের সংখ্যা অল্প, যাঁরা নিজেদের সুখ ভোগের কথা খুব কমই চিন্তা করে থাকেন। তারা অপরের সুখের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে থাকেন। অপরের মুখে হাসি দেখে নিজেরা সুখি হন পরহিতার্থে উৎসর্গকৃত এ মানবেরা তাঁদের কর্মের মাধ্যমে যুগ যুগ বেঁচে থাকেন। পক্ষান্তরে অন্য শ্রেণির লোক ভোগজাত সুখ পাবার জন্য লালায়িত। সে জন্যই তারা কাজ করে, কাজের ফল ভোগ করে তৃপ্ত হয়। এরা কখনো নিজেরদের সুখভোগ ছাড়া অন্যদের সুখের কথা চিন্তা করে না। আত্মসুখবাদী এসব মানুষ স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়। পাছে জগতের আর্তপীড়িতের ক্রন্দনধ্বনি তার সুখ-সম্ভোগের জীবনকে স্পর্শ করে সেজন্য সে তার আত্মসর্বস্বতার সব দ্বার রুদ্ধ করে তার মধ্যে বাস করে। সে মানব সংসারের অংশীদার না হয়ে পশুর মত শুধু খেয়ে-পরে জীবন ধারণ করে, ফলে তার বাঁচার কোন সার্থকতা নেই এবং মৃত্যুর পর মানুষ তাকে সহজেই ভুলে যায়। কিন্তু একথা সত্য যে, বিশ্বের সবার কল্যাণ ব্রতের মধ্যেই উদযাপিত হয় জীবনের চরম সার্থকতা। যে মানুষ চরমভাবে আত্মসুখে নিমগ্ন এবং সংকীর্ণ স্বার্থের মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখে প্রকৃত অর্থে তার জীবন ব্যর্থ। কারণ তার চেনা সংকীর্ণ জীবনের বাইরে পড়ে আছে বিশাল জগৎ। সেই বিশাল জনসমুদ্রে মানব হিতার্থে যদি কেউ সামিল হতে না পারে, তবে তার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণতা পায় না। পরহিতার্থেই মানুষের জীবন যথার্থ গৌরবান্বিত হয়ে উঠেতে পারে এবং জগতের মানুষের যথার্থ কল্যাণ এখানে নিহিত। এ যথার্থ কল্যাণের স্বার্থেই প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন নিজের মধ্যে ত্যাগের মানসিকতা সৃষ্টি করা। তবেই স্বার্থনিমগ্ন মানুষ চোখ তুলে পৃথিবীর দিকে উদার দৃষ্টিতে তাকাতে পারবে। পৃথিবীর যে অপার সৌন্দর্য সুখ, প্রাচুর্য তা স্বার্থনিমগ্ন মানুষ কখনই যথার্থভাবে উপভোগ করতে পারে না তার সবকিছুতেই একটা সংকীর্ণতার ছাপ পড়ে। সুন্দরভাবে, সফলভাবে জগতে বাঁচার অধিকার তার নেই এবং মানুষের মনের কোঠায়ও তার স্থান হয় না। স্বার্থমগ্ন মানুষ সমাজ এবং মানবজাতি কোন উপকারে আসে না। এরা দেশ জাতির কলঙ্ক। এদের থেকে দূরে থেকে পরহিতার্থে জীবন উৎসর্গ করলেই সত্যিকারভাবে বাঁচা সম্ভব।
৬. দণ্ডিতের সাথে/দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে/সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।
অপরাধীর বিচার প্রথা সমাজে অনেক প্রাচীন প্রথা। এর ফলে অপরাধী দণ্ডিত হয়। যে বিচার অপরাধীর ব্যথা-বেদনার বিচারকের হৃদয়-মন সমানভাবে বেদনা-কাতর হয়ে ওঠে, সেই বিচারই সার্থক বিচার।
মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির সেরা জীব। প্রকৃতির নিয়মে মানুষ জীবনীশক্তি লাভ করে সত্যি কিন্তু সত্যিকার মানুষ হতে হলে তার ভেতরকার মানবীয় গুণাবলীর সামগ্রিক প্রকাশ দরকার। সব ধরনের মানুষেরই মধ্যেই এই বিকাশ সমানভাবে হয় না। কু-প্রবৃত্তির তাড়নায় কেউ কেউ অন্যায়-অবিচার করে; তখন সে হয় অপরাধী। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও ন্যায়নীতি রক্ষার জন্য দণ্ড দানের আবশ্যকতা আছে। কিন্তু অপরাধের পরিমাণ, গুরুত্ব এবং উদ্দেশ্য বিবেচনা করে বিচারকার্য পরিচালনা করা দরকার। অন্যথায় বিচারে ত্রুটি হতে পারে। বিচারের বেলায় বিচারকের হৃদয় যদি অহংকার, ঘৃণা বা বিতৃষ্ণা জন্মে তবে তার পক্ষে নিরপেক্ষ বিচার করা সম্ভব নাও হতে পারে। পক্ষপাতদুষ্ট বিচার অবিচারের শামিল। নিরপেক্ষভাবে অপরাধ নির্ণয় হতে হবে। তাছাড়া অপরাধীও একজন মানুষ এ বিষয়টি সদয় বিবেচনায় রাখতে হবে। বিচারকের কাছে আপন-পর ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়। তাছাড়া বিচার হবে অপরাধের, মানুষের নয়। বাইবেলে ঘোষিত হয়েছে-‘পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়।’ অপরাধীর শাস্তি দানের উদ্দেশ্যে হতে হবে তার মন ও মগজ থেকে অপরাধ প্রবণতা দুর করা। তাকে কুকর্ম থেকে ফিরিয়ে এনে সুনাগরিক হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
যে দণ্ডদান দণ্ডদাতার মানবীয় সহানুভূতিশীল হৃদয়কে স্পর্শ করে না তা অত্যাচারের নামান্তর। যে সামাজিক ব্যবস্থায় এ ধরনের দণ্ডদান প্রদান করা হয় সেখানে অত্যাচারের ভয়ে সাময়িকভাবে দণ্ডদাতা সফল হলেও স্থায়ীভাবে সফলতা আশা করা যায় না এবং সে বিচারককে কোনভাবেই উত্তম বিচার ব্যবস্থা নাম দেয়া যায় না। দণ্ডদাতার রায়, আচরণ এবং সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থা যদি অপরাধীর হৃদয়ে অনুশোচনা না জাগিয়ে যদি উল্টো প্রতিশোধসম্পৃহা এবং ক্রোধের জন্ম দেয় তবে সে দণ্ডদাতা অবশ্যই ব্যর্থ। দণ্ডদানের উদ্দেশ্যকে যথাযথ ফলপ্রসূ করতে হলে বিচারকের হৃদয়গত মানবতায় সহানুভুতির যাদু স্পর্শে অপরাধীর অন্তরে জাগবে সুতীব্র অনুশোচনা ও আত্মধিক্কার। তখনই অপরাধী ফিরে পাবে হারানো বিবেক ও লুপ্ত মনুষ্যত্ব। সার্থক বিচার কার্যের উদ্দেশ্য এ লুপ্ত মনুষ্যত্বকে উদ্ধার করা।
বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় প্রতি পদে পদে মানবীয় অনুভুতিগুলোকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। সবধরনের শাসন ও বিচার থেকে হৃদয়ের অনুভূতি উঠে যাচ্ছে। ফলে দণ্ডদাতারা হচ্ছেন প্রতিনিয়ত ব্যর্থ। এ অবস্থা চলতে থাকলে দণ্ডদাতার দণ্ডদান হুমকির সম্মুখীন হতে বাধ্য তাই অপরাধীর প্রতি প্রথমত আমাদের সহৃদয় সহানুভূতি ব্যক্ত করা উচিত এবং তারপর তাকে দণ্ড দেয়া উচিত। সফল দণ্ডদানই সমাজে শাশ্বত মঙ্গল বয়ে আনতে পারে।
৭. কীর্তিমানের মৃত্যু নেই, অথবা, মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে, বয়সের মধ্যে নহে।
পৃথিবীতে মানুষের জীবনকাল সংক্ষিপ্ত কিন্তু কাজের পরিধি ব্যাপক। সময়ের পরিধি সহজেই শেষ হয়ে যায় কিন্তু কৃতকর্মের ফল কখনই শেষ হয় না। মহৎ কাজের মাধ্যেমে মানুষ নিজেকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
মানুষের জীবনকে দীর্ঘ বয়সের সীমারেখা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না জীবন যদি কোন কাজ না থাকে তবে সে জীবন অর্থহীন। সে নিস্ফল জীবনের অধিকারী মানুষটিকে কেউ মনে রাখে না। কিন্তু কীর্তিমান ব্যক্তির যেমন মৃত্যু নেই, তেমনি সমাপ্তি নেই। মৃত্যুর কালো স্পর্শের স্বাদ গ্রহণ করতে হয় প্রতিটি মানুষকেই। কারো দুদিন আগে, কারো দুদিন পরে। এদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষের নাম মৃত্যুর সাথে সাথেই মুছে যায়। কারো নাম আবার শত শত বছরেও এতটুকু অস্পষ্ট হয় না। এ বিষয়গুলো কখনই ব্যক্তি কত বছর বেঁচে থাকল তার উপর নির্ভর করে না। ঐ ব্যক্তি মানব কল্যাণে কী ভুমিকা রেখে গেলেন সেটাই মূল বিবেচ্য। অনেক আত্মসুখ নিমগ্ন মানুষ আছে যারা পৃথিবীতে যতদিন বেঁচে থাকে নিজের সুখের কথাই চিন্তা করেন। মানবকল্যাণে কোন কাজ করার মানসিকতা থাকে না। এদের কথা মানুষ কখনই মনে রাখে না। অন্যদিকে, মানব জাতির কল্যাণে যারা মহৎ কাজ করেন তাদের জীবনকালে অল্প দিন হলেও পৃথিবীর মানুষ তাকে স্মৃতিতে অম্লান করে রাখে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র একুশ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু সাহিত্যজগতে তার অমূল্য অবদান মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর জন্য তিনি মানুষের মধ্যে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন। যিনি কাজের মাধ্যমে জগৎ ও জীবনের কল্যাণ করেন, তাকে বিশ্বের মানুষ হৃদয়ে শ্রদ্ধার সাথে আসন দান করে। ফলে মানবজীবনের প্রকৃত সাফল্য বিবেচিত হয় তাঁর কৃতকর্মের মাধ্যমেই। গৌরবোজ্জ্বল কৃতকর্মের দ্বারাই সে জীবনের সীমা অতিক্রম করে। মানুষের চিরবিদায় পরও মহৎ কর্মের নিদর্শন বিদ্যমান থেকে মানুষের অমরতা ঘোষণা করে।
প্রতিটি মানুষেরই গোপন বাসনা, সে যেন মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে। এই বাসনার প্রতি লক্ষ রেখে আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত জগৎ ও মানুষের কল্যাণের জন্য অবিরত কাজ করে যাওয়া।
৮. জীবে প্রেম করে যেইজন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।
সৃষ্টির সেবাতেই স্রষ্টার সেবা। এ সৃষ্টির মধ্যে যা কিছু রয়েছে তার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করলে বিধাতা মানুষের প্রতি খুশি হন। তাই সকল জীবকে ভালবাসার পথ ধরেই স্রষ্টাকে লাভ করার সাধনা করা উচিত।
স্রষ্টার কাছে প্রিয় জিনিস তার সৃষ্টি। স্রষ্টা তার সৃষ্টির মাধ্যমেই প্রকাশ করেন নিজেকে। তিনি পরোক্ষভাবে সৃষ্টির মাঝেই বিলিয়ে দেন নিজেকে। আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে স্রষ্টা রচনা করেন তার সৃষ্টিকে। এ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হল মানুষ। মানুষের তাই এ সৃষ্টির প্রতি রেয়েছে আলাদা দায়িত্ব, মানুষ তার মেধা-মনন দিয়ে অন্যের সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারে। অন্যান্য জীবের চাহিদাসহ মানুষের বিভিন্ন চাহিদা একমাত্র মানুষই বুঝতে সক্ষম। দুঃখী যন্ত্রণাকাতর জনের সেবা করা। আর সেবা করার মানসিকতা আনতে হলে প্রথমে এদেরকে ভালবাসা দরকার। এ ভালবাসা মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয় স্রষ্টার প্রতি ভালবাসা। শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে যারা স্রষ্টাকে ভালবাসার দাবি করেন, বাস্তবে তাদের দাবি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় মানুষকে ঘৃণা করে যারা শাস্ত্রের পূজা করে তাদের সাধনা ভণ্ডামির পর্যায়েই পড়ে। বিদ্রোহী কবি নজরুলের ভাষায়-
“মানুষেরে ঘৃণা করি
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল, চুম্বিছে মরি মরি।
ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল।”
মানুষের স্পর্শকে তারা দূরে ঠেকিয়ে রেখে অর্থহীন সামাজিক রীতি ও সংস্কারের আরাধনা করে। এতে তারা প্রকারান্তরে ঈশ্বরের স্পর্শকেই দূরে সরিয়ে রাখে। গৌতমবুদ্ধ জীব হিংসা পরিত্যাগ করে সর্বভূতে প্রেম ও মানুষের মধ্যে মৈত্রি স্থাপনের উপদেশ দিয়েছিলেন। শ্রী চৈতন্যের বাণী প্রেম, মৈত্রি ও সহিষ্ণুতার বাণী, শ্রী রামকৃষ্ণের বাণী-সেবার বাণী, মানবতার বাণী আর ইসলামের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর সমগ্র জীবনটাই মানবতার প্রেম। সেবা আর সহিষ্ণুতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, দানের আর ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। একদিন স্বামী বিবেকানন্দ মানব প্রেমে উদ্বেল হৃদয়ে বলেছিলেন “যতদিন ভারতবর্ষে একটি লোকও বুভুক্ষু থাকবে ততদিন আমি আমার মুক্তি চাই না।” এ উদার মানব প্রেম।
মূলত মানব সেবাই ঈশ্বর সেবা। সেই সেবার পশ্চাতে কেবল প্রত্যাশা কিংবা অভিসন্ধি থাকা উচিত নয়। প্রত্যশাবিহীন এবং স্বার্থবিমুক্ত জনসেবার মাধ্যমে ঈশ্বর সেবায় ন্যায় এক অনাবিল স্বর্গীয় আনন্দের প্রসাদ অন্তরে লাভ করা যায়। তা-ই প্রকৃত জনসেবকের চরম ও পরম প্রাপ্তি।
৯. বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছেন নারী, অর্ধেক তার নর।
নারী-পুরুষের সমান চেষ্টা ছাড়া পৃথিবীতে বড় কিছু সৃষ্টি হয়নি। পৃথিবীর যাবতীয় কল্যাণের পেছনে নারী-পুরুষের একত্র প্রয়াস সমানভাবে কার্যকর।
সৃষ্টিকর্তা নারী জাতিকে পুরুষ জাতির পরিপূরক রূপে সৃষ্টি করেছেন। কিংবা অন্যভাবে বলা যায় পুরুষকে নারীর পরিপূরক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তাই যথার্থ সাফল্যের জন্য প্রত্যেক নারী-পুরুষ পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। উভয়ের সম্মিলিত প্রয়াসের ফলেই এ পৃথিবীর সভ্যতা ও প্রগতি বেগবান হয়েছে। এই ধ্রুব সত্যকে যখনই যে সভ্যতা অস্বীকার করতে চেয়েছে তখনই তাদের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার। পুরুষ যখনই নারীর অধিকারের উপর খড়গহস্ত হয়েছে তখনই পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। মানবতার অভাবে পৃথিবীতে বিরাজ করেছে মরুময় শূন্যতা। একই ভাবে নারী যখন তার কল্যাণব্রতের ভূমিকা থেকে চ্যুত হয়েছে তখনই সভ্যতায় এসছে স্থবিরতা। সভ্যতার ইতিহাস এসব ঘটনার নীরব সাক্ষী। তাই আধুনিক সভ্যতা ও প্রগতির জন্য নারী কিংবা পুরুষ জাতি একক কৃতিত্বের দাবি করতে পারে না। আর কেউ যদি তা করে তবে সে দাবি গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হবে।
আদিকাল মানুষ জাতি বড় অসহায়ভাবে জীবনযাপন করত। সময়ের বিবর্তনে মানব জাতি যাবতীয় প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নতুন নতুন সভ্যতা জন্ম দিয়েছে। মানুষ তার মেধা আর কায়িক পরিশ্রম দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলছে বর্তমান সভ্যতার তিলোত্তমা মুর্তি। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসের ফলে পুরুষের পরিশ্রম আর সংগ্রামের পেছনে নারীর সেবা আর সভ্যতার অগ্রগতি যদি একটি গাড়ি হয় তবে নারী-পুরুষ হল সেই গাড়ির দুই চাকা। এই দুই চাকা যদি সমান না হয় তবে গাড়ি সমান তালে এগিয়ে যেতে পারবে না। এই সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করলে এবং সেই অনুযায়ী এগোতে পারলেই মহান কিছুকে লাভ করা সম্ভব।
সম্মিলিত এই প্রয়াসের কথা আমরা মাঝে মধ্যেই ভুলে যাই, ফলে সভ্যতার অগ্রগতি হয় ব্যাহত। যাবতীয় সংকীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে, কল্যাণের পথে অগ্রসর হবার প্রয়োজনে আমাদের তাই সম্মিলিত ভাবে কাজ করা উচিত।
১০. দুর্জন বিদ্বান হইলেও পরিত্যাজ্য।
বিদ্বান যদি চরিত্রহীন বা দুর্জন হয় তবে তাকে দিয়ে কোন উপকার আশা করা অনুচিত। চরিত্রহীন ব্যক্তি অজস্র জ্ঞানের অধিকারী হলেও তার সঙ্গ সর্বদাই পরিত্যাগ করা উচিত।
দুর্জন শব্দের আভিধানিক অর্থ-দুষ্ট বা খল ব্যক্তি। ‘বিদ্বান’ শব্দের অর্থ পণ্ডিত, সুশিক্ষিত বা জ্ঞানী ব্যক্তি। দুর্জন ব্যক্তি চরিত্রহীন ব্যক্তির তুল্য। চরিত্র হচ্ছে কল্যাণ ও সত্যের প্রতি সুতীব্র অনুরাগ। চরিত্রবান ব্যক্তি তার সমস্ত জ্ঞানকে সত্য ও কল্যাণের পথে চালিত করে। তিনি অহংকারহীন, হিংসাদ্বেষহীন সংযত জীবনযাপন করেন। ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে- “বাক্যে কার্যে এবং চিন্তায় সামঞ্জস্য রক্ষিত হইলে মানুষের মধ্যে যে একটি পবিত্র ভাব ফুটিয়ে ওঠে তাহাকে চরিত্র বলিয়া অভিহিত করা যায়।” দুর্জন লোকের চরিত্রে এসব গুণের সমাবেশ দেখা যায় না। আমরা জানি বিদ্যা মানুষের অমুল্য সম্পদ, বিদ্যা মানুষের চোখ, মন খুলে দেয়। বিদ্যা নামক বস্তুটির মাধ্যমে একজন মানুষ পৃথিবীর যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। শুধু তাই নয় মানুষ, সমাজ, জাতির কল্যাণ কিভাবে করা যায়-তার যাবতীয় নির্দেশনাও মানুষ বিদ্যা শিক্ষার মাধ্যমে জানতে পারে। সর্বোপরি একজন বিদ্বান লোক দেশ ও জাতির কল্যাণে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু বিদ্বান যদি চরিত্রহীন হয় তবে তার যাবতীয় জ্ঞান সুস্থ-সুন্দর পথে কাজে না লাগিয়ে অমঙ্গলের পথে, অসুন্দরের পথে কাজে লাগাতে পারেন যা সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। বিদ্বান যদি হয় দুষ্ট বুদ্ধিসম্পন্ন, চরিত্রহীন, লম্পট তবে তার মত দুষ্টক্ষত সমাজদেহে আর নেই। বিদ্বান ব্যক্তি শ্রদ্ধাভাজন হলেও চরিত্রহীন বিদ্বান ভয়ংকর। সে লোক সমাজে কখনো সম্মান লাভের যোগ্য হতে পারে না। চরিত্রহীন বিদ্বান তার বিদ্যাকে অন্যায় কাজে লাগিয়ে থাকে। সুতরাং তার চিন্তা-চেতনার সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রবাদে আছে যে, কোন কোন বিষধর সাপের মাথায় মনি থাকে। মনি বহু মুল্যবান পদার্থ বটে। কিন্তু মনি লাভের জন্য সাপের সাহচার্য বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সেরূপ বিদ্যা আদরণীয় বিষয় হলেও বিদ্যালাভের জন্য দুর্জনের নিকট গমন বিধেয় নয়। কারণ, দুর্জনের সাহচার্য নিষ্কলুষ ব্যক্তির চরিত্রও কুলষিত হতে পারে। ফলে মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চরিত্রহীন দুর্জন ব্যক্তির সঙ্গ পরিত্যাগের বিষয়ে মনীষীদের বক্তব্য হল- “সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।” তাই বিদ্বান ব্যক্তি সৎ কিনা সেটা অবশ্যই বিবেচ্য তা না হলে তার সঙ্গ পরিত্যাগ করাই যুক্তিসঙ্গত।
আমাদের সমাজে বিদ্বান ব্যক্তির যেমন অভাব নেই তেমনি দুর্জন ব্যক্তিরও অভাব নেই। আমাদের উচিত হবে চরিত্রবান বিদ্বান ব্যক্তি খুঁজে বের করা এবং তাদের সাহচর্য লাভ করা অন্যদিকে দুর্জন ব্যক্তিকে সবসময়ই এড়িয়ে চলা।
১১. প্রয়োজনে যে মরিতে প্রস্তুত, বাঁচিবার অধিকার তাহারই।
সাহসীরাই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারে। জীবনের পরিধি একদিন শেষ হবেই। মরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে মানুষ ভীত হয় না, তার জীবনই যথার্থ সার্থকতার দাবিদার। দেশ ও জাতির প্রয়োজনে মহান মৃত্যুকে বরণ করলে গৌরব ও অমরত্ব লাভ করা যায়।
পৃথিবীতে মানুষ চিরজীবী নয়। যে জন্মেছে তাকে মরতেই হবে। মানুষ যেদিন সৃষ্টি হয়েছে সেদিন থেকেই সে আর একটি সত্য বহন করে বেড়াচ্ছে, সেটি হল মরণ। মানুষ দৈহিকভাবে বেঁচে থাকতে না পারলেও অনেকেই অমর হয়ে আছেন কর্মের মাধ্যমে। সেই অমরতা প্রাপ্তির মূলমন্ত্র হচ্ছে বীরের মত কর্ম করে যাওয়া। মরণকে ভয় করলে মানুষের দ্বারা কোন কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। ভয়ের মধ্যে থাকলে জীবনের প্রতি মায়া দেখালে মৃত্যুভয় এসে জীবনকে মর্যাদাহীন করে তোলে। মৃত্যুর হাতে নিজেকে একদিন সমর্পণ করতেই হবে এ সত্যকে মেনে নিয়ে মৃত্যুকে সহজভাবেই মেনে নিতে হবে। তার পাশাপাশি পূর্ণ উদ্যমে কাজ করে যেতে হবে। মরণকে উপেক্ষা করে সৃষ্টির উম্মাদনায় ঝাঁপিয়ে পড়তে না পারলে মানুষের জীবনকে সুখকর অনুভূতিতে ভরিয়ে দেয়া যায় না, প্রত্যেক মানুষেরই এই সহজ সত্যটি অনুধাবন করা উচিত-মানুষ বাঁচে তার কর্মের মাধ্যমে। কর্ম যদি সময়োপযোগী এবং বীরত্বপূর্ণ হয় তবে পৃথিবীর মানুষই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে, পৃথিবীর সব মৃত্যুই বৃথা যায়নি। সভ্যতার বাঁকে বাঁকে বীরত্বপূর্ণ কাহিনীর কথা আমাদের অনেকেরই জানা। সেই দিনগুলোতে যাঁরা হাসতে হাসতে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিল পৃথিবী তাদের কোন দিনই ভুলবে না । তারা জাগতিভাবে মৃত্যুবরণ করলেও বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। দেশ ও জাতি বৃহৎ স্বার্থে মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ জ্ঞান করে বীরের মত এগিয়ে যায় মুত্যু তাদের কোন দিনই নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। সাহসী মানুষের দুর্বার গতির মাঝেই জীবন জেগে থাকে। নতুন কোন সৃষ্টি, কর্তব্যে যে মৃত্যুকে ভয় করে না সেই মৃতুঞ্জয়ী। ১৯৭১ সালে দেশ যখন স্বাধীনতা লাভে উজ্জীবিত তখন জাতি পেয়েছিল প্রাণ। মুক্তিযোদ্ধারা হাসতে হাসতে প্রয়োজনে জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। ফলে দেশ পেয়েছিল স্বাধীনতা, মুক্তিযোদ্ধারা পেলেন অমরতা।
মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। সুতরাং পৃথিবীতে তার এমনভাবেই কর্ম করা উচিত যা মৃত্যুকে জয় করতে সক্ষম। মানব হিতার্থে দেশ ও জাতির বৃহৎ স্বার্থে আমাদের জীবন উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত-এতেই জীবনের যথার্থ সার্থকতা।
১২. প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না।
অথবা, ধনের মানুষ মানুষ নয়, মনের মানুষই মানুষ।
অন্যান্য প্রাণীকুলের মত শুধু প্রাণ বা জীবনের অস্তিত্ব থাকলেই মানুষ পরিপূর্ণ হয় না, যথার্থ মানুষ হতে হলে দেহে প্রশস্ত অন্তঃকরণ তথা মনের উপস্থিতি অত্যাবশ্যকীয়।
বিশ্ববিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি এই পৃথিবী। অতি আদর, যত্নে, মমতায় তিনি সৃষ্টি করেছেন এ বিশ্ব। এ সৃষ্টি বৈচিত্র্যে তার নৈপুণ্যের অন্ত নেই। বিশ্বজগতে যাদের প্রাণ আছে তারাই প্রাণী নামে বিবেচিত। জন্মের দিক দিয়ে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। জন্মের প্রাথমিক স্তরে মানুষের অন্যান্য প্রাণীর মতই বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে প্রাকৃতিক নিয়মে। এই বৃদ্ধি ও বিকাশ লাভের জন্য মানুষকে কোন চেষ্টা, যত্ন, সাধনা বা ত্যাগ স্বীকার করতে হয় না। কিন্তু মানুষের মধ্যকার মন নামক বিশেষ সত্তাটির জন্যই তাকে অতিরিক্ত জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করতে হয়। মানুষ ছাড়া অন্য জীবের মধ্য যা নেই তা হচ্ছে মনের অনুভূতি। এ অনুভূতি উদ্ভব ঘটায় মানবিক চেতনার। এই মানবিক চেতনা অন্য প্রাণীর না থাকায় মানুষের যে মহৎ গুণাবলি অর্জনের সুযোগ ঘটে তা অন্য প্রাণীর সম্ভব হয় না। মানুষ তার মন দিয়ে সাধনা করে জীবনের বিচিত্র বিকাশ ঘটায়। মনের সাহায্যে সে ভালমন্দ, দোষ-গুণ, ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা করতে পারে। এই মন থেকেই সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব মানুষের বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, যার শারীরিক গঠন মানুষের মত তিনিই মানুষ। এজন্য তাকে অনেক সাধনা করতে হয়। সুন্দর মনের অভাবে মানুষের প্রাণ থাকলে ও সে মানুষের পরিণত হয় না। তার অসুন্দর অমানবীয় ও পশুর মত আচরণ তাকে প্রকৃত মানুষ হবার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই মানুষের প্রাণে মনুষ্যত্ব সৃষ্টি করার জন্য অনেক পড়াশুনা এবং সাধনার প্রয়োজন হয়। আমাদের সমাজে অনেক মানুষও পশুর ন্যায় কাজ করে বেড়াচ্ছে। কারণ, তাদের প্রাণে যথার্থ মনুষ্যত্বের উদ্ভব ঘটে নি। এজন্য ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বলেছেন-
‘মনের মানুষই মানুষ’
মানুষকে তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য মানবিক চিন্তাভাবনার উৎকর্ষ সাধন করতে হবে। মানুষ যদি তার শ্রেষ্ঠত্বের চর্চা যথাযথভাবে না করে তবে পশু ও মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে উঠবে।
১৩. ভোগে সুখ নাই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ।
যথার্থ মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষের পরিচয় তার ভোগ-লালসার মাধ্যমের প্রকাশ পায় না, পরের জন্য ত্যাগের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত সুখ নিহিত। নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে যে সুখ তার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব অমৃত সুধা।
ষড়রিপুর (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) প্রবল পরাক্রমে মানুষ আত্মসুখে নিমগ্ন হয়। স্বার্থমগ্ন মানুষেরা ভোগবিলাসের মাধ্যমে পরিতৃপ্তি পেতে চায়। এতে মানুষের লালসা দিন দিন বাড়তে থাকে। ভোগে শুধু আসক্তিই বাড়ে। মানুষ ক্রমে ক্রমে লালসার গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। আত্মতৃপ্তিতে, ভোগে সত্যিকারের লাবণ্য নেই। কারণ, ভোগে মানুষকে ত্যাগী হওয়ার পরিবর্তে অহংকারী হতে শেখায়। মানুষকে আলো ঝলমল জগৎ থেকে অমানিশার জগতের দিকে ধাবিত করে। সে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে পঙ্কিলতার সাথে, গ্লানির সাথে এবং কালিমার সাথে। জীবন চলার বিস্তীর্ণ পথের পরিবর্তে সংকীর্ণ কানা গলিতে সে হাবুডুবু খেতে থাকে। তাদের দিয়ে সমাজের কোন উপকার সম্ভব নয়। অপরদিকে শ্রেষ্ঠ মনুষ্য চরিত্রে পরিচয় পাওয়া যায় তার ত্যাগের মধ্যে। নিজের স্বার্থ বড় বলে বিবেচনা না করে পরের উপকারের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে যথার্থ মহানুভবতার পরিচয় দেয়। ত্যাগ মানুষকে বিরাট হৃদয়ের অধিকারী করে। তাই যে যত বেশি ত্যাগ করতে পারে সে তত বিরাট হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার যোগ্যতা রাখে। ত্যাগী মানুষ নিজের সুখ অন্যের সাথে ভাগ করে নেয়, অন্যের দুঃখে দুখ অনুভব করে। কবির কণ্ঠেও তাই নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে পরের জন্য কাজ করার কথা বলা হয়েছে।
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও
তার মত সুখ কোথাও কি আছে, আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পৃথিবীর সকল মানুষ যদি নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে অন্যের স্বার্থ নিয়ে ভাবে তাহলে আমাদের এই মাটির পৃথিবীও হয়ে উঠতে পারে স্বর্গের সমান। আমাদের মনুষ্যত্বের যথার্থ বিকাশের জন্য আমাদের ভোগী হবার পরিবর্তে ত্যাগী হওয়া উচিত।
১৪. পথ পথিকের সৃষ্টি করে না, পথিকই পথের সৃষ্টি করে।
প্রয়োজনীয়তাই সকল আবিষ্কারের উৎস। মানুষের ঐকান্তিকক প্রচেষ্টায় এবং প্রয়োজনেই সৃষ্টি হয়েছে হাজারো পথের। এই সৃষ্টিতে পথের কোন কৃতিত্ব নেই, সবটুকু কৃতিত্ব পথিকের। পথ না থাকলেও পথিক আসত এবং স্বীয় প্রয়োজনেই সে নতুন পথের সৃষ্টি করত।
পথের উৎপত্তি পথিকের পদচিহ্ন বুকে ধারণ করেই। পথ তৈরি হয়েছে পথিকের অগ্রগমনের জন্যে। যাত্রা যাতে সহজ থেকে সহজতর হয় সেই লক্ষ্যেই নতুন নতুন পথের সৃষ্টি। সৃষ্টির আদি থেকেই চলছে মানবের এই নিরন্তর পথ চলা, নিত্য নতুন আবিস্কার। অজানা থেকে জানার উদ্দেশ্যে মানুষ ছুটছে নিরন্তর। কোন পথ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে, কোনটির জন্য এখনও প্রচেষ্টা চলছে। পথের মত কোন আবিষ্কারকের তত্ত্ব, তথ্য বা উপাদান এমনিতেই ধরা দেয়নি। তার জন্য পরিশ্রম করতে হয়েছে। চলার পথকে সহজ-সরল, সাবলীল করতে অধ্যবসায় ও সাধনার প্রয়োজন হয়েছে। এভাবে প্রতিনিয়ত চলছে নতুন পথ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরন্তর যাত্রা। বিচিত্র এই পৃথিবীর রহস্যও বিচিত্র। এই বিচিত্র পথে চলতে গিয়ে মানুষ সম্মুখীন হয়েছে বিভিন্ন সমস্যার। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য মানুষ বিভিন্ন পথ খুঁজছে। অনবরত চেষ্টার মধ্য দিয়ে পথ খুঁজেও পেয়েছে, সমাধান হয়েছে বিভিন্ন সমস্যার। শুধু সমস্যার কারণেই যে মানুষ পথ খুঁজেছেন তা নয়, বিচিত্র পৃথিবীর অদ্ভূত সব রহস্যের বেড়াজাল ছিন্ন করতে গিয়েও মানুষ পথের সন্ধানে হেঁটেছে নিরন্তর। মানুষ তার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে পরিতৃপ্তি দেয়ার জন্য সাগর পাড়ি দিয়েছে। সে চন্দ্র, মঙ্গল জয় করেছে। আবিষ্কার করেছে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি। সভ্যতার বিকীর্ণ আলোকে আলোকিত হয়েছে বিশ্ব। বস্তুত মানুষ এসব করেছে নিতান্ত প্রয়োজনেই। এসব নব নব আবিষ্কৃত যন্ত্রপাতি নিজে নিজেই উদ্ভাবিত হয়নি। মানুষ তার চাহিদার পূর্ণতা দানের জন্যই এসব কিছু উদ্ভাবন করেছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পথিক ভাস্কো-ডা-গামা, কলম্বাস নিজেদের প্রয়োজনেই এবং নতুন কৌতুহলবশত নতুন পথের সন্ধান করেছে। জীবন পথের যাত্রী হিসেবে যাঁরা মানুষের কথা ভেবেছেন তাঁরাও মানুষের কল্যাণ তৈরি করেছেন বিভিন্ন পথ, বিভিন্ন মত। মানুষের প্রয়োজনে মানুষই তার স্রষ্টা। এভাবে মানবজগতের কল্যাণসহ বিশ্বজগত সম্পর্কে যে সব পথ আবিষ্কৃত হয়েছে সে সবের স্রষ্টা গতিবিধি লক্ষ্য করে নতুন পথের দিকে যাত্রা করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। তবেই পথিক হিসেবে আমরা সার্থক হব।
১৫. নহে আশরাফ যার আছে শুধু বংশ পরিচয়
সেই আশরাফ জীবন যাহার পুণ্য কর্মময়।
অথবা, জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভাল
জন্মের ওপর মানুষের কোন হাত নেই। তার অধিকার আছে কর্মে। কর্মের মধ্য দিয়েই মানুষ তার প্রকৃত পরিচয় ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। কাজেই কোন ব্যক্তি কোন বংশে জন্মগ্রহণ করেন সেটা মূল ব্যাপার নয়, তার সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব পুণ্য কর্মের ওপরই নির্ভরশীল।
আভিজাত্য সকল যুগের মানুষের কাছেই আকাঙ্ক্ষিত। এ মর্যাদা তাদের শিরেই শোভা পায় যাঁরা কৃতকর্মের জন্য সমাজ ও দেশের সম্মানিত ছিলেন। ব্যক্তি বিশেষের সৎ কাজই তাকে শরাফতি বা কৌলিণ্য দেয়। সমাজ বা দেশের চোখে তিনি হন আশরাফ বা কুলীন বা অভিজাত। এর ফলে তিনি সমাজের বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু লোক আছে যারা কাজ না করে বংশানুক্রমিকভাবেই সে ফল ভোগ করতে চায়। বাপ-দাদার উপাধি ও বংশ মর্যাদার বলে তারা সমাজে উচ্চ আসন ও সম্মান দাবি করে। অথচ মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধা লাভ করার মত গুণ ও কর্মদক্ষতা তাদের নেই। পূর্ব পুরুষদের ভাগ্যের ও কর্মের গুণে যে অর্থ প্রতিপত্তি পেয়েছে তার দৌলতে নিজেদেরকে তারা গণ্যমান্য ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি মনে করে। কিন্তু মানবতার মাপকাঠিতে তারা আশরাফ বা অভিজাত ব্যক্তি নন। সত্যিকার অর্থে আভিজাত্যের মাপকাঠি হবে পুণ্যকর্ম। যে ব্যক্তি ন্যায় ও সত্যকে অনুসরণ করে অন্যায় ও অবিচার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে তিনিই যথার্থ আশরাফ ব্যক্তি। সে ব্যক্তির যদি টাকা পয়সা নাও থাকে তবু তিনি মহান, অনুসরণীয় এবং মান্য ব্যক্তি। মিথ্যা ভণ্ডামির ওপর দাঁড়িয়ে যারা আভিজাত্যের আস্ফালন করে তারা কপট; তাদের পতন আবশ্যম্ভাবী। মানুষ জন্মগত অধিকারের জন্য যতই কাড়াকাড়ি করবে তার ব্যক্তিগত শৌর্য ততই দূর্বল ও হীন হয়ে পড়বে। তিনি প্রকৃতপক্ষে বীর্যবান ও কর্মশক্তির অধিকারী যিনি কখনই পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন না। স্বীয় কর্মবলে তিনি সাফল্যের চুড়ায় আরোহণ করেন। তথাকথিত নীচু পেশাজীবীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেও অনেক মহাপুরুষ জগৎকে ধন্য করেছেন। জর্জ ওয়াশিংটন একজন সামান্য কৃষকের ঘরে জন্ম গ্রহণ করে স্বীয় কর্মবলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, শেরশাহ প্রমুখ ব্যক্তিনিতান্তই সাধারণ ঘরের সন্তান ছিলেন। ইতিহাসের পাতায় পাতায় এরূপ শতসহস্র মহাপুরষের উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। প্রকৃতির পুষ্পজগতে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন পদ্মের জন্মও পঙ্কে। সুতরাং মানুষের উচিত স্বীয় কর্মবলে সামনে অগ্রসর হবার চেষ্ট করা। প্রাচীন সভ্যতায় মানুষের কর্মের অধিকারও ছিল না। গোড়া সামন্তবাদী সমাজে এক শ্রণির মানুষকে ছোট করে রাখা হত বিভিন্ন কৌশলে। আজ সে বর্বর সভ্যতার প্রায় অবসান ঘটেছে। মানুষ এখন স্বীয় কর্মবলে বংশগত গ্লানি দূর করতে সক্ষম। পক্ষান্তরে অনেকে অভিজাত বংশে জন্মগ্রহণ করেও আপন কুকর্মের জন্য সমাজে নিন্দিত ও ধিকৃত হয়েছে। আভিজাত্য হারিয়েছে, বংশগৌরব তাকে রক্ষা করতে পারে নি।
মানুষের বল, গৌরব, সম্মান, প্রতিপত্তি সকল কিছু নির্ভর করে তার কর্মের উপর , জন্মের উপর নয়। তাই মিথ্যা অহংকার এবং কপটতায় আশ্রয় না নিয়ে আভিজাত্য অর্জন করার জন্য পুণ্যময় কাজ করা উচিত। তবেই অর্জিত হবে সত্যিকারের সাফল্য।
১৬. মঙ্গল করিবার শক্তিই ধন, বিলাস নহে।
মানবতার কল্যাণে নিজের সঞ্চিত সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করার মহত্ত্বই ধন। বিলাসের স্রোতে গা ভাসানোর জন্য সঞ্চিত ধন পাহাড় সমান হলেও তাকে ধন বলা যায় না।
মানুষ অর্থ উপার্জন করে কারণ সম্পদ মানবজীবন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। মানুষ মনে করে অর্থ উপার্জনই বড় কথা, কীভাবে সেটা ব্যয় হল, সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু অর্থ-সম্পদের সুষ্ঠু ও সুষম ব্যবহারই একজন ব্যক্তি, একটি সমাজ কিংবা জাতির যথার্থ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। ধন-সম্পদ যেহেতু ব্যক্তিগত শ্রমের ফসল, সেজন্য তা ব্যয় করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রয়োজন প্রাধান্য পেতে পারে। কেউ ধন-সম্পদ উপার্জন করে কিন্তু তাতে তাদের মৌলিক চাহিদাটুকু মেটে না, অনেক তাদের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করে নানা প্রকার বিলাস-ব্যসনের পিছনে। পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের সম্পদ লাভের অধিকার থাকলেও সকলেই সম্পদ লাভ করতে পারে না সমানভাবে। যেনতেনভাবে সম্পদ লাভের মধ্যদিয়ে অনেকেই হয়ে উঠেছেন বিশাল সম্পদের মালিক। বিপরীত দিকে কেউ আবার দুবেলা দুমুটো খেতে পায় না। যে ধন ভাগ্যহত নর-নারীর অধিকারকে গলা টিপে হত্যা করে সে ধন ধন নয়। ধন-সম্পদের সার্থকতা নির্ভর করে এর সদ্ব্যব্যবহারের উপর, সৃষ্টিজগতের কল্যাণের উপর। ধনের মালিক যদি মানুষের মঙ্গল বিধানের জন্য তার ধনকে কাজে না লাগায় তবে সেটা হবে বিলাসের নিমিত্ত মাত্র। ধনবানের বুঝা উচিত যে, এ সম্পদ তার একার ভোগের জন্য নয়, সমগ্র মানুষের কল্যাণের জন্য। যে অর্থ মানুষের মঙ্গলের সম্পদ খরচ করে অর্থের সর্বোত্তম সদ্ব্যব্যবহার সম্ভব। একজন বিত্তশালী বিলাসী মানুষ তার প্রয়োজনে অতিরিক্ত সম্পদ দিয়ে অনেক দুঃখী মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উদ্দীপ্ত করে তুলতে পরে। আত্মসুখ আর পরোপকার এদুটো বিষয়ের তুলনা করে অপেক্ষাকৃত কল্যাণকর দিকটি চিহ্নিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিবেকবান লোকমাত্রই পরোপকারের কথা বলবে। পরোপকারের মধ্য দিয়ে অর্থ-সম্পদ তার যথাযথ দিকটি খুঁজে পায়। ধন-সম্পদ নিজস্ব মর্যাদা তখনই খুঁজে পাবে যখন তা মহৎ কাজে ব্যয় হবে। একজন মানুষের ধন-সম্পদ কম থাকলেও তার সে ধন যদি জনগণের কল্যাণের ব্যয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং ব্যয় করে সেটাই হবে তার প্রকৃত ধন-সে ধন জাতীয় শক্তির উৎস, মানব কল্যাণের এক অমূল্য সম্পদ। প্রাচীন ঋষিরা অর্থকে গোমল বা গোবরের সাথে তুলনা করতেন। গোবর এক জায়গায় স্তূপীকৃত করে রাখলে তাতে তেমন কোন কাজ হয় না বরং দুর্গন্ধ ছড়ায়। এই গোবরকে যদি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া যায় তবে মাটির উর্বরতাশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং ভাল ফসল পাওয়া যায়। অর্থকেও যদি এক জায়গায় স্তূপীকৃত অবস্থায় রাখা হয় তাতে মঙ্গলময় কোন কাজ হয় না বরং পরিবেশকে নষ্ট করে। স্তূপীকৃত ধন কখনই ধন হিসেবে আখ্যা পেতে পারে না। যে সম্পদ সুষমভাবে সবার উপকারে আসে তাই প্রকৃত ধন।
ধন সম্পদের কল্যাণকর দিকটিই তার প্রকৃত পরিচয় বহন করে। ঐশ্বর্যের সমারোহের মধ্য মধ্যে বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিলে ঐশ্বর্যের প্রদর্শনী হয় সত্য, কিন্তু তাতে ধন-সম্পদের মর্যাদা প্রমাণিত হয় না। ধন-সম্পদকে বিলাসিতার অপব্যয় না করে পরোপকারে নিয়োজিত করলে তার অর্জন ও ব্যয়ের সার্থকতা প্রমাণিত হয়।
১৭. রাত যত গভীর হয় প্রভাত তত নিকটে আসে।
বাস্তব সংসারে সংকট আছে, সমস্যা আছে। কিন্তু সেটুকুই জীবনের সব নয় একদিন না একদিন সমস্যার অবসান ঘটবে। সমস্যাসংকুল আঁধার কেটে গিয়ে দেখা দিবে সোনালি সকাল। দুর্দিনের পথ বেয়েই আসবে সাফল্যের সেই সুদিন।
রাতের অন্ধকার যতই গভীর হয়ে আসুক না কেন সূর্যকে গ্রাস করার ক্ষমতা তার নেই। অন্ধকার কেটে যাবেই এবং অতঃপর সূর্যও দেখা যাবে। অমাবস্যার অন্ধকার সাময়িকভাবে চন্দ্রকে গ্রাস করে বটে তবে তা কখনো চিরকালের জন্য নয়। মেঘ কিংবা অমাবস্যা এখানে শুধু আস্তরণ মাত্র। সময়ের পরিবর্তনে এসব ঘটে থাকে কিন্তু এগুলো কখনই স্থায়ী নয়। মেঘ যখন প্রচণ্ড ঘন হয়ে আসে তখনই বৃষ্টির বদৌলতে আমরা সূর্যের মুখ দেখতে পাই। তেমনি আঁধার যখন ঘন হয়ে আসে তখনই প্রভাত হবার উপক্রম হয়। কারণ, একটি নির্দিষ্ট সময় পরে অন্ধকার কোনভাবেই থাকতে পারে না। বাস্তব সংসারে মানুষ সুখের জন্য লালায়িত সুখ তার কাম্য, দুঃখ তার পরিত্যাজ্য। দুঃখ কেউ চায় না, সবাই চায় নির্বিঘ্ন সুখের জীবন। সামনে বিপদের ছায়া ঘনীভুত হয়ে উঠলে সে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। সুখ-দুঃখের পর্যায়ক্রমিক পালাবদল মানব মন মানতে চায় না। বিপদের ছায়া যতই ঘনীভূত হবে ততই যে সুসংবাদের আনন্দ ধ্বনি শোনা যাবে এ অপেক্ষা আমাদের মন মেনে নিতে চায় না। এটা আমাদের মানতেই হবে, নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা দুঃখ কোন মানুষের জীবনেই স্থায়ী হয় না। দুঃখেরও প্রয়োজনীয়তা আছে। দুঃখ না হলে সংগ্রামময় মানবজীবনে সুখ প্রাপ্তির উপলব্ধি গভীরতর হয় না। সুখ-দুঃখের পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতির কারণেই পরস্পরের তাৎপর্য সহজেই আমাদের কাছে ধরা দেয়। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বলেই যোগ্যতা, সহিষ্ণুতা, ধৈর্য, মনোবল দিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় মানুষকে। কোনভাবেই তাকে হতোদ্যম হলে চলে না। জীবনের জন্য চাই গভীর উজ্জীবন। উজ্জীবিত মানুষই জীবনে সফল হতে পারে। রাত যত গভীর হয়, প্রভাত তত কাছে আসে-এ সত্যটি মনে রেখে মানুষকে প্রয়োজনে দুঃখের নদীতে ঝাঁপ দিতে হবে। দুঃখকে জয় করেই সুখকে লাভ করতে হবে। এটি খুব সহজ কাজ নয়। নিরন্তর সাধনার মাধ্যমেই সুখকে লাভ করা সম্ভব হয়। বিশ্বাস রাখতে হয় যে দুঃখের তিমির রাত পেরিয়ে সুখও আনন্দ উজ্জ্বল ভোর একদিন আসবেই।
দুঃখ ও বিপদ আমাদের ভেঙ্গে পড়া উচিত নয়। সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে দুঃখ ও বিপদের মোকাবেলা করা উচিত। তবেই আমরা সাফল্যের সিংহদ্বারে পৌঁছাতে সক্ষম হব।
১৮. কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে/দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?
সত্য ও সুন্দরকে লাভ করার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। সুখের জন্য মানুষের চেষ্টাও নিরন্তর। কিন্তু দুর্লভ এসব বস্তুকে সবসময়ই ঘিরে থাকে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি। সেগুলো জয় করতে পারলেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।
সুন্দর মাত্রই মানুষকে আকৃষ্ট করে। পদ্মের অপরূপ সৌন্দর্য, রং, সুগন্ধ স্বভাবতই সবাইকে আকর্ষণ করে। কিন্তু পদ্মফুল তোলার জন্য কেউ যদি হাত বাড়ায় তবে তার হাতে কাঁটা বিধবেই; তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই ভয়ে কেউ যদি কমল তুলতে না যায় তবে তার দ্বারা পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ কখনই সম্ভব নয়। সুখ, সার্থকতার স্পর্শ চায় না এমন ব্যক্তি সমাজে বিরল, কিন্তু তা লাভ করার পথ কখনই সরল নয়। আকাঙ্ক্ষিত মৃণাল যেমন কণ্টকাকীর্ণ, পৃথিবীর যাবতীয় সুখ-সাফল্যও তেমনি দুঃখ ও বাধা-বিপত্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত। এ কারণেই হয়ত ÔLife is not a bed of rose’ ইংরেজি এই বাক্যটি আমাদের সবার কাছে খুবই প্রিয়। তাই জীবনকে সফল ও সমৃদ্ধ করতে হলে যাবতীয় দুঃখের জ্বাালা সহ্য করে এগিয়ে যেতে হয়, এজন্য প্রয়োজন হয় অধ্যবসায় এবং ধৈর্যের। পৃথিবীর সব মহৎ কর্মের পেছনেই রয়েছে বহু শ্রমলব্ধ সাধনা। আজকের পৃথিবী যে সুখ-সাগরের মধ্য ভাসছে তাও এসছে অসংখ্য মানুষের শ্রম এবং নিরলস সাধনার মধ্যদিয়ে।
একের পর এক বাধা অক্রিম করে ইতিহাসের বীর এবং মহৎ ব্যক্তিবর্গ সংগ্রাম ও একনিষ্ঠ চেষ্টার মাধ্যমে দেশ, জাতি ও পৃথিবীর মানুষের জন্য কল্যাণের পথ তৈরি করেছেন। মানুষের অদম্য ইচ্ছ্বাশক্তি ও চেষ্টার কাছে হার মেনেছে সভ্যতার বড় বড় বাধা। পৃথিবীর যাবতীয় সুখ তাই অসংখ্য দুঃখের দ্বারা, জঞ্জালের দ্বারা আবৃত; সেগুলো স্বীকার করে নিয়েই পৃথিবীতে সুখ লাভের চেষ্টা করতে হয়। মানুষের গৌরব ও সম্মান নিহিত রয়েছে বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে সফলতা অর্জনের মধ্যে। একজন শিক্ষার্থীর ভাল ফলাফল নিশ্চিত করতে হলে তাকে অবশ্যই নিষ্ঠার সাথে অধ্যবসায়ী হতে হবে, তবেই আসবে সত্যিকারের সাফল্য। তাছাড়া এ সত্যটিও এখন সর্বজনবিদিত যে, শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যেই প্রকৃত গৌরব নিহিত। অন্যদিকে, বিনাশ্রমে পরের দয়ার দান গ্রহণে মানুষের অমর্যাদাই বাড়ে। সাফল্যের প্রতিক্ষেত্রেই তাই প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধের আহ্বান। এ যুদ্ধ চলে প্রতিনিয়ত এবং প্রতিক্ষেত্রে। এই প্রতিকুলতাকে উপেক্ষা করে সাফল্যের কোন সম্ভাবনাই নেই।
মানবজীবন সংগ্রামের মাধ্যমে দুঃখকে জয় করে, বাধা-বিঘ্নকে। অতিক্রম করে নির্দিষ্ট দিকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যেতে হবে। তবেই সৌন্দর্যকে লাভ করা যাবে, ধরা দেবে ধরনীর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য।
১৯. পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।
সাফল্য প্রতিটি মানুষের একান্ত কাঙ্ক্ষিত বস্তু। সেই সাফল্য লাভ করতে চাইলে পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই। পরিশ্রমের মাধ্যমেই মানুষ ভাগ্যলক্ষীকে নিজ গৃহে বন্দি রাখতে সক্ষম হয়েছে।
প্রসূতি যেমন গর্ভে সন্তান ধারণ করে তাকে প্রসব করেন স্নেহ-প্রীতি, ভালবাসা দিয়ে মানুষ করে তোলেন। ঠিক তেমনি পরিশ্রমও প্রসূতির মতই সৌভাগ্য লাভের পথ তৈরি করে। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠা সাফল্যের দ্বার উম্মোচন করে। সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকেই বেঁচে থাকার জন্য চলছে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। তারই পথ বেয়ে এসছে এই সভ্যতা। মানব সভ্যতার প্রতিটি স্তরে রয়েছে শ্রমের অমূল্য অবদান। গ্রিক ও রোমান সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানসিক শ্রমে আর ক্রীতদাসের কায়িক পরিশ্রমে। পরিশ্রম বলতে কায়িক এবং মানসিক দুই শ্রমকেই বুঝানো হয়। এই দুই শ্রমের সার্থক সন্বয়েই পরিশ্রম যর্থাথ হয়। মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য এই কর্মময় পৃথিবীতে কোন না কোন কাজে লিপ্ত থাকতে হয়। প্রকৃত এবং যথার্থ পরিশ্রমই মানুষের জীবনে সৌভাগ্য বয়ে আনে। শ্রমবিমুখ ও অলস ব্যক্তির জন্য তার কাম্যবস্তু নাগালের বাইরে থাকতে বাধ্য। পরিশ্রম ছাড়া নিতান্ত তুচ্ছ জিনিসও লাভ করা যায় না। সংগ্রাম করে জীবন ও সংসারে প্রতিষ্ঠা সম্ভব। জীবনের সর্বক্ষেত্রে উন্নতির একমাত্র চাবিকাঠি পরিশ্রম। পৃথিবীর অর্থ, বিদ্যা, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা কিছুই পরিশ্রম ছাড়া লাভ করা যায় না। শ্রমবিমুখ লোকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কায়িক শ্রমের প্রতি অনীহা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে বৃহত্তর জনসাধারণ ক্রমশ অলস, বেকার, হতাশ, পরশ্রীকাতর কর্মবিমুখ, অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়েছে। অথচ পৃথিবীর সকল মহামানব, সকল মনীষীই কায়িক ও মানসিক উভয় শ্রমকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে যারা অতি সাধারণ দরিদ্র অবস্থা থেকে নিজ পরিশ্রম ও কর্ম কৌশল দ্বারা জগদ্বিখ্যাত হয়েছেন। ইতর প্রাণীদের মধ্যে পরিশ্রমলব্ধ জীবন লক্ষ্য করা যায়। মৌমাছি কত পরিশ্রম করে মৌচাকে মধু সঞ্চয় করে রাখে আর সারা বছর মধু খায়। পিপীলিকাও তাদের মত সারা বছর খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে। আর এজন্যেই তারা এত সুখি।
উপরের আলোচনায় স্পষ্ট-পরিশ্রমের বিকল্প নেই। পরিশ্রম করলে কেউ প্রবঞ্চিত হয় না। পরিশ্রম সবকিছুর চাবিকাঠি। এই নিরেট সত্যটিকে মাথায় রেখে আমাদের প্রত্যেকের উচিত ধৈর্য ধরে পরিশ্রম করে যাওয়া, তবেই আমরা সাফল্যের স্বাদ গ্রহণ করতে পারব।
২০. এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি।
মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই। যত পায় তত চায়-ততই আরও পাবার বাসনা জাগে। এ বাসনা থেকে লোভের বশবর্তী হয়ে একসময় জন্ম নেয় কু-প্রবৃত্তি। অসংযত ভোগ আকাঙ্ক্ষা তখন অন্যের জন্য সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পৃথিবীতে সম্পদের পরিমাণ নির্দিষ্ট কিন্তু মানুষের ভোগ আকাঙ্ক্ষা অসীম। পাওয়ার মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে চাওয়ার মাত্রাও বেড়ে যায়। লালসা তখন তীব্র হয়ে বিবেকের টুটি চেপে ধরে, মানবিক আচার-বিচার না মেনে কু-প্রবৃত্তির আশ্রয় নিয়ে স্বীয় হীন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্য মেতে ওঠে। ভোগ আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্তির রসদ ছাড়া অন্য কিছু তার চোখে পড়ে না। সম্পদ, প্রতিপত্তি এবং নিজস্ব পেশী শক্তির জোরে অপরের সম্পত্তি কেড়ে নেবার পায়তারা করে। এই সর্বগ্রাসী আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে যারা থাকে তারা নিতান্তই সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এ শ্রেণির উদ্দেশ্যে বাঁচার জন্য সামান্য কিছু উপকরণ সংগ্রহ করা। রাজা কিংবা বিলাসী ধনিকের প্রাচুর্য নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই, কিন্তু তার পরেও তারা রেহাই পায় না। ধনীর অনমনীয় ধন তৃষ্ণা এবং কু-প্রবৃত্তিজাত পেশীশক্তির কালো হাত বাড়ায় গরিবের সামান্য ধনের উপর। ছারখার হয়ে যায় তার ছোট্ট সুখের নীড়। গরিবের রক্ত চুষে কেউ হয় জোতদার, জমিদার, কোটিপতি, কেউ আবার সর্বোচ্চ ডলারধারী। আমরা যদি আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টি ফেরাই তবে দেখতে পাব-ব্রিটিশসহ অন্যান্য দেশগুলো আমাদের এই দরিদ্র দেশগুলোতে এসেছিল আমাদের ব্যবহার করে অধিক মুনাফা অর্জনের স্বার্থেই। ব্রিটিশরা প্রচুর ধন-সম্পত্তির মালিক হয়েও দরিদ্র দেশগুলোর সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরেছিল। ব্রিটিশদের অনুকরণে এ দেশে জন্ম নিয়েছিলল জমিদার, জোতদার কিংবা মধ্যসত্ত্বভোগী। তাদের বলগাহীন লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক লোকের মৃত্যু হয়েছিলো দুর্ভিক্ষে। দুর্দমনীয় লোভ ও ঐশ্বর্যের মোহ মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার প্রামাণও ইতিহাসে অজস্র। ক্ষমতালিপ্সু হিটলার, মুহাম্মদ বিন তুগলক- এর মত ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষকে ভিক্ষুকে পরিণত করেছিল। ক্ষমতালিপ্সু উদ্ধত বড় রাষ্ট্রগুলো পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর দিকে হাত বাড়ায়। সভ্যতার শীর্ষস্থান দাবীকারী দেশগুলো আরো প্রাচুর্যের জন্য হাত বাড়ায় অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী দেশের দিকে। নির্লজ্জভাবে পদানত করে মানবতা ও মানুষের মৌলিক অধিকার। পুঁজিবাদী মানসিকতা ক্রমাগত মানুষের বাঁচার অধিকারকে করছে হুমকির সম্মুখীন।
সর্বগ্রাসী এই কুটিল মানসিকতা কখনই মানুষকে সত্য-সুন্দর পথ দেখাতে পারে না। মানবতার পতন হচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। সর্বাত্মকভাবে এদের প্রতিরোধ করা দরকার, নতুবা সভ্যতার বিনাশ অনিবার্য হয়ে উঠবে।
মুসা স্যার
বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910