
আলস্য ও নেতিবাচকতা থেকে দূরে থাকার উপায়
আলস্য ও নেতিবাচকতা থেকে দূরে থাকার উপায়
একটি গল্প দিয়ে আমরা আজকের আলোচনা শুরু করতে পারি। এক শিষ্য এসে এক সাধকের কাছে প্রশ্ন করল- গুরু, আমি কিছু করতে পারি না। আমার কোনো লক্ষ্য নেই। বন্ধুদের সাথে গল্পে-আড্ডায় আমার জীবন হেসেখেলে কেটে যাচ্ছে। তাদের সাথে থাকলে আমার কাজ করার ইচ্ছা হয় না। সাধক গভীরভাবে শিষ্যের কথা শুনলেন এবং এরপর তিনি শিষ্যকে সাথে নিয়ে একটি বাগানের কাছে গেলেন। সেখানে একটি ছোট আগাছা দেখে গুরু শিষ্যকে বললেন, এই গাছটি তুলে ফেলো।" শিষ্য সহজেই গাছটি মাটি থেকে উপড়ে ফেলল। তারপর সাধক একটি বড় গাছের দিকে ইশারা করে বললেন, এটি তুলে ফেলো।" শিষ্য অবাক হয়ে বলল- গুরু, এটি অসম্ভব। এই গাছ এত বড় যে আমি একা এটি তুলতে পারব না।"
সাধক মৃদু হেসে বললেন, ঠিক এই রকমই নেতিবাচক মানুষের প্রভাব। নেতিবাচক এবং অলস মানুষের সঙ্গে সময় কাটালে তারা তোমার মনের শক্তি ও উদ্যমকে নষ্ট করে দেবে।"
যখন তারা প্রথমে তোমার জীবনে আসে, তখন তাদের প্রভাব ছোট ও দুর্বল হয়, যা সহজেই ত্যাগ করা যায়। কিন্তু যদি তুমি তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাও, তারা তোমার জীবনে শিকড় গেঁথে ফেলবে এবং তাদের প্রভাব ছাড়ানো কঠিন হয়ে যাবে।
আলস্যের সংজ্ঞা এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব :
আমরা অনেকেই ছোটবেলায় বাল্যশিক্ষায় পড়েছি- অ তে অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো। আ- তে আলস্য দোষের আকর। এই কথাগুলো মুখস্থ বুলির মতো পড়লেও আলস্যের সংজ্ঞাও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।
বাইবেলে আলস্যের সুন্দর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আর একটু ঘুম, আর একটু তন্দ্রা, বিছানায় আর একটু গড়াগড়ি- দারিদ্র ও অভাব দস্যুর মতো দেবে হানা তোমার অন্দরে। [ হিতোপদেশ ২৪:৩৩-৩৪]
ধম্মপদে বলা হয়েছে- মূর্খরা আলস্যে নিপতিত হয়। আর প্রাজ্ঞরা সচেতন প্রয়াসে সৎকর্মে সদাতৎপর থাকে। [অপ্পমাদবগ্গো : ২৬]
ঋগবেদে বলা হয়েছে, অলস মস্তিষ্ক কুচিন্তার সহজ শিকার। [ ঋগ্বেদ : ১০.১২.৮]
আলস্য ও কর্মবিমুখতা যাকে পিছিয়ে দেয়, সৎকর্মে যে পিছিয়ে পড়ে, বংশপরিচয় তাকে কখনো এগিয়ে দেবে না। - আবু হুরায়রা (রা); মুসলিম
অলস মানুষ আরাম বলয়ে নিজেকে বন্দি করে রাখে এবং কোনো উদ্যোগ নেয় না এবং সামর্থ্যকে সীমিত করে ফেলে। সে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না।
নেতিবাচকতা সংক্রামক :
নেতিবাচক মানুষ অন্য মানুষকে আশাহত করে, হতোদ্যম করে, নিরুৎসাহিত করে। নেতিবাচক মানুষ আসলে শয়তানের দোসর। সে তখন সবকিছুর মধ্যে ‘কিন্তু’ ঢুকিয়ে দেয়। সবকিছুতে সংশয় প্রকাশ করে। আশঙ্কার কথা বলে।
মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো সে তার সঙ্গী দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত হয়। ইংরেজিতে একটি কথা আছে- A man is known by the company he keeps. একজন নেতিবাচক ও হতাশ মানুষের বিশ্বাস ও আশা নেই। যে কারণে তিনি কখনো অন্যকে আশা ও বিশ্বাস দিতে পারেন না। নেতিবাচক মানুষদের সংস্পর্শে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে আমাদের দেহ ও মনে। আমরা লক্ষ্যচ্যুত হই, উদ্যম, উৎসাহ হারিয়ে ফেলি। তাই শিক্ষাঙ্গনে বা কাজের ক্ষেত্রে যারা নেতিবাচক আচরণ করে, গীবত বা বুলিং করে, অলস, ফাঁকিবাজ লোক যারা আছে তাদের সাথে স্বাভাবিক সৌজন্যের বাইরে তাদের সচেতনভাবে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার কয়েকটি লাইন এখানে উল্লেখ করতে পারি-
‘বিশ্বাস আর আশা যার নাই, যেয়ো না তাহার কাছে,
নড়াচড়া করে তবুও সে মরা, জ্যান্ত সে মরিয়াছে।
শয়তান তারে শেষ করিয়াছে, ঈমান লয়েছে কেড়ে
পরান গিয়েছে মৃত্যুপুরীতে ভয়ে তার দেহ ছেড়ে।‘
তিব্বতের প্রধান ধর্মগুরু দালাই লামা নেতিবাচক মানুষদের সম্পর্কে খুব সুন্দরভাবে বলেছেন- ‘নেতিবাচক মানুষ থেকে দূরে থাকুন। তারা আসে শুধুমাত্র কিছু অভিযোগ, সমস্যা, বিপর্যয়কর ঘটনা, ভয় এবং অন্যদের ব্যাপারে নেতিবাচক বিচার-বিবেচনা নিয়ে। কেউ যদি কোন ময়লা ফেলার পাত্র খোঁজ করে যেখানে তাদের সমস্ত ময়লা-আবর্জনা ফেলবে, তাহলে সেটা যেন কোনোভাবেই আপনার হৃদয় না হয়।‘
পবিত্র কোরআনের সূরা আনফালের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়ে ক্ষতিকর ও নেতিবাচকতায় আচ্ছন্ন না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়কে প্রদত্ত ধনসম্পত্তি ও নেয়ামত প্রত্যাহার করেন না।
পারিবারিক নেতিবাচকতায় মাইন্ডসেট কী হবে?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের পরিবারের অনেক আপনজন যারা নেতিবাচক, তারা নিরাশার কথা বেশি বলে। এ-ক্ষেত্রে পরিত্রাণের উপায় কী? এদের কাছ থেকে বাস্তবে দূরে থাকা সম্ভব নয় কিন্তু এদের নেতিকথা দিয়ে কখনো প্রভাবিত হওয়া যাবে না। এ-ক্ষেত্রে করণীয় বিষয় হলো তাদের নেতিকথাগুলোকে না নেয়া, তাদের কেউ নেতিবাচক কথা বলে ফেললেই মনে মনে তওবা তওবা বলে নিজের কাজে মনোযোগ দেয়া, পরচর্চা, গীবত বা হতাশার কথা না শুনে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া এবং তাদের জন্যে দোয়া করা।
তবে একটি জিনিস খেয়াল রাখবেন- যে সম্পর্ক ছিন্ন করা যায় না, তার মাঝে কখনো দেয়াল তুলবেন না। সদাচরণ, ভালবাসা ও দোয়ার মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে আমাদের লালন করতে হবে ইতিবাচকভাবে।
করণীয় :
১. আলস্য ও নেতিবাচকতা শনাক্ত করুন- অনেকসময় আমরা আলস্য এবং নেতিবাচকতা সঠিক রূপে শনাক্তই করি না। বিনোদনের নামে ঘন্টার পর ঘন্টা যে ইউটিউবে কেটে গেল, অগোছালো ঘরটি যে গোছানো হচ্ছে না, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নেয়া হচ্ছে না- এগুলোও যে আলস্যের প্রতীক তা আমরা বুঝতে পারি না। টক শো, এমন অনলাইন কন্টটেন্ট যেখানে অন্যকে হেয় করা হয়, অন্যকে পঁচানো, গসিপ করা, খোঁচা দিয়ে কথা বলা- এগুলোও যে নেতিবাচকতা তা অনেকসময় আমরা টেরও পাই না। তাই সমস্যা সমাধানের আগে আপনার জীবনে নেতিবাচকতা শনাক্ত করতে হবে আগে। শনাক্ত করার কাজটি সঠিকভাবে করতে পারলে আপনি এড়িয়ে যাবার উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
২. নেতিবাচক কথা ভুলে বলে ফেললেও তা ইতিবাচক বাক্য দিয়ে শেষ করুন- যদি নেতিবাচক ভাবনা আসে মনে মনে তওবা তওবা বলুন।
৩. নিয়মিত মেডিটেশন করুন : অনেক সময় অজান্তেই অন্যের নেতিবাচক কথার প্রভাব আমাদের মনে রয়ে যায়। মেডিটেশন ভেতর থেকে নেতিবাচকতাকে দূর করে দেয়। মেডিটেশনকে জীবনের অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলুন। মনে মনে প্রতিদিন দশবার বলুন- ভালো ভাবব, ভালো বলব, ভালো করব, ভালো থাকব।
৪. আপনার বলয়ের নেতিবাচক মানুষদের জন্যে সবসময় দোয়া করুন : যখনই আপনার আশেপাশে কেউ নেতিবাচক কথা বলছে, তার সাথে তর্ক-বিতর্কে জড়াবেন না। সম্ভব হলে পরে তাকে সুযোগমতো বুঝিয়ে বলুন, এবং সবসময় মনে মনে প্রার্থনা করুন, হে প্রভু, তাকে হেদায়েত দান করো। প্রভু যে কখন কোন দোয়া কবুল করে ফেলেন আমরা বলতে পারি না।
৫. ফাউন্ডেশনের সাথে একাত্ম থাকুন : মহাকবি শেখ সাদী লিখেছেন- ‘ঈগল মেশে ঈগলের সাথে, কবুতর মেশে কবুতরের সাথে।‘ তিনি পরামর্শ দিয়েছেন বুঝে শুনে বন্ধুত্ব করার জন্যে। নেতিবাচক লোক থেকে দূরে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সৎসঙ্ঘের সাথে একাত্ম থাকা।
সঙ্ঘের সাহচর্য যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি গল্পের মাধ্যমে আলোকপাত করতে পারি-
মরক্কোর একটি গল্প। এক শিক্ষার্থী নিয়মিত মক্তবে যেত। মেধাবী হওয়ায় শিক্ষকও তাকে বেশ পছন্দ করতেন। কিন্তু কয়েক মাস পর সেই শিক্ষার্থীর মনে হলো শিক্ষক প্রতিদিন তো প্রায় একই বিষয় পড়ান। মক্তবে আর যাওয়ার দরকার কী! না গেলেও তো হয়। এই ভেবে সে মক্তবে যাওয়া বন্ধ করে দিল।
শিক্ষার্থীকে ক্লাসে অনুপস্থিত দেখে শিক্ষক তাকে এক শীতের সন্ধ্যায় ডেকে পাঠালেন। সেই ছাত্র পৌঁছে দেখল তার ওস্তাদ ফায়ার প্লেসের কাছে বসে আগুন পোহাচ্ছেন। ওস্তাদ তাকে পাশে বসালেন। তারপর হাতের লাঠি দিয়ে জ্বলন্ত কয়লার একটা টুকরো ফায়ার প্লেস থেকে বের করে আনলেন। মেঝের ওপর রাখলেন। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, কয়লার টুকরোটি নিভে গেছে।
শিক্ষক তখন ছাত্রকে বললেন, কিছু কি বুঝতে পারলে? জ্বলন্ত কয়লার যতই তেজ থাকুক, আগুন থেকে সে যদি বিচ্ছিন্ন থাকে একসময় সে অবশ্যই নিভে যাবে। ঠিক তেমনি একজন মানুষের মেধার প্রখরতা যতই হোক না কেন, সঙ্ঘ থেকে-ইতিবাচকতার উৎস থেকে সে যদি নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখে, তবে সে-ও একসময় হারিয়ে যাবে।
আসলে যখন কেউ সঙ্ঘ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তিনি ধাপে ধাপে সত্য থেকে, কল্যাণ থেকে, মেডিটেশন থেকে, নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেন। বিচ্ছিন্নতা কিন্তু একদিনে হয় না। ধীরে ধীরে হয়। এজন্যে ফাউন্ডেশনের সাদাকায়ন প্রোগ্রামে নিয়মিত আসবেন। কোয়ান্টাম গ্রাজুয়েট এবং প্রো-মাস্টাররা রুটিন করে প্রজ্ঞা জালালিতে অংশ নেবেন, বছরে কমপক্ষে দুবার কোর্স রিজুভিনেশন এবং লামা কোয়ান্টায়নে অংশ নেবেন। সাথে সাথে যে সময়টুকু সৃষ্টির সেবায় কাজে লাগানো যায় সেসময়টুকু সৃষ্টির সেবায় দেবেন।
ভালো থাকার জন্যে প্রয়োজন ইতিবাচকতার চর্চা করা। সৎসঙ্ঘে যত বেশি একাত্ম থাকব, তত ইতিবাচকতার স্ফূরণ ঘটবে আমাদের জীবনে। এর ফলশ্রুতিতে জীবনে প্রশান্তি ও অর্জনের পরিমাণ বেড়ে যাবে বহুগুণ।
সামনে আসছে সম্ভাবনাময় ২০২৫। নতুন বছরে নতুন মাইন্ডসেট নিয়ে আমরা যেন ইতিবাচক পথে আরো গতিময়ভাবে এগিয়ে যেতে পারি, এই প্রার্থনা করি। নতুন বছর সবার জন্যে যেন স্মরণীয় বছর হয় এই শুভকামনা জানাচ্ছি।
প্রভু আমাদের সকলকে সৎসঙ্ঘে সঙ্ঘবদ্ধ রাখুন, সকলের সকল সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হোক।
+88 01713 211 910