
NTRCA , ‘প্রধান নয়, বরং অপ্রধান চরিত্র চিত্রণে ভারতচন্দ্রের সাফল্য বিচার
প্রশ্ন: ‘প্রধান নয়, বরং অপ্রধান চরিত্র চিত্রণে ভারতচন্দ্রের সাফল্য অধিক’ -আলোচনা কর।
আলোচনা: মধ্যযুগের অন্যতম প্রধান ও বিশিষ্ট কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর। গতানুগতিক বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেও তিনি চরিত্র সৃষ্টিতে বিশেষ সাফল্য লাভ করেছেন। যদিও প্রধান চরিত্র সৃষ্টিতে ভারতচন্দ্র মুকুন্দরামের মতো সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেন নি। তবে কতিপয় ক্ষুদ্র চরিত্র নির্মাণে ভারতচন্দ্র লাভ করেছেন যুগদুর্লভ শিল্পীর অবিস্মরণীয় মহিমা। বিশেষ করে ঈশ্বরী পাটনী, হীরা মালিনী, সাধী-মাধী, চন্দ্রমুখী-পদ্মমুখী চরিত্র সৃষ্টির জন্য ভারতচন্দ্র বাঙালি পাঠকের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
অপ্রধান চরিত্র সৃষ্টিতে ভারতচন্দ্রের কৃতিত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থের তৃতীয় খন্ডে যে মন্তব্য করেছেন তা এখানে বিশেষ ভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন-
“ভারতচন্দ্র নায়ক-নায়িকার চরিত্রাঙ্কনে ততটা সার্থক না হলেও অপ্রধান চরিত্রে বিশেষ কুশলতা দেখাইয়াছেন। সেগুলো পুঁথির পৃষ্ঠা ছাড়িয়া যেন প্রাত্যহিক জীবনের মাঝখানে নামিয়া আসিয়াছে।”
অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লিখিত মূল্যায়নের যথার্থতা পাওয়া যাবে হীরামালিনী, ধুমকেতু কোটাল ও বিদ্যার চরিত্র চিত্রণের মধ্যে। হীরার চরিত্র সম্পর্কে কবি সংক্ষেপে বলেছেন-
“কথায় হীরার ধার হীরা তার নাম।”
বালবিধবা হীরা যদিও সাদাশাড়ি পড়ে তবুও ‘চুড়াবান্ধা চুল’ এবং মুখে তাঁর ‘গালভরা গুয়াপান’। রসের মালিনী হীরা রাজবাড়িতে ফুল যোগায়। এখন সে বিগত যৌবনা। কিন্তু কবি তার স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন-
‘আছিল বিস্তার ঠাট প্রথম বয়সে।
এবে বুড়া তবু কিছু গুঁড়া আছে শেষে।’
কবির এই বর্ননা মুকুন্দরামের ভাঁড়ু দত্তের অনুকরণে হলেও হীরার ঔজ্জ্বল্য মুকুন্দরামকে ম্লান করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, নায়ক-নায়িকার দূতীগিরি, ধুর্ততা প্রভৃতি কবি অত্যন্ত নিপুণ এবং চিত্রাত্মক ভাবে অঙ্কন করেছেন। ফলে চরিত্রটি হয়ে উঠেছে জীবন্ত ও বাস্তব।
শুধু বিদ্যাসুন্দর কাব্যে নয়, অন্নদা মঙ্গল কাব্যের মানসিংহ ভবনন্দের উপাখ্যানের অপ্রধান চরিত্র চিত্রণেও ভারতচন্দ্র সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এখানেও প্রধান চরিত্র নয়, অপ্রধান চরিত্রসমূহই অধিকতর উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। আলোচ্য উপাখ্যানের প্রধান বা কেন্দ্রীয় চরিত্র হরো ভবানন্দ মজুমদার। এর পর গুরুত্বের দিক থেকে বিবেচনা করলে যে চরিত্রগুলোর নাম উল্লেখ করতে হয় সে গুলো হলো-অন্নদা দেবী, বাদশা জাহাঙ্গীর, এবং মানসিংহ। কিন্তু উল্লিখিত চরিত্রসমূহের চেয়ে অধিকতর উজ্জ্বল ও জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে ঈশ্বরী পাটুনী, প্রতাপআদিত্য, ঘেসেড়ানী, দাসু-বাসু, সাধী-মাধী, চন্দ্রমুখী-পদ্মমুখী প্রভৃতি চরিত্র।
ঈশ্বরী পাটুনী চরিত্রটি আলোচ্য কাব্যে অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের এবং স্বল্প সময়ের জন্য অবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই কবি এই চরিত্রটিকে অত্যন্ত প্রাণবাণ ও রূপবান করে নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন :
‘প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে যোড় হাতে।
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’
ঈশ্বরী পাটুনীর এই উক্তির মধ্য দিয়ে কবি বাঙালির চিরায়ত জীবন-আকাঙ্ক্ষার স্বরূপকেই তুলে ধরেছেন। আধ্যাতিক বা পারলৌকিক নয় বরং পারত্রিক জীবনের সুখভোগই যে বাঙালির কাম্য এই সত্যকেও কবি এখানে উন্মোচন করেছেন। তাছাড়া এর মধ্য দিয়ে কবি সমকালীন জীবনের ভোগ-আকাঙ্ক্ষার স্বরূপকেও নির্দেশ করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রতাপআদিত্য চরিত্র চিত্রণেও কবি সমান সাফল্য লাভ করেছেন। এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে কবি স্বাধীনচেতা বীরত্বপূর্ণ্ বাঙালি জাতির স্বরূপকেই তুলে ধরেছেন। যুদ্ধের পূর্বে মানসিংহ প্রতাপআদিত্যের কাছে তলোয়ার ও বেড়ী পাঠায়। সে তলোয়ার রেখে দিয়ে মানসিংহের দূতকে যা বলেছে কবি এর স্বরূপকে তুলে ধরেছেন এভাবে-
``প্রতাপআদিত্য রাজা তলবার লয়ে।
বেড়ী ফিরা পাঠাইয়া পাঠাইল কয়ে।।
কহ গিয়া অহে চর মানসিংহ রায়ে।।
বেড়ী দেউক আপনার মনিবের পায়ে।
ঘেসেড়ানী চরিত্রটিকেও কবি অত্যন্ত উজ্জ্বল করে নির্মাণ করেছেন। ঝড় ঝঞ্ঝার বিপর্যস্ত ঘেসেড়ানী চরিত্রকে তিনি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই সৃষ্টি করেছেন।
দাসু-বাসু চরিত্র চিত্রণেও কবি যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। অল্প কিছু কথার মধ্যদিয়েই কবি তাঁদের জীবন-আকাঙ্খা স্বরূপটিকে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত শৈল্পিক দক্ষতায়। তাছাড়া সমকালীন নিম্নবিত্তের জীবনের পরিচয়টিও আলোচ্য চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে। যেমন-
মরি তাহে দুখ নাই নারী রইল কোন ঠাঁই
বিধাতা ফেলিল কি ফাঁদে।
কুড়ি টাকা পণ দিয়া নতুন করিনু বিয়া
এক দিনো শুতে না পাইনু।
অন্যদিকে সাধী-মাধী চরিত্রগুলোকে কবি বর্ণনার মধ্য দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছেন। এবং এদের চরিত্র চিত্রণের ম্ধ্য দিয়ে কবি প্রকৃত পক্ষে গভীর মানব জ্ঞানেরই পরিচয় দিয়েছেন।
চন্দ্রমুখী পদ্মমুখী চিরত্র চিত্রণেও কবি নিপুণ মানব-জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন। ভবানন্দ মজুমদার দিল্লি থেকে ফিরে এলে তাকে কাছে পাবার জন্য দু’সতীনের যে কোন্দল শুরু হয় তার মধ্য দিয়ে কবি নারী হৃদয়ের শাশ্বত স্বরূপটিকেই তুলে ধরেছেন।
মজুমদারের বড় স্ত্রী বিগত যৌবনা চন্দ্রমুখীর স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে কবি যে বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন তাতে চন্দ্রমুখী যেন জীবন্ত হয়ে আমাদের সম্মুখে আর্বিভূত হয়েছে। তাছাড়া চন্দ্রমুখীর উচ্চারণের ম্ধ্য দিয়ে তার হৃদয় যন্ত্রণার হাহাকারটিও যেন আমাদের কানে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যেমন:
তোমার যৌবন আছে তুমি আছ সুয়া
হারায়ে যৌবন আমি হইয়াছি দুয়া।
মোটকথা, অপ্রধান চরিত্রগুলো প্রধান চরিত্রের ন্যায় কাব্য কাহিনীর অনিবার্য অনুষঙ্গ না হলেও মানবীয় বৈশিষ্ট্যে অপ্রধান চরিত্রগুলো প্রধান চরিত্র অপেক্ষা উজ্জ্বলতর আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে। তাই বলা যায় ‘ভারতচন্দ্র নায়ক-নায়িকার চরিত্রাঙ্কনে ততটা সার্থক না হলেও অপ্রধান চরিত্রে বিশেষ কুললতা দেখাইয়াছেন।’ সুতরাং সমালোচকের আলোচ্য মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক এবং সঠিক।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক, বাংলা
+88 01713 211 910