
NTRCA মালিক মুহম্মদ জায়সী ও আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যের তুলনামূলক আলোচনা।
প্রশ্ন: ‘জায়সীর কাব্য যেখানে ছায়া, আলাওলের কাব্য সেখানে কায়া।’-আলোচনা কর।
অথবা “পদ্মাবতী অনুবাদ কাব্য হলেও অনেক ক্ষেত্রেই মৌলিক কাব্যের চরিত্র অর্জন করেছে।”- আলোচনা কর।
অথবা “অনুবাদ সত্ত্বেও আলাওলের সৃজনশীলতার কারণে পদ্মাবতী কাব্য মৌলিক রচনার মর্যাদা লাভ করেছে।”-আলোচনা কর।
আলোচনা: সমগ্র মধ্যযুগের বাংলা কাব্য সাহিত্যের ধারায় কবি আলাওল ছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্য তাৎপর্য মন্ডিত। পান্ডিত্যপূর্ণ বাক্য নির্মিতিতে শব্দ ব্যবহারের মুন্সিয়ানায়, উপমা-রূপক-উৎপ্রেক্ষা প্রভৃতি অলঙ্কার ব্যবহারে, রুচিশীল জীবন চেতনায়, সৌন্দর্যবোধে, তিনি ছিলেন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম। ‘পদ্মাবতী’ আলাওলের শ্রেষ্ঠ রচনা। যদিও কাব্যটি মৌলিক নয়; অনুবাদ কাব্য। হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবাৎ’ কাব্য থেকে তিনি এটি অনুবাদ করেন। কিন্তু মৌলিক কাব্য না হলেও আলাওলের পান্ডিত্য, মণীষা, বৈদগ্ধ্য, শিল্প-বোধ ও জীবন দৃষ্টি পদ্মাবতীকে মৌলিক কাব্যের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। আলাওল মালিক মুহম্মদ জায়সীর কাব্যের কাহিনী ও বিষয়কে নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করেই তাঁর কাব্য রচনা করেছেন। ভাব এবং কাহিনী নির্বাচনের দিক থেকে আলাওল সম্পূর্ণরূপে জায়সীর অনুগামী। কিন্তু কাহিনী বিন্যাস ও চরিত্র চিত্রণে আলাওল ছিলেন মৌলিক কবির বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাছাড়া শিল্প ও জীবন রোধের প্রশ্নেও আলাওল ছিলেন স্বাতন্ত্র্যধর্মী প্রতিভায় পরিস্রুত। কাব্য সাধনার মধ্য দিয়ে অধ্যাত্ম-চেতনার স্বরূপ উন্মোচনই ছিল জায়সীর অভিষ্ট। পক্ষান্তরে আধ্যাত্ম সাধনার পরিবর্তে মানব-রস এবং আনন্দ ও সৌন্দর্য-সৃষ্টিই ছিল আলাওলের অনিষ্ট। এ প্রসঙ্গে ড. ওয়াকিল আহমদ বলেন-
“জায়সীর পদ্মাবতী মূলত : অধ্যাত্ম রসের কাব্য, আলাওলের পদ্মাবতী মুখ্যত: মানবরসের কাব্য।
জায়সী মিস্টিক, আলাওল হিউম্যানিস্ট। হিন্দি কবির আধ্যাত্বিক চিন্তার সাথে মানবিক চিন্তার
মিশ্রণ ঘটেছে, বাংলা কবির মানবিক চিন্তার মধ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তার স্পর্শ লেগেছে।
(বাংলা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, ১৯৯৮ পৃ:২৮১)
বস্তুত জীবন-চেতনার দিক থেকে আলাওল ছিলেন, মানবিক জীবন-চৈতন্যে পরিস্রুত । এবং শিল্প ও কাব্য চেতনার ক্ষেত্রে তিনি পরিপূর্ণভাবে ছিলেন মৌলিক প্রতিভার অধিকারী। তাই কাব্যের ছোট খাট ঘটনাতেও তিনি মানবিক দিক থেকেই ফুটিয়ে তুলার প্রয়াস পেয়েছেন। জাগতিক জীবনের বিচিত্র ঘটনার মধ্যে আলাওল সামাজিকতাকেই মুখ্য করে তুলেছেন। অথচ জায়সী সামাজিক ঘটনাকেই আধ্যাত্বিক চেতনায় অভিব্যঞ্জিত করেছেন। পদ্মাবতীর বিবাহ অনুষ্ঠান এরকম একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পদ্মাবতীর বিয়েকে জায়সী অধ্যাত্ম রসে সিক্ত করেছেন কিন্তু আলাওল একে সামাজিকতায় রঞ্জিত করেছেন। যেমন আলাওলের বর্ণনায় পাই।
সজলে নয়নে রাজা কন্যা সমর্পিল।
বলে মোর প্রাণ আজু তোমা হস্তে দিল।
এখানে আধ্যাত্ম চেতনার পরিবর্তে একজন পিতার হৃদয় আর্তিই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
শুধু জীবন বোধের দিক থেকে নয়, শিল্প রীতিতে আলাওল অবিনবত্বের পরিচয় দিয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে মৌলিক। জায়সী চোপঈ দ্বারা তাঁর কাব্য রচনা করেছেন। চৌদ্দ চরণের সাথে ভনিতার দুই চরণ যুক্ত করে চোপঈ রচিত হয় এবং এগুলো স্বয়ংস্পূর্ণ। কিন্তু আলাওল আখ্যানের মাধ্যমে তাঁর কাব্য রচনা করেছেন। তিনি সুর ও তালের নাম উল্লেখ করেছেন যা মূলে নেই।
উপমা রূপক-উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার ব্যবহারও আলাওল বিশেষত্বের পরিচয় দিয়েছেন। বাংলায় পরিচিত প্রকৃতি ও জীবন থেকেই তিনি উপমা রূপাকাদির উপকরণ সংগ্রহ করেছেন। এখানে কবির মূলানুসরণ এবং স্বাধীন কল্পনা দুই-এরই পরিচয় পাওয়া যায়। পদ্মাবতীর কাল বিলম্বিত কেশর বর্ণনা দিতে গিয়ে জায়সী ভূজঙ্গ ও ভ্রমরের উপমা এনেছেন আলাওল এ দুটি ছাড়াও পিক, চামর ও ভুজঙ্গের সাথে তুলনা করেছেন।
যেমন- “অলিপিক ভুজঙ্গ চামর জলধর
শ্যামতা সৌষ্ঠব কেহ নহে সমসর।”
এখানে আলাওল মালোপমা ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন। অর্থালঙ্কার ব্যবহারে আলাওল মূলের কাছে ঋণী থাকলেও শব্দালঙ্কার ব্যবহারে তিনি ছিলেন অভিনব এবং মৌলিক প্রতিভার অধিকারী। স্বীয় ভাষার উপর দখল এবং এর অর্ন্তিনিহিত শক্তি সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান থাকলেই শব্দালঙ্কার সৃষ্টি সম্ভব। আলাওল সে দিক থেকে ছিলেন তুলনারহিত। আর এ জন্যই তাঁর অনুপ্রাসগুলো ধ্বনিসৌন্দর্যে এবং অর্থগৌরবে অনন্যা।
যেমন-
১। “সেই গর্বে গর্ব চূর্ণ করিলেক সর্ব”
২। “খঞ্জন গঞ্জন নেত্র অঞ্জন রঞ্জিত।”
৩। ‘সুখ সর সলিল সকল সুখাইল।’
৪। ‘শক্তি বিনে শিব শক্তি সব শঙ্কাপায়’
৫। ‘পতিরতি শ্রমে সতী গতি অতি মন্দ।’
কাব্যের ভাষা নির্মাণেও আলাওল ছিলেন স্বাতন্ত্র্যধর্মী শিল্পী সত্ত্বায় অভিব্যঞ্জিত। তার কাব্যের ভাষায় সরস জীবনাবেগ যেমন আছে তেমনি আছে চপলতা ও তরলতা। পদ্মাবতী কাব্যের ভাষা বজ্রের গাঁতুনিতে আঁটা; এ জীবনের ভাষা নয়, তবে কৃত্রিম এবং আড়ষ্টও নয়।
রত্মসেন পদ্মাবতীর “বিবাহ খন্ডে” চৌগান সম্বন্ধে সে বিস্তৃত বর্ণনা আছে, তা আলাওলের সম্পূর্ণ মৌলিক সংযোজন। জায়সীর কাব্যে এর উল্লেখ মাত্র নেই। তবুও মুল কাহিনীর সাথে এটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। ঘটনাবহুল এই অংশের মধ্যদিয়ে আলাওলের জীবনের সজীবতা ও গতিচাঞ্চল্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
ষড় ঋতুর বর্ণনায় আলাওল মৌলিক শিল্পী সত্তার পরিচয় দিয়েছেন। এখানে কবি জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ককেই ফুটিয়ে তুলেছেন। জায়সীর কাব্যে সেরকম কিছু লক্ষ্য করা যায় না। আলাওলের কাব্যে বেশ কিছু গান আছে। এই গানগুলোর বিষয় বস্তু সম্পূর্ণ মৌলিক। এর মধ্য দিয়ে আলাওলের গীতধর্মী মৌলিক প্রতিভার পরিচয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আলাওলের কাব্যের ভাষার মধ্যেও গীতিধর্মিতা বর্তমান।
পদ্মবতীকে পাবার উদ্দেশ্যে রত্নসেন নাগমতিকে পরিত্যাগ করে বিদেশ যাত্রা করেন। এতে নাগমতির মধ্যে যে, বিরহ যাতনার সৃষ্টি হয়, তার বিস্তৃত বর্ণনা আলাওল তাঁর কাব্যে উপস্থাপন করেন। অথচ বিরহদগ্ধা রমণীর অন্তর্বেদনার চিত্রটি মূলে নেই। আর এর মধ্যে দিয়ে আলাওলের মৌলিক প্রতিভার স্বরূপ যেমন উন্মোচিত হয়েছে তেমনি তাঁর মানবিক শিল্পী সত্তাটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মোট কথা আলাওলের পদ্মবতী জায়সীয়র কাব্যের অনুবাদ হলেও এটি অনুপুঙখ অনুবাদ কাব্য নয়। আলাওল জায়সীর কাব্যের আক্ষরিক অনুবাদ করেন নি, ভাবানুবাদ করেছেন। ফলে, আলাওলের মৌলিক শিল্পী সত্ত্বাই পদ্মবতী কাব্যে ষ্ফুটিত লাভ করেছে। তাই আলাওলের মৌলিকত্ব বিচার করতে গিয়ে-সৈয়দ আলী আহসান পদ্মবতীর কাব্যের ভূমিকায় নিম্নরূপ মূল্যায়ন করেছেন।
(ক) “জায়সীর সুবৃহৎ কাব্যের প্রতিটি অধ্যায়ের সম্পূর্ণ অনুবাদ আলাওল করেননি। অনেক অংশ তিনি বর্জন করেছেন।
(খ) কাহিনীর ক্রমধারা, বিস্তার এবং আবর্ত রক্ষার জন্য যে সমস্ত অংশের প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র আবেগ ও সৌন্দর্যের তন্ময়তার জন্যই যেগুলোর সৃষ্টি, বর্ণনা সংক্ষেপ করতে গিয়ে আলাওল সেগুলো বাদ দিয়েছেন।
(গ) আলাওলে অতিরিক্ত সংযোজনও অনেক আছে কিন্তু সেগুলো মূলত পান্ডিত্য প্রকাশের জন্য সৌন্দর্য হেতু নয়।” বস্তুত আলাওলের পদ্মাবতী জায়সীর কাব্যের অনুবাদ হলেও কবি হিসাবে তিনি মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছেন। জীবন-বোধ ও শিল্পরীতিতে তিনি পরিপূর্ণভাবে নিজস্বতার পরিচয় দিয়েছেন। মূলের আধ্যাত্মিক কাব্যেকে তিনি মানবিক ও লৌকিক কাব্যে রূপান্তর করেছেন। আর একারণেই মধ্যযুগের বাংলা কাব্যের ধারায় আলাওলের কবি প্রতিভা অনন্য এবং অভিনব।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910