
NTRCA আলাওলের পদ্মাবতী কাব্য ও পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনা।
আলাওলের পদ্মাবতী কাব্য ও পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনা
প্রশ্ন: ‘পদ্মাবতীর রূপবর্ণনায় কবি আলাওল মৌলিক প্রতিভার পরিচয়
দিয়েছেন’-আলোচনা কর।
আলোচনা: আলাওল মধ্য যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘পদ্মাবতী’ কাব্য। যদিও কাব্যটি মৌলিক কাব্য নয়; অনুবাদ কাব্য। হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ থেকে তিনি এটি অনুবাদ করেন। কিন্তু মৌলিক কাব্য না হলেও আলাওলের পান্ডিত, মনীষা, বৈদগ্ধ্য, শিল্পবোধ ‘পদ্মাবতী’ কে মৌলিক কাব্যের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। এমনকি আলাওলের প্রতিভা কাব্যের কোনো কোনো খন্ডে জায়সীকেও অতিক্রম করে গেছে। এরকমই একটি অনন্য খণ্ড হলো, ‘পদ্মাবতীর রূপ বর্ণন খণ্ড’। এখানে কবি শুধু মৌলিক প্রতিভারই পরিচয় দেন নি, বরং অনন্যতারও পরিচয় দিয়েছেন। এই খন্ডে আলাওল ক্ল্যাসিক শিল্পচেতনার যেমন পরিচয় দিয়েছেন তেমনি সৌন্দর্যবোধেরও স্বাক্ষর রেখেছেন। পদ্মাবতীর দেহের রূপ বর্ণনায় এখানে অশ্লীলতার আশ্রয় নেন নি, বরং নান্দনিক শিল্পচেতনার পরিচয় দিয়েছেন।
পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনায় কবি যে সমস্ত উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ করেছেন তাতে পৌরাণিক প্রসঙ্গের প্রভাব যেমন আছে তেমনি ক্ল্যাসিক সংস্কৃত সাহিত্যের অনুপ্রেরণাও আছে। উপমা নির্মাণে কবি সরল উপমা যেমন ব্যবহার করেছেন তেমনি স্মরণ-উপমা এবং মালোপমারও ব্যবহার করেছেন-পদ্মাবতীর চুলের বর্ণনায় তা-ই দেখা যায়। যেমন-
“অলিপিক ভুজঙ্গ জলধর
শ্যামতা সৌষ্ঠব কেহ নহ সমসর।”
একই ভাবে কবি পদ্মাবতীর ললাট, ভ্রু আর চোখের বর্ণনা দিয়েছেন। এ সমস্ত অঙ্গের সৌন্দর্য বর্ণনার পাশাপাশি কবি এগুলোর সৌন্দর্যের প্রতিক্রিয়াকেও চিত্রিত করেছেন। পদ্মাবতীর চোখের সৌন্দর্য যেমন মনোহর তেমনি এর ভ্রু ভঙ্গিও চিত্তাকর্ষক। তাই জগতের সবাই এতে আত্মহুতি দিতে পর্যন্ত প্রস্তুত।–
“ঢাকিয়া ঢাকিয়া পরে প্রাণ হরে সবে
স্বইচ্ছায় প্রাণ দিতে বাঞ্ছা করে সবে।
বঙ্কিম কটাক্ষ শর অস্থির ঘাতক
তথাপি জগজন মরণ যাচক।”
পদ্মাবতীর নাকের বর্ণনা করেছেন কবি সপ্তম স্তবকে। নাককে তিনি তুলনা করেছেন খগপতির সঙ্গে। শুধু তাই নয়, নাকের উপমায় তিনি তিলফুলেরও ব্যবহার করেছেন। এর মধ্য দিয়ে কবির পান্ডিত্যের পরিচয় যেমন প্রকাশিত তেমনি সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গিও উন্মোচিত।
পদ্মাবতীর অধরের বর্ণনায় কবি অনন্য সাধারণ কবি প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। পান খেলে ঠোঁট রাঙা হয়, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কবি দেখেছেন এর বিপরীত সত্য। পদ্মাবতীর রাঙ্গা সুন্দর অধরের স্পর্শে পানই বরং রাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তিনি বর্ণনা করলেন-
‘রাতুল উৎপল জলান্তর বৈসে
তাম্বুল রাতুল হৈল অধর পরশে।’
কাব্যের নবম স্তবকে কবি দাঁতের বর্ণনা দিয়েছেন। দাঁতের বর্ণনায় কবি গতানুগতিকভাবে হিরার প্রসঙ্গ এনেছেন। নারঙ্গির সঙ্গে কপোলের তুলনাতে একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কানকে কবি তুলনা করেছেন চন্দ্র ও সূর্য্যের সাথে। তবে মুখমণ্ডরের বর্ণনায় কবি নিজস্বতার পরিচয় দিয়েছেন। মুখের সৌন্দর্যের কাছে লজ্জিত হয়ে চাঁদের আলো পর্যন্ত ক্ষীণ হয়ে যায় এবং তার জ্যোতি দেখে পদ্মফুল জলে লুকিয়ে যায়। গ্রীবার বর্ণনায় কবি কলসের উপমা ব্যবহার করেছেন। তবে সে কলস সাধারণ কলস নয়, স্বর্ণতন্ত্র সজ্জ্বিত কলস। কিন্তু পদ্মাবতীর স্তনের বর্ণনায় কবি একাধিক উপমা ব্যবহার করেছেন। যেমন-শ্রীফল, কেতকী ফুল, জাম্বির, দাড়িম্ব, কমলা, দ্রাক্ষাফর ইত্যাদি। এই অপরূপ সৌন্দর্য শুধু মানুষ নয় দেবতারাও মুগ্ধ-
‘নৃপকুলে বহু যত্নে দেব আরাধেন্ত
কর দিতে নারে সবে কর কচালেন্ত।’
চন্দন বিচিত্রিতা কুম্কুম কেশরের সাথে পদ্মাবতীর ক্ষীণ উদরকে তুলনা করা হয়েছে। রোমাবলীকে কল্পনা করা হয়েছে কৃষ্ণভুজঙ্গিনী রুপে। পদ্মাবতীর কটিদেশকে তুলনা করা হয়েছে সিংহের কটি দেশে সাথে। এছাড়া নিতম্বকে রামকদলী, চরণকে রক্তপদ্ম এবং নখকে নবচন্দ্রের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেমন-
‘যাবক রঞ্জিত নখ দেখি লাগি ধন্ধ অরুণ বরণ হৈল বরমালা চান্দ।’
পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনার পিছনে সক্রিয় ছিল আলাওলের সুগভীর পান্ডিত্য এবং সৌন্দর্য অনুধ্যান। মানবিক আবেগ এবং শৈল্পিক সুরুচি থেকেও কবি বিচ্যুত হন নি। আর এ কারণেই দেখা যায় যে, পদ্মাবতীর দেহের অপরুপ রূপ বর্ণনায় কবি নান্দনিক উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং রূপকের যথার্থ ব্যবহার করেছেন। সেই সাথে পদ্মাবতীর মহোনীয় রূপ অবলোকনে প্রকৃতি ও মানব সমাজের প্রতিক্রিয়াকেও চিত্রিত করেছেন। তাই আমরা লক্ষ করি পদ্মাবতীর গমনভঙ্গী দেখে হংস দূরে চলে যায় এবং হস্তী লজ্জায় শিরে ধূলি নিক্ষেপ করে। তার মুখ দেখে চন্দ্র লজ্জায় ক্ষীয়মান হয়ে উঠে। তার চক্ষু দেখে খঞ্জন পাখি আত্মগোপন করে, মধুর বাণী শুনে চাতক ও কোকিল বনান্তরে লুকায়। কটি দেখে বাঘ লুকালো, গ্রীবা দেখে ময়ূর, ভ্রু দেখে রামাধনু অকালে আত্মগোপন করল, বেনী দেখে বাসুলী পাতালে গিয়ে লুকিয়ে রইল। পদ্মাবতীর ভুজ দেখে পদ্মনীল আত্মগোপন করল, উরু দেখে কদলী বৃক্ষ নিজেকে লুকালো। পদ্মাবতী সজ্জিত হয়ে যখন হেঁটে চলল তখন অপসরীগণ নিজেদের লুকালো। বস্তুত এই সমস্ত অতিশয়োক্তির মাধ্যমেই ‘পদ্মাবতী’র রূপ বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের এই অধ্যায় একদিকে যেমন সৌন্দর্যের চেতনায় সিক্ত হয়েছে তেমনি অন্যদিকে কবিত্ব মন্ডিত হয়েছে।
মোটকথা, ‘পদ্মাবতী’ আলাওলের মৌলিক কাব্য নয়; অনুবাদ কাব্য। অনুবাদ কাব্য হিসাবে তিনি যে কয় স্থানে স্বাতন্ত্র্যধর্মী প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, তার মধ্যে ‘পদ্মাবতীর রূপ বর্ণন খণ্ড’ অন্যতম। এখানে কবি ক্লাসিক শিল্প-শৈলীর পরিচয় দিয়েছেন। পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনায় উপমা –উৎপ্রেক্ষা-রূপকের ব্যবহারে তিনি সংস্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রকেই অনুসরণ করেছেন। তবে স্থানে স্থানে স্বীয় কবি প্রতিভারও স্বাক্ষর রেখেছেন। যা কবিকে স্বাতন্ত্র্যধর্মী কবি প্রতিভার অধিকারী হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
ড. এ. আই, এম. মুসা
অধ্যাপক, বাংলা
+88 01713 211 910