
NTRCA মুকুন্দরাম কি দুঃখবাদী কবি?
প্রশ্ন: মুকুন্দরাম কি দুঃখবাদী কবি? আলোচনা কর।
অথবা, ‘মুকুন্দরাম দুঃখবাদী কবি নন, দুঃখ বর্ণনার কবি’-আলোচনা কর।
আলোচনা: শুধু বাংলা মঙ্গল কাব্যের ধারায় নয়, সমগ্র মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। কেননা, ধর্মীয় চেতনাস্নাত আবহে সাহিত্য সাধনা করেও তিনি তাঁর কাব্যে মানবীয় বৈশিষ্ট্যকেই উজ্জ্বল করে তুলে ছিলেন। কাহিনীর অন্তর্বয়নে, ভাষা নির্মাণের মুন্সিয়ানায়, শব্দ ব্যবহারের কুশলতায়, সমাজ অনুধ্যানে, উপমা-রূপক-উৎপ্রেক্ষা প্রভৃতি অলঙ্কার সৃষ্টিতে, ছন্দের ঝঙ্কারে, চরিত্র সৃষ্টির দক্ষতায় এবং জীবনবোধের স্বাতন্ত্র্যে তিনি ছিলেন অসাধারণ শিল্পী ব্যক্তিত্ব। সমগ্র মধ্যযুগে তার প্রতিভার সাথে শুধু ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরই তুলিত হতে পারেন। তবে প্রতিভার দিক দিয়ে মুকুন্দরামই বিভিন্ন দিক থেকে অগ্রগামী তাতে সন্দেহ নেই। এ প্রসেঙ্গ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল্যায়ন বিবেচ্য। তিনি বলেন-
“মুকুন্দরাম কাহিনী, চরিত্র ও বাস্তব মানব জীবন রস সৃষ্টিতে যে রূপ নিপুণতা দেখাইয়াছেন, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র ঠিক সেই রূপ বাগধারা শব্দবৈদগ্ধ্য, মণ্ডনকরা, ছন্দের নবীনতা এবং
সরস পরিহাস রসিকতায় একটি মার্জিত ও প্রসন্ন নাগরিক মনের পরিচয় দিয়েছেন। তাহা হইলে
সমস্ত দিক বিচার করিলে মুকুন্দরামকেই শ্রেষ্ঠত্বের আসন দিতে হইবে।”
( বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, পুন: মুদ্রণ, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা-১৫৪)
তবে সমালোচকের উল্লিখিত মূল্যায়ন সত্ত্বেও অনেকে মুকুন্দরামকে দুঃখবাদী কবি হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এদের মধ্যে ড. দীনেশচন্দ্র সেনের নামই সর্বাগ্রে স্মারণযোগ্য। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন-
“কবিকঙ্কন সুখের কথায় বড় নহেন, দুখের কথায় বড়।
বড় বড় উজ্জ্বল ঘটনার মধ্যে অবিরত ফলগুনদীর ন্যায়
এক অন্তর্বাহী দুঃখ সঙ্গীতের মর্মস্পশী অন্তর্ধ্বনি শুনা যায়।”
সমালোচকদের উল্লিখিত মূল্যায়নের ভিত্তি হলো কবির কাব্য রচনার বৈশিষ্ট্য এবং বাস্তব জীবন-চেতনা। বস্তুত, কবি মঙ্গলকাব্যের বিধিবদ্ধ কাহিনীর মধ্যেও ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ দুর্দশার কথা যেমন বর্ণনা করেছেন তেমনি তুলে ধরেছেন কালকেতু-ফুল্লরার দুঃখময় জীবনের উপখ্যান-যা সমকালীন জীবনের দুঃখ দুর্দশাকেই রূপায়িত করেছে। আর এর উপর নির্ভর করেই সমালোচকগণ মুকুন্দরামকে দুঃখবাদী কবি হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তবে প্রকৃতপক্ষে মুকুন্দরাম দুঃখবাদী কবি নন, দুঃখ বর্ণনার কবি। এ প্রসঙ্গে আশুতোষ ভট্রাচার্য তাঁর ‘বাংলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেন-
“মুকুন্দরাম দুঃখবর্ণনার কবি, কিন্তু দুঃখবাদী কবি নহেন।
তাঁহার ‘অভয়া মঙ্গল’ পরম আশাবাদীর জীবন-সঙ্গীত।”
[বাংলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাস, অষ্টম সংস্করণ, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা-৫২৬]
মুকুন্দরাম দুঃখবাদী কবি হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার পিছনে তাঁর কাব্যের কিছু পরিচ্ছেদ ও বিশেষ কিছু চরণই মুখ্যত দায়ী। কবি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন-
“তৈল বিনে কৈল স্নান করিল উদক পান
শিশু কান্দে ওদনের তরে।’ [গ্রন্থ উৎপত্তির কারণ]
কালকেতুর অর্থনৈতিক জীবনের পরিচয় দিতে গিয়ে কবি লেখেন-
‘তিন বাণ শরাসন বিনা আর নাহি ধন
বান্ধা দিতে পারে না উধারে।’ [ কালকেতুর স্বদেশে গমন]
তাছাড়া কালকেতুর দৈন্য ও দুর্দশার চিত্রকেও কবি অত্যন্ত বাস্তবতার সাথে তুলে ধরেছেন। যেমন-
‘তৈল লবণের কড়ি ধারি ছয় বুড়ি
শশুর ঘরের ধান্য ধারি দেড় আড়ি।
কিরাত পাড়াতে বসি না মেলে উধার
হেন বন্ধুজন নাহি কেহ সহে ভার।।’ [ভগবতীর মৃগীরূপ ধারণ ও কালকেতুর খেদ]
দারিদ্র্য পীড়িত এই সংসারের জন্য ফুল্লরার মুখ থেকেও তাই চরম হাহাকার ধ্বনিত হয়। যেমন-
‘বিধাতা করিল মোরে দরিদ্রের কান্তা
চারি প্রহর করি সই উদরের চিন্তা।’ [ফুল্লরা ও কালকেতুর কথোপকথন]
তাছাড়া ছদ্মবেশী দেবীর মুখ দিয়ে কবি যে উচ্চারণ করিয়েছেন তাতেও সমকালীন দুঃখ দুর্দশার ছবিটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন-
‘আমি সে জনম দুখি বসি গুপ্ত বারাণসী
স্বামী মোর জনম ভিখারী।’ [ফুল্লরার সহিত চণ্ডীর কথোপকথন]
উল্লিখিত রচনা ভঙ্গিই সমালোচকদের অনুপ্রাণিত করেছে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে দুঃখবাদী কবি হিসাবে বর্ণনা করতে। তাছাড়া ফুল্লরার বারমাসীটিও এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। যদিও ফুল্লরার বারমাসীটি সুখের কি দুঃখের তা নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না। কারণ-
‘হেন বাক্য হইল যদি অভয়ার তুন্ডে
আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়ে ফুল্লরার মুন্ডে।
হৃদে বিষ মুখে মধু জিজ্ঞাসে ফুল্লরা
দূরে গেল ক্ষুধা-তৃষ্ণা রন্ধনের ত্বরা।’ [ চণ্ডীর সহিত ফুল্লরার সাক্ষাৎ]
তাই ফুল্লরা তার বারমাসীতে যে দুঃখের বর্ণনা দেয় তা সর্বাংশে সত্য নয়। বরং স্বীয় স্বামী-গৃহের প্রতি আকৃষ্ট সুন্দরী রমণীকে নিরত করার জন্যই সে নিজের জীবনের দুঃখকে অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করেছে। এ প্রসঙ্গে আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেন-
“ইহা নির্জলা দুঃখেরও বারমাসী নহে, নিরবচ্ছিন্ন সুখেরও বারমাসী
নহে-ইহা ফুল্লরার এক সাময়িক অশুভ আশঙ্কাজাত অন্তর্দ্বন্দ্বের
বহিরাভিব্যক্তি মাত্র।” [ বাংলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাস, অষ্টম সংস্করণ, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা-৫২২]
তাই ‘ফুল্লরার বার মাসের দুঃখ’ এর উপর নির্ভর করে মুকুন্দরামকে দুঃখবাদী কবি হিসাবে বর্ণনা করা উচিত হবে না। কেননা, বারমাসীর দুঃখ বর্ণনার মধ্যে বাস্তবতা থাকলেও এতে ফুল্লরার আন্তরিকতা ছিল না। সুতরাং মুকুন্দরাম দুঃখবাদী কবি নন। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাই বলেন-
“মুকুন্দরামকে দুঃখবাদী বা Pessimist ও বলা যায় না। তিনি প্রসন্ন
জীবনের কবি। দুঃখবাদের ভূত কখনোই তাঁহার স্কন্ধে ভর করে নাই।
দুঃখবাদ বা নৈরাশ্যবাদ য়ুরোপ হইতে আমদানীকৃত মানসিক ব্যাধি
বিশেষ, এবং একালের মানুষের তথা চিন্তাশীল দার্শনিক পণ্ডিতদের
মনে ইহা শিকড় গাড়িয়াছে।” [ বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, ২য় খণ্ড, পুন মুদ্রণ. ১৯৯৬, পৃষ্ঠা-১৮০]
মোটকথা, উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলতে পারি যে, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী দুঃখ বর্ণনার কবি, কিন্তিু দুঃখবাদী কবি নন।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910