
NTRCA মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কালকেতু উপাখ্যানে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ
মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কালকেতু উপাখ্যানে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ
প্রশ্ন: মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কালকেতু উপাখ্যানে উপন্যাসের যে সব বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়
তা আলোচনা কর।
অথবা, আধুনিক কালে জন্মালে মুকুন্দরাম একজন ঔপন্যাসিক হতেন-আলোচনা কর।
আলোচনা: সময়-সমাজ-সভ্যতা এবং ইতিহাস থেকে সত্য ও শক্তি আহরণ করেই শিল্প সাহিত্যের উদ্ভব ঘটে। বিশেষ কালের জীবনের আকাঙক্ষা স্বপ্ন এবং সংগ্রামকে রূপায়ণের অঙ্গিকারেই সাহিত্য শিল্পের সৃষ্টি। মধ্যযুগের অন্যতম সাহিত্য সৃষ্টি মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল সম্বন্ধেও একথা সত্য। চণ্ডীমঙ্গল কাব্য বিশেষ উদ্দেশ্য তথা দেব-দেবী মহিমা কীর্তনের জন্যই রচিত। তবে এর ম্ধ্য দিয়েই সমকালীন জীবন ও সমাজ বাণীরূপ পেয়েছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে। ফলে দেব দেবীর কথা তথা মাহাত্ম্যকীর্তনের অন্তরালে এদেশের মাটি ও মানুষের কথাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বস্তুত দেবস্তুতির মানসে রচিত হলেও চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে সমকালীন সমাজের জীবন ও জীবিকা, আচার-আচরণ, অভ্যাস, বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, পোশাক-পরিচ্ছেদ, আহার –বিহার প্রভৃতি চিত্র অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। মুকুন্দরামের এই সমাজ মনস্কতা এবং বাস্তববুদ্ধির কথা বিবেচনা করেই অনেক সমালোচক বলেছেন যে, আধুনিক যুগে জন্মগ্রহণ করলে তিনি কবি না হয়ে ঔপন্যাসিক হতেন। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে উল্লিখিত মন্তব্যের সত্যাসত্য যাচাই করব।
দেবী-চণ্ডীর পূজা প্রবর্তন ও প্রচারের কাহিনীকে অবলম্বন করেই মুকুন্দরাম তাঁর কাব্য রচনা করেন। এই ধরনের বিধিবন্ধ কাহিনীর আওতায় সমকালীন জীবন ও সমাজের যর্থাথ রূপায়ণ অত্যন্ত দুরূহ কাজ। কিন্তু প্রতিভাধর কবি মাত্রই এই বাধাকে অতিক্রম করেছেন। অনন্য প্রতিভাধর কবি মুকুন্দরাম সম্বন্ধেও একথা সত্য। তাই দেব কাহিনীর অলৌকিকতার আড়ালে তিনি সমকালীন জীবন ও সমাজকে জীবন্ত করে তুলেছেন। মোটকথা সমাজ চিত্র রূপায়ণে এইরুপ দক্ষতা সমগ্র মধ্যযুগের কোন কবির মধ্যে লক্ষ করা যায় নি। মুকুন্দরামের এই বৈশিষ্ট্যের কথা বিবেচনা করেই শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় “বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা” গ্রন্থে বলেছেন-
“দক্ষ ঔপন্যাসিকের অধিকাংশ গুণই তাঁহার মধ্যে বর্তমান ছিল। এ যুগে
জন্মগ্রহন করিলে তিনি যে কবি না হইয়া একজন ঔপন্যাসিক
হইতেহন তাহাতে সংশয় মাত্র নাই।” [কলিকাতা, ৪র্থ সং, ১৩৬৯, পৃষ্ঠা-১২]
মুকুন্দরাম ছিলেন সমাজ সচেতন কবি ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর কাব্যে মধ্যযুগের বাংলার একটি সামগ্রিকরূপ ফুটে উঠেছে। সামন্তবাদী জীবিন ব্যবস্থায় মধ্যযুগের বাংলা নানা সংকট ও সমস্যায় জর্জরিত ছিল। শোষণ, বঞ্চনা আর অত্যাচার ছিল মধ্যযুগের বাঙালির জীবনের নিত্য সঙ্গী। সামন্ত সমাজের শোষণ জর্জরিত মানুষের অবস্থা, অবক্ষয়, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের এই চিত্রটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে মুকুন্দরামের কাব্যে-
সরকার হৈল কাল খীল ভূমি লেখে লাল
বিনি উপকারে খায় ধুতি
পোতদ্দার হৈল যম টাকা আড়াই আনা কম
পাই লভ্য খায় দিন প্রতি।
[গ্রন্থ উৎপত্তির কারণ]
গুজরাট নগর পরিকল্পনার মধ্য দিয়েও কবির বস্তুনিষ্ঠ সমাজ অনুধ্যানের পরিচয় পাওয়া যায়। যা একজন বস্তুনিষ্ঠ ঔপন্যাসিকের বৈশিষ্ট্যকেই নির্দেশ করে। বিচিত্র পেশার এবং বিভিন্ন ধর্মের লোকের সমাবেশ ঘটে গুজরাট নগরীতে হিন্দু, মুসলিম, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সবাই গুজরাট নগরীতে বসতি স্থাপন করে যাজক, জ্যোতিষী, বৈদ্য যেমন গুজরাট নগরীতে এসেছে, তেমনি এসেছে গোপ, তেলি, চাষী, কামার , কুমার, তত্ত্রায়, মালী, নাপিত, গন্ধবণিক, শঙখবণিক, ধোপা, দর্জি প্রভৃতি বিচিত্র পেশার লোক। এমনকি বারবনিতাও গুজরাট নগরি থেকে বাদ যায় নি। আর এর ভিতর দিয়ে কবির গভীর সমাজ চেতনাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। কবি মুকুন্দরামের সমাজ চেতনা যে কত গভীর ছিল মুসলিম সমাজের বর্ণনায় তা প্রমাণিত হয়। যেমন-
ফজর সময়ে উঠি বিছায়ে লোহিত পাটি
পাঁচ বেরি করয়ে নামাজ।
ছোলেমানী মালা করে জপে পীর পয় গম্বরে
পীরের মোকামে দেয় সাঁজ।।
চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়েও মুকুন্দরাম বস্তুনিষ্ঠ সমাজ মনস্কতার পরিচয় দিয়েছেন। এটিও একজন আধুনিক ঔপন্যাসিকের যর্থাথ গুণ। বস্তুত চরিত্র চিত্রণে মুকুন্দরাম অসাধারণ কবি প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। চরিত্র চিত্রণে মুকুন্দরামের সমান প্রতিভাধর কবি মধ্যযুগে আর একজনও নেই। কাহিনী কেন্দ্রিক সাহিত্যে চরিত্র চিত্রণ দক্ষতা আধুনিকতার লক্ষণ হিসাবে বিবেচ্য। মুকুন্দরামের মধ্যে এই গুণ পুরাপুরি বর্তমান ছিল। তাঁর প্রতিভার পরশে দেব চরিত্রগুলোও আচার আচরণে রক্ত মাংসের মানুষে পরিণত হয়েছে। কালকেতু ফুল্লরা দেবশিশু হয়েও চিরায়ত বাঙালি নরনারীর মত আচরণ করেছে। শুধু তাই নয়, চিন্তা-চেতনায়, বিশ্বাসে, স্বামী প্রেমে এবং ঈর্ষায় ফুল্লরার মধ্যে শ্বাশত বাঙালি নারীরূপই মূর্ত হয়ে উঠেছে। ভাড়ুদত্ত, মুরারীশীল, বাণ্যানী, বুলান মণ্ডল প্রভৃতি অপ্রধান চরিত্রগুলো আমাদের চির পরিচিত গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। আর এ জন্যই আশুতোষ ভট্টাচার্য মুকুন্দরামকে বস্তুতান্ত্রিক ঔপন্যাসিক হিসাবে অভিহিত করেছেন।
তাছাড়া ফুল্লরা-কালকেতু চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে মুকুন্দরাম তৎকালীন বাঙালি সমাজের দুঃখ-দুর্দশা আর দারিদ্র্র্য পীড়িত স্বরূপটিকেই উন্মোচন করেছেন। সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে যে অত্যন্ত নিঃস্ব ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় ফুল্লারার একটি উক্তিটি-
বিধাতা করিল মোরে দরিদ্রের কান্তা
চারি প্রহর করি সই উদরের চিন্তা।
ফুল্লরার বারমাসীর বর্ণনাও একই সত্যকে উন্মোচন করেছে। দেবী চণ্ডীর জবানিতেও সমকালীন সমাজের নিঃস্বতার চিত্রটি ফুটে উঠেছে-
“আমি যে জনম দুখি বসি গুপ্ত বারণসী
স্বামী মোর জনম ভিখারী।”
সুতরাং আমরা বলতে পারি- আধুনিক কালে জন্মগ্রহণ করলে তিন কবি না হয়ে একজন ঔপন্যাসিক হতেন। কারণ, মুকুন্দরাম রচিত কালকেতু উপখ্যান দেব মাহাত্ম্য কীর্তনের মানসে রচিত হলেও এখানে দেব মহিমা। এবং অলৌকিকতা বড় হয়ে উঠে নি। বরং অলৌকিকতা এবং দেব মাহাত্ন্যের পরিবর্তে কালকেতু উপখ্যান হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবন কাব্য।
+88 01713 211 910