
NTRCA বৈষ্ণব কবি জ্ঞান দাস ও গোবিন্দ দাসের পদের তুলনামূলক আলোচনা
জ্ঞান দাস ও গোবিন্দ দাসের পদের তুলনামূলক আলোচনা
প্রশ্ন: জ্ঞান দাস ও গোবিন্দ দাসের পদের তুলনামূলক আলোচনা
কর।
আলোচনা: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় বৈষ্ণব পদাবলী এক অনন্য সৃষ্টি। ভাব, বিষয়, আঙ্গিক, জীবন দৃষ্টি এবং কাব্য-রস সৃষ্টির প্রশ্নে বৈষ্ণব পদাবলীর একেকটি পদ যেন নিটোল শিল্প প্রতিমা। একটি বিশেষ তত্ত্ব এবং বক্তব্যকে ধারণ করেও বৈষ্ণব পদাবলী যথার্থ শিল্প মহিমা থেকে বিচ্যুৎ হয়নি। বরং উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক প্রভৃতি অলঙ্কার সৃষ্টিতে এবং শব্দ প্রয়োগে, ছন্দের ঝঙ্কারে বৈষ্ণব পদাবলী শিল্প সফল কাব্যের বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করার গৌরব অর্জন করেছে। মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যের এই গৌরব জনক ধারা যাঁদের শ্রম ও সাধনায় ঋদ্ধি লাভ করেছে তাঁদের মধ্যে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের সমান না হলেও সমান্তরাল দুই প্রতিভা হলেন জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস। জ্ঞান দাস হলেন বিদ্যাপতির ভাব শিষ্য এবং গোবিন্দদাস হলেন চণ্ডীদাসের ভাব শিষ্য। তাই বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের পদাবলীর মধ্যে যেমন বিভিন্ন দিক থেকে সাদৃশ্য রয়েছে তেমনি জ্ঞানদাস-গোবিন্দ দাসের পদাবলীর মধ্যেও সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য রয়েছে। বস্তুত, ভাব-ভাষা, ছন্দ, অলঙ্কার নিমার্ণ এবং রাধা চরিত্র চিত্রণে এঁদের মধ্যে মিল অমিল অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই দৃষ্টিগোচর হয়।
সময়ের দিক থেকে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস উভয়েই ষোল শতকের কবি। অর্থাৎ উভয়ই চৈতন্য উত্তর কবি। তাই এঁদের কাব্যে চৈতন্য প্রভাব যেমন লক্ষ করা যায় তেমনি বৈচিত্র্যও দেখা যায়। ভাষার দিক থেকে গোবিন্দ দাস ও জ্ঞান দাসের কাব্যের মধ্যে মিল অমিল দু’টিই লক্ষ করা যায়। গোবিন্দ দাস প্রায় সাত শতকের মত পদ রচনা করেন। তাঁর সাত শত পদের মধ্যে বেশি সংখ্যক পদই ব্রজবুলি ভাষায় রচিত। বাংলায় রচিত পদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু জ্ঞান দাসের রচিত পদের মধ্যে বাংলায় রচিত পদের সংখ্যাই বেশি। বাংলায় তুলনায় ব্রজবুলিতে রচিত পদে তৎসম শব্দের প্রয়োগ বেশি দেখা যায় কিন্তু জ্ঞানদাসের পদে অর্ধতৎসম ও তদ্ভব শব্দের প্রয়োগ বেশি দেখা যায়। ফলে জ্ঞানদাসের পদ হয়ে উঠেছে সহজ সরল। অপর পক্ষে গোবিন্দ দাসের পদ হয়ে উঠেছে কারুকার্যময়।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে জ্ঞানদাস চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য। তিনি যে ভাবে তপস্বিনী রাধার মূর্তিটি নিরাভরণ ও নিরলঙ্কার ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন তা থেকে চণ্ডীদাসের রাধাকে পৃথক করে চেনা যায় না। নায়িকার রূপবর্ণন, অতৃপ্ত প্রণয়াকাঙখার তীব্রজ্বালা, মিলনের জন্য ব্যাকুলতা, মিলনের গভীর উল্লাস এবং বিরহের মর্মস্পর্শী আর্তি, জ্ঞানদাস চণ্ডীদাসের মতই ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন-
“রূপলাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে
পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বান্দে।।”
রাধার এরূপ ব্যাকুলতা আমরা গোবিন্দ দাসের পদে লক্ষ করি না। কারণ; গোবিন্দ দাসের রাধা বৈষ্ণব তত্ত্বেরই জীবন্তরূপ। রূপ বর্ণনায় জ্ঞানদাস বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। রূপ বর্ণনায় এরূপ কৃতিত্ব অন্যান্য পদকরতার মধ্যে লক্ষ করা যায় না। ‘এক অঙ্গে এতরূপ নয়নে না ধরে’ রাধার রূপ বর্ণনায় তাঁর একটি অনন্য পদ। এই পদটি ছাড়াও অন্যান্য পদ তাঁর রূপ বর্ণনার কৃতিত্ব ব্যাপকভাবে প্রকাশ করেছে। তাঁর গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদগুলোতে পাই-
সহচর অঙ্গে গোরা অঙ্গ হেলাইয়া
চলিতে না পারে যেন পড়ে মুরছিয়া।
নায়কের রূপ বর্ণনাতেও আমরা জ্ঞানদাসের মৌলিক প্রতিভার পরিচয় পাই। শ্রী কৃষ্ণের রূপ দেখে রাধা বিমোহিতা। কৃষ্ণের মনোহর রূপলাবণ্য তাঁর মনে এমন করে অঙ্কিত হয়ে গেছে যে তিনি তা নানা ভাবে বলেও শান্তি পাচ্ছেন না। যেমন-
দেইখ্যা আইলাম তারে-
সই দেইখ্যা আইলাম তারে।
এক অঙ্গে এতরূপ নয়ানে না ধরে।
এই অপরূপ রূপে মুগ্ধ রাধা তাই নিজেকে বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত হয়েছেন-
দেখিতে যে সুর উঠে কি বলিব তা
দরশ পরশ লাগি আউলাইছে গা।।
জ্ঞানদাস ছিলেন চণ্ডীদাসের মত সহজ ভাষার সহজ ভাবের কবি। কাব্যদেহের সচেতন অলঙ্করণ তাঁর পদে লক্ষ করা যায় না। যা আমরা লক্ষ করি বিদ্যাপতি ও গোবিন্দ দাসের পদে। তবে তাঁর পদাবলী একেবারে ছন্দ অলঙ্কারে বৈচিত্র্যহীন একরকম নয়। তাঁর পদাবলী স্বাভাবিক ছন্দের প্রয়োগ সফলতা লাভ করেছে। তিনি প্রধানত বাংলা পদে অক্ষরবৃত্ত এবং ব্রজবলি পদে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের প্রয়োগ করেছেন। অলঙ্কার সৃষ্টিতে জ্ঞানদাস পান্ডিত্যের পরিচয় না দিলেও জীবনের স্বভাব ধর্মের পরিচয় দিয়েছেন। বাঙালির শাশ্বত জীবনকেই তিনি তাঁর উপমা-উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কারের বিষয়ে পরিণত করেছেন।
যেমন-
উপমা-কানুর পিরীত কহিতে শুনিতে পরাণ ফাটিয়া ওঠে
শঙ্খ বণিকের করাত যেমন আসিতে যাইতে কাটে।
উৎপ্রেক্ষা-চোরের রমনী যেন ফুকরিতে নারে।
এমতি রহিয়ে পাড়া পড়সীর ডরে।।
জ্ঞানদাস যেমন চণ্ডীদাসের ভাব অনুসারী কবি ছিলেন। তেমনি গোবিন্দ দাস ছিলেন বিদ্যাপতির ভাব অনুযায়ী কবি। ষোল শতকের শেষের দিকে তিনি কাব্য চর্চা করেন। তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার বাধুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সংস্কৃত শাস্ত্রে তিনি অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করেন। ফলে এই পাণ্ডিত্যর ছাপ তাঁর কাব্যে সহজেই দৃষ্টি গোচর হয়। যা আমরা জ্ঞানদাসের পদে লক্ষ করিনা। পান্ডিত্যের কারণেই গোবিন্দ দাসের পদে ছন্দ, অলঙ্কার ও পদবিন্যাসের বৈচিত্র্য একক ও তুলনা রহিত। গৌর চন্দ্রিকা, পূর্বরাগ, মাথুর ও অভিসারের পদে গোবিন্দ দাস সবিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। তাঁর পদগুলোর প্রাণের আবেগে উজ্জ্বল। গোবিন্দ দাস বৈষ্ণব ভক্ত ছিলেন। তবে ভক্তির চেয়ে তাঁর মধ্যে কবিত্ব শক্তি ছিল প্রবল। ফলে তার পদাবলী ভক্তিগীতি না হয়ে, হয়ে উঠেছে প্রেমগীতি। তাই বলা হয়ে থাকে গোবিন্দ দাস যত বড় ভক্ত, ততবড় কবি নন। গোবিন্দ দাসের প্রকাশ ভঙ্গি ছিল অনবদ্য। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর পদাবলী রসোত্তীর্ণ হয়ে উঠে। চিত্রকল্প নির্মিতিতেও গোবিন্দদাস ছিলেন অনন্য। চিত্রকল্প নির্মাণে এ রকম দক্ষতা পদাবলী সাহিত্যে আর দেখা যায় না। রাধা ও কৃষ্ণের রূপ, রাধার অভিসার ও বিরহের যে চিত্র গোবিন্দ দাস অঙ্কন করেছেন তাতে আমাদের বাস্তব ভগবতের অনুভুতিই জাগিয়ে দেয়। রাধা ও কৃষ্ণের রূপ বর্ণনায় গোবিন্দ দাস জ্ঞানদাসের সমকক্ষ না হলেও এ ক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্ব একেবারে কম নয়। রাধা ও কৃষ্ণের রূপ বর্ণনায় গোবিন্দদাস যে ভাবে শব্দচয়ন করেছেন তা যে কোন বিচারে অনন্য।
যেমন-
১। ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণি
অবনী বহিয়া যায়।
২। নীরদ নয়নে নীর ঘন সিঞ্চনে
পুলক-মুকুল অবলম্ব।
তবে অভিসারের পদ রচনায় গোবিন্দদাস একক ও অনন্য। এ ক্ষেত্রে বৈষ্ণব পদাবলীর কোন পদকর্তাই তাঁর সাথে তুলিত হতে পারেন না। ভাবের গভীরতার সাথে শিল্প কলার এরূপ সংমিশ্রণ আর কোন কবির পদে লক্ষ করা যায় না। বাস্তবতা, তত্ত্ব ও শিল্প গোবিন্দদাসের অভিসারের পদে একাকার হয়ে গেছে। যেমন-
কন্টক গাড়ি কমল-সম পদতল
মঞ্জীর চিরহি ঝাঁপি
গাগরি বারি ঢারি করি পিছল
চলতহি অঙ্গলি চাপি।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ছন্দ ও অলঙ্কার নির্মাণে গোবিন্দদাস জ্ঞানদাসের তুলনায় সচেতন শিল্পী ছিলেন। গোবিন্দ দাসের ছন্দ ও অলঙ্কারে সংস্কৃত শাস্ত্রের প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁর স্বকীয়তা ও কম নয়। যেমন-
যাঁহা যাঁহা নিকসএ তনু তনু যোতি।
তাঁহ তাঁহা বিজুরি চমকময় হোতি।
এর ভিতর দিয়ে কবির পাণ্ডিত্য পূর্ণ শিল্পীসত্তাই উন্মোচিত হয়েছে।
বস্তুত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় জ্ঞানদাসের ও গোবিন্দদাসের স্থান স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত। কাব্য সৌন্দর্য, শিল্প ভাবনায় এবং জীবন-চেতনায় উভয়ের যেমন মিল রয়েছে তেমনি অমিলও রয়েছে। তবে উভয়ের শ্রম ও সাধনা বাংলা সাহিত্যকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। তাই মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় তাঁরা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910