
NTRCA বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের তুলনামূলক আলোচনা
বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের তুলনামূলক আলোচনা
প্রশ্ন: বৈষ্ণব পদকর্তা হিসেবে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের তুলনামূলক আলোচনা লিপিবদ্ধ কর।
আলোচনা: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় বৈষ্ণব পদাবলী এক অনন্য সৃষ্টি। ভাব, বিষয়, আঙ্গিক, জীবন-দৃষ্টি এবং কাব্যরস সৃষ্টির প্রশ্নে বৈষ্ণব পদাবলীর এক একটি পদ যেন শিল্প প্রতিমা। একটি বিশেষ তত্ত্ব এবং বক্তব্যকে ধারণ করেও বৈষ্ণব পদাবলী যথার্থ শিল্পগুণ থেকে বিচ্যুত হয়নি। বরং উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক সৃষ্টিতে এবং শব্দ প্রয়োগে ছন্দের ঝংকার বৈষ্ণব পদাবলী শিল্প সফল কাব্যের বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করার গৌরব অর্জন করেছে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এই গৌরবজনক ধারা যাঁদের শ্রম ও সাধনায় ঋদ্ধি লাভ করেছে তাঁদের মধ্যে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস যে কোন বিচারে শ্রেষ্ঠ। এই বিরল প্রতিভাধর দুই কবির মধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে যেমন সাদৃশ্য রয়েছে তেমনি বৈসাদৃশ্যও রয়েছে। ভাব-ভাষা, ছন্দ, অলঙ্কার এবং রাধা চরিত্র চিত্রণে এঁদের মধ্যে মিল অমিল অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবেই দৃষ্টিগোচর হয়।
বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের সাহিত্য সাধনার তুলনা করতে যেয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় যে মন্তব্য করেছেন তাই-ই সর্বাগ্রে বিবেচ্য। তিনি বলেন-
‘বিদ্যাপতির কবিতা স্বর্ণহার, চণ্ডীদাসের কবিতা রুদ্রাক্ষমালা,
বিদ্যাপতির গান মূরজবীণাসঙ্গিনী স্ত্রীকণ্ঠগীতি, চণ্ডীদাসের গান
সায়াহ্ন সমীরণের দীর্ঘ নিঃশ্বাস।”
বস্তুত বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস বৈষ্ণব মহাজনদের মধ্যে উভয়েই প্রবল প্রেরণায় ও প্রদীপ্ত প্রতিভায় রাধা-কৃষ্ণের লীলা-মাধুর্য বর্ণনা করেছেন। উভয়েই বৈষ্ণব ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে রাধা কৃষ্ণের বিভিন্ন রসের পদ রচনা করেছেন।
চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির মধ্যে ভাবের দিক থেকে এ মিল ছাড়া অন্য কোথাও মিল খোজে পাওয়া দুরুহ বিষয়। চণ্ডীদাসের কাব্যে ভাবের চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির মধ্যে ভাবের দিক থেকে এ মিল ছাড়া অন্য কোথাও মিল খোজে পাওয়া দুরুহ বিষয়। চণ্ডীদাসের কাব্যে ভাবের গভীরতা বেশি, বিদ্যাপতির পদে ভাষার মাধুর্য, ছন্দ-বিন্যাস অধিক। চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির কাব্য আলোচনা করলে মনে হয়, চণ্ডীদাসের কাব্য ভাবের রত্নাকর এবং বিদ্যাপতির কাব্য ভাষার তাজমহল, বিদ্যাপতি উচ্ছ্বসিত ও স্পন্দিত মহাসমুদ্রের উপরিভাগের মতো উর্মিচঞ্চল; চণ্ডীদাস সমুদ্রের তলদেশের ন্যায় গভীরতায় স্তব্ধ। বিদ্যাপতি আত্মবিহ্বল, চণ্ডীদাস আত্মসমাহিত। বিদ্যাপতির কাব্য যেন দেহ চণ্ডীদাসের কাব্য যেন প্রাণ। একে অপরকে অবলম্বন করে আছে। একে অপরের পরিপূরক বললেও অত্যুক্তি হয় না।
বিদ্যাপতির কাব্যের প্রধান গুণ হলো এর মানবিকতা। মানবিক রসে জারিত করেই তিনি রাধাকে নির্মাণ করেছেন রাজদরবারের নাগরিক আবহে লালীত হওয়ায় তিনি রাধার দৈহিক প্রেমের উচ্ছ্বাসকেই বড় করে দেখেছেন। তিনি নবীন যৌবনবতী কিশোরী রাধার বয়ঃসন্ধি থেকে কৃষ্ণ বিরহের সুতীব্র আর্তি বর্ণনা করেছেন তাঁর কাব্যে। কিশোরী রাধার চিত্ত চঞ্চলতার চিত্র আঁকতে গিয়ে বিদ্যাপতি উচ্চারণ করেন-
“বচনক চতুরী লহু লহু হাস।
ধরণীয়ে চাঁদ করল পরগাস।।
মুকুর লই অব করত সিঙ্গার।
সখী পুছই কৈছে সুরত বিহার।।”
রাধার শরীরের অপূর্বরূপ বর্ণনাতেও বিদ্যাপতি অনন্য। তিনি রাধা চরিত্র কল্পনায় অপূর্ব কবিত্ব এবং বাস্তবতার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। কামকলায় অনভিজ্ঞ বালিকা রাধাকে তিনি পরিপূর্ণ নায়িকায় রূপান্তর করেছেন। মোটকথা বিদ্যাপতির রাধা কল্পনায় ভক্তি রসের স্থান সামান্যই-তাঁর অভিসার, তাঁর বিরহ সবই বাস্তব নারীর সঙ্গত আচরণ। বাস্তব নারীর মতই তাকে উচ্চারণ করতে শুনি-
“এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।”
তবে বিদ্যাপতি রাধা বিরহে ব্যাকুল হলেও আধ্যাত্নিক তন্ময়তায় সমাহিত নয়, বরং তা যুবতী নারীর প্রেমচঞ্চল, বিরহক্লিষ্ট আচরণের প্রতিচ্ছবি। এ কারণেই দেখা যায় বিদ্যাপতির রাধা যতটুকু দেহ সবর্স্ব, হৃদয় সম্পদে ততটুকু ঐশ্বর্যশীল নয়।
অপরদিকে চণ্ডীদাসের রাধা সম্পূর্ণ বিপরীত প্রান্তে অবস্থিত। এর কারণ, চণ্ডীদাসের জীবন-চেতনা ও কবি মানস। বিদ্যাপতির ন্যায় চণ্ডীদাস রাজসভার কবি ছিলেন না। অগাধ পাণ্ডিত্যের ঐশ্বর্যও তাঁর ছিল না। তিনি ছিলেন একটি গ্রাম্য মন্দিরের পূজারী। তাই বিদ্যাপতির মতো নাগরিক রুচি, জ্ঞান ও বৈদগ্ধ্য তিনি অর্জন করতে পারেননি। তিনি ছিলেন সহজ-ভাষার এবং সহজ ভাবের কবি। এসব কারণে তাঁর কাব্যের রাধায় দেখি ভক্তিরসের প্রাবল্য। রাধা প্রেম আকুলতা ও বিরহকাতরতার প্রকাশভঙ্গীতেও সরল নিরাভরণ। চণ্ডীদাসের একটি পদে পাই-
“সই কে বলে পিরীতি ভালো
হাসিতে হাসিতে পিরীতি করিয়া
কান্দিতে জনম গেল।”
চণ্ডীদাস রাধাকে কৃষ্ণ প্রেমে আত্নহারারূপে দেখিয়েছেন। কৃষ্ণের প্রেম লাভ করার জন্য চণ্ডীদাসের রাধার মধ্যে সুক্ষ্ম কোন কৌশল নেই। অভিসারের যাওয়ার আগে অনুশীলন করার মত সচেতন নাগরিক বৃদ্ধিও তাঁর নেই। কৃষ্ণকে লাভ করার জন্য অকৃত্রিম গভীর প্রেমই তাঁর সম্বল। যে কোন কিছুর বিনিময়ে সে কৃষ্ণকে চায়। সে কৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য পরকে আপন আবার আপনকে পর করেছে। তবে চণ্ডীদাসের রাধার কৃষ্ণকে পেয়েও সুখ নেই। মিলনের মধ্যেও সে বোধ করে বিরহের অসীম যাতনা। আগত বিরহের কল্পনাতেই সে কাতর-
“এমন পিরীতি কভু দেখি নাই শুনি
পরাণে পরাণ বান্ধা আপনা-আপনি।
দুহুঁ কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।
আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।।”
বিদ্যাপতির রাধার সঙ্গে চণ্ডীদাসের রাধার এখানেই একটি পার্থক্য সূচিত হয়েছে। বৈষ্ণব ভক্তিতত্ত্বের সার্থক স্বরূপ হলো চণ্ডীদাসের রাধা। বিরহ বৈষ্ণব তত্ত্বের সারকথা। আর চণ্ডীদাস রাধা চরিত্র অঙ্কনে মিলনের আনন্দের চেয়ে বিরহের বেদনাকেই তীব্র করে তুলেছেন।
চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির তুলনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
“বিদ্যাপতির সুখের কবি, চণ্ডীদাস দুখের কবি। বিদ্যাপতি বিরহে
কাতর হইয়া পড়েন, চণ্ডীদাসের মিলনেও সুখ নাই। চণ্ডীদাসের
জগতের মধ্যে প্রেমকে সার বলিয়া জানিয়েছেন, চণ্ডীদাস প্রেমকেই
জগৎ বলিয়া জানিয়েছেন। বিদ্যাপতি ভোগ করিবার কবি, চণ্ডীদাস
সহ্য করিবার কবি।”
বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের এই পার্থক্য তাঁদের কবি মানসগত এবং তা তাঁদের জীবন চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিহিত। চণ্ডীদাসের সরলতা, আন্তরিকতা ও ভাবগভীরতা যেমন বিদ্যাপতির মধ্যে পাওয়া যায় না, তেমনি আবার বিদ্যাপতির সুক্ষ্মশিল্পচাতুর্য ও অপূর্ব সঙ্গীত লহরী চণ্ডীদাসের মধ্যে পাওয়া যায় না। তাই পূর্ণতার দিক থেকে উভয় তুল্য মযার্দার অধিকারী।
বস্তুত; ভাব ও শিল্পীশৈলীর প্রশ্নে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের কবিতা শুধু বাংলা সাহিত্যের নয় সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যের ধারায় এক অনন্য সম্পদ।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910