
NTRCA গীতিকবিতা এবং গীতিকবিতা হিসাবে বৈষ্ণব পদাবলীর সার্থকতা
গীতিকবিতা এবং গীতিকবিতা হিসাবে বৈষ্ণব পদাবলীর সার্থকতা
প্রশ্ন : গীতিকবিতা কাকে বলে? গীতিকবিতা হিসাবে বৈষ্ণব পদাবলীর সার্থকতা বিচার কর।
আলোচনা: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় বৈষ্ণব পদাবলী এক অনন্য সৃষ্টি। ভাব, বিষয়, আঙ্গিক, জীবন দৃষ্টি এবং কাব্য-রস সৃষ্টির প্রশ্নে বৈষ্ণব পদাবলীর একেকটি পদ যেন নিটোল শিল্প প্রতিমা। একটি বিশেষ তত্ত্ব এবং বক্তব্যকে ধারণ করেও বৈষ্ণব পদাবলী যথার্থ শিল্প গুণ থেকে বিচ্যুৎ হয় নি। বরং উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক প্রভৃতি অলঙ্কার সৃষ্টিতে এবং শব্দ প্রয়োগে, ছন্দের ঝঙ্কারে বৈষ্ণব পদাবলী শিল্প সফল কাব্যের বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করার গৌরব অর্জন করেছে। তবে মধ্যযুগের এই সমস্ত পদাবলী গীতিকবিতা কি না এই বিষয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মত বিরোধ রয়েছে। আমরা আলোচ্য নিবন্ধে পন্ডিতদের মতামতের আলোকে এই প্রশ্নের মিমাংসার প্রয়াস পাব।
ইংরেজি ‘লিরিক’ Lyric শব্দের প্রতিশব্দ হিসাবেই বাংলা ‘গীতিকবিতা’ শব্দটির ব্যবহার। গ্রিক লেখকরা Lyre বা বীণাবাদনের সঙ্গে পরিবেশিত গানকে লিরিক বলতো, কিন্তু বর্তমানে এর সঙ্গে বীণা বা কোনো বাদ্যযন্ত্রের অপরিহার্য সম্পর্ক নেই। ড. শুদ্ধস্বত্ত্ব বসু গীতিকবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন-
“যে কবিতায় পাঠকের চিত্তে দোলা লাগে, আনন্দের হিল্লোল জাগে, অনিবর্চনীয়
এক আবেগে তাঁর মানসলোকে বেপথু কাতর হয়-সেই কবিতাকে গীতিকবিতা বলে।”
শ্রীশচন্দ্র দাস তাঁর ‘সাহিত্য সন্দর্শন’ গ্রন্থে গীতিকবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন-
“যে কবিতায় কবির আত্মানুভূতি বা একান্ত ব্যক্তিগত বাসনা-কামনা ও
আনন্দ-বেদনা তাঁহার প্রাণের অন্ত:স্তল হইতে আবেগ-কম্পিত সুরে অখণ্ড
ভাবমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে, তাহাকেই গীতিকবিতা বলে।”
গীতিকবিতার বিচার করতে হলে ‘গীতি’ শব্দটিকে বিশেষ অর্থে মূল্যায়ন প্রয়োজন। কবির সূক্ষ্ম হৃদয়াবেগের নিপুণ ও ধ্বনিমাধুর্যময় প্রকাশ ঘটে ‘গীতি’ শব্দটির সাহায্যে। গীতিকবিতায় আত্মগত কবি যদি আপেক্ষিক নৈর্ব্যক্তিকতার পরিচয় দিতে না পারেন তা হলে তাঁর প্রকাশ রীতি সফল হয় না। কবিমন যদি সম্পূর্ণ অসংযত হয়, তা হলে আবেগ প্রকাশে তাঁর কোন রকম সংকোচ থাকে না।
গীতিকবিতায় ভাবগত ঐক্য অটুট থাকতে হয়। যদিও গীতীকবিতায় কবি ভাবগত ঐক্য সৃষ্টিতে কোন সমস্যায় পড়েন না। সমস্যা সৃষ্টি হয়, পুরাতন ভাবকে নতুন রূপদানে। কীভাবে এই গতানুগতিকতা দূর করা যায় তা, বলা কঠিন। তবে ভাষা, ছন্দস্পদ, উপমার স্বকীয়তা ও নতুনত্ব এগুলোই ভাবকে নতুন রূপ দেয়। গ্রন্থিবহুল ভাবকে প্রকাশের সৌষম্যে নিয়ে আসাই প্রতিভার কাজ। কবিতা যখন একটি সরল রেখায় এগোয় তখন তার অর্থঘনত্ব নির্ভর করে ভাবের অনন্যতা ও ইঙ্গিতময়তার ওপর। আর এই দিক লক্ষ রেখেই ড. উজ্জ্বল কুমার মজুমদার গীতিকবিতহার স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন-
‘লিরিক বা গীতিকাব্য হল বিষয়গতভাবে ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ, আর রূপগতভাবে সংগীতের গঠনাত্মক ভঙ্গি বা ধ্বনিসুরের সামঞ্জস্যময় এবং চিত্রময় বা চিত্রকল্পময় প্রকাশ ‘
গীতিকবিতা একক ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনায় পরিপূর্ণ। কবি এখানে আত্মমুগ্ধ, তাই সমস্ত কবিতা জুড়ে তাঁর প্রাণের স্পন্দন শোনা যায়। কবির ব্যক্তি অনুভূতি বা বিশিষ্ট মানসিকতা একে স্নিগ্ধ কান্তি দান করে। তাঁর চরিত্রের কোমনীয়তা বা মাধুর্য দৃঢ়তা এতে প্রতিফলিত হয়। তাই এক কথায় গীতিকবিতাকে বলা যায় কবির আত্ম-মুকুর।
বৈষ্ণব কবিতা গীতি কবিতা হিসেবে কতটুকু সার্থক তা আমরা গীতিকবিতার উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই বিচার করব। বৈষ্ণব কবিতা কী পরিমাণে গীতি কবিতা এ বিষয় বিচার কালে মনে রাখতে হবে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা আশ্রয় করে রচিত এ পদগুলো আমাদের এক অলৌকিক জগতের স্বর্ণদুয়ারে পৌঁছে দেয়। যেখানে ভগবান শান্ত, সখ, দাস্য বাৎসল্য ও মধুর রসে ভজনা করে ভক্ত আপনার জীবনের মধূর পরিণতিকে ঘনীভূত করে তোলে। পদাবলীর কবিরা রাধাকৃষ্ণের প্রেমের প্রতীকে ভক্ত ভগবানের প্রেমরূপী পদ রচনা করেন। কিন্তু রচনাকালে কবিদেরকে বৈষ্ণব তত্ত্বের অনুশাসনকে মেনে চলতে হয় বলে স্বাধীন কল্পনার অবকাশ নেই। তাছাড়া বৈষ্ণব কবিরা একটা গোষ্ঠীগত চেতনায় উদ্বুদ্ধ। কিন্তু বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদানের পদাবলীতে ভণিতা না থাকলেও স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য ও কবি প্রকৃতিকে চিনে নিতে কষ্ট হয় না। তাছাড়া বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের রাধা চরিত্রের পাথর্কের কারণে উভয় কবিকে পৃথকভাবে চিনা যায়।
আধুনিক গীতিকবিতার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ধমর্মূলক কবিতা গীতিকবিতা না হয়ে উঠারই কথা। কিন্তু ধর্মের আবেদনকে পশ্চাতে ফেলে কবির একান্ত ব্যক্তিগত আকুলতা উপলব্ধি স্পষ্ট হলে তা গীতিকবিতার মূল্য পায়। কারণ, ধর্মীয় উপলব্ধি আর কবির একান্ত উপলব্ধির মধ্যে তেমন কোনো পাথর্ক্য নেই।
বৈষ্ণব কবিরা ভক্ত ছিলেন, তাদের আচরিত ধর্মতত্ত্বও ছিল কিন্তু তাঁদের রচনায় ধর্ম মুখ্য হয়ে উঠে নি। বরং বৈষ্ণব কবিদের রচনায় আবেগ অনুভূতি আকুলতা যেভাবে সুরাবদ্ধ হয়েছে তা অনির্বচনীয়। এ কবিতাগুলো তাই কেবল বাংলা সাহিত্যের নয় বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
বৈষ্ণব কবিতা ভাবের দিক থেকে গীতিকবিতা ঠিকই, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে একে গীতিকবিতা বলা সমীচিন নয়। কেননা, এ কবিতা পাঠের মাধ্যমে আমরা যথার্থভাবে রসাস্বাদন করতে পারি না। গায়ক যখন সুর ও তাল সহযোগে এ পদগুলোকে উচ্চারণ কের তখনই এর পরিপূর্ণ রস আস্বাদিত হয়। তাই বলা যায় গীতিকবিতা হিসেবে পদাবলী অর্ধসৃষ্টি, পূর্ণতা পায় সুরের মাধ্যমে।
গীতিকবিতার অভীষ্ট লক্ষ্য মানবরস। পদাবলীর যে মানবরস তা ধর্মীয় রসে জারিত। ফলে মানব রস সেখানে কৃত্রিম। তাছাড়া পদাবলী ইহজগতকে বিস্মৃতি হয়ে একটি বিশিষ্ট্য অধ্যাত্ব জগতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। গীতিকবিতার বিষয় লৌকিক জগত।
আধুনিক গীতিকবিতায় কবিতার নয়টি রসই প্রয়োগযোগ্য। কিন্তু পদাবলীতে পাঁচটির বেশি রস প্রয়োগ করা যায় না। এর মধ্যে মধুর রসই অধিক প্রয়োগযোগ্য। পদাবলীতে যতক্ষণ ভক্ত ভগবানে লীন না হচ্ছে ততক্ষণে কেবল ছুটে চলা, কেবলই বেদনা। আধুনিক গীতিকবিতা কেবল মিলন আকাঙ্ক্ষায় ছুটে চলে কিন্তু পদাবলীর ভক্ত ভগবানে মিলিত হয়েই শান্ত হয়।
আধুনিক গীতিকবিতার ভাব ও বিষয় বৈচিত্র্য অসীম। তাই এর ছন্দও বিচিত্র। আধুনিক গীতিকবিতার ধ্বনি তার প্রধান বহু ছন্দ রয়েছে; যেমন পয়ার, মহাপ্রয়ার, সমিল অমিত্রাক্ষর ইত্যাদি। কিন্তু পদাবলীতে ছন্দের তেমন বৈচিত্র্য নেই। কারণ সুরের এগুলো সুরের দিক লক্ষ রেখে রচিত। শব্দ প্রয়োগেও আধুনিক গীতিকবিতা সচেতন ও স্বাধীন। কারণ, শব্দের মাধ্যমেই রসের ব্যঞ্জনা সার্থক হয়। অপর দিকে পদাবলীর কবিরা শব্দপ্রয়োগে স্বাধীন নয়।
বৈষ্ণব কবিতা রচতি হয়েছিল মূলত কীর্তনের জন্য। সেহেতু এগুলো সুর ও সঙ্গীতের আশ্রয় চায়। কিন্তু আধুনিক গীতিকবিতা অবিমিশ্রভাবে পাঠযোগ্য। পুরাতন গীতিকবিতা তার সৃষ্টিলগ্নে সুর তালযোগ্যে গীত হতো। বৈষ্ণব কবিতা পুরাতন গীতিকবিতার লক্ষনাক্রান্ত তাই বলা যায় সীমিত আকারে হলেও বৈষ্ণব কবিতা আধুনিক গীতি কবিতার কিছু বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করে। এ প্রসঙ্গে মুহম্মদ আব্দুল হাই ও ড. আহম্মদ শরীফ- এর বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে-
‘পদাবলী অবশ্য এক বিশেষ সীমিত অর্থেই গীতি কবিতা। আধুনিক সংজ্ঞায়
গীতি কবিতা কবির আত্নগত ভাবোচ্ছ্বাসের অভিব্যক্তি।------তবু মানুষের
রচনা ব্যক্তিক অনুভূতির স্পর্শ বিহীন হতে পারে না বলেই উৎকৃষ্ট পদ উৎকৃষ্ট
গীতি কবিতা হয়ে উঠেছে।
মোটকথা, উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলতে পারি যে, আধুনিক গীতিকবিতার পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য পদাবলতে নেই। তবে আধুনিক গীতিকবিতার উল্লেকযোগ্য বৈশিষ্ট্য পদাবলীতে রয়েছে। তাই পদাবলীকে আমরা সীমিত আকারে গীতিকবিতার অভিধায় অভিহিত করতে পারি।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910