
NTRCA বাংলা পদাবলী সাহিত্যের প্রধান প্রধান কবিদের পরিচয়
বাংলা পদাবলী সাহিত্যের প্রধান প্রধান কবিদের পরিচয়
প্রশ্ন: বাংলা পদাবলী সাহিত্যের প্রধান প্রধান কবিদের পরিচয় দাও।
অথবা, মধ্যযুগের বাংলা পদাবলী সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
আলোচনা: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ফসল বৈষ্ণব পদাবলী। ভাবের গভীরতায় ও স্বাতন্ত্র্যে, বিষয় বিন্যাসে, ভাষা ও ছন্দের শ্রুতিময়তায়, শিল্পগুণের অনন্যতায়, বৈষ্ণব পদাবলী শুধু মধ্যযুগে নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভাব কল্পনাকে আশ্রয় করে এ সাহিত্য ধারার বিকাশ ঘটলেও মানবীয় ও বাস্তব জীবন-চেতনাকে উপেক্ষা করতে পারে নি। ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে মানব-হৃদয়ের আর্তি ও হাহাকার সব সময় সক্রিয় থেকেছে।
চতুর্দশ শতকের শেষভাগ থেকে শুরু করে উনিশ শতক পর্যন্ত পদাবলী রচনা চলে। এই সুদীর্ঘ সময় ধরে পদাবলী সাহিত্য রচিত হওয়ার ফলে এটি একটি সমৃদ্ধশীল ধারা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সব কবির রচনায় পরিচয় না পাওয়া গেলেও শতাধিক কবি যে, পদাবলী সাহিত্য রচনা করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিচে প্রধান প্রধান কবিদের সাহিত্য কীর্তির পরিচয় দেওয়া হল:
বিদ্যাপতি : বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে বিদ্যাপতি এক অনন্য কবি ব্যক্তিত্ব। ছন্দের কারুকার্যে, ভাষার চমৎকারিত্বে তাঁর পদাবলী স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত। বিদ্যাপতি চৌদ্দ পনের শতকে আর্বিভূত হয়ে ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি ছিলেন মিথিলার রাজসভার কবি। এই জন্য তাঁকে ‘মৈথিল কোকিল’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বিভিন্ন ভাষায় ও বিদ্যায় তিনি ছিলেন সুপন্ডিত। নিজ ভাষা মৈথিলি ছাড়াও তিনি বাংলা, প্রাকৃত এবং সংস্কৃতে গ্রন্থ রচনা করেন।
বিদ্যাপতির কাব্যের প্রধান গুণ হলো এর মানবিকতা। মানবিক রসেরঞ্জিত করেই তিনি রাধাকে নির্মাণ করেছেন। রাজদরবারের মানবিক আবহে লালিত হওয়ায় তিনি রাধার দৈহিক প্রেমের উচ্ছ্বাসকেই বড় করে দেখেছেন। তিনি নবীন যৌবনাবতী কিশোরী রাধার বয়ঃসন্ধি থেকে কৃষ্ণ বিরহে কাতর রাধার বর্ণনা করেছেন তাঁর কাব্যে। কাব্যে অলঙ্কার ব্যবহারে বিদ্যাপতি ছিলেন অনন্য।
চণ্ডীদাস : বৈষ্ণব পদাবলীর ধারায় বিদ্যাপতির ন্যায় চণ্ডীদাসও বিশিষ্ট কবি ব্যক্তিত্ব। তিনি চৈতন্য পূর্ববর্তী কবি ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে একাধিক চণ্ডীদাসের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস এবং দীন চণ্ডীদাস এই তিনটি নামই বেশি আলোচিত। তবে সাধারণ পাঠকের কাছে একজন চণ্ডীদাসেরই অস্তিত্ব স্বীকার্য। তারা চণ্ডীদাসের পদাবলীর ভাব ও ভাষা ও শিল্প সৌন্দর্যে মুগ্ধ।
চণ্ডীদাস সহজ ভাষার সহজ ভাবের কবি। এই গুণের কারণেই তিনি বাংলার প্রবীণ কবিদের মধ্যে প্রধান। আর এ কারণেই তিনি সকল বাঙালির কাছে সমান জনপ্রিয়। তাছাড়া তাঁর কাব্যে দেবত্ববাদের চেয়ে মানবিকতাই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। তিনি জানতেন “সবার উপরে মানুষ সত্য-তাহার উপরে নাই।” আর এ বোধ থেকেই তিনি রাধাকে নির্মাণ করেছেন। বিদ্যাপতির কবিতার ন্যায় চণ্ডীদাসের কবিতা অলঙ্কারপূর্ণ নয়। চণ্ডীদাস সংষ্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রকে অনুসরণ করে কাব্য রচনা করেননি। তাঁর কাব্যের উপমা অলঙ্কারের বিষয় সংগৃহীত হয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক চলমান জীবন থেকে। ফলে চেষ্টাকৃত কবিত্ব প্রকাশের প্রয়াস তাঁর কাব্যে লক্ষ করা যায় না।
জ্ঞানদাস : বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের ধারায় ভাব ও ভাষার প্রশ্নে চণ্ডীদাসের সমগুণ সম্পন্ন কবি জ্ঞানদাস। ১৫৩০ খ্রি. থেকে ১৬১৫ খ্রি. মধ্যে তিনি বর্তমান ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। ড. দীনেশচন্দ্রের মতে তিনি বীরভূম জেলার ইন্দ্রানী থানার কাঁকড়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ। জ্ঞান দাসের বংশ ‘মঙ্গল বংশ’ নামে পরিচিত। নিত্যানন্দ প্রভূর পত্নী জাহ্নবী দেবী ছিলেন দীক্ষাগুরু। কাঁকড়ায় জ্ঞানদাসের নামে একটি মঠ আছে। জ্ঞানদাস ছিলেন চিরকুমার। সংসারের প্রতি তিনি ছিলেন চরম উদাসীন। ফলে দার গ্রহণে তিনি ছিলেন বিমুখ।
জ্ঞানদাস ব্রজবুলি ও বাংলায় উভয় ভাষাতেই পদ রচনা করেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ১৯৪টি পদের উল্লেখ করেছেন। চণ্ডীদাসের ন্যায় জ্ঞানদাসের পদে অলঙ্কারের বাহুল্য নেই। তিনি কাব্যের বাণীকে সাধারণ নরনারীর হৃদয়ের চিরন্তন বাণীতে রূপান্তরিত করেছেন। যেমন-
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
অনলে পুড়িয়া গেল
অমিয়া সাগরে সিনান করিতে
সকলি গরল গেল।।”
গোবিন্দ দাস : পদাবলী সাহিত্যের আরেকজন উল্লেখযোগ্য কবি গোবিন্দদাস। তিনি বর্ধমান জেলার শ্রীখণ্ড নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন বলে জানা যায়। তাঁর জীবনকাল ১৫৩৫ থেকে ১৬১৩ খৃ: মধ্যে বলে অনুমান করা হয়। কবির পিতার নাম ছিল চিরঞ্জীব সেন এবং মাতার নাম সুনন্দা। চণ্ডীদাসের ন্যায় গোবিন্দ দাস নামেও একাধিক কবির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কারো কারো মতে এই সংখ্যা ১২/১৩ জন হবে। তবে আমাদের আলোচ্য গোবিন্দ দাস কবিরাজই তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। গোবিন্দ দাসের ভণিতায় ৪৫৮টি পদ আছে বলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মত প্রকাশ করেছেন। গোবিন্দ দাস ব্রজবুলি ভাষায় কাব্য রচনা করেছেন। ছন্দের ঝঙ্কারে এবং অনুপ্রাসের শ্রুতিমাধুর্যে তাঁর পদাবলী বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ স্থান করে আছে। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে-
যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তনু জ্যোতি
তাঁহা তাঁহা বিজরি চমকময় হোতি।।
অলঙ্কার ব্যবহারেও গোবিন্দ দাস ছিলেন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সংষ্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্র অনুসারী এবং বিদ্যাপতি প্রভাবিত। কবি জয়দেবের প্রভাব ও তাঁর কাব্যে দুর্লক্ষ্য নয়। বিদ্যাপতির ব্রজবুলি তাঁর হাতে এসে চরম উৎকর্ষ লাভ করে।
বৈষ্ণব পদাবলীর অপ্রধান কবি : বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস ছাড়াও অজস্র কবি বৈষ্ণব পদাবলী রচনা করেছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে কেইউ উল্লিখিত চারজনের সমতুল্য ছিলেন না। অপ্রধান বৈষ্ণব কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-বাসুদেব ঘোষ, বৃন্দাবন দাস, মুরারি গুপ্ত, প্রেমদাস, রাধামোহন, বলরাম দাস, যাদবেন্দ্র দাস, ঘনশ্যাম, কবি রঞ্জন, কবি বল্লভ, গোপাল দাস, অনন্ত দাস প্রমুখ। এরা সকলেই চৈতন্য পরবর্তী এবং বৈষ্ণবভক্ত কবি ছিলেন। পদে ভক্তিভাবের সাথে শিল্প রসের মিশ্রণ ঘটেনি। বৈষ্ণব ভক্তছাড়া অনেক মুসলমান কবিও এ ধারার সাহিত্য রচনা করেন। মুসলমান কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদকর্তা হলেন-শাহ আকবর, নাসির মাহমুদ, সৈয়দ আইনুদ্দিন, মোহাম্মদ, ফকির হাবিব, সৈয়দ মর্তুজা, সৈয়দ সুলতান, শেখ কবির, আলাওল, সালেহ বেগ, আলি রাজা, মীল ফয়জুল্লাহ প্রমুখ। এঁরা সকলেই কোন না কোন ভাবে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তবে আলাওল, সৈয়দ মর্তুজা, সৈয়দ সুলতান, স্বীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতেই সক্ষম হয়েছেন।
বস্তুত বৈষ্ণব পদাবলী মধ্যযুগে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। ভাব, ভাষা ও বিস্তারের প্রশ্নে কেবল আধুনিক যুগের সাহিত্যই এর সাথে তুলিত হতে পারে। বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার ও বিকাশের ক্ষেত্রে বৈষ্ণব কবিদেরই অবদান সবচেয়ে বেশি।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910