
NTRCA মধ্যযুগের বাংলা অনুবাদ সাহিত্য
মধ্যযুগের বাংলা অনুবাদ সাহিত্য
প্রশ্ন: বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তর: অনুবাদ মৌলিক রচনা নয়। এটি মৌলিক রচনার অনুকরণ। অনুবাদের মাধ্যমে এক ভাষার শিল্প সম্পদ অন্য ভাষায় রূপান্তর করা হয়। সাধারণত সমৃদ্ধতর শিল্পরীতির ভাষান্তর হয়ে থাকে। বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ কর্ম সম্বন্ধেও এ মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। কেননা, যে যুগে বাংলা অনুবাদ কর্ম শুরু হয় সে যুগে সংষ্কৃত, আরবি, ফারসি খুবই উন্নত সাহিত্য সম্পদের অধিকারী ছিল। আধুনিক যুগে অনুবাদ আক্ষরিক হয়, কিন্তু অতীতে ভাবানুবাদ হতো বেশি। মধ্যযুগের অনুবাদ কর্মের বিষয় বৈচিত্র্য বিচার করলে পৌরাণিক কাব্য , শোককাব্য, নাটক ও ধর্মগ্রন্থ জাতীয় সাহিত্য কর্মের পরিচয় পাওয়া যায়। ভাষার উপর ভিত্তি করে মধ্যযুগের বাংলা অনুবাদ সাহিত্যকে সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, হিন্দি এই কয়টি ধারায় বিভক্ত করা যেতে পারে।
সংস্কৃত ধারা
রামায়ণ : রামায়ণ, মহাভারত ও ভগবত এই তিনটি গ্রন্থকে আশ্রয় করেই অনুবাদ সাহিত্যের সংস্কৃত ধারাটি বিস্তৃতি লাভ করেছে। এগুলো হলো একাধারে মহাকাব্য ও ধর্মকাব্য। বাল্মীকি রচিত রামায়ণ ও ব্যাস রচিত মহাভারত যথার্থ অর্থেই মহাকাব্য।
বাংলায় রামায়ণ অনুবাদের মূল ভিত্তি ছিল-বাল্মীকি রামায়ণ, অদ্ভুত রামায়ণ, যোগব্যশিষ্ট রামায়ণ ইত্যাদি। বাংলায় রামায়ণ অনুবাদের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ কবি হলেন কৃত্তিবাস। তিনি পনের শতকের কবি ছিলেন। প্রধানত বাল্মীকি রামায়ণ অনুসরণ করেই তিনি সপ্তকাণ্ড রামায়ণ রচনা করেন। স্থান বিশেষে অধ্যাত্মা রামায়ণ, জৈমিনি ভারত প্রভৃতি গ্রন্থ থেকেও সাহায্য নিয়েছেন। সামগ্রিক ভাবে অনুবাদে তিনি বাল্মীকি রামায়ণের মহাকাব্যোচিত ঔদার্য, গাম্ভীর্য, বিশালতা ও গভীরতা রক্ষা করতে পারেন নি। বরং এর পরিবর্তে বাঙালি স্বভাবের আবেগ প্রবণতা, ভক্তিভাব, গার্হস্থ্যধর্ম ও প্রাঞ্জলতা আনায়ন করেছেন।
কৃত্তিবাস ছাড়া আরো অনেক কবি রামায়ণ অনুবাদ করেছেন। তবে তাঁরা কেউ কৃত্তিবাসকে অতিক্রম করতে পারেন নি। কৃত্তিবাস ছাড়া আর যাঁরা রামায়ণ রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-অদ্ভুদ আচার্য, চন্দ্রাবতী, দ্বিজ গঙ্গানারায়ণ ঘনশ্যাম দাস, ভবানীদাস, দ্বিজ লক্ষ্নণ, রামশঙ্কর,যষ্ঠীবর সেন, রামানন্দ ঘোষ প্রমুখ। তাঁরা প্রায় সবাই কৃত্তিবাসকে অনুসরণ করেছেন।
মহাভারত: বাংলায় মহাভারত অনুবাদের উৎস ছিল ব্যাসকৃত মহাভারত, জৈমিনি ভারত ও অন্যান্য পুরাণ কথা। বাংলায় মহাভারত অনুবাদের প্রথম কবি ছিলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর। তবে কেউ কেউ শ্রীকরনন্দীর কথাও বলেন। কবীন্দ্র ও শ্রীকরনন্দী অশ্বমেধ পূর্বের উপর প্রাধান্য দিয়ে মহাভারতের অনুবাদ করেন। কবীন্দ্র পরমেশ্বরের অনুদিত মহাভারত ‘পরাগলী মহাভারত’ ৈএবং শ্রীকরণন্দীর মহাভারত ‘ছুটিখানী মহাভারত’ নামে পরিচিত। তবে কাশীরাম দাশ রচিত মহাভারতই অধিক শিল্প সাফল্য লাভ করে এবং বাঙালির চিত্ত জয় বরতে সমর্থ হয়। এ ছাড়াও অন্যান্য কবিগণ মহাভারত অনুবাদ করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রামচন্দ্র খান। দ্বিজ রঘুনাথ, দ্বিজ অভিরাম, নিত্যানন্দ ঘোষ, কৃষ্ণরাম, প্রমুখ।
ভাগবত অনুবাদ : ভগবত পুরাণ বিষ্ণু পুরান, হরিবংশ প্রভৃতি গ্রন্থ ও উৎস অবলম্বনে বাংলায় ভাগবতের অনুবাদ কর্ম সাধিত হয়। ভাগবতের প্রথম অনুবাদ করে ছিলেন মালাধর বসু, গৌড়ের সুলতান বারবক শাহের আমলে। তাঁর অনুদিত গ্রন্থর নাম শ্রীকৃষ্ণবিজয়। ভাগবতের দশম ও একাদশ স্কন্ধের অনুবাদ এটি। মালাধর বসু আরো দু’টি সংষ্কৃত গ্রন্থ থেকে উপাদান নিয়ে ছিলেন। এ দু’টি গ্রন্থ হলো হরিবংশ ও বিষ্ণু পুরাণ। তাছাড়া কাব্যের স্থানে স্থানে কবির স্বাধীন কল্পনারও পরিচয় পাওয়া যায়। মালাধর বসু ছাড়া আরো যাঁরা ভাগবত অনুবাদ করে ছিলেন তাঁরা হলেন-কৃষ্ণদাস, দ্বিজ হরিদাস, কবি শেখর, দ্বিজ মাধব প্রমুখ।
উল্লিখিত সাহিত্য ধারা ছাড়া আরও কিছু সংষ্কৃত গ্রন্থ বাংলায় অনুদিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো-কৃষ্ণকরুণামৃত, দানলীলাচন্দ্রামৃত, গোবিন্দবিলাস, বিদ্যাসুন্দর ইত্যাদি।
আরবিধারা
আরবি ধারায় যে সমস্ত গ্রন্থ অনুদিত হয় তার অধিকাংশই ছিল ধর্মগ্রন্থ। আরবি থেকে বাংলায় অনুদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো-সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ, হেয়াত মাহমুদের আম্বিয়াবাণী, সৈয়দ নুরউদ্দিনের দাকাইকুল হকাইক এবং মুজাম্মিলের সায়াতনামা ইত্যাদি। তবে এই সমস্ত গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ সহজ ছিল না। কারণ ধর্মশাস্ত্র বাংলায় অনুবাদ করলে পাপ হবে, এ রকম একটি মিথ্যা ধারণা সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচারিত ছিল। মোল্লারা নানা ভয় ভীতি প্রদর্শন করতেন।
আরবি ধারায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুবাদ গ্রন্থ হলো, সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ। এ গ্রন্থটি কবি স’লাবার কিসাসুল আম্বিয়া থেকে অনুবাদ করেন।
বাংলা সাহিত্যে ফারসি অনুবাদের ধারাকে প্রধানত দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। এর একটি হলো রোমান্সমূলক প্রণয়োপাখ্যানের ধারা এবং অন্যটি হলো ধর্মতত্ত্ব। রোমান্সমূলক প্রণয়োপাখ্যানের মধ্যে অন্যতম গ্রন্থগুলো হলো ‘ইউসুফ-জোলেখা’, ‘সয়ফুল মূলূক বদিউজ্জামাল’, ‘সপ্তপয়কর’, ‘সিকান্দার নামা’, ‘লায়লী মজনু’ ইত্যাদি। রোমান্সমূলক প্রণয় কাব্যের মধ্যে সুফি প্রভাব আছে। ধর্মতত্ত্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো ‘নসিহত নামা’, ‘নুরনামা’, ‘তোহফা’ ইত্যাদি।
হিন্দি ধারা
আকারের দিক থেকে হিন্দি অনুবাদের ধারাটি ক্ষুদ্র হলেও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে দুরসঞ্চারি। কেননা, হিন্দি থেকে যে কয়টি গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করা হয় তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে ছিল। হিন্দি থেকে বাংলায় অনুদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো; ‘সতীয়মনা-লোর-চন্দ্রানী’, ‘পদ্মাবতী’, ‘মধুমালতী’ ও ‘মৃগাবতী’ ইত্যাদি।
মোটকথা, মধ্যযুগের অনুবাদ সাহিত্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছিল। এ জন্য মধ্যযুগের অনুবাদকদের কাছে বাংলা ও সাহিত্য ব্যাপকভাবে ঋণি।
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
+88 01713 211 910