
NTRCA College: কায়কোবাদের কাব্যে ইতিহাস চেতনার স্বরূপ
প্রসঙ্গ : কায়কোবাদের কাব্যে ইতিহাস চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ কর।
উত্তর: উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যে দুই জন শ্রেষ্ঠ মুসলিম সাহিত্যিক অবসন্ন মুসলমানের মনে নতুন জীবনের স্পন্দন সৃষ্টি করে ছিলেন তাদের মধ্যে একজন বিষাদ সিন্ধু’র কবি মীর মশাররফ হোসেন এবং অন্যজন কবি কায়কোবাদ ১৮৫৭-১৯৫২। বাংলা কবিতার এক বিরাট অংশ জুড়ে কায়কোবাদের অবদান স্থায়ী হয়ে আছে। কায়কোবাদের জীবনের এক বিরাট অংশ বিশ শতকে ব্যয় হলেও সাহিত্য সাধনায় তিনি উনিশ শতকী বৈশিষ্ট্যকে পরিত্যাগ করতে পারেন নি। বিশ শতকের তৃতীয় দশকেও তিনি কাহিনী কাব্য আর মহাকাব্য রচনায় মগ্ন ছিলেন। তবে শিল্প চেতনার প্রশ্নে কায়কোবাদ পশ্চাতপদ হলেও জীবন চেতনায় ছিলেন আধুনিক এবং ইতিহাস নিষ্ঠ। ইতিহাস অবলোকনের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক। আর এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই কায়কোবাদ তাঁর সাহিত্যে ইতিহাসের প্রয়োগ করেছেন।
প্রচলিত অর্থে কায়কোবাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি জাতীয় জীবনে ইতিহাসের সীমাহীন গুরুত্বকে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঔপনিবেসিক শাসনে শৃঙখলিত দেশে জন্ম গ্রহণ করে শৈশব থেকেই তিনি জাতীয় জীবনের সংকটকে অবলোকন করেছেন। তিনি উপলব্ধি করে ছিলেন দেশ ও জাতির সংকটে ইতিহাস এক শক্তিশালী প্রেরণাদাত্রী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এ কারণেই দেশ ও জাতির পুনজার্গরণের লক্ষ্যে তিনি ইতিহাসের শরণ নিয়ে ছিলেন। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই কায়কোবাদ ঐতিহাসিক বিষয় আশ্রয়ী কাব্য ‘মহাশ্মসান’ রচনা করেন। কায়কোবাদ শুধু ইতিহাস সচেতন কবি ছিলেন এমন নয়, তিনি একই সাথে ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মসচেতন এবং আত্ম-সন্ধানী কবি।
ঐতিহাসিক বিষয় নিয়ে রচিত কায়কোবাদের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হলো ‘মহাশ্মসান’ কাব্য। এই কাব্যের বিষয় নির্বাচনেই কায়কোবাদ মৌলিকত্ব ও স্বাতন্ত্র্যবাদিতার পরিচয় দিয়েছেন এমন নয়। বরং এ ক্ষেত্রে তাঁর সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিক ঔদার্যের পরিচয় স্পষ্ট। উনিশ শতক ছিল পুনর্জাগরণের যুগ। এ পুনজার্গরণ বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যেমন একই সাথে আসে নি, তেমনি মানসিকতার দিক থেকেও ঐক্যবদ্ধভাবে আসে নি। বরং এসেছে ভিন্ন পথে। পুনজার্গরণবাদী হিন্দু লেখকগণ ভারতবর্ষ বা বাংলা বলতে হিন্দু ভারতবর্ষ ও মুসলিম বর্জিত বাংলাদেশ বুঝতেন, পুনর্জাগরণবাদী মুসলমানদের চেতনায়ও তেমনি এদেশের চাইতে আরব ইরান নিকট হয়ে উঠে। কিন্তু কায়কোবাদ এই দ্বিবিধ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত ছিলেন। কায়কোবাদের কবি-মানসে সর্বদাই সংকটের গভীরে পৌঁছার মতো একটি প্রজ্ঞা কার্যকর ছিল। তাই কায়কোবাদ একজন মুসলমান হয়েও একজন বাঙালি। এবং তাঁর কাছে বাঙালিদের ঐতিহ্য মানে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ঐতিহ্য। দেশকে পরাধীনতার শৃঙখল থেকে মুক্ত করতে হলে হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত প্রয়াস ও জাগরণ দরকার। এ কারণে হিন্দু মুসলমানের সম্প্রীতি কামনা তাঁর কবি মানসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যার মূলে রয়েছে অত্যন্ত সুন্দর, উদার ও অসম্প্রদায়িক মনোভাব এবং সুগভীর দেশপ্রেম।
কায়কোবাদের ইতিহাস চেতনা উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যে তাৎপর্য মন্ডিত। জাতীয় জীবনের বিপর্যয়ে থেকে জাতিকে রক্ষার তাগিদে তিনি ‘মহাশ্মসান’ কাব্য রচনা করেন। এই কাব্য রচনা করতে গিয়ে তিনি এমন এক বিষয় বেচে নিলেন যা হিন্দু মুসলমান উভয় জাতির বীরত্ব, সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগে পূর্ণ এবং উজ্জ্বল। কাব্য মধ্যে কায়কোবাদ উভয় জাতিকেই সমান মর্যাদা ও সমান গুরুত্ব দিয়ে একেছেন। পরিণতিতে জয় পরাজয় আছে বটে কিন্তু তা কাবির কাছে প্রধান্য পায় নি। কারণ, তিনি উপলব্ধি করতে পেরে ছিলেন যে, সাময়িকভাবে এই যুদ্ধে কোনো পক্ষের জয় হলেও পরিণামে উভয় সম্প্রদায়েরই ধ্বংস নির্মিত হয়েছে এই মহাশ্মসানে। কবি পরম মমতায় তাই উচ্চারণ করেছেন-
এই সেই পানিপথ? দারুণ প্রান্তর।
হিন্দুর সৌবভাগ্যমান যে রণ প্রাঙ্গণে
হয়েছিল নির্বাপিত জনমের মত।
এই সেই স্থান? সেই ভীষণ শ্মসান।
আর এ কারণে দেশ অচিরেই পরাধীনতার শৃঙখরে আবদ্ধ হয়েছে। এ চরম সত্যকে কায়কোবাদ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই কায়কোবাদ ইতিহাস অবলম্বন করেছেন এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে জাতিকে আহ্বান জানিয়েছেন। তবে কায়কোবাদ শুধু স্বজাতির মুক্তি কামনা করেননি, তিনি উভয় সম্প্রদায়ের মুক্তি কামনা করেছেন। আর এটাই হলো কায়কোবাদের চিন্তা চেতনা এবং শিল্প সাধনার বৈশিষ্ট্য, যা উনিশ শতকের প্রেক্ষিতে তাঁকে মহৎ ও অতুলনীয় করে রেখেছে।
‘মহাশ্মাসান’ কাব্যের ন্যায় কায়কোবাদের আরেকটি ইতিহহাস নিষ্ঠ কাব্য হলো- ‘মহরম শরীফ’ ১৯৩৩ কাব্য। কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার সত্যনিষ্ঠ ইতিবৃত্ত হলো মহরম শরীফ কাব্য। কারবালা কাহিনীর ইতিহাসকে বিকৃত করে ইতোপূর্বে রচিত গ্রন্থ সমূহের তীব্র সমালোচনা করে কায়কোবাদ এই কাব্যখানি রচনা করেন। বস্তুত, সত্য ঘটনাকে তুলে ধরার মহৎ প্রেরণার বশবর্তী হয়ে কবি ‘মহরম শরীফ’ কাব্য রচনা করেন। কবি কারবালার ঘটনার আবেগকে মুসলিম জাগরণের প্রেরণা হিসেবে উপস্থাপনা করতে গিয়ে উচ্চারণ করেন-
হা হোসেন হা হোসেন বালিয়া হতাশে
কাঁদিয়া উঠিল শোকে হুরপরী সব।
জলে স্থালে মরু মাঠে উঠিল চৌদিকে
হা হোসেন হা হোসেন হা হোসেন রব।
মোটকথা, মহরম শরীফ একই সাথে ইতিহাস এবং কাব্য। এ কাব্য রচনা করে কবি মুসলিম কাব্যমোদিদের রসপিপাসা নিবৃত্ত করেছেন এবং অন্যদিকে ঐতিহাসিকদের খোরাক জুগিয়েছেন।
‘শিবমন্দির’ কাব্য রচনা করেও কায়কোবাদ ইতিহাস চেতনার পরিচয় দিয়েছেন। এই কাব্যটি আসলে একটি সত্য ঘটনার ইতিবৃত্ত। কথিত আছে ভাওয়ালের এক মুসলিম পরিবারের সত্য কাহিনী নিয়ে কবি এই কাব্য রচনা করেন।
‘কায়কোবাদের ইতিহাস আশ্রয়ী কাব্যেই যে ইতিহাস আছে এমন নয়।’ বরং তাঁর খন্ড কবিতায় বা গীতি কবিতায়ও ইতিহাসের স্পর্শ আছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘অশ্রুমালা’ এবং ‘অমিয়ধারা’ কাব্যের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। অশ্রুমালা কাব্য আত্মগত গীতিকবিতার সংকলন হলেও ‘সিরাজের সমাধি’ কবিতায় কবির ইতিহাস নিষ্ঠ কবি-মানসের পরিচয় পাওয়া যায়-
এই সেই সমাধিগৃহ?- এই স্থানে হায়
বঙ্গের গৌরব সূর্য্য চির অস্তমিত।
এই স্থানে, কি বলিব বুক ফেটে যায়
স্মরিলে সে কথা প্রাণ হয় আকুলিত।
অমিয়ধারা কাব্য গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডের অনেক কবিতার মধ্যে কবির ইতিহাস চেতনার স্বরূপটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষত, ‘মোশ্লেমের জাতীয় গৌরব’, ‘তুমি কি ঘুমায়ে রবে’, ‘ইসলাম’, ‘অতীতের স্বপ্ন’ ইত্যাদি কবিতায় জাতীয় জীবনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নান্দনিক প্রেরণায় উন্মোচিত-
মোশ্লেমের গৌরবগাথা ভুলিতে যে নারি
সে কথা স্মরণ হলে চক্ষে বহে বারি।
মোশ্লেম ঐশ্বর্য বীর্য যাহা ছিল ভবে,
ধুলাতে মিশায়ে গেছে নীরবে নীরবে।
বস্তুত, সাহিত্য সাধনার এক অনিবার্য চেতনা থেকেই কায়কোবাদ ইতিহাস নিষ্ঠ। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শরনের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় জীবনের জাগরণ ও মুক্তি প্রত্যাশা করেছেন। ফলে কোনো কোনো কবিতার শিল্প চ্যুতি ঘটলেও সামগ্রিকভাবে কায়কোবাদের সাহিত্য সাধনা বাঙালি পাঠকের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে গেছে।
*****************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910