
NTRCA College : জীবনানন্দ দাশের ইতিহাস চেতনার স্বরূপ
প্রশ্ন : জীবনানন্দ দাশের ইতিহাস চেতনার স্বরূপ।
আলোচনা : তিরিশোত্তর বাংলা কবিতার ইতিহাসে কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯-১৯৫৪ ছিলেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত এক বিরলপ্রজ কবি প্রতিভা। প্রধানত ইতিহাসচেতনাই তাঁকে স্বতন্ত্র ধারার কবি হিসাবে চিহ্নিত করেছে। তিনি তাঁর কবিতায় ইতিহাসকে নানা প্রেক্ষিতে এবং নানা মাত্রায় ব্যবহার করেছেন। ইতিহাস ও ঐতিহ্যবোধ জীবনানন্দ দাশের কবিতায় হয়ে উঠেছে সমস্ত সৃষ্টিশীল প্রেরণার উৎস।
যুদ্ধ বিপর্যস্ত সমকালীন বিশ্বের সম্ভাবনাহীনতা থেকে কবি কখনও মগ্ন হয়েছেন ইতিহাসের স্মৃতি ও শ্রুতিতে; কখনো এই ইতিহাসকে কবি অনাগত ভবিষ্যতের সৃষ্টি প্রেরণার নতুন মাত্রা দিয়েছেন। ইতিহাস চেতনা কবিকে সংযুক্ত করেছে ঐতিহ্য ও সভ্যতার আদি উৎসের সঙ্গে। কবি অস্তিতে বহমান ইতিহাসবোধ কিন্তু চেতনায় জাগ্রত সমকাল।
জীবনাননন্দের কাব্যে ইতিহাসচেতনার একান্ত ক্রমবিকাশ পরিলক্ষিত হয়। ‘ঝরাপালক’ থেকেই এর সূচনা। মানব বেদনার মুক্তি আকাঙক্ষী কবি এ কাব্যে সমকালীন ইতিহাসকে প্রেরণা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ‘ধূসর পান্ডুলিপি’তে কবির সর্বব্যাপী মৃত্যুচেতনা ও জড়ত্ব আচ্ছন্ন করে রেখেছে ইতিহাস মগ্নতাকে।
কবির ইতিহাস নিমজ্জন ‘বনলতা সেন’ কাব্যে পেয়েছে স্পষ্টতা। এ কাব্যের ‘বনলতা সেন’ কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে ইতিহাসের মহাযাত্রায় চিরচলমান এক ক্লান্ত মানবের পরিপূর্ণ শান্তিময়তায় উপনীত হবার কথা। ইতিহাস, ভূগোল, বিলুপ্ত সভ্যতার পটভূমিকায় কবি তাঁর অনন্ত পরিক্রমার কথা বলেছেন। এখানে ইতিহাস, মহাকাল ও স্থান এক অবিভাজ্য সত্তায় রূপান্তরিত।
অতিক্রান্ত ইতিহাস ও সভ্যতার প্রেক্ষিতে বনলতা সেন কবিতাটি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় ও ব্যাপ্তিতে প্রাণময়-
“সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে।” [বনলতা সেন/বনলতা সেন]
যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ক্ষয়িঞ্চু অবক্ষয়িত বাস্তবতায় চিরায়ত প্রেম ও সৌন্দর্যের ধারণাও বিপন্ন হয়ে উঠেছে। বর্তমানের জটিল অস্তিত্ব বিনাশক সময় থেকে অপসৃত হয়ে কবি নিমজ্জিত হন অতীত ইতিহাসের কেন্দ্র; অন্বেষণ করেন লুপ্ত প্রেম ও সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতা। ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতায় কবি ইতিহাসচারী সভ্যতার নি:শব্দ দ্রষ্টা-
“ভারতসমুদ্রের তীরে
কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে
অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে
আজ নেই, কোন এক নগরী ছিল একদিন।” [নগ্ন নির্জন হাত/বনলতা সেন]
ইতিহাসের সেই ধূসর প্রদোষে ছিলেন কবি এবং সেই সঙ্গে ছিল-
“আর তুমি নারী
এই সব ছিল সেই জগতে একদিন।”
বিশ্বের বিরূপতা ও দুঃসময় থেকে পরিক্রমণকারী কবি মগ্নচৈতন্যে অবগাহন করেছেন এবং অবচেতনার পথ ধরে নক্ষত্রলোকে সন্ধান করেছেন তাঁর বিগত বিষ্মাতা সৌন্দর্যময়ীদের । ‘হাওয়ার রাত’ কবিতায়-
“যে রূপসীদের আমি এশিরিয়ায়, মিশরে, বিদিশায় মরে যেতে দেখেছি
কাল তারা অতিদূর আকাশের সীমানার কুয়াশায় কুয়াশায় দীর্ঘ বর্শা হাতে
করে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেছ যেন।” [হাওয়ার রাত/বনলতা সেন]
ব্যক্তি প্রেমের ব্যর্থতা ও অচরিতার্থতাকেও কবি ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বিন্যাস করেছেন। কখনো কখনো এই ব্যক্তিক উপলব্ধি বৈশ্বিক ও অনুভূতিতে লীন হয়েছে। ‘সুরঞ্জনা’ কবিতায় আত্ম সর্বস্ব অপ্রাপনীয়তার বেদনা তুল্যমূল্যতা পেয়েছে সভ্যতার ক্লান্তি ও ধ্বংসের সঙ্গে। ইতিহাস শ্রুত সভ্যতার অনুষঙ্গে জীবনানন্দ দাশ ব্যক্তি আকাঙক্ষাকে বিশ্বানুভূতিতে একাত্ব করেছেন-
“গ্রীক হিন্দু ফিনিশীয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন
শুনেছ ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা নগরীর গায়ে
কী চেয়েছ ? কী পেয়েছ? গিয়েছে হারায়ে”
জীবনানন্দের কবিতায় ইতিহাস চেতনা ও মৃত্যুচিন্ত কখনো কখনো একার্থক হয়ে উঠেছে। ‘বনলতা সেন’ কাব্যের ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ কবিতায় ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ও অনুষঙ্গ মৃত্যু অভিজ্ঞতায় বিলীন-
“হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো
চারিদিকে চিরদিন রাত্রির নিধান
বালির উপরে জ্যোৎস্না দেবদারু ছায়া ইতস্তত
বিচূর্ণ ঘাসের মতো: দ্বারকার; দাঁড়ায়ে রয়েছে মৃত ম্লান।”
‘রূপসী বাংলা’ কাব্যে জীবনানন্দের ইতিহাস চেতনা ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত । লোকায়ত বাংলা ঐতিহ্য ও পুরাণ কথার সঙ্গে কবির ইতিহাস মনস্কতা ও সম্পৃক্ত হয়ে আছে। প্রকৃতি-আচ্ছন্ন ঐতিহ্যকেন্দ্রিক বাংলার যে সনাতন জীবন-প্রবাহ-ইতিহাসও তার এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। ‘রূপসী বাংলা’য় ইতিহাস চেতনা এই অনুষঙ্গেই ব্যবহৃত-
“তখন এ জলসিড়ি শুকায় নি, মজে নি আকাশ
বল্লাল সেনের ঘোড়া, ঘোড়ার কেশর ঘেরা ঘুঙুর জিনের
শব্দ হতো এই পথে।”
ইতিহাস চেতনাকে জীবনানন্দ দাশ কেবল অতীতের ইতিবৃত্ত হিসাবেই বিবেচনা করেন নি। ইতিহাস একই সঙ্গে মানবসভ্যতাকে মুক্ত করে। অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের সঙ্গে মহাকালের নিরবচ্ছিন্ন প্রবহমানতায় ইতিহাস এক অনি:শেষ প্রেরণার উৎস। জীবনানন্দের ‘সাতটি তারার তিমির’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ এই কাব্যগুলোতে ইতিহাস চৈতন্য কবিকে প্রাগ্রসর করেছে বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে। ইতিহাসচৈতন্য কবির সমাজ চৈতন্যকে করেছে বিশ্বপ্রসারিত, আর্ন্তজাতিক ও মানবমুখী। সমকালীন বিশ্ব-ইতিহাসকে কবি মানবতার বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই নির্যাতিত, শোষিত মানবাত্মার বেদনা ও দুঃখ আফ্রিকার প্রতীকে ব্যক্ত করেছেন-
“কতবার হটেনটট জুলু দম্পতীর প্রেমের কথাবর্তার ভিতর
আফ্রিকার সিংহকে লাফিয়ে পড়তে দেখলাম।” [আজকের এক মুহূর্ত/ মহাপৃথিবী]
সাতটি তারার তিমির কাব্যে সমাজ সচেতনা কবি উপলব্ধি করেছেন সমকালের বিনাশী অন্ধকার। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থচেতনার সংঘাত সৃষ্টি করেছে যুদ্ধ, মারী ও মন্বন্তর। মানবতা ও মনুষ্যত্ব আগ্রাসী শক্তিসমষ্টির প্রতাপে অবমানিত। মানবতা ও নির্যাতিত বিশ্বমানবের মুক্তি অর্জনে কবি দৃষ্টিপাত করেন ইতিহাসও সভ্যতার চলিঞ্চু গতিধারার দিকে।
‘নাবিক’ কবিতায় কবি এক দুর্মর অভিযাত্রিকের কল্পনা করেছেন যে যাত্রী মহাকাল ও ইতিহাসের আদি উৎস থেকে ক্রমাগত সম্মুখগামী-
“হে নাবিক, হে নাবিক, কোথায় তোমার যাত্রা সূর্যকে লক্ষ করে শুধু
বেবিলন, নিনেভে, মিশর, চীন, উরের আরশি থেকে ফেঁসে
অন্য এক সমুদ্রের দিকে তুমি চলে যাও-দুপুর বেলায়;
শৈবালীর থেকে বায়ু-গেৎসিমানি-আলেকজান্দ্রিয়ার”[নাবিক/সাতটি তারার তিমির]
মানব সভ্যতার অগ্রগমন আবর্তিত, গতিময়। নির্মাণ ও বিনাশ, সমৃদ্ধি ও অবক্ষয়ের দ্বৈত প্রক্রিয়ায় মানব ইতিহাস চিরচলিঞ্চু। বিংশ শতাব্দীর দুঃসময় কবলিত কবি প্রতীক্ষা করেন এই জড় অন্ধকার ও অবক্ষয় অতিক্রম করার। আতঙ্কগ্রস্ত অস্তিত্বে কবি যদিও দেখছেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী আগ্রাসন; সেখানে-
“পশ্চিমে প্রেতের মতন ইউরোপ;
পূর্ব দিকে প্রেতায়িত এশিয়ার মাথা
আফ্রিকার দেবতাত্মা জন্তুর মতন ঘনঘটাচ্ছন্নতা
ইয়াঙ্কীর লেন দেন ডলারে প্রত্যয়।” [রাত্রির কোরাস, সাতটি তারার তিমির]
কিন্তু মানববিশ্বের এই হতাশা ও বিপর্যয় শাশ্বত নয়; নিরঙ্কুশ নির্ভীক আশাবাদী মানবলোকের মাঙ্গলিক যাত্রাই ইতিহাস ও সভ্যতার মৌল সত্য। জীবনানন্দ দাশ তাই শেষপযর্ন্ত গেয়ে উঠেন তিমির হননের গান।
বস্তুত, জীবনানন্দ দাশের ইতিহাসচেতনা নেতিবাচক জীবনবোধে আক্রান্ত নয়, বরং তা পরিপূর্ণভাবে ইতিবাচকচেতনা পরিস্রুত। কেননা, তিনি সমকালীন জীবনের বিরূপতা থেকে মুক্তির জন্য ইতিহাসের আশ্রয় নেন নি। তিনি ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছেন বর্তমান জীবনকে, স্বপ্নকে এবং আকাঙক্ষাকে পরিপূর্ণভাবে পাবার জন্য। তাই তাঁর ইতিহাস চেতনা ধ্বংসাত্মক নয়, সৃষ্টিশীল। মোটকথা, জীবনানন্দ দাশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যবোধ মানে অতীত অন্ধকারে নিমজ্জন নয়, বরং অন্ধকার ভেঙে ভেঙে ক্রমে আলোর পথে প্রদীপ্ত অভিযাত্রা।
***********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910