
NTRCA College : বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস মূলত রোমান্সধর্মী
প্রশ্ন : “বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস মূলত রোমান্সধর্মী”-আলোচনা কর।
উত্তর: ভারতীয় জীবনাদর্শ আর বেম্থাম, মিল ও কোঁতের জীবনদর্শন পরিস্রুত বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) ছিলেন জীবন-ঘনিষ্ট শিল্পী। মানব জীবনের বহু বঙ্কিম জটিলতা তাঁর উপন্যাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যদিও তাঁর রচিত উপন্যাসে ঐতিহাসিক উপন্যাসের সংখ্যাই বেশি। তবে ঐতিহাসিক উপন্যাস হলেও ঐ সমস্ত উপন্যাসে মানুষের আবেগ-অভ্যাস, চিন্তা-চেতনা, মনন, প্রেম-ভালবাসা বিরহ, মোহ-মায়া-মমতা, কামনা-বাসনা ইত্যাদিই প্রাধান্য লাভ করেছে। বঙ্কিমের উপন্যাসে ইতিহাসের প্রাধান্য থাকার কারণে অনেক সমালোচক এগুলোকে রোমান্সধর্মী উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সমালোচকের এই মূল্যায়ন কতটুকু যথার্থ তা আমরা আলোচ্য নিবন্ধে মীমাংসা করার প্রয়োস পাব। তবে তার আগে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ নির্ণয়ের প্রয়াস পাব। অন্যথায় আমাদের বিবেচনা বিভ্রান্তির চোরাবালিত নিমজ্জিত হতে বাধ্য।
রোমান্সের বৈশিষ্ট্য স্বরূপ নিদের্শ করতে গিয়ে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা গ্রন্থে বলেছেন-
‘রোমান্স-এর বাস্তবতা অপেক্ষাকৃত মিশ্র ধরণের; ইহা জীবনের সহজ প্রবাহ অপেক্ষা তাহার অসাধারণ উচ্ছ্বাস বা গৌরবময় মুহূর্তগুলির উপরেই অধিক নির্ভর করে। অন্তরের বীরোচিত বিকাশগুলি, মনের উঁচুসুরে বাঁধা ঝংকারগুলি, জীবনের বর্ণবহুল শোভাযাত্রা সমারোহ-ইহাই মূখ্যাত : রোমান্সের বিষয়বস্তু।’
আর এ কারণেই রোমান্সের প্রবণতা সূর্যালোক দীপ্ত, অতিপরিচিত বর্তমান অপেক্ষা কুহেলিকাচ্ছন্ন, অপরিচিত অতীতের দিকে। অতীতের বিচিত্র বেশ-ভূষা ও আচার-ব্যবহার, অতীতের আকাশ বাতাসে লঘুমেঘখন্ডের মত যে সমস্ত অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস ও কবিত্বময় কল্পনা ভেসে বেড়ায়, রোমান্স লেখক সেগুলোকেই ফুটিয়ে তুলতে যত্নবান হয়ে উঠেন। তবে এ সমস্ত অসাধারণত্বের মধ্যে রোমান্স বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক হারায় না। এ জন্যই মধ্যযুগের রোমান্সগুলো উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যকে স্পর্শ করতে পারে নি। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্সগুলো ঐতিহাসিক হয়েও বাস্তবতার মন্ত্রে অনুপ্রাণিত হয়ে সত্যের কঠোর সংযমকে স্বীকার করে নিয়েছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের সমগ্র উপন্যাসের মধ্যে নিম্ন লিখিত নয়টি উপন্যাসকে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় রোমান্সধর্মী উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এগুলো হলো- ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কপালকুন্ডলা’, ‘মৃণালিনী’, ‘যুগলাঙ্গরীয়’, ‘চন্দ্রশেখর’, ‘রাজসিংহ’, ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবীচৌধুরাণী’, ও ‘সীতারাম’। তবে এই তালিকায় সমালোচক বঙ্কিমের সামাজিক উপন্যাসকে স্থান দেননি। যদিও তাঁর সামাজিক উপন্যাসসমূহও রোমান্সের বৈশিষ্ট্য পরিস্রুত।
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস ‘দুগের্শনন্দিনী’। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দে। কাহিনী নির্মাণ, ঘটনা বিন্যাস, আবহসৃষ্টি, চরিত্র চিত্রণ ও বর্ণনার মধ্য দিয়ে দুর্গেশনন্দিনী বাংলা সাহিত্যে রোমান্স রচনার প্রথম ও সফল প্রয়াস। তাই শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন-
‘দুর্গেশনন্দিনী আমাদের উপন্যাসসাহিত্যে একটি নূতন অধ্যায় খুলিয়া দিয়াছে। যে পথ দিয়া উহার অশ্বারোহী পুরুষটি অশ্চচালনা করিয়াছিলেন তাহা প্রকৃত পক্ষে রোমান্সের রাজপথ এবং বঙ্গ উপন্যাসে প্রথম বঙ্কিমচন্দ্রেই এই রাজপথের রেখাপাত করিয়াছিলেন।’
বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কপালকুন্ডলা’। ‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে যে রোমান্স ঐতিহাসিক যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সাহিত্যসূলভ প্রেমের আশ্রয়ে ধীরে ধীরে দানা বেঁধে উঠছিল, তা কপালকুন্ডলাতে একেবারে সব ধরনের বাহ্যিক অবলম্বন ত্যাগ করে নিজ অন্তর্হিত রসের দ্বারাই পূর্ণবিকশিত হয়ে উঠেছে। ‘দুর্গেশনন্দিনী’-তে গতানুগতিকাতার যে একটা জড়তা ছিল, তা কপালকুন্ডলাতে কল্পনা শক্তির অসামান্য সাহসিকতায় সতেজ ও লীলাচঞ্চল হয়ে উঠেছে। সাগরতীরবাসিনী, কাপালিক-প্রতিপালিতা, চির-সন্ন্যাসিনী কপালকুন্ডলা মূর্তি কল্পনায় বঙ্কিম যে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, তা একজন বাঙালি ঔপন্যাসিকের পক্ষে বাস্তবিকই বিস্ময়কর। আর এ কারণেই কপালকুন্ডলা যথার্থ রোমান্সধর্মী উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের সব উপন্যাস রোমান্সধর্মী হলেও ‘চন্দ্রশেখর’, ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবীচৌধুরাণী’ ও ‘সীতারাম’ উপন্যাসে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়।
‘চন্দ্রশেখর’ বঙ্কিমচন্দ্রের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর রোমান্স প্রধানত ইংরেজ শাসনের সবর্ব্যাপী অরাজকতা ও কেন্দ্র শক্তির শিথিলতা হতে উদ্ভুত। অরাজকতা, প্রবল বৈদেশিক শক্তির আবির্ভাব অনেক সময় আমাদের শাস্ত স্রোতহীন পারিবারিক জীবনের উপর অতর্কিত দৈববিপ্লবের মত এসে পড়ে এবং এতে একটা অভাবিত গতিবেগ ও বৈচিত্র্য সঞ্চার করে। বঙ্কিমের সমসাময়িক অনেক ঔপন্যাসিক এ ধরনের কাহিনী নিয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন কিন্তু তাদের রচনা স্বাভাবিক করুণ রসের প্রবণতাকে অতিক্রম করে রোমান্সের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য পরিস্রুত হয়ে উঠতে পারে নি। চন্দ্রশেখরের রোমান্স মূখ্যত মনস্তত্ত্বমূলক হলেও এর মধ্যে চমকপ্রদ সংঘটনের অভাব নেই। বরং ফস্টের নৌকা থেকে শৈবলিনীর উদ্ধার ও শৈবলিনীর প্রত্যুপকার, গঙ্গাবক্ষে প্রতাপ-শৈবলিনীর সন্তরণ, মুসলমান কর্তৃক আমিয়টের নৌকা আক্রমণ ও ইংরেজদের মৃত্যুভয়হীন বীরত্ব প্রকাশ আলোচ্য উপন্যাসের রোমান্সধর্মিতাকে গভীর রেখায় ব্যাক্ত করেছে।
আনন্দমঠ উপন্যাসও রোমান্সের পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছে। চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোছর হয়। কেননা, আনন্দমঠের চরিত্রগুলো সম্পূর্ণভাবে বাস্তব নয়। এদের এক পা বাস্তবে এবং অন্য পা আদর্শলোকে স্থাপিত হয়েছে। বাস্তব ও রোমান্স এই উভয়রূপ উপাদানের সংমিশ্রণে তারা গঠিত। ডিকেন্সের কতগুলো চরিত্রের মত এরা একটা মধ্যলোকের অধিবাসী আদর্শলোকের কল্পনা। বাঙালির সামাজিক ও পারিবারিক আবহে স্থাপন করার কারণে এরা যতটুকু বাস্তব বলে মনে হয়, তারা ততটুকু বাস্তব। সত্যানন্দ, ভবানন্দ, জীবানন্দ-সকলেরই ব্যক্তিত্ব একটা কুহেলিকা মন্ডিত। যা এই উপন্যাসের রোমান্সধর্মিতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
দেবী চৌধুরাণী উপন্যাসে রোমান্সের বৈশিষ্ট্য থাকলেও তা আনন্দমঠের সমধর্মী নয়। যদিও আনন্দমঠের ন্যায় এখানেও উচ্চ-আদর্শ সম্পন্ন দস্যূচরিত্র কল্পনা করা হয়েছে। তবে এদের অনেক আচরণই, এমনকি এদের অলৌকিক আচরণও আমাদের বাস্তব জীবনের অনেক বৈশিষ্ট্যর সাথে মিলে যায়। প্রকৃতি বর্ণনাতে বঙ্কিম এই উপন্যাসে যথার্থ কবি প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। আর এই প্রকৃতিলোকের রহস্যময় বর্ণনাই এই উপন্যাসে এক ধরনের রোমান্সের আবহ সৃষ্টি করেছে।
সীতারাম উপন্যাসে ধর্মতত্ত্ব প্রাধাণ্য পেলেও এটি ঔপন্যাসিকের অন্তর্দৃষ্টিকে ছাপিয়ে উঠতে পারে নি। বরং চরিত্রের সূক্ষ্ম পরিবর্তন সংঘটনে ও এর কারণ বিশ্লেষণ গ্রন্থকার আশ্চর্য নিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে অনেক সমালোচক ইংরেজি উপন্যাসের সাথে তুলনা করে সীতারাম উপন্যাসের রোমান্সধর্মিতাকে স্বীকার করতে চায় নি। কিন্তু শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ইংরেজি উপন্যাসে আবহ ও বাংলা উপন্যাসের আবহের পার্থক্য নির্দেশ করে সীতারামকে যথার্থ রোমান্সধর্মী উপন্যাস হিসেবেই আধ্যায়িত করেছেন। তাছাড়া শ্রী চরিত্র চিত্রণও রোমান্সের বৈশিষ্ট্যকেই প্রতিফলিত করেছে।
বস্তুত, উল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্সের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো-অতিপ্রাকৃত আবহ সৃষ্টি এবং মানব চরিত্রের অন্তগূর্ঢ় রহস্য অনুসন্ধানের চেষ্টা। বঙ্কিম ছিলেন আদর্শবাদী এবং দেশীয় বিশ্বাস ও সংস্কারের স্থিতধী। তাঁর এই আদর্শ, বিশ্বাস ও সংষ্কারকে তিনি ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষিতে স্থাপন করে উপনস্থাপন করেছেন। ফলে তার উপন্যাসে রোমান্সের আবহ একটি ভিন্নমাত্রা পেয়েছে এবং তাঁকে অধিষ্ঠিত করেছে মহৎ শিল্পীর সু-উচ্চ আসনে।
**********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910