
NTRCA College: বঙ্কিম উপন্যাসে ইতিহাস চেতনার স্বরূপ ও সাফল্য।
প্রশ্ন: বঙ্কিম উপন্যাসে ইতিহাস চেতনার স্বরূপ ও সাফল্য।
উত্তর: বাংলা উপন্যাসের সূচনা প্যারীচাঁদ মিত্রের (১৮১৪-১৮৮৩) হাতে হলেও যথার্থ শিল্পসফল উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) এর হাতেই সৃষ্টি। ভাব, বিষয় ভাষা ও গঠন কৌশলে তাঁর উপন্যাসসমূহ বাংলা সাহিত্যে স্বাতন্ত্র্য বিলাসী। সামাজিক ও ঐতিহাসকি উভয় বিষয় নিয়েই বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাস রচনা করেছেন। তবে ঐতিহাসকি উপন্যাস রচনায় তিনি দক্ষতার পরিদয় দিয়েছেন বেশি। সামাজিক উপন্যাসে তিনি যেমন সমকালীন মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা হতাশা-নৈরাশ্য সূখ ও যন্ত্রাণাকে চিত্রিত করেছেন। তেমনি ঐতিহাসিক উপন্যাসে উন্মোচিত করেছেন মানুষের চিরকালীন তথা শাশ্বত অভিপ্সাকে। তাই আমরা তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসে দেখি ওসমান, জগৎসিংহ, আয়েশা, বিমলা, তিলোত্তমা, লুৎফ-উন্নিসা, সেলিম, হেমচন্দ্র, মৃণালিনী, মনোরমা, প্রতাপ, চন্দ্রশেখর, দলিনী বেগম, শৈবলিনী, রাজসিংহ, চঞ্চলকুমারী, জেব-উন্নিসা, মোবারক, আলমগীর, সীতারাম প্রভৃতি চরিত্র ঐতিহাসকি আবহে আবতির্ত হয়েও চিরকালীন মানবীয় গুণে অনন্যা।
‘বিষবৃক্ষ’, ‘ইন্দিরা’, ‘রজনী’, ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ব্যতীত বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সব উপন্যাসই ঐতিহাসিক ঘটনা ও কাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার পশ্চাতে বঙ্কিমচন্দ্রের শিল্প মানসে প্রধানত দু’টি কারণ সক্রিয় থেকেছে। প্রথমত; উনিশ শতকের নবজাগরণের মধ্য দিয়ে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়। এত উপন্যাস রচনার সামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয় বটে কিন্তু উপন্যাসের চরিত্র হওয়ার মতো বাস্তব চরিত্র তখনও বিকাশ লাভ করেনি। দ্বিতীয়ত, পাশ্চাত্য দর্শন পরিস্রুত বঙ্কিম-মানসে স্বাভাবিকভাবে জাগ্রত হয়- আধুনিকতম ধারণা জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তা চেতনাকে ব্যাপকতর এবং সাফল্যমন্ডিত করার জন্যই বঙ্কিমচন্দ্র শরণ নেন ইতিহাসের। ‘মৃণালিনী’, ‘রাজসিংহ’, ‘আনন্দ মঠ’, ‘সীতারাম’-এই চেতনারই শৈল্পিক রূপায়ণ।
রোমান্টিক সাহিত্য রচনায় ইতিহাস সুদুর বা অনতিদুর অতীতের একটি রহস্যময়া বিস্তার করে, পাঠক পাঠিকার কল্পনাকে উজ্জীবিত করে। আবার ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত কোনো জাতিকে গৌরবোজ্জ্বল বিগত দিনগুলোর কতা স্মরণকরিয়ে দেয়, তাকে বর্তমানের হীন অবস্থা থেকে উত্তরণের শক্তি যোগায় অথবা বৃহত্তর মহিমা লাভের জন্য অনুপ্রেরণা যোগায়। এই ভাবেই ইউরোপীয় রেনেসাঁসে দেশে দেশে ঐতিহাসের পুনরুজ্জীবন লাভ করেছে, এই কারণেই Stein এর জার্মান জাতির ইতিহাস আজকের এই বিপুল জার্মান দেশকে প্রাণ প্রেরণা দিয়েছে এই জন্যই বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন-‘বাঙ্গালীর ইতিহাস চাই।’
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) কে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে অখ্যা দেয়া চলে। কারণ হুগলি জেলার গড়মন্দিরণ সম্পর্কে স্থানীয় জনশ্রুতি এবং স্টুয়ার্টের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত কাহিনীকে ভিত্তি করেই এই উপন্যাস রচিত হয়েছে। তবে এও সত্য যে দুর্গেশনন্দিনীতে ইতিহাস রোমান্সর উপাদান মাত্র।
ইতিহাসে ওসমান খাঁ ও তার দুঃসাহসিক বীর্ষবত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। ওসমান চরিত্র সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের উক্তি-‘ওসমান পাঠানকুল তিলক। যুদ্ধ তাঁহার স্বার্থসাধন ও নিজ ব্যবসায় এবং ধর্ম; সুতরাং যুদ্ধজয়ার্থ ওসমান কোনো কার্যেই সংকোচ করতেন না। কিন্তু যুদ্ধ প্রয়োজনসিদ্ধ হইলে পরাজিত পক্ষের প্রতি কদাচিৎ নিষ্প্রয়োজনে তিলার্দ্ধ অত্যাচার করতে দিতেন না।”
(২য় খন্ড ৫ম পরিচ্ছেদ)
বঙ্কিমচন্দ্রের পরবর্তী উপন্যাস কপালকুন্ডলা (১৮৬৬)। এটি রোমান্টিক প্রকৃতি-কেন্দ্রিক উপন্যাস। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের এই উপন্যাসটি যথার্থ অর্থে ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। এ উপন্যাসে ঐতিহাসিক যে অংশটুকু আছে তা কাহিনীর প্রয়োজনে মাত্র।
বঙ্কিমচন্দ্রের তৃতীয় উপন্যাস ‘মৃণালিনী’(১৮৬৯)। এখানে বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাসের সাথে স্বদেশ প্রেমকে সমন্বিত করেছেন। এ উপন্যাসে ঐতিহাসকি উপদান হিসাবে এসেছে বখতিয়ার খিলজী ও লক্ষণ সেনের চরিত্র এবং লক্ষণসেনের কাল ও সমাজ সম্বন্ধে মিনহাজুদ্দিনের ইতিহাসের বিকৃত চিত্র।
চন্দ্রশেখর (১৮৭৪) উপন্যাসের প্রধান কাহিনী চন্দ্রশেখর শৈবলিনী প্রতাপকে কেন্দ্র করে আবতির্তে। এদের ঐতিহাসকি কোনো পরিচয় নেই। তবে বঙ্কিমচন্দ্র নিটোল শিল্পকুললতায় ঐতিহাসিক চরিত্র মীরকাশেমের এবং তার সমসাময়িক কিছু ঘটনাকে এদের কাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। এ উপন্যাসের ঐতিহাসিক অংশের নায়ক মীরকাশেম। চরিত্রটি বীর, প্রেমিক ও স্বাধীনচেতা একটি পুরুষের।
বঙ্কিমচন্দ্রের ত্রয়ী উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২), ‘দেবী চৌধুরাণী’ (১৮৮০), ও ‘সীতারাম’ (১৮৮৭)। এই উপন্যাসত্রয়ে বঙ্কিমচন্দ্র অনুশীলন তত্ত্বের স্বরূপ উন্মোচন করার প্রয়াস পেয়েছেন। এই উপন্যাস ত্রয়ে ইতিহাস মুখ্য ভূমিকা পালন করে নি, বরং এখানে ইতিহাস শুধু উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসের ভূমিকার এক স্থানে বলেছেন।
“পাঠক মহাশয় অনুগ্রহ পূর্বক আনন্দমঠ বা দেবী চৌধুরাণীকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বিবেচনা না করলে বাধিত হইব।”
বঙ্কিমচন্দ্রের ত্রয়ী উপন্যাসের অন্যতম ‘সীতারাম’ উপন্যাস। এ উপন্যাসও যথার্থ অর্থে ঐতিহাসিক উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করতে পারে নি। বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম-এর বিজ্ঞাপনে বলেছেন-
“এই গ্রন্থে ‘সীতারামের’ ঐতিহাসিক কিছুই রক্ষিত হয় নাই। গ্রন্থের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিতা নহে।” (বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম: সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা ৩য় ও ৪র্থ সংখ্যা- ১৩৫)
তবে আচার্য যদুনাথ সরকার এ উপন্যাসকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বস্তুত এ উপন্যাসের যে সমস্ত চরিত্র ও ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে তা যথার্থভাবে ঐতিহাসিক উপন্যাস হওয়ার যোগ্য নয়।
তবে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসটি বিভিন্ন দিক থেকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে সার্থক। আমরা এর কাহিনী ঘটনা ও চরিত্রের বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে এর সার্থকতা ও সীমাবদ্ধতা নিরুপণের প্রয়াস পাব।
উদয়পুরের বীর রানা রাজসিংহ এবং মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মধ্যে সংগঠিত সংঘর্ষ কাহিনীকে কেন্দ্র করে রাজসিংহ উপন্যাস প্রণিত। এই উপন্যাস লেখক কর্নেল টডের ‘এ্যানালস অব রাজস্থান’ কে প্রায় সম্পূর্ণ রূপে অনুসরণ করেছেন। উপন্যসটিকে বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন-
“আমি পূর্বে কখনও ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখি নাই। দুর্গেশ নন্দিনী বা চন্দ্রশেখর বা সীতারামকে। ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যাইতে পারে না। এই প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিলাম।”
রাজসিংহ উপন্যাসে ঐতিহাসিকতা সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র সমালোচক প্রথমনাথ বিশী বলেন-
‘ঐতিহাসিক রসটি...রাজসিংহে পুরামাত্রায় বিরাজমান। তা যদি হয়, তবে অন্যগুলোর সঙ্গে রাজসিংহের পার্থক্য মাত্রাগত দাড়ায়, গুণগত নয়। বঙ্কিমচন্দ্র মাত্রাধিক্যকেই লক্ষ্য করেছেন তাই অন্যগুলোর ঐতিহাসিকত্ব স্বীকার করতে চান নি।...পৃথিবীর ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে রাজবিংঙ্গের স্থান একেবারে প্রথম সারিতে।” [বঙ্কিমসরণী: প্রথমনাথ বিশী কালবাতা ১৯৮৮]
বস্তুত কাহিনী বিন্যাস, ঘটনা ও চরিত্র নির্বাচনে রাজসিংহ উপন্যাস যথার্থ অর্থেই ঐতিহাসিক উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করেছে যদিও বঙ্কিমচন্দ্র কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ঘটনা বিন্যাসে স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন।
মহাকাব্যোপম উপন্যাসের ধীরোদাত্ত নায়ক রাজসিংহ বীর্যে, ব্যক্তিত্বে, শরণাগতের ত্রাণে, লোক জ্ঞানে তিনি পুরুমোত্তম রাজপুত্র শ্রেষ্ঠ। উপন্যাসের দাবীতে কল্পনার বর্ণলোপে ইতিহাসকে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত করেছেন লেখক। শরণার্থিনী রাজপুত কন্যা চারুমতী-ই কাহিনীর রোমান্টিক নায়িকা চঞ্চলকুমারী। তাকে কেন্দ্র করেই ভারতব্যাপ্ত রাজপুত্র মোগলের মাহাসমর।
আরঙ্গজেবের রাজনীতি রণনীতি এবং চরিত্র প্রবণতা বর্ণনায় বঙ্কিম বস্তুনিষ্ঠ হলেও কর্নেল টডের রাজস্থান অনুসরণের ফলে কিছু কিছু ঐতিহাসিক ক্রটি এতে ঘটেছে। তাছাড়া কয়েকটা ব্যাপারে বঙ্কিমচন্দ্র ঐতিহাসিক স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এগুলো সত্ত্বেও কাহিনীর অধিকাংশ চরিত্র প্রাণরসে সঞ্জীবিত। তাদের উপস্থাপনা ও বিকাশ ইতিহাস সম্মত। এই প্রসঙ্গে সর্ব প্রথম স্মরণীয় পুরুষ বাদশা আওরঙ্গজেব।
মবারক আলি রাজসিংহ উপন্যাসের অন্যতম পার্শ্ব চরিত্র। কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তিতে মবারক চরিত্রটি চিত্রিত কি না তা নিঃসন্দেহে বলা কঠিন। জেব উন্নিসার প্রণয়ী রূপে অকিলমান খানের নাম আমরা ইতিহাসে পাই। অনুমান করা যেতে পারে যে, এই অকিলমান খানের অনুসারণেই মবারক চরিত্রটি সৃষ্টি হয়েছে। তবে মবারক আলী চরিত্রটি দ্বন্দ্ব সংঘাতে জটিল। দরিয়া বিবির ভালবাসায় মবারকের তৃপ্তি নেই, সে জেব উন্নিসার লালসাবহ্নিতে মৃত্যুবাসী পতঙ্গ। বস্তুত, মানবরসে মবারক চরিত্রটি ইতিহাসকে ছড়িয়ে অনন্যতা লাভ করেছে।
বস্তুত, রাজসিংহ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র ইতিহাসকে ব্যবহার করেছেন উপন্যাসের উপাদান হিসেবে। ঐতিহাসিক ঘটনা বঙ্কিমচন্দ্রের লক্ষ্য নয়। বঙ্কিমচন্দ্রের মূল লক্ষ্য হল-ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে নরনারীর চিরায়ত হৃদয় সংঘাত ও জীবন জিজ্ঞাসাকে রূপায়িত করা। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাকে থাকলেও রাজসিংহ উপন্যাস ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে শিল্প সফল।
********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910