
NTRCA College: বলাকা কাব্যে অনুসৃত গতিবাদের স্বরূপ
প্রসঙ্গ : বলাকা কাব্যের মূল ভাব আলোচনা কর।
অথবা, বলাকা কাব্যে অনুসৃত গতিবাদের স্বরূপ ব্যাখ্যা।
অথবা, তত্ত্বের সাথে জীবনের যোগ বলাকা কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য-আলোচনা কর।
উত্তর: ‘বলাকা’ ১৯১৬ রবীন্দ্রনাথের ১৮৬১-১৯৪১ শ্রেষ্ঠ কাব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য, গীতালিতে রবীন্দ্র প্রতিভায় যে অধ্যাত্ম চেতনার প্রকাশ দেখা যায় তাতে মনে হয়েছিল অধ্যাত্ম রসে নিমজ্জনের মধ্য দিয়েই রবীন্দ্র প্রতিভার শেষ পরিণতি ঘটবে। কিন্তু অধ্যাত্তলোকের আনন্দ কবিকে বেঁধে রাখতে পারলো না। বলাকা কবি নতুন করে জীবন যৌবনের আহ্বান শুনতে পেলেন। এ কাব্যে রবীন্দ্র প্রতিভার নবজন্ম লাভ ঘটল। বলাকার রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য, আর গীতালির রবীন্দ্রনাথ থেকে ভাবৈশ্বর্যে যেমন পৃথক তেমনি কলাকৌশলেও।
‘বলাকা’য় যুদ্ধ, যৌবন, গতিবাদ, মৃত্যু চিন্তা প্রভৃতি বিষয়ক কবিতা রয়েছে। কিন্তু বলাকার মূল সুর গতিবাদের। এই গতিবাদকেই তিনি বিভিন্ন কবিতার মধ্যে তুলে ধরেছেন। ফলে ‘বলাকা’র বিভিন্ন বিষয়ক কবিতার মধ্যে স্বাভাবিক ঐক্য লক্ষ করা যায়। এবং এ কাব্যের ভাষা ও আঙ্গিক ভাবের অনুগামী হয়ে একে করে তুলেছে অসামান্য শিল্পগুণ সম্পন্ন।
বিশ্বের কোন কিছুই স্থির নয়, বস্তু ও নয়। আধুনিক দার্শনিক বৈজ্ঞানিকেরা বলেন যে নিরবচ্ছিন্ন স্থান বা কাল বলে কিছু নেই। কেবল বস্তুর গতিতেই আমাদের মনে স্থান ও কালের জ্ঞান জন্মে থাকে। অতএব গতিই একমাত্র সত্য। সত্য অনন্ত প্রবহমাণ ও অবিভাজ্য। গতি রুদ্ধ হলেই সত্য জীবনহীন হয়ে জড়বস্তুতে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ ‘বলাকা’র প্রায় সব কবিতার মধ্যেই এই গতিবাদকে সত্য বলে প্রচার করেছেন। ‘ছবি’ কবিতায় একটি রূপবস্তুকে আশ্রয় করে কবি গতিতত্ত্বের চিন্তাতুন্তুটিকে উপভোগ করেছেন। এই গতিতত্ত্বের সত্যতা সম্বন্ধে তাঁর মনে কোন সন্দেহ নেই, সত্যে তিনি আগেই পৌঁছেছেন, কিন্তু এই সত্যকে তিনি যে চিন্তা ধারা অবলম্বন করে লাভ করেছেন সেই চিন্তা ধারাটিকে রূপাভিব্যক্তি দান করেছেন এই কবিতায়-
“তুমি কি কেবল ছবি শুধু পটে লিখা।
ওই যে সুদূর নীহারিকা
....................................
তুমি কি তাদের মত সত্য নও
হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি?”
কিন্তু এই যে পটে লিখা ছবিকে জড় বলে স্থিতিশীল বলে মনে করে, এতো মিথ্যা মায়া মাত্র; সৃষ্টির প্রত্যেক অণূপরমাণুও গতি ছন্দে ছুটে চলছে, এই গতি আছে বলেই তো জগৎ। কবি নিজেই তাই বলেছেন-
“কী প্রলাপ কহ কবি
তুমি ছবি?
নহে নহে, নও শুধু ছবি।
কে বলে রয়েছ স্থির রেখার বন্ধনে
নিস্তব্ধ ক্রন্দনে।”
চলাই হচ্ছে এই বিশ্বের একমাত্র সত্য স্বরূপ। থামতে গেলেই যত অনিষ্ট। কবি বলেছেন, প্রাণ প্রবাহের বিরাম নেই, তার গতির পথে ক্ষণিক বাধাই জড় বস্তুর রূপ গ্রহণ করে, কিন্তু এই বাধা যদি অকল্পনীয় বিরতিতে পরিণত হয় তা হলে সৃষ্টি নিশ্চল হয়ে পুঞ্জীভূত বস্তুর বারে পীড়িত হয়ে যাবে। নিশ্চল বস্তুর যেমন অপবিত্র, তেমনি ভয়ঙ্কর। রুদ্ধ গতিবদ্ধ জীবন অসহনীয়। তাই চঞ্চলা কবিতায় কবির উচ্চারণ-
“যদি তুমি মুহূর্তের তরে
ক্লান্তিভরে
দাঁড়াও থমকি,
তখনি চমকি
উচ্ছিয়া উঠিবে বিশ্ব পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুর পর্বতে
পঙ্গু মুক কবন্ধ বধির আঁধা
স্থুলতনু ভয়ংকরী বাধা
সবারে ঠেকায়ে দিয়ে দাঁড়াইবে পথে;”
গতিই যতি একমাত্র সত্য হয়, তা হলে তো একদিন জীবন মৃত্যুতে এসে তার চরম বিরতি লাভ করবে। তাই মৃত্যু ভাবনা এক সময় কবিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কিন্তু ক্রমশ এ ভাব কেটে যায়। কারণ গতি সত্যের কারণেই তো জীবনে এক দিন মৃত্যু আসবে। তাই কবির উক্তি-
“ভালোবাসিয়াছি এই জগতের আলো
জীবনের তাই বাসি ভালো
তবুও মরিতে হবে এও সত্য জানি।” (১৯ নম্বর কবিতা)
মৃত্যু সম্বন্ধে কবির পরিচ্ছন্ন বোধের প্রকাশ দেখা যায় বলাকার যুদ্ধ বিষয়ক কবিতাগুলোতে। বলাকা পর্বে তাই কবি অনেক বেশি সমাজ সচেতন হয়ে উঠেছেন। উদাসীন ও রোমান্টিক এই কবির অন্তরাত্মা ক্ষত বিক্ষত হয়ে ওঠে মহাযুদ্ধের বীভৎসতা, রক্তাক্ততা আর মানবেতর পরিস্থিতির জন্য। ইউরোপে তখন প্রবল সমরানল জ্বলে উঠেছে, মরণের তান্ডব নৃত্য তখন দিকে দিকে। এই যে মরণে মরণে আলিঙ্গন এর মধ্যে কবি জীবনের সার্থকতা দেখতে পান। জীবনের হাটে পুরানো সঞ্চয় নিয়ে বেচা কেনা আর কতকাল চলবে, দিনে দিনে সত্যের পুঁজি ফুরিয়ে যাচ্ছে, বঞ্চনা বেড়ে উঠছে, তাই মরণ সমুদ্র পার হয়ে জীবনকে নতুন করে দেখতে হবে। তাই কবি বলেছেন-
“বলো অকম্পিত বুকে,
তোরে নাহি করি ভয়,
এ সংসারে প্রতিদিন তোরে আমি করিয়াছি জয়।
তোর চেয়ে আমি সত্য এ বিশ্বাসে প্রাণ দিব দেখ।
শান্তি সত্য, শিব সত্য, সত্য সেই চিরন্তন এক।” (৩৭ নং কবিতা)
সৃষ্টির গতিকে একদিন মৃত্যুর মুখোমুখী হতেই হয়। কিন্তু সেইখানে সব শেষ হয়ে যায় না। সৃষ্টি ও জীবন মৃত্যুকে অতিক্রম করে নতুন গতির নতুন মুক্তির সন্ধান লাভ করে।
‘বলাকা’র যৌবন বিষয়ক কবিতাগুলো কাব্যের মুলভাবের সাথে ঐক্যসূত্রে বাধা। ‘বলাকা’র কেন্দ্রীয় সুর গতিবাদ। এই গতিবাদকে ধরতে যেয়ে রবীন্দ্রনাথ এ কাব্যে যৌবনের জয়গান করেছেন।
ভাষাই হচ্ছে ভাবের বাহন। ভাষা যদি ভাবের যথার্থ অনুগামী হয়ে ওঠে তবেই সাহিত্য হয় যথার্থ শিল্পগুণমন্ডিত। ‘বলাকা’ কাব্যে এর নিদর্শন লক্ষ করা যায়। বলাকার ভাব পরিকল্পনায় যেমন রয়েছে তির্যক অনুভূতির উপলব্ধি, ভাষাও তেমনি হয়ে উঠেছে প্রখর গতিবেগ সম্পন্ন। বলাকার কবি-ভাষা কাঙ্ক্ষিত ধ্বনি-ব্যঞ্জনা সমৃদ্ধ ও স্থিতিস্থাপক, গুণ সম্পন্ন উচ্চকিত ভাষারূপের পরিচায়ক।
এর ভাষার মধ্যে ভাব ও কল্পনার ঐশ্বর্য ক্ষমতা পরিলক্ষিত হয়। ‘বলাকা’র তীক্ষ্ণ এবং মেধাস্পর্শী ভাষার দৃষ্টান্ত-‘রক্ত আলোর মদ’, ‘যৌবনেরই পরশ মণি’, ‘স্থিরতা’, ‘চির অন্তপুর’, ‘মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল’।
‘বলাকা’র অলঙ্কার হয়ে উঠেছে ভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যেমন উপমার কথাই ধরা যাক। এর উপমা ঐশ্বর্যপূর্ণ ও কল্পনা সমৃদ্ধ এবং তীক্ষ্ণ গতিময়তায় স্নাত। যেমন-
“সন্ধ্যার রাগে ঝিলিমিলি ঝিলিমের স্রোত খানি বাঁকা
আধাঁরে মলিন হল, যেন খাপে ঢাকা
বাঁকা তলোয়ার।” [৩৬ নং কবিতা]
‘বলাকা’র ছন্দও কাব্যটিকে উচ্চ শিল্পমূল্যের অধিকারী করে তুলেছে। ‘বলাকা’তে কবি একটি নতুন ছন্দ সৃষ্টি করেছেন যার মধ্যে বিপুল শক্তি, উদ্দাম গতিবেগ এবং বন্ধনহীন আবেগ কল্পনা উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠেছে। একটি দৃষ্টান্ত-
“পুরাতন বৎসরের জীর্ণ ক্লান্ত রাত্রি
ওই কেটে গেল ওরে যাত্রী।
তোমার পথের পরে তপ্ত রৌদ্র এনেছে আহ্বান
রুদ্রের ভৈরব গান।” [৪৫ নং কবিতা]
বস্তুত, তত্ত্বের সাথে জীবনের ঐকান্তিক বন্ধনে এবং শিল্পকলার যথাযথ প্রয়োগে বলাকা কাব্য রবীন্দ্র কাব্য ধারায় অনন্য বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত শিল্প-প্রতিমা হিসেবে বাঙালি পাঠকের কাছে নন্দিত হয়েছে।
**************************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক-বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910