
NTRCA College: বাংলা ভাষার পরিচয়: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার উদ্ভব ও বিবর্তনের বিভিন্ন ধারার পরিচয়সহ ইন্দো-ইরানীয় শাখাভূক্ত ভাষাগুলোর পরিচয়
প্রশ্ন: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার উদ্ভব ও বিবর্তনের বিভিন্ন ধারার পরিচয়সহ ইন্দো-ইরানীয় শাখাভূক্ত ভাষাগুলোর পরিচয় দাও এবং বাংলা ভাষার স্থান নির্দেশ কর।
আলোচনা: ইন্দোইউরোপীয় ভাষাবংশ, তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানীদের সবচেয়ে প্রিয় ভাষাবংশ। এই ভাষাবংশকে প্রধান দুটি শাখায় ভাগ করা হয়ে থাকে। এই শাখা দুটি হলো-কেন্তুম শাখা ও শতম শাখা। এই শাখাগুলো আবার কতগুলো উপশাখায় বিভক্ত। কেন্তুম শাখার উপশাখাগুলো হলো-কেলটীয়,ইতালীয়,জর্মনীয় ও হেল্লেনীয় এবং শতম শাখায় উপশাখাগুলো হলো-ইন্দো-ইরানীয়, বালটো-শ্লাভীয়, আরমেনীয় ও আলবেনীয়। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশকে নিম্নরূপ চিত্রের সাহায্য দেখানো যেতে পারে।

নিচে প্রধান প্রধান উপশাখাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া হলো-
ইন্দো-ইরানীয় শাখা: এই শাখার পূর্ব নাম ছিল ‘ইন্দো-আর্য, শাখা। এখন বলা হয় ‘ইন্দো-ইরানীয়’ বা ‘ইন্দো-ইরানি‘ শাখা। অনুমান করা হয় প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে ভারতবর্ষে ও ইরানে এর ভাষীদের দেশান্তরের ফলে এই শাখাটি উদ্ভব হয়। এই শাখাটির ভারতীয় উপশাখাটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ । কেননা , এর অনেক প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে। ইন্দো-ইরানীয় শাখায় প্রধান দুটি শাখা হলো-ইরানি শাখা ও ভারতীয় শাখা।
ইরানীয় শাখা: ইরানীয় শাখাকে প্রাচীন,মধ্য ও আধুনিক তিনটি যুগে ভাগ করা হয়। ইরানীয় শাখার প্রাচীন ভাষাকে প্রাচীন ফারসি বলে অভিহিত করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দের পূর্ববর্তী ভাষাকে প্রাচীন ফারসি বলা হয়। মধ্য ইরানি ভাষার সময় কাল খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ৯০০ অব্দ। এই সময়ের প্রধান দুটি ভাষা হলো প্রাচীন ফারসি ও আবেস্তীয়। এর নানা নিদর্শন পাওয়া গেছে। আধুনিক ইরানি ভাষার অন্যতম কয়েকটি ভাষা হলো বালুচি, পশতু, কুর্দি ও আধুনিক ফারসি। একটি বংশপীঠিকার মাধ্যমে এই শাখাটির পরিচয় দেয়া হলো:

ভারতীয় শাখা: এই শাখাটি ইরানি শাখার চেয়ে প্রাচীনতর। এই ভাষার প্রাচীন স্তরটি পূর্ব ২০০০ থেকে ৫০০ অব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। ঋগ্বেদে এই ভাষার নিদর্শন পাওয়া গেছে। ঋগ্বেদে মোট এক হাজার সতেরোটি শ্লোক আছে। এগুলো রচিত হয়ে ছিল খ্রি. পূর্ব ২০০০ থেকে খ্রি. পূর্ব ৫০০ অব্দের মধ্যে। ভাষাবিদেরা বেদের ভাষার ধ্বনি, শব্দ ও অর্থ চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেন। এর ফলেই বিধিবদ্ধ হয় একটি সুশৃঙ্খল মান ভাষা, তাই এর নাম হয় সংস্কৃত ভাষা। সংস্কৃত ছিল লিখিত ভাষা। এই ভাষায় প্রচুর ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়। এই সময় মৌখিক ভাষাও প্রচলিত ছিল। একে বলা হতো প্রাকৃত ভাষা।
মোটকথা ভারতীয় শাখা তথা আর্য ভাষার অর্থাৎ সংস্কৃতের মোট তিনটি স্তর ছিল। এই তিনটি স্তর হলো-ক. বৈদিক সংস্কৃত ( আনুমানিক খ্রি.পূ. ১২০০-৮০০), খ. ধ্রুপদী সংস্কৃত ( আনুমানিক খ্রি.পূ. ৪০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে বিধিবদ্ধ হয়।) এবং গ. প্রাকৃতসমূহ।
বৈদিক ও ধ্রুপদী সংস্কৃতকে বলা হয়ে থাকে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা। এবং প্রাকৃতসমূহকে বলা হয়ে থাকে মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা। প্রাকৃতের কাল মোটামুটি খ্রি. পূ. ৪০০ অব্দ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাকৃত ভাষার প্রকৃত সংখ্যা জানা যায় না। তবে উল্লেখযোগ্য প্রাকৃত ভাষাগুলো হলো, শৌরসেনী, মাগধী, অর্ধমাগধী ও পৈশাচী। এই সমস্ত প্রাকৃত ভাষা থেকেই আধুনিক ভারতীয় ভাষাসমূহ উদ্ভব লাভ করেছে। তবে অনেক ভাষাবিদ ভিন্নমতও পোষণ করেন। তাঁদের বক্তব্য হলো আর্য ভাষার বিভিন্ন অপভ্রংশ থেকে আধুনিক ভারতীয় ভাষাসমূহের উদ্ভব হয়েছে।
নিচে ড. হুমায়ুন আজাদ প্রদত্ত ইন্দো-ইরানীয় ভাষা গোষ্ঠীর একটি বংশপীঠিকা দেখানো হলো। এখানে ভারতীয় শাখার আধুনিক ভাষাগুলোর উদ্ভব নির্দেশিত আছে।

***********************************
ড. এ. আই. এম. মুসা
অধ্যাপক বাংলা
www.onlinereadingroombd.com
+88 01713 211 910