
এসএসসি পরীক্ষা: ”রানার”। কবিতার আলোচনা, বিশ্লেষণ ও মূলভাব ।
রানার
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মূল কবিতা
রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে, রানার!
রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার।
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।
রানার! রানার!
জানা-অজানার
বোঝা আজ তার কাঁধে,
বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে;
রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়,
আরো জোরে, আরো জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়।
তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিছে সরে যায় বন,
আরো পথ, আরো পথ বুঝি হয় লাল ও পূর্ব কোণ।
অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিটমিট করে চায়;
কেমন করে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায়!
কত গ্রাম কত পথ যায় সরে সরে-
শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে;
হাতে লণ্ঠন করে ঠনঠন, জোনাকিরা দেয় আলো
মাভৈঃ রানার! এখনো রাতের কালো।
এমনি করেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে 'মেলে'।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।
অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।
রানার! রানার!
এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?
রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?
ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া,
পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,
রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,
দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে।
কত চিঠি লেখে লোকে-
কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে।
এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও,
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,
এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,
এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে।
দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি,-
এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি-
রানার! রানার! কী হবে এ বোঝা বয়ে?
কী হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে?
রানার! রানার! ভোর তো হয়েছে আকাশ হয়েছে লাল
আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?
রানার! গ্রামের রানার!
সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;
শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ -
ভীরুতা পিছনে ফেলে
পৌঁছে দাও এ নতুন খবর,
অগ্রগতির 'মেলে',
দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি-
নেই, দেরি নেই আর,
ছুটে চলো, ছুটে চলো, আরো বেগে
দুর্দম, হে রানার।
রানার: কবিতার গদ্যরূপ
রাতের অন্ধকারে রানার ছুটে চলেছে। তার দৌড়ানোর সাথে সাথে হাতে থাকা ঝুমঝুম ঘণ্টাটি অবিরাম বেজে চলেছে। রানারের পিঠে রয়েছে খবরের এক বিশাল বোঝা। কোনো বাধা বা নিষেধ তাকে থামাতে পারে না; সে এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে ছুটে চলে কেবল মানুষের কাছে নতুন খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
তার কাঁধে আজ জানা-অজানার অনেক দায়িত্ব। অসংখ্য চিঠি আর সংবাদের বোঝা নিয়ে সে যেন এক চলন্ত জাহাজ। রাত শেষ হয়ে আসছে, ভোর হওয়ার আগেই তাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। তাই সে আরও জোরে, আরও দ্রুত দৌড়ায়। সে এতটাই বেগে ছোটে যে বনের গাছপালাগুলো তার জীবনের ফেলে আসা স্বপ্নের মতো দ্রুত পেছনে সরে যায়। আকাশের মিটমিটে তারারা অবাক হয়ে চেয়ে দেখে—কীভাবে একজন মানুষ হরিণের মতো দ্রুতবেগে ছুটে চলে! শহর তাকে ভোরেই পৌঁছাতে হবে, কারণ সেখানে অনেক মানুষ তার আনা খবরের অপেক্ষায় আছে। হাতে থাকা লণ্ঠনটা ঠনঠন শব্দ করছে, আর অন্ধকার পথে জোনাকিরা তাকে সামান্য আলো দিয়ে সাহায্য করছে।
এভাবেই রানার নিজের জীবনের অনেকগুলো বছর শ্রম আর ঘামের বিনিময়ে পেছনে ফেলে এসেছে। ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে সে পৃথিবীর যাবতীয় খবরের বোঝা ঠিক সময়ে 'মেলে' (ডাকঘর) পৌঁছে দিয়েছে। তার দীর্ঘশ্বাসে আকাশ ক্লান্ত হয়, গায়ের ঘামে মাটি ভিজে যায়; অথচ সমাজের কাছে এদের জীবনের কোনো দাম নেই। রানার যখন পথে ছোটে, তখন তার ঘরে তার স্ত্রী একা জেগে থাকে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায়।
রানারের নিজের ঘরে চরম অভাব। অভাবের যন্ত্রণায় তার কাছে সুন্দর পৃথিবীটাও কালো ধোঁয়ার মতো মনে হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার পিঠে হাজার হাজার টাকার মনি-অর্ডার বা টাকার বোঝা থাকলেও সে ওই টাকা ছোঁয়ার কথা কল্পনাও করতে পারে না। তার সততা এমনই অটল। রাতের নির্জন পথে দস্যুর ভয় আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় ভয় হলো ঠিক সময়ে পৌঁছাতে না পারা অর্থাৎ সূর্য উঠে যাওয়া।
লোকে কত আবেগ, স্মৃতি, সুখ আর দুঃখের চিঠি লেখে। কিন্তু রানারের জীবনের কষ্টের কথা কেউ কোনোদিন পড়বে না। তার দুঃখের খবর শহরের বা গ্রামের মানুষ জানবে না; জানবে কেবল পথের ধারের ঘাস বা লতাগুল্ম। তার সব বেদনা এই কালো রাত্রির খামের ভেতরেই চিরকাল ঢাকা পড়ে থাকবে। কেবল আকাশের তারারা তার জন্য করুণায় মিটমিট করে কাঁদে।
কবি রানারকে প্রশ্ন করেছেন—এত কষ্ট করে এই বোঝা বয়ে কী লাভ? ক্ষুধার যন্ত্রণায় শরীর ক্ষয়ে ফেলে কী হবে? কিন্তু কবি আশাবাদী। তিনি দেখছেন ভোরের আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। আলোর স্পর্শে হয়তো একদিন এই শোষিত ও বঞ্চিত রানারদের দুঃখের দিন শেষ হবে। তাই কবি রানারকে সাহস দিয়ে বলছেন—ভয় আর ভীরুতাকে পেছনে ফেলে নতুন শপথের চিঠি নিয়ে আরও বেগে ছুটে চলো। কারণ, শোষণের রাত শেষ হয়ে প্রগতির নতুন সূর্য এখনই উদিত হবে। হে দুর্দম রানার, তুমি এগিয়ে চলো!
কবিতার মূলবক্তব্য
সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'রানার' কবিতার সারমর্ম হলো শ্রমজীবী মানুষের দায়িত্বশীলতা, সততা এবং তাদের প্রতি সমাজের চরম অবহেলার চিত্র। কবিতাটি এমন এক শ্রমিকের গল্প বলে, যার কাঁধে থাকে অন্যের আনন্দ-বেদনার খবরের বোঝা, কিন্তু যার নিজের কষ্টের খবর নেওয়ার কেউ নেই।
কবিতার মূল বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
- কর্তব্যনিষ্ঠা ও কষ্টসহিষ্ণুতা: রানার বা ডাকহরকরা রাতের অন্ধকারে দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছুটে চলেন। ঝড়-বৃষ্টি বা দস্যুর ভয় কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারে না। ভোর হওয়ার আগেই তাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়, যাতে মানুষ তাদের প্রিয়জনের খবর পেতে পারে। তার এই ছুটে চলা কেবল জীবিকার জন্য নয়, বরং এক মহান দায়িত্ববোধের পরিচয়।
- সততা ও নৈতিকতা: রানারের পিঠে হাজার হাজার টাকার মনি-অর্ডারের বোঝা থাকে, অথচ তার নিজের ঘরে চরম অভাব। অর্থের অভাবে তার পৃথিবী ‘কালো ধোঁয়া’র মতো মনে হলেও, তিনি পরের ধনে কখনো হাত দেন না। অভাবের চেয়েও তাঁর কাছে আদর্শ ও দায়িত্ব বড়।
- বঞ্চনা ও বৈষম্য: রানার অন্যের সুখ-দুঃখের চিঠি বিলি করলেও তার নিজের জীবনের দুঃখের খবর কোনোদিন কেউ পড়ে দেখে না। তার জীবনের আর্তনাদ ‘কালো রাত্রির খামে’ ঢাকা পড়ে থাকে। সমাজ এই নিভৃতচারী সেবকদের শ্রমকে খুব অল্প দামে কিনে নেয়।
- আশার বাণী: কবি শোষিত এই রানারদের কেবল করুণা করেননি, বরং তাদের ভেতর এক অদম্য শক্তির রূপ দেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই অন্ধকারের রাত শেষ হবেই এবং এক নতুন ভোরের সূর্যের আলোয় রানারদের সব বঞ্চনার অবসান ঘটবে।
পরিশেষে বলা যায়, কবিতাটি শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা দেয় এবং সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন প্রগতিশীল পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়।
১০ বাক্যে কবিতার মূল বক্তব্য :
সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'রানার' কবিতার মূলবক্তব্য ১০টি বাক্যে নিচে উপস্থাপন করা হলো:
১. কবিতাটিতে রানার বা ডাকহরকরাদের অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম এবং মহান দায়িত্ববোধের চিত্র ফুটে উঠেছে।
২. রানাররা রাতের অন্ধকারে পিঠে চিঠিপত্রের বোঝা নিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বিরামহীনভাবে ছুটে চলেন।
৩. ঝড়-বৃষ্টি, অন্ধকারের ভয় কিংবা দস্যুর আক্রমণ—কোনো বাধাই তাঁদের কর্তব্য পালনে বাধা দিতে পারে না।
৪. রানারের পিঠে অন্যের পাঠানো হাজার হাজার টাকার মনি-অর্ডার থাকলেও তাঁর ব্যক্তিগত সততা ও আদর্শ অটুট থাকে।
৫. নিজের ঘরে চরম অভাব এবং পৃথিবীটা কালো ধোঁয়ার মতো মনে হলেও তিনি অন্যের সম্পদ স্পর্শ করেন না।
৬. মানুষ সুখে-দুঃখে প্রিয়জনকে চিঠি লেখে, কিন্তু রানারের নিজের জীবনের কষ্টের কথা কেউ কোনোদিন পড়ে দেখে না।
৭. রানারদের এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামের বিনিময়ে সমাজ খুব অল্প মূল্য বা মজুরি দেয়।
৮. তাঁদের জীবনের সব দুঃখ আর বঞ্চনা কেবল রাতের অন্ধকারের খামেই সারাজীবন ঢাকা পড়ে থাকে।
৯. কবি এই শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন এবং তাঁদের জীবনের আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন।
১০. পরিশেষে, কবি রানারদের সাহস জুগিয়েছেন এই বিশ্বাসে যে, একদিন নতুন ভোরের সূর্য তাঁদের জীবনের সব শোষণের অবসান ঘটাবে।
সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
ক. রানার ভোরে শহরে পৌঁছে যাবে।
খ. প্রিয়জনদের কাছে যথাসময়ে খবরের বোঝা পৌঁছে দেওয়ার তীব্র দায়িত্ববোধের কারণে রানার শত ভয় সত্ত্বেও নির্জন পথে ছুটে চলেন।
রানারদের কাজ হলো মানুষের সুখ-দুঃখের সংবাদবাহী চিঠি গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। দুর্গম পথ, অন্ধকার রাত কিংবা দস্যুর ভয়—কোনো কিছুই তাঁদের পথে বাধা হতে পারে না। সময়ের সদ্ব্যবহার ও কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠাই তাঁদের নিরন্তর এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
গ. উদ্দীপকের সামাদ সাহেবের মাঝে 'রানার' কবিতার রানার চরিত্রের সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি হলো— 'অটল দায়িত্বশীলতা ও সময়ানুবর্তিতা'।
'রানার' কবিতায় দেখা যায়, রানার একজন অতি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ হলেও তাঁর দায়িত্ববোধ অসাধারণ। ঝড়-বৃষ্টি বা অন্ধকার রাতেও তিনি ক্লান্তিহীনভাবে ছুটে চলেন কেবল গ্রাহকের সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। উদ্দীপকের সামাদ সাহেবও ব্যাংকের ক্যাশিয়ার হিসেবে ৩০ বছর যাবৎ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করছেন। তিনি সবার আগে অফিসে আসেন এবং সবশেষে যান, যেন তাঁর কারণে গ্রাহকের কোনো কষ্ট না হয়। রানারের মতো সামাদ সাহেবও নিজের ব্যক্তিগত শোক বা প্রতিকূলতার চেয়ে কর্মের দায়িত্বকে বড় করে দেখেছেন। উভয়ের মাঝেই পেশাগত নিষ্ঠা ও পরার্থপরতার এই মহৎ গুণটি সাদৃশ্যপূর্ণ।
ঘ. "সামাদ সাহেব 'রানার' চরিত্রের বিশেষ দিককে ধারণ করলেও রানার স্বতন্ত্র"— মন্তব্যটি যথার্থ।
উদ্দীপকের সামাদ সাহেব ও রানার উভয়েই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতন। সামাদ সাহেব ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদেও পরদিন কাজে ফেরেন, যা রানারের ক্লান্তিহীন ছুটে চলার মতোই দায়িত্বশীলতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু রানারের জীবন সংগ্রামের প্রেক্ষাপট ও ত্যাগ আরও গভীর ও কষ্টসাধ্য।
কবিতার রানার কেবল দায়িত্বশীল নন, তিনি শোষিত ও বঞ্চিত শ্রেণির প্রতিনিধি। রানারের পিঠে টাকার বোঝা থাকলেও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে তিনি তা স্পর্শ করেন না— এই প্রখর সততা তাঁকে স্বতন্ত্র করেছে। তাঁর নিজের জীবনের দুঃখের চিঠি কেউ পড়ে না, অথচ তিনি অন্যের সুখ-দুঃখের বোঝা পিঠে বয়ে বেড়ান। সামাদ সাহেব একটি স্থিতিশীল পরিবেশে কাজ করেন, কিন্তু রানারকে প্রতিকূল প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে জীবন বাজি রেখে 'যমালয়ের পথ' দিয়ে ছুটতে হয়। সামাজিক অবজ্ঞা ও দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়েও রানার যে মহত্ত্ব দেখান, তা সামাদ সাহেবের চেয়ে ভিন্ন ও উচ্চতর। তাই বলা যায়, দায়িত্ববোধে মিল থাকলেও রানার তাঁর ত্যাগ ও সততার গৌরবে অনন্য।
(মুসা স্যার )
( প্রফেসর ড. এ. আই. এম. মুসা)
বিএ (সম্মান) এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিএইচডি. জা. বি.
ভূতপূর্ব : সহযোগী অধ্যাপক, রংপুর সরকারি কলেজ, রংপুর
গাইবান্ধা সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর
বিভাগীয় প্রধান, সরকারি পিসি কলেজ, বাগেরহাট
অধ্যক্ষ, তারাগঞ্জ সরকারি কলেজ, রংপুর।
-০-
রানার
সুকান্ত ভট্টাচার্য
[কবি-পরিচিতি: সুকান্ত ভট্টাচার্য ৩০শে শ্রাবণ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে কলকাতার কালীঘাটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ধ্বংস ও মৃত্যুর তাণ্ডবলীলা কিশোর সুকান্তকে দারুণভাবে স্পর্শ করে। এছাড়া সামাজিক নানা অনাচার ও বৈষম্য তাঁকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। তাঁর কবিতায় এই অনাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধ্বনিত প্রবল প্রতিবাদ আমাদের সচকিত করে। নিপীড়িত গণমানুষের প্রতি গভীর মমতার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর কাব্য: ছাড়পত্র, ঘুম নেই, পূর্বাভাস, অভিযান, হরতাল ইত্যাদি। ২৯শে বৈশাখ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে মাত্র একুশ বছর বয়সে কবি মৃত্যুবরণ করেন।]
রানার
রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে, রানার!
রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার।
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।
রানার! রানার!
জানা-অজানার
বোঝা আজ তার কাঁধে,
বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে;
রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়,
আরো জোরে, আরো জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়।
তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিছে সরে যায় বন,
আরো পথ, আরো পথ বুঝি হয় লাল ও পূর্ব কোণ।
অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিটমিট করে চায়;
কেমন করে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায়!
কত গ্রাম কত পথ যায় সরে সরে-
শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে;
হাতে লণ্ঠন করে ঠনঠন, জোনাকিরা দেয় আলো
মাভৈঃ রানার! এখনো রাতের কালো।
এমনি করেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে 'মেলে'।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।
অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।
রানার! রানার!
এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?
রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?
ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া,
পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,
রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,
দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে।
কত চিঠি লেখে লোকে-
কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে।
এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও,
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,
এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,
এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে।
দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি,-
এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি-
রানার! রানার! কী হবে এ বোঝা বয়ে?
কী হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে?
রানার! রানার! ভোর তো হয়েছে আকাশ হয়েছে লাল
আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?
রানার! গ্রামের রানার!
সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;
শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ -
ভীরুতা পিছনে ফেলে
পৌঁছে দাও এ নতুন খবর,
অগ্রগতির 'মেলে',
দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি-
নেই, দেরি নেই আর,
ছুটে চলো, ছুটে চলো, আরো বেগে
দুর্দম, হে রানার।
শব্দার্থ ও টীকা: রানার- ইংরেজি শব্দ 'runner'-এর আভিধানিক অর্থ যিনি দৌড়ান। এখানে 'ডাক হরকরা' অর্থে ব্যবহৃত। নতুন খবর আনার- ডাক হরকরার ব্যাগে মানুষের সুখ-দুঃখের অনেক অজানা সংবাদ থাকে। চিঠি বিলি হলে সে সংবাদ মানুষ জানতে পারে। তাই ডাক হরকরাকে নতুন খবরের বাহক বলা হয়েছে। দুর্বার- যাকে নিবারণ করা যায় না। হরিণের মতো যায়- এটি একটি উপমা। হরিণ যেমন নিঃশব্দে কিন্তু অতি দ্রুত দৌড়ায়, রানারও তেমনি। লণ্ঠন- হারিকেন বা তেল দিয়ে চালিত আলোর আধার। ভোর তো হয়েছে- আকাশ হয়েছে লাল- এটি প্রতীক। বাচ্যার্থে রাত্রির অন্ধকার শেষ হয়ে আকাশে সূর্য উঠছে। কিন্তু প্রতীকী অর্থে কষ্টের কালিমা দূরীভূত হয়ে সুখের সোনালি আলো দেখা দিচ্ছে।
পাঠ-পরিচিতি: সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'রানার' কবিতাটি কবির ছাড়পত্র কাব্য থেকে সংকলন করা হয়েছে। কবিতাটি শ্রমজীবী মানুষ রানারদের নিয়ে লেখা। তাদের কাজ হচ্ছে গ্রাহকদের কাছে ব্যক্তিগত ও প্রয়োজনের চিঠি পৌঁছে দেওয়া। রানাররা এতটাই দায়িত্বশীল যে কোনো কিছুই তাদের কাজের বাধা হয়ে ওঠে না। রাত হোক, দুর্গম পথ হোক, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হোক-নিরন্তর তাদের এই কাজ করে যেতে হয়। চিঠি মানেই সুখে-আনন্দে, দুঃখে-শোকে ভরা সংবাদ। এই সংবাদের জন্যেই অপেক্ষায় থাকে প্রিয়জনরা। প্রিয়জনদের কাছে যথাসময়ে এই খবর পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। রানারদের তাই ক্লান্তি নেই, অবসর নেওয়ার অবকাশ নেই। তারা ছুটছেন তো ছুটছেনই। এই মহান পেশায় যারা নিয়োজিত রয়েছেন তারা যে মানুষ হিসেবে কতটা মহৎ, কবিতাটিতে এই ভাবনারই প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
অনুশীলনী
কর্ম-অনুশীলন
১। 'শ্রমজীবী মানুষ যেসব পণ্য উৎপাদন করে তারা সে পণ্য ব্যবহার করতে পারে না'-শিরোনামে একটি রচনা লিখ।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১। রানারের কাছে পৃথিবীটা 'কালো ধোঁয়া' মনে হয় কেন?
ক. মেঘাচ্ছন্ন থাকায় * অভাবের তাড়নায়
গ. সূর্য না ওঠায় ঘ. কলকারখানার কারণে
২। দস্যুর ভয়ের চেয়েও রানার সূর্য ওঠাকে বেশি ভয় পায় কেন?
ক. চাকরি হারানোর জন্য খ. ডাক না পাওয়ার ভয়ে
গ. বাড়ি ফেরার তাড়া থাকায় * দায়িত্ববোধের কারণে
নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং ৩-সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দাও:
সুমন বেশ স্বেচ্ছাচারী। সব কাজই দায়সারা গোছে শেষ করে। ইচ্ছামতো অফিসে যাতায়াত করে। একদিন জরুরি সভা উপলক্ষে কর্মকর্তা অফিসে এসে দেখেন গেট বন্ধ। ফলে সমস্ত আয়োজন পণ্ড হয়ে যায়।
৩। উদ্দীপকের সুমন ও 'রানার' কবিতার রানার-এর সাদৃশ্যের দিকটি হলো তারা উভয়েই -
i. চাকরিজীবী
ii. দায়িত্ব সচেতন
iii. সেবাদানকারী
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i খ. ii ও iii
* i ও iii ঘ. i, ii ও iii
সৃজনশীল প্রশ্ন
সামাদ সাহেব ব্যাংকে ক্যাশিয়ার হিসেবে ৩০ বছর যাবৎ কর্মরত আছেন। সবার আগে অফিসে আসেন এবং সবশেষে অফিস ত্যাগ করেন। একদিন ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে অপরাহ্ণে তিনি বাড়ি যান। পরদিন যথাসময়ে তিনি ফিরে আসেন। তার কারণে কারো এতটুকু কষ্ট যাতে না হয় সে ব্যাপারে তিনি বেশ সচেতন।
ক. রানার ভোরে কোথায় পৌঁছে যাবে?
খ. 'রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে' রানার কেন ছোটে?
গ. উদ্দীপকের সামাদ সাহেবের মাঝে 'রানার' কবিতার রানার চরিত্রের সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা কর।
ঘ. "সামাদ সাহেব 'রানার' চরিত্রের বিশেষ দিককে ধারণ করলেও রানার স্বতন্ত্র" মন্তব্যটির যথার্থতা যাচাই কর। -
+88 01713 211 910