
এসএসসি পরীক্ষা: ”তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা ”। কবিতার আলোচনা, বিশ্লেষণ ও মূলভাব ।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা
শামসুর রাহমান
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙল,
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মতো চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র।
তুমি আসবে বলে ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে বলে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করল একটা কুকুর।
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতা-মাতার লাশের উপর।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে থুথুড়ে এক বুড়ো
উদাস দাওয়ায় বসে আছেন তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাড়ির এক বিধবা দাঁড়িয়ে আছে
নড়বড়ে খুঁটি ধরে দগ্ধ ঘরের।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে,
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো
সেই তেজি তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে-
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে,
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।
(সংক্ষেপিত)
কবিতার গদ্যরূপ
হে স্বাধীনতা, তোমাকে অর্জন করার জন্য আমাদের আর কতবার রক্তের নদীতে ভাসতে হবে? আর কতবার সহ্য করতে হবে আগুনের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা?
তুমি আসবে বলে সাকিনা বিবির কপাল পুড়ল অর্থাৎ তিনি নিঃস্ব হলেন, আর হরিদাসী হারাল তার স্বামীকে। তোমার আগমনের অপেক্ষায় শহরের রাস্তায় দানবের মতো চিৎকার করতে করতে এগিয়ে এল জলপাই রঙের ঘাতক ট্যাঙ্ক। পাকি বাহিনীর অত্যাচারে ছাত্রাবাস আর সাধারণ মানুষের বস্তিগুলো উজাড় হয়ে গেল। রাইফেল আর মেশিনগান থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ে মানুষ হত্যা করা হলো। তোমার জন্য গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে গেল। বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে একটি কুকুর একটানা আর্তনাদ করল। এমনকি অবুঝ শিশুকেও তার বাবা-মায়ের লাশের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে হলো।
হে স্বাধীনতা, তোমার জন্য থুথুড়ে এক বুড়ো উদাস মনে দাওয়ায় বসে প্রতীক্ষা করছেন। মোল্লাবাড়ির বিধবা নারী তার পুড়ে যাওয়া ঘরের নড়বড়ে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পথের ধারে শূন্য থালা হাতে বসে আছে এক হাড্ডিসার অনাথ কিশোরী। শাহবাজপুরের জোয়ান কৃষক সগীর আলী, জেলেপাড়ার সাহসী কেষ্ট দাস, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি মতলব মিয়া আর ঢাকার সেই রিকশাওয়ালা রুস্তম শেখ—যার ফুসফুস আজ ঘাতকের গুলিতে ঝাঁঝরা (পোকার দখলে)—সবাই তোমার অপেক্ষায়। এমনকি সেই তেজি তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, যার পদভারে নতুন এক পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে, সেও রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেবল তোমার জন্য।
সারা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অমোঘ ঘোষণা আর জয়ের নিশান উড়িয়ে, যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে এই বাংলার বুকে তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।
কবিতার সারমর্ম
'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতাটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি করুণ ও গৌরবোজ্জ্বল চিত্রপট। স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় বাঙালি জাতিকে যে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও রক্তগঙ্গা পার হতে হয়েছে, কবি এখানে তারই বর্ণনা দিয়েছেন। শত্রুসেনার নির্মম আক্রমণে জনপদ ধ্বংস হয়েছে, ছাত্রাবাস-বস্তি উজাড় হয়েছে এবং হরিদাসী কিংবা সাকিনা বিবির মতো অগণিত মানুষ হারিয়েছে তাঁদের সর্বস্ব। তবে এই হাহাকারের মাঝেও কৃষক, মাঝি, রিকশাচালক ও তেজি তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সংকল্প ফুটে উঠেছে। সকল ধ্বংস ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলা তথা বাঙালির জীবনে স্বাধীনতার অনিবার্য আগমনই এই কবিতার মূল সুর।
শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতার মূলবক্তব্য নিচে ১০টি বাক্যে উপস্থাপন করা হলো:
১. কবিতাটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত বাঙালির এক অমোঘ আত্মত্যাগের মহাকাব্য।
২. স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাঙালি জাতিকে যে চরম মূল্য ও রক্তের নদী পার হতে হয়েছে, এখানে তারই বিবরণ রয়েছে।
৩. পাকি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি, বস্তি ও ছাত্রাবাস পুড়ে ছাই হওয়ার চিত্র ফুটে উঠেছে।
৪. ‘হরিদাসী’ ও ‘সাকিনা বিবি’র মতো চরিত্রের মাধ্যমে যুদ্ধে স্বামীহারা নারী ও সর্বস্ব হারানো মানুষের হাহাকার প্রকাশ পেয়েছে।
৫. অবুঝ শিশুর মা-বাবার লাশের ওপর হামাগুড়ি দেওয়ার দৃশ্যটি যুদ্ধের বীভৎসতাকে তুলে ধরে।
৬. শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জেলে, কৃষক, মাঝি ও রিকশাচালকের মতো শ্রমজীবী মানুষের স্বাধীনতার প্রতি অদম্য আকাঙ্ক্ষা প্রদর্শিত হয়েছে।
৭. রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো তেজি তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে নতুন এক আগামীর স্বপ্ন দেখানো হয়েছে।
৮. এখানে স্বাধীনতা কেবল একটি শব্দ নয়, বরং একটি জাতির অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকার নাম।
৯. কবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এত রক্তপাত আর ধ্বংসের পর স্বাধীনতার সূর্য উদিত না হয়ে পারে না।
১০. পরিশেষে, দামামা বাজিয়ে এবং বিজয়ের নিশান উড়িয়ে বাংলার বুকে স্বাধীনতার অনিবার্য আগমনী বার্তার মাধ্যমেই কবিতাটি শেষ হয়েছে।
কবিতার মূলবক্তব্য ৫টি পয়েন্টে :
১. চরম আত্মত্যাগ: স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাঙালি জাতিকে যে অগণিত মানুষের প্রাণ বিসর্জন ও রক্তের নদী পার হতে হয়েছে, কবি এখানে তার করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।
২. মানবিক বিপর্যয়: পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় সাকিনা বিবির মতো মানুষের নিঃস্ব হওয়া, হরিদাসীর স্বামী হারানো এবং অবুঝ শিশুর অনাথ হওয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের চরম নির্মমতা প্রকাশ পেয়েছে।
৩. জনপদ ধ্বংসের চিত্র: ছাত্রাবাস, বস্তি এবং গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে হানাদার বাহিনীর ধ্বংসলীলা ও বাঙালির ভিটেমাটি হারানোর হাহাকার বর্ণিত হয়েছে।
৪. সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ: কৃষক, জেলে, মাঝি ও রিকশাচালক থেকে শুরু করে তেজি তরুণ মুক্তিযোদ্ধারাই যে স্বাধীনতার জন্য অধীর প্রতীক্ষায় উন্মুখ, তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
৫. অনিবার্য বিজয়: এত ত্যাগ, ধ্বংস আর হাহাকারের পর কবি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, সকল বাধা পেরিয়ে বিজয়ের নিশান উড়িয়ে বাংলার বুকে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হবেই।
এক বাক্যে কবিতার মূলবক্তব্য:
"বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর ধ্বংসযজ্ঞ এবং রক্তস্নাত ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের সুনিশ্চিত আকাঙ্ক্ষাই এ কবিতার মূল উপজীব্য।"
সৃজনশীল প্রশ্ন
পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই শাসকগোষ্ঠী শুরু করে নানা বৈষম্যনীতি। তারা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার হীন ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু এদেশের ছাত্র-শিক্ষকসহ আপামর জনতা এর বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, বিসর্জন দেয় বুকের তাজা রক্ত।
ক. কার সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল?
খ. জলপাই রঙের ট্যাঙ্ককে কবি দানব বলেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকের যে ভাবটি 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় পাওয়া যায় তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. "তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় বর্ণিত দিকগুলোর একটিমাত্র দিক উদ্দীপকে ফুটে উঠেছে"- মন্তব্যটির যথার্থতা
বিশ্লেষণ কর।
‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতার আলোকে সৃজনশীল প্রশ্নটির উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
ক.
শামসুর রাহমানের কবিতায় স্বাধীনতার জন্য হরিদাসীর সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল।
খ.
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা শহরে যে ট্যাঙ্ক নিয়ে আক্রমণ চালায়, তার ভয়াবহ ধ্বংসক্ষমতা ও নিষ্ঠুরতা বোঝাতে কবি সেটিকে 'দানব' বলেছেন। দানব যেমন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ও দয়াহীন, জলপাই রঙের ট্যাঙ্কগুলোও তেমনি অমানবিক গর্জন তুলে ছাত্রাবাস ও বস্তি উজাড় করে দিয়েছিল।
গ.
উদ্দীপকের বৈষম্যবিরোধী চেতনা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ভাবটি ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতার মূল চেতনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভাষা-বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির রক্তদানের চিত্র ফুটে উঠেছে। কবিতাতেও কবি দেখিয়েছেন, স্বাধীনতা কোনো সস্তা অর্জন নয়; এর জন্য অগণিত মানুষকে 'রক্তগঙ্গায়' ভাসতে হয়েছে। উদ্দীপকের ছাত্র-শিক্ষকদের মতো কবিতাতেও সগীর আলী, রুস্তম শেখ ও কেষ্ট দাসের মতো সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখেছিলেন। মূলত শোষণমুক্ত হয়ে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে আত্মত্যাগ, উদ্দীপক ও কবিতা উভয় ক্ষেত্রেই সেই বীরত্বগাথা ও দেশপ্রেমের ভাবটি প্রতিফলিত হয়েছে।
ঘ.
"তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় বর্ণিত দিকগুলোর একটিমাত্র দিক উদ্দীপকে ফুটে উঠেছে"— মন্তব্যটি যথার্থ। নিচে এর বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
উদ্দীপকটি মূলত ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অধিকার আদায়ের সংগ্রামের একটি খণ্ডচিত্র। কিন্তু শামসুর রাহমানের কবিতার ক্যানভাস আরও অনেক বেশি বিস্তৃত ও বহুমুখী।
কবিতায় স্বাধীনতার জন্য বাঙালির অপরিসীম ত্যাগের পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার যে চিত্র বর্ণিত হয়েছে, তা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। কবিতায় দেখা যায়—
১. নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ: ছাত্রাবাস-বস্তি উজাড় ও জলপাই রঙের ট্যাঙ্কের তাণ্ডবে গ্রামের পর গ্রাম ছাই হওয়া।
২. মানবিক বিপর্যয়: মা-বাবার লাশের ওপর অবুঝ শিশুর হামাগুড়ি কিংবা অনাথ কিশোরীর শূন্য থালা—যা যুদ্ধের করুণ বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
৩. প্রকৃতির প্রতিবাদ: এমনকি প্রভুর বাস্তুভিটায় কুকুরের আর্তনাদ প্রকৃতির হাহাকারকে ফুটিয়ে তোলে।
৪. সর্বজনীন অংশগ্রহণ: জেলে, কৃষক থেকে শুরু করে ঢাকার রিকশাওয়ালার মতো আপামর জনসাধারণের প্রতীক্ষা ও বিসর্জনের চিত্র এখানে জীবন্ত।
উদ্দীপকে কেবল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যের প্রতিবাদ ও রক্তদানের কথা আছে। কিন্তু স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য যে বিশাল 'রক্তগঙ্গা' ও 'খাণ্ডবদাহন' বা সর্বব্যাপী ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার সামগ্রিক রূপ উদ্দীপকে নেই। উদ্দীপকটি মূলত বীরত্বের একটি খণ্ড অংশ মাত্র, আর কবিতাটি হলো মুক্তিযুদ্ধের একটি অনবদ্য সাহিত্যিক দলিল। তাই উদ্দীপকের ভাবটি কবিতার সামগ্রিক ভাবের একটি অংশ মাত্র।
-০-
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা
শামসুর রাহমান
[কবি-পরিচিতি: শামসুর রাহমান ১৯২৯ সালের ২৩শে অক্টোবর ঢাকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পাড়াতলী গ্রাম। তিনি ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর পেশা ছিল সাংবাদিকতা। তিনি একনিষ্ঠভাবে কাব্য সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের প্রত্যাশা, হতাশা, বিচ্ছিন্নতা, বৈরাগ্য ও সংগ্রাম তাঁর কবিতায় সার্থকভাবে বিধৃত। তাঁর প্রধান কাব্য: প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, রৌদ্র করোটিতে, বিধ্বস্ত নীলিমা, নিরালোকে দিব্যরথ, বন্দী শিবির থেকে, বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে, বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর কিছু অনুবাদ-কবিতা ও শিশুতোষ কবিতা রয়েছে। শামসুর রাহমান তাঁর অনন্যসাধারণ কবি-কীর্তির জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। তিনি ১৭ই আগস্ট, ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন ।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙল,
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মতো চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র।
তুমি আসবে বলে ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে বলে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করল একটা কুকুর।
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতা-মাতার লাশের উপর।
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে থুথুড়ে এক বুড়ো
উদাস দাওয়ায় বসে আছেন তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাড়ির এক বিধবা দাঁড়িয়ে আছে
নড়বড়ে খুঁটি ধরে দগ্ধ ঘরের।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে,
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো
সেই তেজি তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে-
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে,
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।
(সংক্ষেপিত)
শব্দার্থ ও টীকা: খাণ্ডবদাহন- খাণ্ডব মূলত মহাভারতের একটি বিখ্যাত অরণ্য, যা আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। নির্বিচারে ধ্বংস করা হয়েছিল অরণ্যের প্রায় সকল প্রাণীকে। এ কবিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞকে খাণ্ডবদাহন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর- মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন হরিদাসীর স্বামী। এ কারণে বিধবা হরিদাসীর সিঁথি থেকে সিঁদুর মুছে ফেলতে হয়েছে। সনাতন ধর্মের বিবাহকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে সধবারা সিঁদুর পরেন, স্বামীর মৃত্যু হলে সিঁদুর মুছে ফেলতে হয়। হরিদাসীকেও হতে হয়েছে সিঁদুরবিহীন। যত্রতত্র -যেখানে সেখানে, সব জায়গায়; তুমি আসবে বলে... ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো -নয় মাসব্যাপী সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে। ধ্বংস করেছে ছাত্রাবাস, বস্তি। কারণ ছাত্রজনতার প্রবল প্রতিবাদ আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ছাত্রাবাস ও বস্তি। হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা চেয়েছিল প্রতিরোধের সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দিতে। তাই তারা পুড়িয়ে দিয়েছিল গ্রাম ও শহর। নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল বাঙালি জাতিকে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে অপরিসীম আত্মত্যাগের মাধ্যমে। থুথুড়ে এক বুড়ো- বয়সের ভারে বিধ্বস্ত লোক, যার বয়স অনেক হয়েছে এবং চলাচল করতে যার কষ্ট হয়; রুস্তম শেখ ... এখন পোকার দখলে- রুস্তম শেখ নামের এক রিক্সাওয়ালা যিনি যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। মৃত অবস্থা বোঝানোর জন্য বলা হয়েছে 'যার ফুসফুস এখন পোকার দখলে'।
পাঠ-পরিচিতি: 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' শীর্ষক কবিতাটি শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা নামক কাব্য থেকে নেওয়া হয়েছে। কবিতাটি কবির বন্দী শিবির থেকে নামক কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। স্বাধীনতা শুধু শব্দমাত্র নয়, এটি এমন এক অধিকার ও অনুভব যা মানুষের জন্মগত। কিন্তু এই অধিকার আদায়ের জন্য বাঙালি জাতিকে দীর্ঘ কাল যেমন সংগ্রাম করতে হয়েছে তেমনি করতে হয়েছে অপরিসীম আত্মত্যাগ। ১৯৭১ সালে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে আপামর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধচলাকালে বাঙালির রক্তে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয় পাকিস্তানি যুদ্ধবাজরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে সকিনা বিবির মতো গ্রামীণ নারীর সহায়-সম্বল-সম্ভ্রম বিসর্জিত হয়েছে, হরিদাসী হয়েছে স্বামীহারা, নবজাতক হারিয়েছে মা-বাবাকে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের ছাত্রাবাস আক্রমণ করে ছাত্রদের হত্যা করে, শহরের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গণহত্যা চালায়, পুড়িয়ে দেয় গ্রাম ও শহরের লোকালয়। এর প্রাকৃতিক প্রতিবাদ ওঠে পশুর কণ্ঠেও। আর্তনাদ করে কুকুরও। মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক, জেলে, রিকশাওয়ালা প্রমুখ সাধারণ মানুষ আত্মত্যাগ করে। দগ্ধ হওয়া লোকালয় প্রবীণ বাঙালির আলোকিত চোখে অগ্নি ঝরায়। সেইসঙ্গে নবীন রক্তে প্রাণস্পন্দন ও আশা জেগে থাকতে দেখে কবি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন- এত আত্মত্যাগ যার উদ্দেশ্যে সেই স্বাধীনতাকে বাঙালি একদিন ছিনিয়ে আনবেই। কবিতাটি মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য সাহিত্যিক দলিল।
অনুশীলনী
কর্ম-অনুশীলন
১। কবিতাটিতে স্বাধীনতার জন্য যেসব শ্রেণি-পেশা ও সাধারণ মানুষের অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার তালিকা তৈরি কর।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১। দানবের মতো চিৎকার করতে করতে কী এসেছিল?
ক. পাকিস্তানিসেনা * ট্যাঙ্ক
গ. মাঝি ঘ. রাইফেল
২। 'তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো 'ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো'- এ পঙ্ক্তিতে কিসের চিত্র আছে?
ক. স্বাধীনতার সুর * ধ্বংসের চিত্র
গ. গণ-আন্দোলনের রূপ ঘ. মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি
নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং ৩ ও ৪-সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দাও:
চিনতে নাকি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিল যে
মুক্ত বাতাস কিনতে।
৩। উদ্দীপকের ক্ষুদিরাম 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় কাদের প্রতিনিধিত্ব করে-
i. মুক্তিযোদ্ধাদের
ii. আপামর জনসাধারণের
iii. আত্মত্যাগী মানুষদের
নিচের কোনটি সঠিক?
* i ও ii গ. ii ও iii
খ. i ও iii ঘ. i; ii ও iii
৪। এরূপ প্রতিনিধিত্বের কারণ কী?
ক. ঐক্যচেতনা খ. স্বজাত্যবোধ
* দেশপ্রেম ঘ. সাহসিকতা
সৃজনশীল প্রশ্ন
পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই শাসকগোষ্ঠী শুরু করে নানা বৈষম্যনীতি। তারা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার হীন ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু এদেশের ছাত্র-শিক্ষকসহ আপামর জনতা এর বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, বিসর্জন দেয় বুকের তাজা রক্ত।
ক. কার সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল?
খ. জলপাই রঙের ট্যাঙ্ককে কবি দানব বলেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকের যে ভাবটি 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় পাওয়া যায় তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. "তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় বর্ণিত দিকগুলোর একটিমাত্র দিক উদ্দীপকে ফুটে উঠেছে"- মন্তব্যটির যথার্থতা বিশ্লেষণ কর।
(মুসা স্যার )
( প্রফেসর ড. এ. আই. এম. মুসা)
বিএ (সম্মান) এমএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিএইচডি. জা. বি.
ভূতপূর্ব : সহযোগী অধ্যাপক, রংপুর সরকারি কলেজ, রংপুর
গাইবান্ধা সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা
সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর
বিভাগীয় প্রধান, সরকারি পিসি কলেজ, বাগেরহাট
অধ্যক্ষ, তারাগঞ্জ সরকারি কলেজ, রংপুর।
+88 01713 211 910